সোহরাব হাসান

বন্ধু আনিস আলমগীরের জামিন পাওয়ার খবরটি দেখে আশ্বস্ত হয়েছিলাম। মঞ্জুর আলম পান্নার পর আরেকজন সাংবাদিক জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসছেন, এটা আনন্দের খবর হতে পারত। কিন্তু আনিস আলমগীর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিন পেলেও তার বিরুদ্ধে অন্য মামলা থাকায় এখনই কারাগার থেকে বের হতে পারছেন না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ব্যায়ামাগার থেকে আনিস আলমগীরকে জিজ্ঞাবাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় ১৫ ডিসেম্বর তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অর্থাৎ আগে গ্রেপ্তার করে পরে মামলা দেওয়া। রাজনৈতিক সরকারের মতো অন্তর্বর্তী আমলেও হরহামেশা এসব ঘটেছে।
আইনজীবী আসলাম মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় হাইকোর্ট গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আনিস আলমগীরের জামিন প্রশ্নে রুল দেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল অ্যাবসলিউট (যথাযথ) ঘোষণা করেছেন। ফলে আনিস আলমগীর নিয়মিত জামিন পেলেন। তবে এখনই মুক্তি পাচ্ছেন না। কেননা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা রয়েছে। এই মামলায় তার জামিন আবেদনের ওপর অধস্তন আদালতে আগামী সপ্তাহে শুনানি হওয়ার কথা।
এর আগে গত ১৫ জানুয়ারি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় তার বিরুদ্ধে তিন কোটি ২৬ লাখ ৪৮ হাজার ৯৩৮ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা দিয়ে সাংবাদিক আনিস আলমগীরের আটকের ঘটনায় যখন সরকার দেশে বিদেশে সমালোচিত হচ্ছিল, তখনই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করে। কেউ দুর্নীতি করলে অবশ্যই সরকার মামলা করবে। তদন্ত হবে। কিন্তু এখানে আগে গ্রেপ্তার করে পরে তদন্ত ও মামলা করার ঘটনা ঘটেছে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার চেয়ে দুর্নীতির মামলায় জামিন পাওয়া সহজ। তারপরও আনিস আলমগীর জামিন পাবেন কি না সেটাই প্রশ্ন। এক মামলায় আটক থাকা আর একাধিক মামলায় আটক থাকার মধ্যে বস্তুগত ফারাক কম। অভিযুক্তকে কারাগারেই থাকতে হচ্ছে।
যেমনটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ক্ষেত্রে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। যখন সংবাদমাধ্যমে খবর বের হলো সেলিনা হায়াৎ আইভী ‘পরিশীলিত’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসতে পারেন, তখনই একের পর এক মামলা দিয়ে তাকে জেলে পোরা হয়। একটি মামলায় তিনি জামিন পান তো আরেকটি মামলায় তার নাম ঢুকানো হয়।
সম্প্রতি হত্যার অভিযোগসহ পৃথক পাঁচ মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই পাঁচ মামলার মধ্যে চারটি ফতুল্লা থানায় করা হত্যা মামলা এবং অপরটি হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় করা। এসব মামলায় নিম্ন আদালতে বিফল হয়ে হাইকোর্টে জামিন চেয়ে পৃথক আবেদন করেন কারাগারে থাকা সেলিনা হায়াৎ আইভি।
গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের হওয়া তিনটি হত্যা মামলা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট থেকে গত বছরের ৯ নভেম্বর জামিন পান কারাবন্দী সেলিনা হায়াৎ আইভী। এই জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে পৃথক পাঁচটি আবেদন করে। শুনানি নিয়ে চেম্বার আদালত গত বছরের ১২ নভেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। আবেদনগুলো আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায়। আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজুর ভাষ্যমতে, ‘যেদিন হাইকোর্ট থেকে জামিন পান, সেদিনই আরও পাঁচ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়, যা গত বছরের ১৮ নভেম্বর মঞ্জুর হয়।’ এখানেও আগে গ্রেপ্তার পরে মামলা ও তদন্ত। রাজনৈতিক সরকারগুলো যে কায়দায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করত, অন্তর্বর্তী সরকারও তা-ই করেছে।
