রাশেদুর রহমান

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সার্কিট হাউসে পরিচালিত অপারেশনে অংশ নিয়েছিল ৩টি দল। এর মধ্যে দুটি দল সার্কিট হাইসে যায়। ওই দুই দলে ছিলেন মেহবুবুর রহমান, শাহ এম ফজলে হোসেন, মতিউর রহমান, খালেদ, জামিল হক ও মমিনুল হকসহ মোট ১২ জন। তারা পৃথক দুটি পিকআপে ছিলেন। সেদিন পিকআপ দুটি সজোরে গেটে ধাক্কা দিয়ে সোজা সার্কিট হাউসের মাঠে ঢুকে পড়ে। একটি পিকআপ থেকে ছোড়া রকেট লঞ্চারের প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো সার্কিট হাউস ভবন। প্রথম দল এসএমজি দিয়ে একনাগাড়ে গুলি করতে করতে দোতলার দিকে এগিয়ে যায়। তাদের পেছনে ছিল দ্বিতীয় দল। দুই দল প্রায় বিনা বাধায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায় দোতলায়।
এদিকে সার্কিট হাউসের যে ঘরে জিয়াউর রহমানের থাকার কথা ছিল, সে ঘরে সেদিন তিনি ছিলেন না। গোলাগুলির আওয়াজে সিঁড়ির ডান দিকের রুমটার দরজার একটি পাল্লা ফাঁক করে বাইরে কী হচ্ছে, তা দেখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এই সময় গর্জে ওঠে মতিউর রহমানের হাতের অস্ত্র। মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন জিয়া। তিনি নিহত হন।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনার ৪৫ বছর পরও সেই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। যিনি জিয়াকে হত্যা করেছিলেন, তিনি নিজেও ঘটনার দুই দিন পর আত্মঘাতি গুলিতে মারা হন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন মেহবুবুর রহমান। তারা একজন আরেকজনকে গুলি করে নিজেদের প্রাণ সংহার করেন।
কর্নেল মতিউর রহমান তখন সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনাল হেড কোয়াটার্সের সিনিয়র অফিসার ছিলেন। আর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুবুর রহমান ছিলেন চট্টগ্রামে ২১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য মতিউর রহমান বীর বিক্রম ও মেহবুবুর রহমান বীর উত্তম খেতাব পেয়েছিলেন। তারা দুজনসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন কি না–ঘটনার পরে তাদের কর্মকাণ্ডে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তারা আসলে কী চেয়েছিল, সেটা এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
৩০ মে থেকে ১ জুনের ঘটনা জানা ও বোঝার জন্য মেজর মো. রেজাউল করিম রেজার সাক্ষ্য বা বয়ান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তখন চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তরে অর্ডন্যান্স সার্ভিসেসের (DADOS) উপসহকারী পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। ঘটনার পর তাকে বাসা থেকে জিওসির দপ্তরে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তিনি মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের ষ্টাফ অফিসার বা চিফ সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঘটনার পর থেকে আটক হওয়া পর্যন্ত মঞ্জুরের ছায়াসঙ্গী ছিলেন।
মেজর রেজার ভাষ্যে আমরা জানতে পারি, ৩০ মে ভোরে বাসার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। তখন সময় সাড়ে ৫টা বা পৌনে ৬টা এ রকম হবে। দরজা খুলে দেখেন অফিস রানার একেবারে যুদ্ধসাজে আর্মসসহ তার বাসায় হাজির। রানার তাকে সালাম দিয়ে বলেন, “স্যার আপনাকে সালাম দিয়েছে অফিসে যাওয়ার জন্য।”
অফিসে যাওয়ার পর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানের সঙ্গে তার প্রথমে দেখা হয়। তার নির্দেশে তিনি সার্কিট হাউসে যান। সেখান থেকে ফিরে ডিভ হেডকোয়ার্টারে জিওসি মঞ্জুরের অফিসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পান অফিসের বারান্দায় জেনারেল মঞ্জুর পায়চারি করছেন। তিনি রেজাকে দেখে ডেকে বলেন, “রেজা কাম হেয়ার।” রেজা তার সামনে গিয়ে স্যালুট করেন। মঞ্জুর তাকে জিজ্ঞেস করেন–
“রেজা তুমি কোত্থেকে আসছ?”
“স্যার সার্কিট হাউস থেকে আসছি।”
“কী কী দেখলে?”
রেজা সার্কিট হাউসে যা যা দেখেছেন, তা বলার পর মঞ্জুর কিছুক্ষণ নীরব থাকেন। এর পর রেজার দিকে তাকিয়ে মঞ্জুর বলেন–
“Oh, What they have done! What they have done!”
তারপর রেজাকে জিজ্ঞেস করেন–
“তুমি কি রাতে সার্কিট হাউসে গিয়েছিলে?”
“না স্যার, আমি সার্কিট হাউসে যাইনি। আমি বাসায় ঘুমিয়েছিলাম।”
“তোমার মাথা ঠান্ডা আছে?”
“হ্যাঁ, ঠান্ডা আছে, থাকবে না কেন?”
“দেখ, ওদেরতো মাথা গরম, তোমারতো মাথা ঠান্ডা আছে…, You give the full security. Now on word you are my chief security, ok.”
এই কথা বলে মঞ্জুর রেজার কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলেন, “ঠিক আছে।” তখন থেকে রেজা মঞ্জুরের চিফ সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। এর পর থেকে মঞ্জুর যেখানে যান, রেজা তার সঙ্গে ছিলেন।
এদিকে সার্কিট হাউস থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফিরে মেজর রেজা দেখতে পান যুদ্ধের পরিবেশ। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিত চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ছিল না। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে তার পরের ঘটনাপ্রবাহ কোনো পরিকল্পনা ছাড়া ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলেছে বলে তার মনে হয়েছে।
মেজর রেজার ভাষ্যমতে, জিয়াউর রহমান পাকিস্তান-ফেরত সেনা কর্মকর্তা ও অমুক্তিযোদ্ধাদের বেশি সুযোগ-সুবিধা বা পদ-পদন্নোতি এবং পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে সেনাপ্রধান করেছিলেন। এ কারণে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হবে–এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। জড়িতরা জানতেন, সার্কিট হাউস থেকে জিয়াকে বন্দি করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এনে দাবি আদায়ে চাপ সৃষ্টি করা হবে।
সামরিক আদালতে জিয়া হত্যার বিচারের সময় অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ডিফেন্ডিং অফিসার হিসেবে পরে মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহিম বীর প্রতীকসহ (তখন লেফটেন্যান্ট কর্নেল) তিনজন সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তা ও সাক্ষীদের কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়েছিলেন জানিয়েছেন।
মতিউর রহমান ও মেহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে যেসব সেনা কর্মকর্তা ৩০ মে সার্কিট হাউসে গিয়েছিলেন, তাদের ব্রিফ করা হয়েছিল জিয়াউর রহমানকে বন্দি করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এনে চাপ সৃষ্টির। মতিউর রহমানই এই ব্রিফিং দিয়েছিলেন। এই তথ্য জানিয়েছেন মেজর রেজা। এই তথ্য তিনি পেয়েছিলেন, সার্কিট হাউস অপারেশনে যারা গিয়েছিলেন, তাদের কয়েকজনের কাছ থেকে।
মেজর রেজা জানান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে অপসারণ করে মেজর জেনারেল মঞ্জুর বা অন্য কোনো মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হোক–এমনটাই চেয়েছিলেন জড়িত সেনা কর্মকর্তারা।
দ্বিতীয় দাবি ছিল, পাকিস্তান প্রত্যাগত বা অমুক্তিযোদ্ধা যেসব কর্মকর্তা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন উচ্চপদে ছিলেন, তাদের সরিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের সেসব পদে নিয়ে আসা। এ ছাড়া জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভা থেকে পাকিস্তানপন্থী মন্ত্রীদের সরানোরও দাবিও ছিল। তবে প্রথম দুটিই ছিল তাদের মূল দাবি।
মেজর রেজা এই তথ্য জেনেছিলেন জড়িত কয়েকজনের কাছ থেকে। মেজর জেনারেল ইব্রাহিমও সামরিক আদালতে অভিযুক্তদের কাছ থেকে একই ধরনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের ভূমিকা সম্পর্কে নানা রকম বক্তব্য পাওয়া যায়। মেজর রেজাউল করিম রেজার মতে, জিয়াউর রহমানকে হত্যার বিষয়টি মঞ্জুর আগে জানতেন না এবং ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তা জেনেছেন।
মেজর রেজা জানিয়েছেন, ৩০ মে সকালে তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে সার্কিট হাউসে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফেরার পর মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে তার দেখা হয়। তখন রেজার কাছ থেকে সার্কিট হাউসের বর্ণনা শুনে মঞ্জুর তাকে বারবার বলেছিলেন, “ওহ হোয়াট হ্যাভ দে ডান (ওরা কী করেছে)?”
