Advertisement Banner

ফিরে দেখা: জিয়া হত্যাকাণ্ড

জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ৩ জুন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে তার শাসনকে বেসামরিক করার উদ্যোগ নেন।

রাশেদুর রহমান
রাশেদুর রহমান
ফিরে দেখা: জিয়া হত্যাকাণ্ড
জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। ক্ষমতার এই পালাবদলের ১০ দিন পর ২৪ আগস্ট তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান। ৩ নভেম্বর এক অভ্যুত্থানে তিনি পদচ্যুত ও বন্দি হন। ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থানে আবার সেনাপ্রধান ও উপ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তার নতুন পথচলা শুরু হয়। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এভাবে তিনি তার ক্ষমতা ক্রমশ সুসংহত করেছিলেন।

জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা সংহতকরণের এই পথ মৃসণ ছিল না। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর ৯ অক্টোবর থেকে তার বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানের (ক্যু) চেষ্টা হয়। কারও মতে অভ্যুত্থান হয়েছিল ১৯টি। কারও মতে ২১টি। আবার কারও মতে আরও বেশি। সর্বশেষ অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। এর আগের সব অভ্যুত্থানই তিনি প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সর্বশেষটি তার পক্ষে প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ৩ জুন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে তার শাসনকে বেসামরিক করার উদ্যোগ নেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল)। এই দলের প্রার্থী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরপর ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। এর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতা আরও সুসংহত করেন।

পরে জিয়াউর রহমান তার নিজের আন্তজার্তিক ভাবমুর্তি বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। ১৯৮০ সালে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ওই বছর আগস্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। একই বছরের শেষ দিকে শুরু হয় ইরাক-ইরান যুদ্ধ। ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) এই যুদ্ধ বন্ধে জোরদার চেষ্টার পাশাপাশি কমিটি গঠন করে। কমিটিতে বাংলাদেশ সদস্য ছিল। জিয়াউর রহমান এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শান্তি মিশনে কয়েকবার ইরাক-ইরান সফর করেন। তার এই ভুমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়।

এদিকে ১৯৮১ সালের প্রথমার্ধে বিশেষত মে থেকে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি কিছুটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হতে থাকে। ঘটতে থাকে একের পর এক নানা ঘটনা। ৭ মে বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি আবদুর রহমান এবং রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সিনিয়র রিপোর্টার ফেরদৌস আলম দুলাল ঢাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। তারা একসঙ্গে জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে কাকরাইল যাচ্ছিলেন। পথিমথ্যে বিজয়নগরে তাদের হত্যা করা হয়। এই ঘটনা তখন বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।

এই ঘটনার আগে গোলাম আযম ও জামাতে ইসলামীর তৎপরতার প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করতে থাকে।

অন্যদিকে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর দৃশ্যমান হওয়া দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ (পরে সমুদ্রে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বীপটি সাগরে তলিয়ে গেছে) নিয়ে তখন ভারত–বাংলাদেশের মধ্যে ভূখণ্ডগত বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। এ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠও তখন বেশ সরব ছিল।

এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে বেশ বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ফলে ব্যাংকগুলোতে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২৩ মে। সেদিন সোনালী ব্যাংকের একদল কর্মচারীর হাতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও একজন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) নাজেহাল ও মারধরের শিকার হন। সে সময় ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার কক্ষে মহাব্যবস্থাপকের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। কর্মচারীরা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কক্ষের আসবাবপত্রও ব্যাপক ভাঙচুর করে। এই ঘটনাও তখন বেশ আলোচিত হয়। এমন আরও কিছু ঘটনা তখন ঘটেছিল।

এসবের মধ্যে বিদেশ সফরে যান জিয়া। ৯ মে ঢাকায় ফিরে পরদিন ঢাকা সেনানিবাসের নিজ বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। সেখানে দেশের পরিস্থিতির অবনতির কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন। ১১ মে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গতকাল (রবিবার) বলেন, ইদানীং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হইয়াছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তাঁহার সরকার চেষ্টা করিতেছেন বলিয়া তিনি আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫–৭৬ সালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ হয়। পরবর্তীকালে অবস্থার উন্নতি হয়। বর্তমানে আবার কিছুটা অবনতি ঘটিয়াছে।”

ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, “সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধী শক্তির তৎপরতা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি ও বিক্ষোভ এবং গোলাম আযমের নাগরিকত্ব সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এই সমস্যা লইয়া আমরাও চিন্তাভাবনা করিতেছি। কাহারা কি করিতেছে উহার খবরা–খবর সংগ্রহ করিতেছি। ইনশাআল্লাহ একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা যাইবে।’”

এর কয়েক দিন পর তিনি দেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে আবার কথা বলেন। ২৩ মে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বর্ধিত সভায় বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশ আমাদের স্থিতিশীলতা কামনা করে না। বাংলাদেশ শক্তিশালী দেশ হোক তা [তারা] চায় না।” (দৈনিক বাংলা ২৪ মে)। এই সভায় জিয়াউর রহমান দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ নিয়েও বক্তব্য দিয়েছিলেন।

এদিকে পশ্চিম জার্মানি থেকে ৯ মে ফিরে আসার তিন দিন পর তিনি ১২ মে ইরাকের বাগদাদে যান। পরদিন ১৩ মে তিনি ইরান সফর করেন। ১৪ মে ঢাকায় ফিরে আসেন। এর পর ২৪ মে ওআইসির সম্মেলনে যোগ দিতে তার জেদ্দা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এই সফর স্থগিত হয়। ২৪ মে দৈনিক ইত্তেফাকে ‘জিয়ার জেদ্দা সফর স্থগিত’ শিরোনামে প্রতিবেদনে বলা হয়, “ওয়াকিবহাল সূত্রের বরাত দিয়া (বার্তা সংস্থা) এনা জানায়, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁহার অদ্যকার (রবিবার) নির্ধারিত জেদ্দা যাত্রা স্থগিত রাখিয়াছেন। সেখানে তাঁহার ইসলামী সম্মেলন সংস্থার শান্তি কমিটির বৈঠকে যোগদান করার কথা ছিল।”

জেদ্দা সফর স্থগিত হওয়ার আগে জিয়াউর রহমান ব্যস্ত সময় কাটান। ২০ মে বেলজিয়ামের রাজা-রানি চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। জিয়া ঢাকার কুর্মিটোলা (বর্তমানে হযরত শাহজালাল) বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান। ওই দিন রাতে তিনি তাদের সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করে। রাজা-রানি ২৩ মে থাইল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেন। জিয়া বিমানবন্দরে তাদের বিদায় জানান।

২৯ মে সকালে জিয়াউর রহমান দুই দিনের সফরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। ৩০ মে দৈনিক ইত্তেফাকে ‘চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাসস জানায় বন্দর নগরী চট্টগ্রামে দুই দিনের সফরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গতকাল (শুক্রবার) চট্টগ্রাম পৌঁছিয়াছেন। তাহার সঙ্গে রহিয়াছেন বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল প্রফেসর এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী।”

এই সফর সম্পর্কে পত্রিকায় আর কিছু উল্লেখ করা হয়নি। পরে জানা যায়, জিয়ার ওই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপির চট্টগ্রাম শাখার উপদলীয় বিরোধ মেটানো। তার চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা ছিল না। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার নোটিশে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।

জিয়া চট্টগ্রাম যান বিমানে। বিমানবন্দর থেকে সার্কিট হাউসে (বর্তমানে জিয়া জাদুঘর) পৌঁছে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তিনি অনেক রাত পর্যন্ত বৈঠক করেন। রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত এই বৈঠক চলে। দীর্ঘ সময় বৈঠক করেও তিনি উপদলীয় কোন্দল মেটাতে পারেননি। তবে আলোচনার মধ্য দিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। পরদিনও আবার একই বিষয়ে বৈঠকের কথা ছিল।