আবার এক বা একাধিক মামলায় রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাবেক বিচারপতিকে আটক করার পর ১৭-১৮ মাস চলে গেলেও কোনো তদন্ত হয়নি। অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। এমনকি তদন্তের বিষয়ে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। সম্প্রতি জামিন পাওয়া এক সাবেক সচিব বলেছেন, তিনি একটি সেমিনারে গিয়েছিলেন। সেই সেমিনারস্থলে এসে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালালো সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে আহ্বানকারী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি সেই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন, এই অজুহাতে পরে তাকেও বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটা যদি ন্যাবিচারের ধরন হয় তাহলে অবিচার কাকে বলে?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তদন্ত ছাড়া সাতজন আসামির কারাবাসের একটি তালিকা দিয়েছেন। এদের মধ্যে যেমন সাংবাদিক আছেন, তেমনি আছেন অন্য পেশার মানুষও। এতে দেখা যায়, সাবেক আমলা শাহ কামাল ৫৬২ দিন, সাংবাদিক ফরজানা রূপা ও শাকিল আহমদ ৫৫৯ দিন, সাবেক মন্ত্রী টিপু মুনশী ৫৫১ দিন, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ৫৩৪ দিন, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত ও একাত্তর টিভির প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল হক বাবু ৫৩২ দিন, সাবেক মেয়র আতিকুল হক ৫০৪ দিন ও সাবেক প্রধান বিচারপিত ২২২ দিন কারাগারে আটক আছেন। এদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধেই হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
এই যে আসামিকে মাসের পর মাস কারাগারে আটক রেখে তদন্ত না করার অর্থ কি? অর্থ হলো তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, তা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক।
গত দেড় বছরে যে হাজার হাজার পেশাজীবীর বিরুদ্ধে ভুয়া ও প্রতিহিংসামূলক মামলা দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিকার কী? ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলা দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে ডিবি অফিসে ডেকে নিয়ে আটক করে পরে মামলা দেওয়া হতো, তার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব হয়রানিমূলক ও অসত্য মামলা হয়েছে সেগুলো যাচাই বাছাই করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। আরও অনেক কিছুর মতো অন্তর্বর্তী সরকার মামলার বোঝাও চাপিয়ে গেছে নির্বাচিত সরকারের ওপর। এখন এগুলোর ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি ও বিনাবিচারে কারাগারে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দায় এসে পড়েছে আদালতের ওপর।
অন্তবর্তী সরকারের আমলে যেসব মামলা করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই গয়রহ ও পাইকারী। একটি হত্যা মামলায় ৪০০ জন পর্যন্ত আসামি করা হয়েছে। আবার দিনাজপুরের ঘটনায় ঢাকার বাসিন্দাকে কিংবা সিলেটের ঘটনায় চট্টগ্রামের বাসিন্দাকে আসামি করা হয়েছে।
সম্প্রতি সম্পাদক পরিষদ এক বিবৃতিতে সাংবাকদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তারা বলেছে, অন্তবর্তী সরকার এসব মামলা প্রত্যাহারের ওয়াদা দিয়েও রাখেনি। আশা করি নির্বাচিত সরকার কথা রাখবে। কমনওয়েলথ সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশনও এক বিবৃতিতে আটক সাংবাদিকদের মুক্তি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার বহু বার ভূয়া ও অসত্য মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও কথা রাখেনি। আশা করি, নির্বাচিত সরকার কথা রাখবে। ন্যায়বিচার ও মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য সেটা জরুরি বলে মনে করি।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

বন্ধু আনিস আলমগীরের জামিন পাওয়ার খবরটি দেখে আশ্বস্ত হয়েছিলাম। মঞ্জুর আলম পান্নার পর আরেকজন সাংবাদিক জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসছেন, এটা আনন্দের খবর হতে পারত। কিন্তু আনিস আলমগীর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিন পেলেও তার বিরুদ্ধে অন্য মামলা থাকায় এখনই কারাগার থেকে বের হতে পারছেন না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ব্যায়ামাগার থেকে আনিস আলমগীরকে জিজ্ঞাবাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় ১৫ ডিসেম্বর তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অর্থাৎ আগে গ্রেপ্তার করে পরে মামলা দেওয়া। রাজনৈতিক সরকারের মতো অন্তর্বর্তী আমলেও হরহামেশা এসব ঘটেছে।