জিয়া হত্যার ঘটনার দায়িত্ব মঞ্জুর কাঁধে নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন মেজর রেজা। তিনি বলেন, মেজর জেনারেল মঞ্জুর সকলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য সকাল থেকেই সেনা কর্মকর্তা ও সেনাদের বিভিন্ন ব্যারাকে ঘুরে ঘুরে বক্তব্য দিয়েছেন।
মেজর রেজার বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি এটা মানতে রাজি নন যে, জিয়াকে হত্যার বিষয়ে মেজর জেনারেল মঞ্জুর জানতেন না। তিনি মনে করেন, মঞ্জুর চট্টগ্রামে জিওসির দায়িত্বে থাকার সময় আগেও জিয়াউর রহমানকে হত্যার একাধিকবার ব্যর্থ চেষ্টা হয়েছিল। ফলে জিয়া হত্যার ঘটনা জেনারেল মঞ্জুরের অগোচরে ঘটেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মেজর জেনারেল ইব্রাহিম উল্লেখ করেন “মতিউর রহমান ও মঞ্জুরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আর মেহবুবুর রহমান সম্পর্কে মঞ্জুরের ভাগনে ছিলেন।”
জিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পেছনে জেনারেল এরশাদের কোনো ভূমিকা ছিল কি না–এই প্রশ্নও তখন উঠেছিল। জেনারেল এরশাদের সঙ্গে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অন্য কারও সম্পর্ক ছিল কি না এবং মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা দ্বন্দ্বের সুযোগ সেখানে নেওয়া হয়েছে কি না–এই সন্দেহ রয়েছে মেজর রেজার।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানকে হত্যার কয়েক দিন আগে মতিউর রহমান ঢাকা সেনানিবাসে এসে জেনারেল এরশাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ঘটনার অনেক পরে তিনি এ কথা শুনেছিলেন।
জেনারেল এরশাদ জীবিত থাকা অবস্থায় মঞ্জুর হত্যা মামলায় আদালতে শুনানিতেও এ ধরনের অভিযোগ এসেছিল।
মতিউর রহমানের ঢাকায় আসার তথ্য সেনা কর্মকর্তা মইনুল হোসেন চৌধুরীর বইয়েও পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, “১৯৮১ সালের মে মাসের প্রথম দিকে আমেরিকাতে সামরিক প্রশিক্ষণে মনোনয়নের জন্য তৎকালীন লে. ক. মতিউর রহমান, লে. কর্নেল ইমামুজ্জামান (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ও পাকিস্তান-প্রত্যাগত লে. কর্নেল সাখাওয়াতসহ (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার) ৫ জনকে একত্রে সেনাসদরে বাছাইয়ের জন্য ডাকা হয়। এঁদের মধ্যে সাখাওয়াত ছিলেন ১০ মার্চ ১৯৮১ সালে এরশাদ কতৃর্ক মনোনীত একটি কোর্ট মার্শালের প্রসিকিউটর, যেখানে ষড়যন্ত্র ও অভ্যুত্থান পরিকল্পনার দায়ে মুক্তিযোদ্ধা অফিসার লে. ক. নুরুন্নবী (এস আই নুরুন্নবী খান) বীর বিক্রম, কর্নেল দিদার (দিদারুল আলম বীর প্রতীক) ও একজন বেসামরিক ব্যাংকার মনির হোসেনের বিচার হয়েছিল। কোর্ট মার্শালে লে. ক. নুরুন্নবীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং এক বছরের কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়। দিদারকে ১০ বছরের জেল এবং মনির হোসেনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সেনাপ্রধান ইমামুজ্জামান ও মতিকে বাদ দিয়ে সাখাওয়াতকে আমেরিকায় প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত করেন, যদিও যোগ্যতাবলে বাকি এক অফিসার সাখাওয়াতের চেয়ে ভালো ছিল বলে অনেকের ধারণা। মনোনয়ন না পেয়ে মতিউর রহমান অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হন এবং ওইদিনই বঙ্গভবনে গিয়ে জিয়ার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সাদেকের সঙ্গে দেখা করেন। মনোনয়ন, অনিয়মের কথা তিনি সরাসরি জেনারেল সাদেককে বলেন। তিনি আরো অভিযোগ করেন, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারগণ আর্মিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে জানানোর জন্য জেনারেল সাদেককে অনুরোধ করেন।” (এক জেনারেলের নীরব স্বাক্ষ্য, স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা: ১২৩)
এ ছাড়া গণমাধ্যমে প্রচারিত ভাষ্যে আরও জানা যায়, ইন্টারভিউ দিয়ে মতিউর রহমান কয়েক দিন ঢাকায় ছিলেন। এ সময় তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও জিয়ার ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ ওয়াই এম মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে বঙ্গবভনে তিনি দেখা করেন। তখন তিনি জানতে পারেন, ২৯ মে রাষ্ট্রপতি জিয়া রাজনৈতিক সফরে চট্টগ্রাম যাচ্ছেন এবং মঞ্জুরকে ঢাকায় স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে বদলির আদেশে জিয়া স্বাক্ষর করেছেন।
মতিউর রহমান ও তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাকি অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করছিলেন জিয়াকে চট্টগ্রামে হত্যার। এ জন্য তিনি ও তার সহযোগীরা কয়েকবার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তাদের সেসব প্রচেষ্টা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়। এতে মতিউর হতাশ হয়ে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে; অর্থাৎ, বিদেশে প্রশিক্ষণে যেতে না পারায় তিনি আবার জিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে অনুপ্রাণিত হন।
এদিকে জিয়া যেদিন চট্টগ্রাম আসার সিদ্ধান্ত নেন, সেদিনই তিনি সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর বদলির আদেশে স্বাক্ষর করেন। তাকে সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেলের পদ থেকে বগুড়ায় জিওসি হিসেবে বদলি করা হয়। অনেকের ধারণা, রাষ্ট্রপতি জিয়া মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর বদলির আদেশ স্বাক্ষরের সময় চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরকে ঢাকার ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে বদলির আদেশেও স্বাক্ষর করেন। জিয়া তাদের দুজনকে বদলির সিদ্ধান্ত মে মাসের প্রথম দিকেই নিয়েছিলেন। কিন্তু আদেশে স্বাক্ষর করেন ২৪ মে।
বদলির আদেশে স্বাক্ষরের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায় মইনুল হোসেন চৌধুরীর লেখায়। তিনি লিখেছেন, “...এর কয়েকদিন (এপ্রিল) পরেই এরশাদ আমাকে জানালেন, রাষ্ট্রপতি জিয়ার নির্দেশে আমাকে ঢাকায় অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল পদ থেকে বগুড়াতে জিওসি হয়ে চলে যেতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে আমি জানতে চাইলাম, আর কার পোস্টিং হয়েছে। এরশাদ উত্তরে বললেন, জেনারেল মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্টাফ কলেজে বদলি করা হয়েছে এবং আমার বর্তমান অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল পদ আপাতত খালি থাকবে এবং লে. জে. এরশাদ নিজেই সে দায়িত্ব পালন করবেন।...১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়া নিহত হওয়ার পাঁচদিন পূর্বে বগুড়া সেনানিবাসে বদলির আদেশ পেলাম।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা ২১৯)
অন্যদিকে ভোরের কাগজের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৯ মে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে মঞ্জুরকে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করা হয়েছিল। প্রটোকল অনুযায়ী তারই বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অফিস; অর্থাৎ, বঙ্গভবন থেকে তাকে জানানো হয়েছিল, তার উপন্থিত থাকার প্রয়োজন নেই। এরপর মঞ্জুর সেনাপ্রধান এরশাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। তখন এরশাদও তাকে বলেন, রাষ্ট্রপতি চান না তিনি উপস্থিত থাকুন।
আরেকটি ভাষ্যে জানা যায়, বঙ্গভবন থেকে মঞ্জুরকে আরও বলা হয়েছিল রাষ্ট্রপতির সফর রাজনৈতিক। তাই জিওসির বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই।
আবার জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর লেখার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি মঞ্জুর চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কেন আসেননি, সে ব্যাপারে জিয়া সেনা প্রতিনিধিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন।
এই দুই তথ্য অনেকের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। এটা হয়তো ষড়যন্ত্রকারীদেরই একটা কৌশল ছিল। জিয়া হয়তো এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না অথবা ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে না জানিয়েই মঞ্জুরকে বিমানবন্দরে যেতে নিষেধ করেন তাকে ক্ষুব্ধ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে। অন্যদিকে ষড়যন্ত্রকারী দলের কেউ হয়তো তাদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জিয়ার চট্টগ্রাম সফর ও মঞ্জুরের বদলির আদেশে জিয়ার স্বাক্ষরের খবর পরিকল্পিতভাবেই মতিউরকে দেয়, যাতে তিনি মঞ্জুরসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের জড়িয়ে হঠকারী কিছু একটা করেন।
এসব তথ্য আমরা পাই পরে প্রচারিত কিছু ভাষ্যে। মতিউর রহমান ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে তার ঘনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন মঞ্জুরকে স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট হিসেবে বদলির সিদ্ধান্তের খবর। তিনি তাদের বোঝান, এটি হচ্ছে জিয়া ও পাকিস্তান-প্রত্যাগত সেনা কর্মকর্তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্রান্তের অংশ। খবরটি তিনি মঞ্জুরকেও জানান।