এদিকে সেদিন; অর্থাৎ, ২৯ মে রাতে চট্টগ্রামের আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ জমা হয়েছিল। মেঘে মেঘে আকাশ কালো হয়ে ওঠে। সঙ্গে ঝড়ো বাতাস। বাইরে শোঁ শোঁ শব্দ আর বিজলির চমকানি। এক সময় বৃষ্টি শুরু হয়। প্রথমে হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি, পরে মুষলধারে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার সড়ক আর সড়কের দুই পাশে থাকা বাড়িঘর ও অফিস আদালতগুলো তখন সুনসান। সড়কের বাতিগুলো কোথাও কিছুটা উজ্জ্বল, কোথাও অনুজ্জ্বল। ফলে শহরজুড়ে একটা আলো-আঁধারি পরিবেশ। তবে শহরের একটি অংশ কিছুটা আলোকিত। সেটা সার্কিট হাউস এলাকা। এর পূর্ব দিকে কাজির দেউড়ি। পশ্চিম দিকে লালখান বাজার। উত্তরে জামিয়াতুল ফালাহ মসজিদ। দক্ষিণে আউটার স্টেডিয়াম। সার্কিট হাউসের সামনে দিয়ে এস এস খালেদ (শহীদ সাইফউদ্দিন খালেদ) সড়ক। এই সড়কের এক দিক মিলেছে সিডিএ অ্যাভিনিউয়ে। আরেক দিক কাজির দেউড়ি মোড় হয়ে চলে গেছে আরও অনেক দূর। সিডিএ অ্যাভিনিউ ও কাজির দেউড়ির মাঝামাঝি সিআরবি রোড আউটার স্টেডিয়ামের পার্শ্ববর্তী খেলার মাঠের (পরে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে স্টেডিয়াম) পাশ দিয়ে এসে মিলেছে এস এস খালেদ সড়কে। তারপর সোজা চলে গেছে সার্কিট হাউসের দিকে। এই সব সড়ক এবং সার্কিট হাউসের ভেতরে মাঠ, ফুলের বাগান ও সীমানা প্রাচীর বরাবর খুঁটিগুলোয় বাতি জ্বলছে।

সেদিন সকাল ৯টা থেকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস ও সংলগ্ন এলাকা ছিল জনসমাগমে পূর্ণ। রাত ১০টা-সাড়ে ১০টা অবধি সেখানে ছিল অনেক মানুষের ভিড়। রাত বাড়ার সাথে সাথে, মানুষের ভিড় কমতে শুরু করে। রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে সার্কিট হাউস বাইরের লোকশূন্য হয়ে পড়ে।

সার্কিট হাউসের বিভিন্ন কক্ষে ঢাকা থেকে আগত গুরুত্বপূর্ণ অতিথিরা সেদিন রাতযাপন করেন। সার্কিট হাউসের মূল গেট ও সীমানা প্রাচীরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। এ ছাড়া মূল ভবনে রয়েছেন সামরিক বাহিনীর কয়েকজন। গভীর রাতে তারা কেউ ঘুমিয়ে, কেউ অস্ত্র হাতে জেগে। বৃষ্টিস্নাত রাতে সার্কিট হাউসের ভেতরে আলো-আঁধারির খেলা। মূল ভবনও কিছুটা আলো-আঁধারিতে। থেকে থেকে আচমকা হাওয়ার ঝাপটায় গেট ও সীমানাপ্রাচীরের নিরাপত্তা চৌকিতে বৃষ্টির ছাঁট লাগছে। খুঁটির বাতির আলো যেখানে পড়েছে সেখানটা চিকচিক করছে। দুর্যোগের সে রাতে মৃদু ঠান্ডা আবহাওয়ায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকাদের দু-একজন ঝিমোলেও বাকিরা জেগে আছেন। দূরে খালি চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তারপরও তারা সতর্ক দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে। কারণ, সার্কিট হাউসে আছেন দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি সেখানে রাতযাপন করছেন। এ জন্যই তাদের এমন দুর্যোগের রাতেও এভাবে জেগে থাকা।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে তখন ২৯ মে শেষ হয়ে ৩০ মে। আর ঘড়ির ঘণ্টার কাঁটা ৪টার ঘরে। মিনিটের কাঁটা ১০ বা ১৫-র ঘরে। এমন সময় সার্কিট হাউস এলাকা প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতসহ অন্যদের প্রথমে মনে হয়েছিল সেটা বজ্রপাতের শব্দ।

কিন্তু শব্দটা আসলে বজ্রপাতের ছিল না। প্রাকৃতিক ঝড়–বৃষ্টির পাশাপাশি সেই রাতে সেখানে বয়ে যায় আরেক ঝড়। সেই ঝড়ে নিহত হন জিয়াউর রহমান। একদল সেনাকর্মকর্তার ঝড়ো অভিযানে প্রাণ হারান তিনি।