আইনজীবী আসলাম মিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় হাইকোর্ট গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আনিস আলমগীরের জামিন প্রশ্নে রুল দেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল অ্যাবসলিউট (যথাযথ) ঘোষণা করেছেন। ফলে আনিস আলমগীর নিয়মিত জামিন পেলেন। তবে এখনই মুক্তি পাচ্ছেন না। কেননা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা রয়েছে। এই মামলায় তার জামিন আবেদনের ওপর অধস্তন আদালতে আগামী সপ্তাহে শুনানি হওয়ার কথা।
এর আগে গত ১৫ জানুয়ারি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় তার বিরুদ্ধে তিন কোটি ২৬ লাখ ৪৮ হাজার ৯৩৮ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা দিয়ে সাংবাদিক আনিস আলমগীরের আটকের ঘটনায় যখন সরকার দেশে বিদেশে সমালোচিত হচ্ছিল, তখনই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করে। কেউ দুর্নীতি করলে অবশ্যই সরকার মামলা করবে। তদন্ত হবে। কিন্তু এখানে আগে গ্রেপ্তার করে পরে তদন্ত ও মামলা করার ঘটনা ঘটেছে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার চেয়ে দুর্নীতির মামলায় জামিন পাওয়া সহজ। তারপরও আনিস আলমগীর জামিন পাবেন কি না সেটাই প্রশ্ন। এক মামলায় আটক থাকা আর একাধিক মামলায় আটক থাকার মধ্যে বস্তুগত ফারাক কম। অভিযুক্তকে কারাগারেই থাকতে হচ্ছে।
যেমনটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ক্ষেত্রে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। যখন সংবাদমাধ্যমে খবর বের হলো সেলিনা হায়াৎ আইভী ‘পরিশীলিত’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসতে পারেন, তখনই একের পর এক মামলা দিয়ে তাকে জেলে পোরা হয়। একটি মামলায় তিনি জামিন পান তো আরেকটি মামলায় তার নাম ঢুকানো হয়।
সম্প্রতি হত্যার অভিযোগসহ পৃথক পাঁচ মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই পাঁচ মামলার মধ্যে চারটি ফতুল্লা থানায় করা হত্যা মামলা এবং অপরটি হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় করা। এসব মামলায় নিম্ন আদালতে বিফল হয়ে হাইকোর্টে জামিন চেয়ে পৃথক আবেদন করেন কারাগারে থাকা সেলিনা হায়াৎ আইভি।
গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের হওয়া তিনটি হত্যা মামলা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট থেকে গত বছরের ৯ নভেম্বর জামিন পান কারাবন্দী সেলিনা হায়াৎ আইভী। এই জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে পৃথক পাঁচটি আবেদন করে। শুনানি নিয়ে চেম্বার আদালত গত বছরের ১২ নভেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। আবেদনগুলো আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায়। আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজুর ভাষ্যমতে, ‘যেদিন হাইকোর্ট থেকে জামিন পান, সেদিনই আরও পাঁচ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়, যা গত বছরের ১৮ নভেম্বর মঞ্জুর হয়।’ এখানেও আগে গ্রেপ্তার পরে মামলা ও তদন্ত। রাজনৈতিক সরকারগুলো যে কায়দায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করত, অন্তর্বর্তী সরকারও তা-ই করেছে।
আবার এক বা একাধিক মামলায় রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাবেক বিচারপতিকে আটক করার পর ১৭-১৮ মাস চলে গেলেও কোনো তদন্ত হয়নি। অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। এমনকি তদন্তের বিষয়ে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। সম্প্রতি জামিন পাওয়া এক সাবেক সচিব বলেছেন, তিনি একটি সেমিনারে গিয়েছিলেন। সেই সেমিনারস্থলে এসে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালালো সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে আহ্বানকারী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি সেই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন, এই অজুহাতে পরে তাকেও বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এটা যদি ন্যাবিচারের ধরন হয় তাহলে অবিচার কাকে বলে?