পরে মতিউর রহমান তার খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে (ইনার গ্রুপ) নিয়ে এক গোপন বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি জানান, জিয়া চট্টগ্রাম সফরে আসছেন এবং মঞ্জুরকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের তার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত করতে ইনার গ্রুপের সদস্যদের বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন, মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটা বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বৈঠকে উপস্থিত একজন পরে অন্য মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের এই খবর জানান। এর ধারাবাহিকতায় জিয়া চট্টগ্রামে যাওয়ার আগের দিন সেনানিবাসে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি ও একটা ভীতিকর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এই গুঞ্জন আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই জানতে পারেন মঞ্জুরের বদলির আদেশে রাষ্ট্রপতি জিয়া স্বাক্ষর করেছেন। এর পর মতিউর রহমান ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে তেমন বাধা থাকে না।
আলোচনার সময় মতিউর রহমান ইনার গ্রুপের সদস্যদের আরও বলেন, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অভিযান চালিয়ে জিয়াকে বন্দি করা হবে। তারপর তাকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় বঙ্গভবনে নিয়ে সেখানে সেনাপ্রধান এরশাদ ও মেজর জেনারেল মীর শওকত আলীসহ অন্য প্রিন্সিপাল অফিসারদের ডেকে তাদের সবাইকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। মতিউর বলেন, তিনি বঙ্গভবন রেকি করে এসেছেন। এই কাজের জন্য ৩০ জন কর্মকর্তা দরকার। তাহলে এটা করা সম্ভব।
এর পর সকলে বিষয়টি নিয়ে অনেকক্ষণ আলোচনা করলেন। কিন্তু তারা একমত হতে পারেননি। তবে তারা সবাই একটা ব্যাপারে একমত হন, দ্রুত একটা কিছু করা দরকার। জিওসি মঞ্জুর চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে গেলে এই সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নৈশ প্রশিক্ষণ চলছে। সেনানিবাস থেকে সার্কিট হাউসে গেলে তা কারও নজরে পড়বে না। তাই এটা ২৯ তারিখ রাতে্ই করতে হবে।
এদিকে মতিউর রহমানসহ তার ইনার গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে, যখন তারা জানতে পারেন চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতির অভ্যর্থনায় জিওসি মঞ্জুরকে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করা হয়েছে। এ খবরে মতিউর রহমান ও তার ইনার গ্রুপের সদস্যরা কিছুটা ভয় পেয়ে মনে করেন, তাদের পরিকল্পনা হয়তো ফাঁস হয়ে গেছে। এ অবস্থায় তারা স্থির করেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে।
মতিউর রহমান ও তার সহযোগী ‘ইনার গ্রুপ’র এই তৎপরতার সঙ্গে মঞ্জুর জড়িত ছিলেন–এমন তথ্য সরকারি ভাষ্য ছাড়া আর কোথাও পাওয়া না। যদি কখনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, তাহলেই হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন মঞ্জুর। কিন্তু তাকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে মতিউর রহমান ও মেহবুবুর রহমান পরস্পরের গুলিতে নিহত হয়েছেন। অবশ্য তারা দুজন সরকার সমর্থক সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন, এমন তথ্যও প্রচারিত আছে।
এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা এ সম্পর্কে তথ্য দিতে পারতেন, তাদেরও দ্রুত ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার প্রমাণ চিরতরে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা পরিকল্পনামাফিক মঞ্জুরকে হত্যা এবং সংশ্লিষ্টদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছে। মঞ্জুরের হত্যাকাণ্ড ষড়যন্ত্রের প্রকৃত ইতিহাসকে পর্দার আড়ালে ঠেলে দিয়েছে। সেই পর্দা সরিয়ে প্রকৃত ইতিহাস উদ্ধার করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আড়াল করা এই ইতিহাস কোনোদিনই হয়তো আর আলোর মুখ দেখবে না।
ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত দুজনসহ অন্য আরও কিছু ভাষ্যে আমরা জেনেছি, সেনানিবাসে ২৯ মে রাত ১২টার পর থেকেই মতিউর রহমানের নেতৃত্বে দ্রুত অভিযান বাস্তবায়নের কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে যায়। অভিযানে অংশগ্রহণকারীরা নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হলে মতিউর রহমান একটি কোরআন শরিফ বের করে তাদের সবার উদ্দেশে বলেন, “আমার হাতে রয়েছে পবিত্র কোরআন শরিফ। আমরা আজ যা করতে যাচ্ছি তা শুধু এই দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। এর সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ জড়িত নেই। যারা আমাদের সঙ্গে থাকতে চান তারা এই কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ নিন এবং প্রতিজ্ঞা করুন। আর যারা এ কাজে রাজি নন তারা রুম ছেড়ে চলে যেতে পারেন। তবে তাদের কাছে একটাই অনুরোধ দয়া করে এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলবেন না।” মতিউরের এ বক্তব্যের পর কেউ কোনো কথা বলেননি। সবাই কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেন।
মতিউর রহমানই ছিলেন এই অভিযানের নেতা। সার্কিট হাউসের একটি নকশা বের করে তিনি সকলকে পরিকল্পনাটি বুঝিয়ে দেন। তিনি তাদের আবার শপথ করিয়ে বলেন, “আজ আমরা শুধু প্রেসিডেন্টকে তুলে আনতে যাচ্ছি।” অপারেশনে অংশগ্রহণকারী সেনা কর্মকর্তারা জানতেন, জিয়াকে আটক করে সেনানিবাসে নেওয়ার পর তার কাছে তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করা হবে।
এই অভিযানে তিনটি গ্রুপ ছিল। দুটি দল সার্কিট হাউস আক্রমণ করে। তারা সার্কিট হাউসে বিনা বাধায় প্রবেশ ও দোতলায় চলে যায়। গোলাগুলির শব্দে সাদা পাজামা পরিহিত জিয়া দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে বলেন, “কী চাও তোমরা?” এ সময় আক্রমণকারী দলের দুজন ওখানে ছিলেন। তাদের একজন জিয়াকে বলেন, “ভয়ের কোনো কারণ নেই স্যার।” কাছেই ছিলেন মতিউর। তিনি জিয়াকে কোনো সুযোগ না দিয়ে তার সাবমেশিনগান দিয়ে জিয়ার দিকে গুলি ছোড়েন। একের পর এক গুলিতে জিয়ার শরীরের একদিক ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
এ ব্যাপারে সেনা কর্মকর্তা মইনুল হোসেন চৌধুরী লিখেছেন, “বিদ্রোহের সেই রাতে বেশ ঝড় হচ্ছিল এবং জিয়া সার্কিট হাউসের দোতলায় ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোর ৪টার দিকে অফিসারা অতর্কিতে সার্কিট হাউস আক্রমণ করে। ওই আক্রমণের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, তাতে কোনো সৈনিক, জেসিও বা এনসিওকে সরাসরি জড়ানো হয়নি। জুনিয়র অফিসাররা নিজেরাই দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রথমে সার্কিট হাউসে রকেট লঞ্চার নিক্ষেপ করে। পরে এক গ্রুপ গুলি করতে করতে ঝড়ের বেগে সার্কিট হাউসে ঢুকে পড়ে। গুলির শব্দ শুনে জিয়া রুম থেকে বের হয়ে আসেন এবং কয়েকজন অফিসার তাকে ঘিরে দাঁড়ায়। ওই সময় লে. কর্নেল মতিউর রহমান মাতাল অবস্থায় টলতে টলতে ‘জিয়া কোথায়, জিয়া কোথায়’ বলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে আসে এবং পলকেই গজখানেক সামনে থেকে তার চাইনিজ স্টেনগানের এক ম্যাগজিন (২৮টি) গুলি জিয়ার উপর চালিয়ে দেয়। অন্তত ২০টি বুলেট জিয়ার শরীরে বিদ্ধ হয় এবং পুরো শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। উপস্থিত অন্য অফিসাররা ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যায়। তারা কোনো গুলি ছোড়েনি। শুধু দু-একজন অফিসার ‘কী করছেন, কী করছেন’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। কিন্তু ততক্ষণে প্রেসিডেন্ট জিয়া মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।…
“যেসব অফিসারের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জেনারেল জিয়াকে হত্যা করা হয়, তাদের মধ্যে একমাত্র মেজর খালেদ ও মেজর মুজাফফরই তখন জীবিত ছিলেন। লে. কর্নেল মতিউর রহমান এবং লে. কর্নেল মাহবুব দুজন পালিয়ে যাওয়ার সময় মানিকছড়ির কাছে গোলাগুলিতে নিহত হন। মুজাফফর ও খালেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে মুজাফফর ভারতে ও খালেদ ব্যাংককে চলে যান। বাকিদের কোর্ট মার্শালে ফাঁসি দেওয়া হয়। আমার মনে হয়, জিয়াকে হত্যার পেছনে লে. কর্নেল মতির ক্রোধ ও আক্রোশের কারণ ছিল অন্যত্র।…
“জিয়াহত্যার পরদিন সকালেই কথা প্রসঙ্গে জেনারেল সাদেক আমাকে মতিউর রহমানের ক্ষোভের বিষয়টি অবহিত করেন। জেনারেল সাদেক আরো বলেন, মতিই সম্ভবত জেনারেল জিয়াকে হত্যা করেছে।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ২০০০। পৃষ্ঠা ১২১-১২২)