১৯৯৫ সালের ২১ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত দৈনিক ভোরের কাগজে ১৯৮১ সালের ২৯-৩০ মের এই ঘটনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এর আগে ১৯৯৪ সালে প্রোব বার্তা সংস্থা একই ঘটনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে।

এসব প্রতিবেদনসহ আরও কিছু সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালের ২৯ মে রাত সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসও ছিল অন্য দিনের মতোই সুনসান। গভীর রাতে সেনানিবাসের নিরাপত্তা চৌকিতে নিয়োজিত সেনারা ছাড়া বাকি সবাই ব্যারাকে ঘুমিয়ে ছিলেন। সেনানিবাসের ভেতরে রাস্তায় লাইটপোস্টের আশপাশ ছাড়া চারদিকে ছিল এক আলো-আঁধারির পরিবেশ। অফিস ও ব্যরাকের আলোগুলো নেভানো। সেনানিবাসে আলো জ্বলছিল শুধু ২১ ও ৬ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসে। ২১ ইস্টবেঙ্গলের অফিসে তখন উপস্থিত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুবুর (মাহবুবুর) রহমান, মেজর মোমিনুল হক, মেজর গিয়াসউদ্দিন, ক্যাপ্টেন মুনীর, ক্যাপ্টেন জামিল হক ও ক্যাপ্টেন মঈনুল। আরও উপস্থিত ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান। তারা সমবেত হয়েছেন একটা অপারেশনে অংশ নিতে। মতিউর রহমান তাদের সবাইকে সেই অপারেশন সম্পর্কে ব্রিফিং দেন। এ ছাড়া সবাই অপারেশনের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারেও শপথ নেন।

শপথ নেওয়ার পর ২১ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিস থেকে মেহবুবুর রহমান ও মতিউর রহমান যান ৬ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসে। সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ এম ফজলে হোসেন, মেজর দোস্ত মোহাম্মদ সিকদার, ক্যাপ্টেন আরেফিন, লেফটেন্যান্ট রফিক, ক্যাপ্টেন ইলিয়াস ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। শাহ এম ফজলে হোসেন এখানে করণীয় সম্পর্কে সবাইকে ব্রিফ করেন এবং সবাই মিলে শপথ নেন।

সেনাকর্মকর্তাদের এই তৎপরতার মধ্যে রাত পৌনে ১২টা বা ১২টার দিকে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। রাত দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পেছন দিক দিয়ে নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাদের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে সেনাকর্মকর্তাদের নিয়ে তিনটি গাড়ি বেরিয়ে যায়। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ দিয়ে এগোতে থাকে সেগুলো। পাবলিক স্কুল রোড হয়ে যাত্রা করে কালুরঘাট ব্রিজের দিকে। গাড়িগুলোর আরোহী ছিলেন মতিউর রহমান, মেহবুবুর রহমান, মেজর খালেদ প্রমুখ সেনাকর্মকর্তারা।

রাত ২টার দিকে কালুরঘাট ব্রিজের পাশে এসে থামে ৩টি গাড়ি। সেখানে মেজর ফজলুল হক, সুবেদার জাফর চৌধুরী ও নায়েক সুবেদার সোলায়মানের অধীনে প্রথম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ২টি প্লাটুন বান্দরবান থেকে এসে অপেক্ষা করছিল আগে থেকেই।

সেখান থেকে সার্কিট হাউসে রওনা হওয়ার আগে মেহবুবুর রহমান আবার সবাইকে ব্রিফ করেন। অপারেশনের পদ্ধতি আগেই লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেলাওয়ার হোসেনের বাসায় বসে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবুও কারও যেন একটুও দ্বিধা না থাকে, সে জন্যই আবার ব্রিফ করেন মেহবুব। তারা সিদ্ধান্ত নেন বান্দরবান থেকে আসা প্লাটুন ২টি কালুরঘাটেই থাকবে।