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তদন্ত ছাড়া সাতজন আসামির কারাবাসের একটি তালিকা দিয়েছেন। এদের মধ্যে যেমন সাংবাদিক আছেন, তেমনি আছেন অন্য পেশার মানুষও। এতে দেখা যায়, সাবেক আমলা শাহ কামাল ৫৬২ দিন, সাংবাদিক ফরজানা রূপা ও শাকিল আহমদ ৫৫৯ দিন, সাবেক মন্ত্রী টিপু মুনশী ৫৫১ দিন, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ৫৩৪ দিন, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত ও একাত্তর টিভির প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল হক বাবু ৫৩২ দিন, সাবেক মেয়র আতিকুল হক ৫০৪ দিন ও সাবেক প্রধান বিচারপিত ২২২ দিন কারাগারে আটক আছেন। এদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধেই হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
এই যে আসামিকে মাসের পর মাস কারাগারে আটক রেখে তদন্ত না করার অর্থ কি? অর্থ হলো তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, তা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক।
গত দেড় বছরে যে হাজার হাজার পেশাজীবীর বিরুদ্ধে ভুয়া ও প্রতিহিংসামূলক মামলা দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিকার কী? ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলা দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে ডিবি অফিসে ডেকে নিয়ে আটক করে পরে মামলা দেওয়া হতো, তার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব হয়রানিমূলক ও অসত্য মামলা হয়েছে সেগুলো যাচাই বাছাই করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। আরও অনেক কিছুর মতো অন্তর্বর্তী সরকার মামলার বোঝাও চাপিয়ে গেছে নির্বাচিত সরকারের ওপর। এখন এগুলোর ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি ও বিনাবিচারে কারাগারে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দায় এসে পড়েছে আদালতের ওপর।
অন্তবর্তী সরকারের আমলে যেসব মামলা করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই গয়রহ ও পাইকারী। একটি হত্যা মামলায় ৪০০ জন পর্যন্ত আসামি করা হয়েছে। আবার দিনাজপুরের ঘটনায় ঢাকার বাসিন্দাকে কিংবা সিলেটের ঘটনায় চট্টগ্রামের বাসিন্দাকে আসামি করা হয়েছে।
সম্প্রতি সম্পাদক পরিষদ এক বিবৃতিতে সাংবাকদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তারা বলেছে, অন্তবর্তী সরকার এসব মামলা প্রত্যাহারের ওয়াদা দিয়েও রাখেনি। আশা করি নির্বাচিত সরকার কথা রাখবে। কমনওয়েলথ সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশনও এক বিবৃতিতে আটক সাংবাদিকদের মুক্তি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার বহু বার ভূয়া ও অসত্য মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও কথা রাখেনি। আশা করি, নির্বাচিত সরকার কথা রাখবে। ন্যায়বিচার ও মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য সেটা জরুরি বলে মনে করি।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

পৃথিবীতে যেমন বিশুদ্ধ চাকুরি নেই, ঠিক তেমনি কেবলই ন্যায়ের পক্ষের কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং যে যার ‘যুক্তি’ দাঁড় করিয়ে, চালায় সেই একবগ্গা নীতিই। এতে একসময়ের মনে হওয়া ‘ভালো’ ঢুকে যায় এমন ‘খারাপ’ দুনিয়ায়, যা এড়ানোই হয়তো ছিল উদ্দেশ্য। দিনশেষে দেখা যায়, আজকের কথিত মজলুম হয়ে উঠছে আগামীর জালিম। আর যে জাল

২০২৪ সালের জুলাইয়ের শাসন পরিবর্তন কেবল গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না; বরং এটি ছিল বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প, বৈশ্বিক পুঁজি এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের লক্ষ্যপূরণে রাষ্ট্রের একটি কৌশলগত পুনর্গঠন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার এবং জুলাই সনদের আড়ালে মূলত রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজানোর প্রক্রি