অংশগ্রহণকারী সেনা কর্মকর্তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্য নিয়ে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত হননি। শুধুমাত্র কিছু দাবি–দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। তারা জানতেন জিয়াকে বন্দি করে সেনানিবাসে নেওয়া হবে। মতিউর রহমান জিয়াকে হত্যা করলে তারা বিস্মিত হতবিহ্বল হয়ে পড়েন।
নিছক ব্যক্তিগত ক্রোধের বশে মতিউর রহমান একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করেছেন বললে তা অতি সরলিকরণ হয়ে যায়। যেকোনো চিন্তাশীল মানুষের মনেই এই বিষয়টি সন্দেহের উদ্রেক করে। কারণ, এ ব্যাখ্যা অত্যন্ত সরল ও দুঃখজনক। ঘটনা পরম্পরা পর্যালোচনা করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এর পেছনে একটা বড় ষড়যন্ত্র ছিল এবং ষড়যন্ত্রকারীরা মতিউর রহমানকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। এটা সহজেই অনুমেয়। ষড়যন্ত্রকারীরা মতিউর রহমান ও তার ঘনিষ্ঠ দুই-তিনজনের মাধ্যমে সার্কিট হাউস অপারেশনে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের জিয়ার বিরুদ্ধে উসকানি দিয়ে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। প্রকৃতপক্ষে ষড়যন্ত্রকারী সব সময় মহৎ ও ভালো কথা বলেই অনেকের মধ্যে থেকে কয়েকজনকে উদ্বুদ্ধ করে কোনো মিশনে পাঠায়। আর ওই দলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তাদের এক-দুজন এজেন্ট। যারা চূড়ান্ত সময়ে নাশকতামূলক কাজের মাধ্যমে সব ভন্ডুল করে দেয়।
এ ছাড়া ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’; অর্থাৎ, মঞ্জুরও যাতে ষড়যন্ত্রের পাতা ফাঁদে পা বাড়ান, সে জন্য ষড়যন্ত্রকারী অনেক আগে থেকেই নানা কৌশল প্রয়োগ করেছে। কোনো পদক্ষেপ নিতে মঞ্জুর যাতে উদ্বুদ্ধ হন, সে জন্য তাকে ক্রমাগত নানাভাবে উত্তেজিত করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে আমরা একটা আভাস পাই সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খোন্দকার নুরুন্নবীর লেখায়। তিনি লিখেছেন, “...১৯৮১-এর প্রথম দিকে আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির অধীনে বরকলে একটি বিডিআর ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব নিয়ে যাই। তিনি (মঞ্জুর) জিওসি হিসেবে একাধিকবার বরকলে আসেন।...শান্তি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য ২১ এপ্রিল একটি সভা ডাকা হয়। আমি বরকলে ছিলাম। ২০ এপ্রিল ’৮১তে সন্ধ্যাবেলা আমাকে ২১ তারিখের সভার কথা বলে জানানো হয় যে, সেদিন খুব ভোরে জিওসি তার হেলিকপ্টারে করে আমাকে বড় হরিনায় নিয়ে যাবেন। আমি যেন প্রস্তুত থাকি।...ভোরবেলা পার্বত্য এলাকা প্রায়শ কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে, জিওসির হেলিকপ্টার আসতে প্রায় দশটা বেজে গেল, হেলিকপ্টার উঠে ১৫ মিনিটের মধ্যে বড় হরিনায় পৌঁছে গেলাম। সেখানে আরো পাঁচ-ছয়জন সেনা অফিসার উপস্থিত ছিলেন। তারা অন্য একটি হেলিকপ্টারে বিভিন্ন জায়গা থেকে সরাসরি এখানে এসেছেন। আমাদের অপারেশনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে আমরা চা-এর বিরতি নিলাম।…বড় হরিনায় আমাদের বিডিআর এর ক্যাম্পটি ছিল কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়। ওখান থেকে ভারতের মিজোরামের শহর ডেমাগিরি দেখা যায়। চারিদিকে অসংখ্য ছোট বড় পাহাড়, খুবই সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। জেনারেল মঞ্জুর মাঝে মাঝে সিগারেট খেতেন। তিনি ঘরের বাইরে এসে সিগারেট টানছিলেন এবং পাহাড়ের উপর পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ আমাকে বললেন, ‘নবী আমার মনটা খুব ভালো না। কিছুলোক আমাকে ভালো থাকতে দিচ্ছে না। আমি খুব চাপের মধ্যে আছি।’ আমি বিষয়টি তার ব্যক্তিগত মনে করে কোনো প্রশ্ন করিনি। তিনিও আর কিছু বলেননি।” (ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে সেক্টর আট, আনন্দ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭, পৃষ্ঠা ১৭৮-১৭৯)
এ ছাড়া তখন হয়তো রাষ্ট্রীয় কিছু বিষয় নিয়ে মঞ্জুর নিজে বা তার স্ত্রী সমালোচনা বা মত ব্যক্ত করেছেন। ষড়যন্ত্রকারীরা এসবও কাজে লাগিয়েছে।
এ ব্যাপারে কিছু তথ্য পাওয়া যায় মইনুল হোসেন চৌধুরীর লেখায়। তিনি লিখেছেন, “...১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে আমি ক্যাডেট কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে সস্ত্রীক চট্টগ্রাম ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগদান করি। রাতে জিওসি জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে ব্যক্তিগত নৈশভোজে অংশগ্রহণ করি। সেখানে আলাপচারিতায় মঞ্জুরের স্ত্রী জিয়ার ওপর খুব বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় খোলামেলাভাবে সরকার ও সেনাকর্তৃত্বের সমালোচনা করতে শুরু করেন। এতে আমি ও আমার স্ত্রী অস্বস্তিবোধ করেছিলাম এবং অন্য প্রসঙ্গ টানতে চেষ্টা করি। যাহোক খাওয়াদাওয়ার পর আমরা চলে আসি। কিন্তু সামরিক গোয়েন্দারা অতিরঞ্জিত ও কাল্পনিকভাবে সাজিয়ে সেই নৈশভোজের কথা সেনাপ্রধান এরশাদ ও জিয়ার কানে তোলে।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা ১১৮)
এ ছাড়া জিয়াউর রহমান তখন আন্তর্জাতিক খ্যাতির আশায় দীর্ঘদিন সময় ধরে চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে ১৯৮০-৮১ সালে দুতিয়ালীতে ব্যস্ত ছিলেন। জানা যায়, এ সময় জিয়া দেশের অনেক সমস্যার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিকেও তিনি মনোযোগ দেননি। এই সুযোগ চতুরতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন সেনাপ্রধান এরশাদ। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের দাবিয়ে রেখে পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনা কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেন। তখন মেজর জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে মাত্র চারজন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। চারজনের একজন ছিলেন মেডিকেল কোরে। বাকি তিনজন যথাক্রমে ছিলেন এম এ মঞ্জুর, মীর শওকত আলী ও মইনুল হোসেন চৌধুরী। এম এ মঞ্জুর ও মীর শওকত আলীর সম্পর্ক আবার ভালো ছিল না।
এ ব্যাপারে আমরা তথ্য পাই মইনুল হোসেন চৌধুরীর লেখায়। তিনি লিখেছেন, “...পাকিস্তান-প্রত্যাগত এরশাদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ১৯৭৩ সালে। এরপর মাত্র সাত বছরে তিনি লে. কর্নেল থেকে তরতর করে লে. জেনারেল ও সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে যান। আর আট বছরের মাথায় তিনি সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে যান।…
…আমি আগেই উল্লেখ করেছি, তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অনৈক্যের একটা প্রধান কারণ ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা সেনা-অফিসারদের দ্বন্দ্ব। এরশাদ উপসেনাপ্রধান হওয়ায় এ সুযোগকে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে কাজে লাগান। তিনি এদের মধ্যে বিভেদের ফাটল সৃষ্টি করেন। মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের দাবিয়ে রেখে অমুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধার পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেন। তখন মেজর জেনারেল পদমর্যাদার সেনা অফিসারদের মধ্যে চারজন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই চারজনের মধ্যে একজন ছিলেন ডা. শামসুল হক। বাকি তিনজন মীর শওকত, মঞ্জুর ও আমি। আবার এঁদের মধ্যে দুজন–শওকত ও মঞ্জুরের সম্পর্ক ভালো ছিল না, যা আগেই বলেছি। …এদিকে এরশাদ ধীরে ধীরে জিয়ার কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বস্ততা ও আস্থাভাজন হওয়ার পথ করলেন। ছলনা ও চতুরতার মাধ্যমে এরশাদ জিয়ার খুব প্রিয়পাত্র হলেন। জিয়াও তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করলেন। ...সেনাপ্রধান হওয়ার পর এরশাদ অত্যন্ত সুকৌশলে পদক্ষেপ নিতে লাগলেন। তাঁর নিজের পছন্দের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বসম্পন্ন পদগুলোতে বহাল করলেন। মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের পার্বত্য বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হলো। কৌশলে স্পর্শকাতর পদগুলো থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়া হলো। সেনা ও সামরিক গোয়েন্দা বিভাগগুলোতে তিনি নিজের কাছের লোকদের নিয়োগ করলেন। পরে ক্ষমতা দখলের সময় এসব লোক তাঁকে সহায়তা করে এবং তাঁর রাজনীতির দোসর হয়। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো লে. জেনারেল (মেজর জেনারেল) মহব্বত (মহাব্বত) জান চৌধুরী, যিনি পরে মন্ত্রী হন। বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য নিজের পছন্দমতো লোকদের পাঠিয়ে তাঁর প্রতি আনুগত্যের জন্য পুরস্কৃত করতেন। আর্মি হেডকোয়ার্টারের একজন পিএসও হিসেবে এসব বিষয়ে আমার সঙ্গে তাঁর পরামর্শ করার কথা। কিন্তু এরশাদ সেটা এড়িয়ে যেতেন।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা ১১৪-১১৬)