রাত সাড়ে ৩টার দিকে ৩টি পিকআপে উঠে বসেন মোট ১৬ জন সেনাকর্মকর্তা। গাড়ি এগিয়ে চলে চট্টগ্রামের দিকে। ৩টি পিকআপের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৩টি গ্রুপকে। প্রথম গ্রুপে রয়েছেন মেহবুবুর রহমান, ফজলে হোসেন ও খালেদসহ মোট ৬ জন। দ্বিতীয় গ্রুপে মতিউর রহমান ও মমিনুল হকসহ ৬ জন। তৃতীয়টিতে ফজলুল হক ও গিয়াসউদ্দিনসহ ৪ জন।

ভোর ৪টার কিছু পরপরই শহরে ঢুকে পড়ে গাড়ি ৩টি। চট্টগ্রাম ক্লাবকে বাঁয়ে রেখে প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রুপ দেওয়ানহাট ব্রিজ ঘুরে সি আর বি রোড হয়ে সার্কিট হাউসের দিকে এগিয়ে যায়। তৃতীয় গ্রুপ যায় আলমাস সিনেমা হলের সামনে।

সার্কিট হাউস ভবনের মূল দরজা তখন বন্ধ। ভবনের বিভিন্ন কক্ষের জানালাগুলোও অন্ধকারাচ্ছন্ন। বৃষ্টির আমেজ মাখা ভোরে সবাই ঘুমিয়ে রয়েছেন। জেগে আছেন শুধু নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কিছু পোশাকধারী। বারান্দা আর পোর্চের লাইটগুলো জ্বলে রয়েছে। পিকআপ ২টি এগিয়ে যায় সার্কিট হাউসের মূল ফটকের দিকে। গেটে ধাক্কা দিয়ে পিকআপ ২টি সোজা সার্কিট হাউসের মাঠে ঢুকে পড়ে। তারপর প্রথম পিকআপ থেকে ছোঁড়া রকেট লাঞ্চারের প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো সার্কিট হাউস ভবন। এ সময় সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন পোশাকধারী চমকে উঠে তাদের অস্ত্র আঁকড়ে ধরেন। কিন্তু তাদের দিক থেকে অনুপ্রবেশকারীদের বাধা দেওয়ার সেই চেষ্টা সফল হয়নি।

প্রথম দল এসএমজি দিয়ে একনাগাড়ে গুলি করতে করতে দোতলার দিকে এগিয়ে যায়। কী হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই সিঁড়ির নিচে থাকা প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট ও পুলিশের কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন সেখানেই। হতবিহ্বল অন্যদের পক্ষ থেকে গুলির উত্তর আসে সামান্যই। সিঁড়ি দিয়ে প্রথম গ্রুপ প্রায় বিনা বাধায় উঠে যায় দোতলায়। তাদের পেছনে ছিল দ্বিতীয় গ্রুপ। এ দলে ছিলেন মতিউর রহমান।

এদিকে সার্কিট হাউসের যে ঘরে জিয়াউর রহমানের থাকার কথা ছিল সে ঘরে সেদিন তিনি ছিলেন না। গোলাগুলির আওয়াজে সিঁড়ির ডান দিকের রুমটার দরজার একটি পাল্লা ফাঁক করে বাইরে কী হচ্ছে তা দেখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। প্রথম দলের নজর পড়ে তার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে মতিউর রহমানের হাতের অস্ত্র। মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন জিয়া। তিনি নিহত হন। পুরো অপারেশনে সময় লাগে মাত্র ৯ মিনিট। এই অপারেশন চলাকালে আহত হন শাহ এম ফজলে হোসেন ও জামিল হক। অপারেশন শেষে প্রথম দল আহত দুজনকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।

এদিকে ভোরে গোলাগুলির আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর। ডিসির বাংলো থেকে সার্কিট হাউসের দূরত্ব মাইলখানেক। ঘটনার পর তিনি গিয়েছিলেন সার্কিট হাউসে। জেলা প্রশাসক হিসেবে ঘটনাপ্রবাহ কাছে থেকে দেখেছেন তিনি।