জিয়া নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সেনাপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তখন অনেকেই আশা করেছিলেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকেই সেই পদে নিয়োগ দেবেন। কিন্তু জিয়া কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে সেনাপ্রধান করেননি।
এ ব্যাপারে সেনাকর্মকর্তা মইনুল হোসেন চৌধুরীর লেখা প্রনিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, “…একসময় জিয়া এরশাদকে সেনাপ্রধান করে নিজে ওই পদ থেকে সরে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। এ পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্বে জিয়া একদিন আর্মি হেডকোয়ার্টারের সামনের লনে হাঁটতে হাঁটতে কথা প্রসঙ্গে আমার মতামত জানতে চাইলেন। আমি জেনারেল মঞ্জুরকে সেনাপ্রধান করার কথা বললাম। জিয়া আমার ওই মতামতকে অন্যভাবে নিলেন। ভাবলেন, আমি আর মঞ্জুর একই পক্ষের। তাই জিয়া আমার দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ করে বললেন, তোমরা দুজনেই চিফ হবে, তবে অপেক্ষা করতে হবে। শুধু আমি নই, জিয়ার অন্যান্য সুহৃদ, শুভাকাঙ্ক্ষী, অনুগত ও বন্ধুবান্ধবরা এরশাদকে সেনাপ্রধান করার বিপক্ষে ছিলেন। …এতকিছু সত্ত্বেও জিয়া ১৯৭৯ সালের ২৯ এপ্রিল এরশাদকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করেন।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা ১১৬)
সেনাবাহিনীর এই দ্বন্দ্বের আরও কিছু বিবরণ আমরা পাই ১৯৮১ সালের ৩০ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেনের এক সাক্ষাৎকারে। এই সাক্ষাৎকারে তিনি তখনকার সেনাবাহিনীর ভেতরে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কের বিবরণ দিয়েছিলেন। মোজাফফরের ভাষ্যে আমরা জানতে পারি, ৩০ মে সকালে মঞ্জুর চট্টগ্রামের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মাঝে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যাকাণ্ড।
মোজাফফর বলেন, “জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরই তার মুক্তিযুদ্ধের অতীত থেকে সরে যেতে শুরু করলেন। সামরিক বাহিনীর ভেতরে থাকা অমুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান ফেরত সামরিক অফিসাররা তার খুব কাছের লোক হয়ে দাঁড়াল। আর সুবিধাবাদী অমুক্তিযোদ্ধারাও জিয়ার এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের হীন স্বার্থ হাসিল করে চলেছিল।…
…অন্যদিকে শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের বিদেশে চাকরি দিলেন। সেটা না করে খুনিদের বিচার করতে পারতেন জিয়া। তাতে তার ভাবমূর্তি কমত না বরং বাড়ত। আর সেটা না হওয়ার কারণেই এরপর বিদ্রোহের আগ্রহ সৃষ্টি হয় অনেকের মনে। সাহসী হয়ে ওঠে তারা। আর ফারুক-রশিদের বিষয়টিও ক্রমে ক্রমে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের দূরে ঠেলে দিচ্ছিল জিয়ার কাছ থেকে। সামরিক বাহিনীর ভেতরে অমুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের প্রতি কিছুটা পক্ষপাতিত্ব স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযোদ্ধা পক্ষকে হতাশ করেছিল। এর একটা পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করেছিলেন অনেকেই। প্রয়োজনবোধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনাও মুক্তিযোদ্ধা পক্ষের অনেকের মাথার ঠাঁই পেতে শুরু করে।…
…অমুক্তিযোদ্ধা পক্ষও চুপ করে বসে ছিল না। তারাও মনেপ্রাণে চাচ্ছিল সামরিক অভ্যুত্থান ঘটুক। কৌশলে তারা মুক্তিযোদ্ধা পক্ষকে উসকানি দিতে শুরু করেছিল, যাতে মুক্তিযোদ্ধা পক্ষই অভ্যুত্থান ঘটায়। সম্ভবত সে কারণেই মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের বদলি করে নির্দিষ্ট সেনানিবাসগুলোতে সমবেত করতে অদৃশ্যভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল তারা। যাতে এক জায়গায় মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা থাকলে অভ্যুত্থান ঘটানোর সুবিধা হয় এবং অভ্যুত্থানের দায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযুক্ত করা যায়।”
মোজাফফর আরও একটি ঘটনার কথা বলেন, “চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহের দিন পনেরো আগে জেনারেল মঞ্জুর সামরিক বাহিনীর ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ এবং এর আশু প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াকে একটা চিঠি লেখেন। জিয়াকে দেওয়ার জন্য জিয়ার তৎকালীন পিএস কর্নেল মাহফুজকে দিয়েছিলেন চিঠিটি। জিয়ার কাছে পৌঁছানোর আগেই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চিঠিটা হাতিয়ে নেন। এর পরবর্তী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যায়, এই চিঠি আদৌ জিয়ার কাছে পৌঁছেনি। তাহলে হয়তো পরবর্তী ঘটনা এমন হতো না। শুধু তাই নয়, সেনাবিদ্রোহের তিন মাস পর কর্নেল মাহফুজকে অভ্যুত্থানের দায়ে জড়িয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। চিঠির বিষয়টি জানতেন বলেই মাহফুজকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অনেকের ধারণা।” (দৈনিক ভোরের কাগজ, ২ জুন ১৯৯৪, রহস্যাবৃত জিয়া হত্যা-৪)
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বিশেষত প্রগতিশীল অংশকে আরও কোণঠাসা এবং বাকি সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতেই পরিকল্পিতভাবে এই অভ্যৃত্থান সংঘটন করা হয়।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সার্কিট হাউসে পরিচালিত অপারেশনে অংশ নিয়েছিল ৩টি দল। এর মধ্যে দুটি দল সার্কিট হাইসে যায়। ওই দুই দলে ছিলেন মেহবুবুর রহমান, শাহ এম ফজলে হোসেন, মতিউর রহমান, খালেদ, জামিল হক ও মমিনুল হকসহ মোট ১২ জন। তারা পৃথক দুটি পিকআপে ছিলেন। সেদিন পিকআপ দুটি সজোরে গেটে ধাক্কা দিয়ে সোজা সার্কিট হাউসের মাঠে ঢুকে পড়ে। একটি পিকআপ থেকে ছোড়া রকেট লঞ্চারের প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো সার্কিট হাউস ভবন। প্রথম দল এসএমজি দিয়ে একনাগাড়ে গুলি করতে করতে দোতলার দিকে এগিয়ে যায়। তাদের পেছনে ছিল দ্বিতীয় দল। দুই দল প্রায় বিনা বাধায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায় দোতলায়।
এদিকে সার্কিট হাউসের যে ঘরে জিয়াউর রহমানের থাকার কথা ছিল, সে ঘরে সেদিন তিনি ছিলেন না। গোলাগুলির আওয়াজে সিঁড়ির ডান দিকের রুমটার দরজার একটি পাল্লা ফাঁক করে বাইরে কী হচ্ছে, তা দেখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এই সময় গর্জে ওঠে মতিউর রহমানের হাতের অস্ত্র। মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন জিয়া। তিনি নিহত হন।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনার ৪৫ বছর পরও সেই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। যিনি জিয়াকে হত্যা করেছিলেন, তিনি নিজেও ঘটনার দুই দিন পর আত্মঘাতি গুলিতে মারা হন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন মেহবুবুর রহমান। তারা একজন আরেকজনকে গুলি করে নিজেদের প্রাণ সংহার করেন।
কর্নেল মতিউর রহমান তখন সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনাল হেড কোয়াটার্সের সিনিয়র অফিসার ছিলেন। আর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুবুর রহমান ছিলেন চট্টগ্রামে ২১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য মতিউর রহমান বীর বিক্রম ও মেহবুবুর রহমান বীর উত্তম খেতাব পেয়েছিলেন। তারা দুজনসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন কি না–ঘটনার পরে তাদের কর্মকাণ্ডে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তারা আসলে কী চেয়েছিল, সেটা এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
৩০ মে থেকে ১ জুনের ঘটনা জানা ও বোঝার জন্য মেজর মো. রেজাউল করিম রেজার সাক্ষ্য বা বয়ান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তখন চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তরে অর্ডন্যান্স সার্ভিসেসের (DADOS) উপসহকারী পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। ঘটনার পর তাকে বাসা থেকে জিওসির দপ্তরে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তিনি মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের ষ্টাফ অফিসার বা চিফ সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঘটনার পর থেকে আটক হওয়া পর্যন্ত মঞ্জুরের ছায়াসঙ্গী ছিলেন।
মেজর রেজার ভাষ্যে আমরা জানতে পারি, ৩০ মে ভোরে বাসার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। তখন সময় সাড়ে ৫টা বা পৌনে ৬টা এ রকম হবে। দরজা খুলে দেখেন অফিস রানার একেবারে যুদ্ধসাজে আর্মসসহ তার বাসায় হাজির। রানার তাকে সালাম দিয়ে বলেন, “স্যার আপনাকে সালাম দিয়েছে অফিসে যাওয়ার জন্য।”
অফিসে যাওয়ার পর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানের সঙ্গে তার প্রথমে দেখা হয়। তার নির্দেশে তিনি সার্কিট হাউসে যান। সেখান থেকে ফিরে ডিভ হেডকোয়ার্টারে জিওসি মঞ্জুরের অফিসের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পান অফিসের বারান্দায় জেনারেল মঞ্জুর পায়চারি করছেন। তিনি রেজাকে দেখে ডেকে বলেন, “রেজা কাম হেয়ার।” রেজা তার সামনে গিয়ে স্যালুট করেন। মঞ্জুর তাকে জিজ্ঞেস করেন–
“রেজা তুমি কোত্থেকে আসছ?”
“স্যার সার্কিট হাউস থেকে আসছি।”
“কী কী দেখলে?”
রেজা সার্কিট হাউসে যা যা দেখেছেন, তা বলার পর মঞ্জুর কিছুক্ষণ নীরব থাকেন। এর পর রেজার দিকে তাকিয়ে মঞ্জুর বলেন–
“Oh, What they have done! What they have done!”
তারপর রেজাকে জিজ্ঞেস করেন–
“তুমি কি রাতে সার্কিট হাউসে গিয়েছিলে?”
“না স্যার, আমি সার্কিট হাউসে যাইনি। আমি বাসায় ঘুমিয়েছিলাম।”
“তোমার মাথা ঠান্ডা আছে?”
“হ্যাঁ, ঠান্ডা আছে, থাকবে না কেন?”
“দেখ, ওদেরতো মাথা গরম, তোমারতো মাথা ঠান্ডা আছে…, You give the full security. Now on word you are my chief security, ok.”
এই কথা বলে মঞ্জুর রেজার কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলেন, “ঠিক আছে।” তখন থেকে রেজা মঞ্জুরের চিফ সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। এর পর থেকে মঞ্জুর যেখানে যান, রেজা তার সঙ্গে ছিলেন।
এদিকে সার্কিট হাউস থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফিরে মেজর রেজা দেখতে পান যুদ্ধের পরিবেশ। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করার পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিত চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ছিল না। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে তার পরের ঘটনাপ্রবাহ কোনো পরিকল্পনা ছাড়া ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলেছে বলে তার মনে হয়েছে।
মেজর রেজার ভাষ্যমতে, জিয়াউর রহমান পাকিস্তান-ফেরত সেনা কর্মকর্তা ও অমুক্তিযোদ্ধাদের বেশি সুযোগ-সুবিধা বা পদ-পদন্নোতি এবং পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে সেনাপ্রধান করেছিলেন। এ কারণে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হবে–এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। জড়িতরা জানতেন, সার্কিট হাউস থেকে জিয়াকে বন্দি করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এনে দাবি আদায়ে চাপ সৃষ্টি করা হবে।
সামরিক আদালতে জিয়া হত্যার বিচারের সময় অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ডিফেন্ডিং অফিসার হিসেবে পরে মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহিম বীর প্রতীকসহ (তখন লেফটেন্যান্ট কর্নেল) তিনজন সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তা ও সাক্ষীদের কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়েছিলেন জানিয়েছেন।
মতিউর রহমান ও মেহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে যেসব সেনা কর্মকর্তা ৩০ মে সার্কিট হাউসে গিয়েছিলেন, তাদের ব্রিফ করা হয়েছিল জিয়াউর রহমানকে বন্দি করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এনে চাপ সৃষ্টির। মতিউর রহমানই এই ব্রিফিং দিয়েছিলেন। এই তথ্য জানিয়েছেন মেজর রেজা। এই তথ্য তিনি পেয়েছিলেন, সার্কিট হাউস অপারেশনে যারা গিয়েছিলেন, তাদের কয়েকজনের কাছ থেকে।
মেজর রেজা জানান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে অপসারণ করে মেজর জেনারেল মঞ্জুর বা অন্য কোনো মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হোক–এমনটাই চেয়েছিলেন জড়িত সেনা কর্মকর্তারা।
দ্বিতীয় দাবি ছিল, পাকিস্তান প্রত্যাগত বা অমুক্তিযোদ্ধা যেসব কর্মকর্তা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন উচ্চপদে ছিলেন, তাদের সরিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের সেসব পদে নিয়ে আসা। এ ছাড়া জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভা থেকে পাকিস্তানপন্থী মন্ত্রীদের সরানোরও দাবিও ছিল। তবে প্রথম দুটিই ছিল তাদের মূল দাবি।
মেজর রেজা এই তথ্য জেনেছিলেন জড়িত কয়েকজনের কাছ থেকে। মেজর জেনারেল ইব্রাহিমও সামরিক আদালতে অভিযুক্তদের কাছ থেকে একই ধরনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের ভূমিকা সম্পর্কে নানা রকম বক্তব্য পাওয়া যায়। মেজর রেজাউল করিম রেজার মতে, জিয়াউর রহমানকে হত্যার বিষয়টি মঞ্জুর আগে জানতেন না এবং ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তা জেনেছেন।
মেজর রেজা জানিয়েছেন, ৩০ মে সকালে তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে সার্কিট হাউসে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফেরার পর মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে তার দেখা হয়। তখন রেজার কাছ থেকে সার্কিট হাউসের বর্ণনা শুনে মঞ্জুর তাকে বারবার বলেছিলেন, “ওহ হোয়াট হ্যাভ দে ডান (ওরা কী করেছে)?”
জিয়া হত্যার ঘটনার দায়িত্ব মঞ্জুর কাঁধে নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন মেজর রেজা। তিনি বলেন, মেজর জেনারেল মঞ্জুর সকলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য সকাল থেকেই সেনা কর্মকর্তা ও সেনাদের বিভিন্ন ব্যারাকে ঘুরে ঘুরে বক্তব্য দিয়েছেন।
মেজর রেজার বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি এটা মানতে রাজি নন যে, জিয়াকে হত্যার বিষয়ে মেজর জেনারেল মঞ্জুর জানতেন না। তিনি মনে করেন, মঞ্জুর চট্টগ্রামে জিওসির দায়িত্বে থাকার সময় আগেও জিয়াউর রহমানকে হত্যার একাধিকবার ব্যর্থ চেষ্টা হয়েছিল। ফলে জিয়া হত্যার ঘটনা জেনারেল মঞ্জুরের অগোচরে ঘটেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মেজর জেনারেল ইব্রাহিম উল্লেখ করেন “মতিউর রহমান ও মঞ্জুরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আর মেহবুবুর রহমান সম্পর্কে মঞ্জুরের ভাগনে ছিলেন।”
জিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পেছনে জেনারেল এরশাদের কোনো ভূমিকা ছিল কি না–এই প্রশ্নও তখন উঠেছিল। জেনারেল এরশাদের সঙ্গে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অন্য কারও সম্পর্ক ছিল কি না এবং মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা দ্বন্দ্বের সুযোগ সেখানে নেওয়া হয়েছে কি না–এই সন্দেহ রয়েছে মেজর রেজার।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানকে হত্যার কয়েক দিন আগে মতিউর রহমান ঢাকা সেনানিবাসে এসে জেনারেল এরশাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ঘটনার অনেক পরে তিনি এ কথা শুনেছিলেন।
জেনারেল এরশাদ জীবিত থাকা অবস্থায় মঞ্জুর হত্যা মামলায় আদালতে শুনানিতেও এ ধরনের অভিযোগ এসেছিল।
মতিউর রহমানের ঢাকায় আসার তথ্য সেনা কর্মকর্তা মইনুল হোসেন চৌধুরীর বইয়েও পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, “১৯৮১ সালের মে মাসের প্রথম দিকে আমেরিকাতে সামরিক প্রশিক্ষণে মনোনয়নের জন্য তৎকালীন লে. ক. মতিউর রহমান, লে. কর্নেল ইমামুজ্জামান (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ও পাকিস্তান-প্রত্যাগত লে. কর্নেল সাখাওয়াতসহ (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার) ৫ জনকে একত্রে সেনাসদরে বাছাইয়ের জন্য ডাকা হয়। এঁদের মধ্যে সাখাওয়াত ছিলেন ১০ মার্চ ১৯৮১ সালে এরশাদ কতৃর্ক মনোনীত একটি কোর্ট মার্শালের প্রসিকিউটর, যেখানে ষড়যন্ত্র ও অভ্যুত্থান পরিকল্পনার দায়ে মুক্তিযোদ্ধা অফিসার লে. ক. নুরুন্নবী (এস আই নুরুন্নবী খান) বীর বিক্রম, কর্নেল দিদার (দিদারুল আলম বীর প্রতীক) ও একজন বেসামরিক ব্যাংকার মনির হোসেনের বিচার হয়েছিল। কোর্ট মার্শালে লে. ক. নুরুন্নবীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং এক বছরের কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়। দিদারকে ১০ বছরের জেল এবং মনির হোসেনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। সেনাপ্রধান ইমামুজ্জামান ও মতিকে বাদ দিয়ে সাখাওয়াতকে আমেরিকায় প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত করেন, যদিও যোগ্যতাবলে বাকি এক অফিসার সাখাওয়াতের চেয়ে ভালো ছিল বলে অনেকের ধারণা। মনোনয়ন না পেয়ে মতিউর রহমান অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হন এবং ওইদিনই বঙ্গভবনে গিয়ে জিয়ার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সাদেকের সঙ্গে দেখা করেন। মনোনয়ন, অনিয়মের কথা তিনি সরাসরি জেনারেল সাদেককে বলেন। তিনি আরো অভিযোগ করেন, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারগণ আর্মিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে জানানোর জন্য জেনারেল সাদেককে অনুরোধ করেন।” (এক জেনারেলের নীরব স্বাক্ষ্য, স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা: ১২৩)
এ ছাড়া গণমাধ্যমে প্রচারিত ভাষ্যে আরও জানা যায়, ইন্টারভিউ দিয়ে মতিউর রহমান কয়েক দিন ঢাকায় ছিলেন। এ সময় তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও জিয়ার ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ ওয়াই এম মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে বঙ্গবভনে তিনি দেখা করেন। তখন তিনি জানতে পারেন, ২৯ মে রাষ্ট্রপতি জিয়া রাজনৈতিক সফরে চট্টগ্রাম যাচ্ছেন এবং মঞ্জুরকে ঢাকায় স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে বদলির আদেশে জিয়া স্বাক্ষর করেছেন।