‘দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড, ১৯৮১-র ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান’ নামে তিনি একটি বই লিখেছেন। জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী লিখেছেন, গোলাগুলি থেমে যাওয়ার পর ভোরেই একজন সহকারী প্রটোকল অফিসার মোশতাক তাকে ফোন করে কিছু তথ্য দেন। ওই সহকারী প্রটোকল অফিসারের বরাত দিয়ে জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী লিখেছেন, “ভোর চারটার দিকে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি গুলি করতে করতে সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে। সে (সহকারী প্রটোকল অফিসার) জানে না পুলিশ বা প্রেসিডেন্টের গার্ড তাদের বাধা দিতে পেরেছিল কি না। তবে তারা গুলি করতে করতে সার্কিট হাউসে ঢুকে যায়। মোশতাক লাউঞ্জে বসে ছিল। সেনারা প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সে পাশের ডাইনিং রুমের টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ে। এরপর সে শুনতে পায় ভারী বুটের আওয়াজ। কয়েকজন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে প্রেসিডেন্টের রুমের দিকে যায়। এরপর সে আরও গুলির আওয়াজ শুনতে পায়। কয়েক মিনিট পর ওপরের লোকগুলো নিচে চলে আসে আর তার কিছুক্ষণ পর শোনে গাড়ির আওয়াজ। সে বুঝল, যারা এসেছিল, তারা চলে গেছে। সে এত ভয় পেয়েছিল যে, গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পর সে পালিয়ে এসে গ্যারেজ থেকে আমাকে ফোন করেছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, প্রেসিডেন্ট কী অবস্থায় আছেন, সে জানে কি না, উত্তরে সে জানাল, এ ব্যাপারে এখনো কিছুই জানে না সে।”

এরপর অল্প সময়ের মধ্যে চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন ফোন করে জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীকে জানান যে, “প্রেসিডেন্ট জিয়া আততায়ীদের হাতে খুন হয়েছেন।”

এ তথ্য পাওয়ার পর পরই বিভাগীয় কমিশনারকে সঙ্গে নিয়ে সার্কিট হাউসে যান জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী। সেখানে পৌঁছে দেখেন সার্কিট হাউস প্রায় পরিত্যক্ত একটা ভবন। চারপাশে কোনো প্রহরা নেই। ছিল না কোনো পুলিশ বা সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য। তারা দেখতে পান সার্কিট হাউসের লনে দাঁড়িয়ে আছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন কমিশনার, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশের গোপন শাখার সহকারী কমিশনার আবদুস সাত্তারকে।

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী আবদুস সাত্তারকে সঙ্গে নিয়ে সার্কিট হাউসের ওপরতলায় যান পরিস্থিতি দেখতে। এর বর্ণনাও তিনি দিয়েছেন তার বইয়ে।

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী লিখেছেন, “সিঁড়ি ভেঙে ওপরতলায় গিয়েই দেখি, প্রেসিডেন্টের কামরার ঠিক দরজায় পড়ে আছে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি মৃতদেহ। তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড! সাত্তার আমাকে মৃতদেহের দিকে আঙুল দিয়ে বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়ার লাশ।’ তিনি কাপড় ওঠাতেই দেখলাম এক বীভৎস দৃশ্য। গুলির আঘাতে আঘাতে জিয়ার মুখে একপাশ উড়ে গিয়েছিল।”

সার্কিট হাউসের তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রায় একই রকম বর্ণনা দিয়েছেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর রেজাউল করিম রেজা।

তিনি বলেন, “কিছু ট্রুপস (সেনা) সঙ্গে নিয়ে জিয়াউর রহমানের ডেডবডি (মৃতদেহ) সার্কিট হাউস থেকে নিয়ে পাহাড়ের ভেতরে কোথাও কবর দেওয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দেন কর্নেল মতিউর রহমান। আমি তখন তাকে বললাম যে. আমাকে অন্য কাজ দেন। তারপর উনি মেজর শওকত আলীকে ডেকে ওই দায়িত্ব দিলেন আর আমাকে বললেন, তুমি এদের সঙ্গে যাও। গিয়ে সার্কিট হাউসে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিয়ে আসবে।”

সার্কিট হাউসে যাওয়ার পর সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠেই মেজর রেজাউল করিমও সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা মৃতদেহ দেখতে পান। তিনি বলেন, “সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দেখি একটা ডেডবডি সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা আছে। পাশে একজন প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার ডেডবডি? সে বলল, এটা রাষ্ট্রপতির। আমি বললাম কাপড়টা খোলো। সেটা খোলার পর দেখলাম তার মাথাটা। ভয়াবহ অবস্থা।”

এ ছাড়া, রেজাউল করিম সেখানে কাছাকাছি দূরত্বেই দেখেন জিয়াউর রহমানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্নেল এহসান এবং ক্যাপ্টেন হাফিজের মৃতদেহ।

তিনি উল্লেখ করেন, মেজর শওকত আলীর নেতৃত্বে যে দল তার সঙ্গে ছিল, তারা জিয়াউর রহমানসহ তিনজনকে নিয়ে তাদের আনা পিকআপে ওঠায়। এরপর দলটির কিছু সদস্য সেনাবাহিনীর অন্য গাড়ি নিয়ে ওই পিকআপকে পাহারার জন্য থাকেন। তারা তখন জিয়াউর রহমান ও অন্য দুজনের মৃতদেহ কবর দিতে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যান। আর তিনি সার্কিট হাউসে প্রেসিডেনশিয়াল গার্ডের যে কজন সদস্য ছিলেন, তাদের নিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে চলে যান।

মেজর রেজাউল করিম পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তখনকার জিওসি মেজর জেনারেল এ মঞ্জুরের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মঞ্জুরই তাকে এই দায়িত্ব দেন। তিনি বলেন, এই দায়িত্ব দেওয়ার সময় জেনারেল মঞ্জুর তাকে বলেছিলেন, “ওদের [যারা জিয়া হত্যায় জড়িত ছিল] মাথা তো গরম। তোমার মাথা ঠান্ডা আছে। তুমি ঠান্ডা মাথায় নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্বটা পালন করতে পারবে।”

মেজর রেজাউল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, মেজর জেনারেল এ মঞ্জুর ৩০ মে সকাল থেকে সারা দিন কর্মকর্তা ও সেনাদের বিভিন্ন ব্যারাকে ঘুরে ঘুরে বক্তব্য দেন। রেজাউল করিমকে সারা দিন মঞ্জুরের সঙ্গে থাকতে হয়েছে। তিনি বলেন, জেনারেল মঞ্জুর যখন সেনানিবাসের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন একপর্যায়ে মঞ্জুরের কাছে ঢাকা সেনানিবাস থেকে একটি টেলিফোন আসে। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হয় যে সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্তু জেনারেল মঞ্জুর জেনারেল এরশাদের সঙ্গে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখিয়ে ফোন রেখে দিয়েছিলেন।

রেজাউল করিম বলেন, “ফোনের অপর প্রান্ত থেকে যখন বলছে, জেনারেল এরশাদের সঙ্গে কথা বলেন, তখন জেনারেল মঞ্জুর বলেন, আই ক্যান নট টক টু এরশাদ। এ কথা বলে তিনি টেলিফোনটা রেখে দিলেন। আবার টেলিফোন আসল। আবার টেলিফোনে বলা হলো, ফর গড সেক স্যার, ফর গড সেক– ইউ টক টু জেনারেল এরশাদ। জেনারেল মঞ্জুর এমনভাবে ধরেছিলেন টেলিফোনটা, আমি ক্লিয়ার শুনতে পাচ্ছিলাম। জেনারেল মঞ্জুর আবার বললেন, আই ক্যান নট টক টু হিম। এ কথা বলে টেলিফোনটা রেখে দিলেন।”

মেজর জেনারেল মঞ্জুর ৩০ মে সারা দিন সেনা সদস্যদের ব্যারাকে গিয়ে গিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তিনি মূলত মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা ও পাকিস্তানফেরত কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বের কথা তুলে ধরেছেন। পাকিস্তান ফেরত কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কথা বলেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বক্তব্যে তিনি বিপ্লবী সরকার গঠনের কথা বলেছিলেন। যদিও রাজধানী থেকে অনেক দূরে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে, তিনি এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িতরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল কি না, ঘটনার পরে তাদের কর্মকাণ্ডে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তারা আসলে কী চেয়েছিলেন, সেটা এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।

এদিকে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় দেশের উপ রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। ৩০ মে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে দুপুরের দিকে রেডিও-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণে তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। এর আগে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানেরা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এরপর ৩১ মে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে থাকে। যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের বেশির ভাগকে পরে আটক করা হয়। দুজন নিহত এবং কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। মেজর জেনারেল মঞ্জুরও আটকের পর নিহত হন।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক

সম্পর্কিত