মতিউর রহমান ও তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাকি অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করছিলেন জিয়াকে চট্টগ্রামে হত্যার। এ জন্য তিনি ও তার সহযোগীরা কয়েকবার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তাদের সেসব প্রচেষ্টা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়। এতে মতিউর হতাশ হয়ে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে; অর্থাৎ, বিদেশে প্রশিক্ষণে যেতে না পারায় তিনি আবার জিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে অনুপ্রাণিত হন।
এদিকে জিয়া যেদিন চট্টগ্রাম আসার সিদ্ধান্ত নেন, সেদিনই তিনি সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর বদলির আদেশে স্বাক্ষর করেন। তাকে সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেলের পদ থেকে বগুড়ায় জিওসি হিসেবে বদলি করা হয়। অনেকের ধারণা, রাষ্ট্রপতি জিয়া মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর বদলির আদেশ স্বাক্ষরের সময় চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরকে ঢাকার ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে বদলির আদেশেও স্বাক্ষর করেন। জিয়া তাদের দুজনকে বদলির সিদ্ধান্ত মে মাসের প্রথম দিকেই নিয়েছিলেন। কিন্তু আদেশে স্বাক্ষর করেন ২৪ মে।
বদলির আদেশে স্বাক্ষরের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায় মইনুল হোসেন চৌধুরীর লেখায়। তিনি লিখেছেন, “...এর কয়েকদিন (এপ্রিল) পরেই এরশাদ আমাকে জানালেন, রাষ্ট্রপতি জিয়ার নির্দেশে আমাকে ঢাকায় অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল পদ থেকে বগুড়াতে জিওসি হয়ে চলে যেতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে আমি জানতে চাইলাম, আর কার পোস্টিং হয়েছে। এরশাদ উত্তরে বললেন, জেনারেল মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্টাফ কলেজে বদলি করা হয়েছে এবং আমার বর্তমান অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল পদ আপাতত খালি থাকবে এবং লে. জে. এরশাদ নিজেই সে দায়িত্ব পালন করবেন।...১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়া নিহত হওয়ার পাঁচদিন পূর্বে বগুড়া সেনানিবাসে বদলির আদেশ পেলাম।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা ২১৯)
অন্যদিকে ভোরের কাগজের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৯ মে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে মঞ্জুরকে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করা হয়েছিল। প্রটোকল অনুযায়ী তারই বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অফিস; অর্থাৎ, বঙ্গভবন থেকে তাকে জানানো হয়েছিল, তার উপন্থিত থাকার প্রয়োজন নেই। এরপর মঞ্জুর সেনাপ্রধান এরশাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। তখন এরশাদও তাকে বলেন, রাষ্ট্রপতি চান না তিনি উপস্থিত থাকুন।
আরেকটি ভাষ্যে জানা যায়, বঙ্গভবন থেকে মঞ্জুরকে আরও বলা হয়েছিল রাষ্ট্রপতির সফর রাজনৈতিক। তাই জিওসির বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন নেই।
আবার জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর লেখার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি মঞ্জুর চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কেন আসেননি, সে ব্যাপারে জিয়া সেনা প্রতিনিধিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন।
এই দুই তথ্য অনেকের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। এটা হয়তো ষড়যন্ত্রকারীদেরই একটা কৌশল ছিল। জিয়া হয়তো এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না অথবা ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে না জানিয়েই মঞ্জুরকে বিমানবন্দরে যেতে নিষেধ করেন তাকে ক্ষুব্ধ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে। অন্যদিকে ষড়যন্ত্রকারী দলের কেউ হয়তো তাদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জিয়ার চট্টগ্রাম সফর ও মঞ্জুরের বদলির আদেশে জিয়ার স্বাক্ষরের খবর পরিকল্পিতভাবেই মতিউরকে দেয়, যাতে তিনি মঞ্জুরসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের জড়িয়ে হঠকারী কিছু একটা করেন।
এসব তথ্য আমরা পাই পরে প্রচারিত কিছু ভাষ্যে। মতিউর রহমান ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে তার ঘনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন মঞ্জুরকে স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট হিসেবে বদলির সিদ্ধান্তের খবর। তিনি তাদের বোঝান, এটি হচ্ছে জিয়া ও পাকিস্তান-প্রত্যাগত সেনা কর্মকর্তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্রান্তের অংশ। খবরটি তিনি মঞ্জুরকেও জানান।
পরে মতিউর রহমান তার খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে (ইনার গ্রুপ) নিয়ে এক গোপন বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি জানান, জিয়া চট্টগ্রাম সফরে আসছেন এবং মঞ্জুরকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের তার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত করতে ইনার গ্রুপের সদস্যদের বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন, মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটা বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বৈঠকে উপস্থিত একজন পরে অন্য মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের এই খবর জানান। এর ধারাবাহিকতায় জিয়া চট্টগ্রামে যাওয়ার আগের দিন সেনানিবাসে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি ও একটা ভীতিকর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এই গুঞ্জন আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই জানতে পারেন মঞ্জুরের বদলির আদেশে রাষ্ট্রপতি জিয়া স্বাক্ষর করেছেন। এর পর মতিউর রহমান ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে তেমন বাধা থাকে না।
আলোচনার সময় মতিউর রহমান ইনার গ্রুপের সদস্যদের আরও বলেন, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অভিযান চালিয়ে জিয়াকে বন্দি করা হবে। তারপর তাকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় বঙ্গভবনে নিয়ে সেখানে সেনাপ্রধান এরশাদ ও মেজর জেনারেল মীর শওকত আলীসহ অন্য প্রিন্সিপাল অফিসারদের ডেকে তাদের সবাইকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। মতিউর বলেন, তিনি বঙ্গভবন রেকি করে এসেছেন। এই কাজের জন্য ৩০ জন কর্মকর্তা দরকার। তাহলে এটা করা সম্ভব।
এর পর সকলে বিষয়টি নিয়ে অনেকক্ষণ আলোচনা করলেন। কিন্তু তারা একমত হতে পারেননি। তবে তারা সবাই একটা ব্যাপারে একমত হন, দ্রুত একটা কিছু করা দরকার। জিওসি মঞ্জুর চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে গেলে এই সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নৈশ প্রশিক্ষণ চলছে। সেনানিবাস থেকে সার্কিট হাউসে গেলে তা কারও নজরে পড়বে না। তাই এটা ২৯ তারিখ রাতে্ই করতে হবে।
এদিকে মতিউর রহমানসহ তার ইনার গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে, যখন তারা জানতে পারেন চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতির অভ্যর্থনায় জিওসি মঞ্জুরকে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করা হয়েছে। এ খবরে মতিউর রহমান ও তার ইনার গ্রুপের সদস্যরা কিছুটা ভয় পেয়ে মনে করেন, তাদের পরিকল্পনা হয়তো ফাঁস হয়ে গেছে। এ অবস্থায় তারা স্থির করেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে।
মতিউর রহমান ও তার সহযোগী ‘ইনার গ্রুপ’র এই তৎপরতার সঙ্গে মঞ্জুর জড়িত ছিলেন–এমন তথ্য সরকারি ভাষ্য ছাড়া আর কোথাও পাওয়া না। যদি কখনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, তাহলেই হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন মঞ্জুর। কিন্তু তাকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে মতিউর রহমান ও মেহবুবুর রহমান পরস্পরের গুলিতে নিহত হয়েছেন। অবশ্য তারা দুজন সরকার সমর্থক সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন, এমন তথ্যও প্রচারিত আছে।
এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা এ সম্পর্কে তথ্য দিতে পারতেন, তাদেরও দ্রুত ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার প্রমাণ চিরতরে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা পরিকল্পনামাফিক মঞ্জুরকে হত্যা এবং সংশ্লিষ্টদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছে। মঞ্জুরের হত্যাকাণ্ড ষড়যন্ত্রের প্রকৃত ইতিহাসকে পর্দার আড়ালে ঠেলে দিয়েছে। সেই পর্দা সরিয়ে প্রকৃত ইতিহাস উদ্ধার করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আড়াল করা এই ইতিহাস কোনোদিনই হয়তো আর আলোর মুখ দেখবে না।
ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত দুজনসহ অন্য আরও কিছু ভাষ্যে আমরা জেনেছি, সেনানিবাসে ২৯ মে রাত ১২টার পর থেকেই মতিউর রহমানের নেতৃত্বে দ্রুত অভিযান বাস্তবায়নের কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে যায়। অভিযানে অংশগ্রহণকারীরা নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হলে মতিউর রহমান একটি কোরআন শরিফ বের করে তাদের সবার উদ্দেশে বলেন, “আমার হাতে রয়েছে পবিত্র কোরআন শরিফ। আমরা আজ যা করতে যাচ্ছি তা শুধু এই দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। এর সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ জড়িত নেই। যারা আমাদের সঙ্গে থাকতে চান তারা এই কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ নিন এবং প্রতিজ্ঞা করুন। আর যারা এ কাজে রাজি নন তারা রুম ছেড়ে চলে যেতে পারেন। তবে তাদের কাছে একটাই অনুরোধ দয়া করে এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলবেন না।” মতিউরের এ বক্তব্যের পর কেউ কোনো কথা বলেননি। সবাই কোরআন ছুঁয়ে শপথ নেন।
মতিউর রহমানই ছিলেন এই অভিযানের নেতা। সার্কিট হাউসের একটি নকশা বের করে তিনি সকলকে পরিকল্পনাটি বুঝিয়ে দেন। তিনি তাদের আবার শপথ করিয়ে বলেন, “আজ আমরা শুধু প্রেসিডেন্টকে তুলে আনতে যাচ্ছি।” অপারেশনে অংশগ্রহণকারী সেনা কর্মকর্তারা জানতেন, জিয়াকে আটক করে সেনানিবাসে নেওয়ার পর তার কাছে তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করা হবে।
এই অভিযানে তিনটি গ্রুপ ছিল। দুটি দল সার্কিট হাউস আক্রমণ করে। তারা সার্কিট হাউসে বিনা বাধায় প্রবেশ ও দোতলায় চলে যায়। গোলাগুলির শব্দে সাদা পাজামা পরিহিত জিয়া দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে বলেন, “কী চাও তোমরা?” এ সময় আক্রমণকারী দলের দুজন ওখানে ছিলেন। তাদের একজন জিয়াকে বলেন, “ভয়ের কোনো কারণ নেই স্যার।” কাছেই ছিলেন মতিউর। তিনি জিয়াকে কোনো সুযোগ না দিয়ে তার সাবমেশিনগান দিয়ে জিয়ার দিকে গুলি ছোড়েন। একের পর এক গুলিতে জিয়ার শরীরের একদিক ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
এ ব্যাপারে সেনা কর্মকর্তা মইনুল হোসেন চৌধুরী লিখেছেন, “বিদ্রোহের সেই রাতে বেশ ঝড় হচ্ছিল এবং জিয়া সার্কিট হাউসের দোতলায় ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোর ৪টার দিকে অফিসারা অতর্কিতে সার্কিট হাউস আক্রমণ করে। ওই আক্রমণের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, তাতে কোনো সৈনিক, জেসিও বা এনসিওকে সরাসরি জড়ানো হয়নি। জুনিয়র অফিসাররা নিজেরাই দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রথমে সার্কিট হাউসে রকেট লঞ্চার নিক্ষেপ করে। পরে এক গ্রুপ গুলি করতে করতে ঝড়ের বেগে সার্কিট হাউসে ঢুকে পড়ে। গুলির শব্দ শুনে জিয়া রুম থেকে বের হয়ে আসেন এবং কয়েকজন অফিসার তাকে ঘিরে দাঁড়ায়। ওই সময় লে. কর্নেল মতিউর রহমান মাতাল অবস্থায় টলতে টলতে ‘জিয়া কোথায়, জিয়া কোথায়’ বলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে আসে এবং পলকেই গজখানেক সামনে থেকে তার চাইনিজ স্টেনগানের এক ম্যাগজিন (২৮টি) গুলি জিয়ার উপর চালিয়ে দেয়। অন্তত ২০টি বুলেট জিয়ার শরীরে বিদ্ধ হয় এবং পুরো শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। উপস্থিত অন্য অফিসাররা ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যায়। তারা কোনো গুলি ছোড়েনি। শুধু দু-একজন অফিসার ‘কী করছেন, কী করছেন’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। কিন্তু ততক্ষণে প্রেসিডেন্ট জিয়া মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।…
“যেসব অফিসারের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জেনারেল জিয়াকে হত্যা করা হয়, তাদের মধ্যে একমাত্র মেজর খালেদ ও মেজর মুজাফফরই তখন জীবিত ছিলেন। লে. কর্নেল মতিউর রহমান এবং লে. কর্নেল মাহবুব দুজন পালিয়ে যাওয়ার সময় মানিকছড়ির কাছে গোলাগুলিতে নিহত হন। মুজাফফর ও খালেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে মুজাফফর ভারতে ও খালেদ ব্যাংককে চলে যান। বাকিদের কোর্ট মার্শালে ফাঁসি দেওয়া হয়। আমার মনে হয়, জিয়াকে হত্যার পেছনে লে. কর্নেল মতির ক্রোধ ও আক্রোশের কারণ ছিল অন্যত্র।…
“জিয়াহত্যার পরদিন সকালেই কথা প্রসঙ্গে জেনারেল সাদেক আমাকে মতিউর রহমানের ক্ষোভের বিষয়টি অবহিত করেন। জেনারেল সাদেক আরো বলেন, মতিই সম্ভবত জেনারেল জিয়াকে হত্যা করেছে।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ২০০০। পৃষ্ঠা ১২১-১২২)
অংশগ্রহণকারী সেনা কর্মকর্তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্য নিয়ে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত হননি। শুধুমাত্র কিছু দাবি–দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। তারা জানতেন জিয়াকে বন্দি করে সেনানিবাসে নেওয়া হবে। মতিউর রহমান জিয়াকে হত্যা করলে তারা বিস্মিত হতবিহ্বল হয়ে পড়েন।
নিছক ব্যক্তিগত ক্রোধের বশে মতিউর রহমান একাই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করেছেন বললে তা অতি সরলিকরণ হয়ে যায়। যেকোনো চিন্তাশীল মানুষের মনেই এই বিষয়টি সন্দেহের উদ্রেক করে। কারণ, এ ব্যাখ্যা অত্যন্ত সরল ও দুঃখজনক। ঘটনা পরম্পরা পর্যালোচনা করলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এর পেছনে একটা বড় ষড়যন্ত্র ছিল এবং ষড়যন্ত্রকারীরা মতিউর রহমানকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। এটা সহজেই অনুমেয়। ষড়যন্ত্রকারীরা মতিউর রহমান ও তার ঘনিষ্ঠ দুই-তিনজনের মাধ্যমে সার্কিট হাউস অপারেশনে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের জিয়ার বিরুদ্ধে উসকানি দিয়ে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। প্রকৃতপক্ষে ষড়যন্ত্রকারী সব সময় মহৎ ও ভালো কথা বলেই অনেকের মধ্যে থেকে কয়েকজনকে উদ্বুদ্ধ করে কোনো মিশনে পাঠায়। আর ওই দলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তাদের এক-দুজন এজেন্ট। যারা চূড়ান্ত সময়ে নাশকতামূলক কাজের মাধ্যমে সব ভন্ডুল করে দেয়।
এ ছাড়া ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’; অর্থাৎ, মঞ্জুরও যাতে ষড়যন্ত্রের পাতা ফাঁদে পা বাড়ান, সে জন্য ষড়যন্ত্রকারী অনেক আগে থেকেই নানা কৌশল প্রয়োগ করেছে। কোনো পদক্ষেপ নিতে মঞ্জুর যাতে উদ্বুদ্ধ হন, সে জন্য তাকে ক্রমাগত নানাভাবে উত্তেজিত করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে আমরা একটা আভাস পাই সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খোন্দকার নুরুন্নবীর লেখায়। তিনি লিখেছেন, “...১৯৮১-এর প্রথম দিকে আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির অধীনে বরকলে একটি বিডিআর ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব নিয়ে যাই। তিনি (মঞ্জুর) জিওসি হিসেবে একাধিকবার বরকলে আসেন।...শান্তি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য ২১ এপ্রিল একটি সভা ডাকা হয়। আমি বরকলে ছিলাম। ২০ এপ্রিল ’৮১তে সন্ধ্যাবেলা আমাকে ২১ তারিখের সভার কথা বলে জানানো হয় যে, সেদিন খুব ভোরে জিওসি তার হেলিকপ্টারে করে আমাকে বড় হরিনায় নিয়ে যাবেন। আমি যেন প্রস্তুত থাকি।...ভোরবেলা পার্বত্য এলাকা প্রায়শ কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে, জিওসির হেলিকপ্টার আসতে প্রায় দশটা বেজে গেল, হেলিকপ্টার উঠে ১৫ মিনিটের মধ্যে বড় হরিনায় পৌঁছে গেলাম। সেখানে আরো পাঁচ-ছয়জন সেনা অফিসার উপস্থিত ছিলেন। তারা অন্য একটি হেলিকপ্টারে বিভিন্ন জায়গা থেকে সরাসরি এখানে এসেছেন। আমাদের অপারেশনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে আমরা চা-এর বিরতি নিলাম।…বড় হরিনায় আমাদের বিডিআর এর ক্যাম্পটি ছিল কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়। ওখান থেকে ভারতের মিজোরামের শহর ডেমাগিরি দেখা যায়। চারিদিকে অসংখ্য ছোট বড় পাহাড়, খুবই সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। জেনারেল মঞ্জুর মাঝে মাঝে সিগারেট খেতেন। তিনি ঘরের বাইরে এসে সিগারেট টানছিলেন এবং পাহাড়ের উপর পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ আমাকে বললেন, ‘নবী আমার মনটা খুব ভালো না। কিছুলোক আমাকে ভালো থাকতে দিচ্ছে না। আমি খুব চাপের মধ্যে আছি।’ আমি বিষয়টি তার ব্যক্তিগত মনে করে কোনো প্রশ্ন করিনি। তিনিও আর কিছু বলেননি।” (ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে সেক্টর আট, আনন্দ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭, পৃষ্ঠা ১৭৮-১৭৯)
এ ছাড়া তখন হয়তো রাষ্ট্রীয় কিছু বিষয় নিয়ে মঞ্জুর নিজে বা তার স্ত্রী সমালোচনা বা মত ব্যক্ত করেছেন। ষড়যন্ত্রকারীরা এসবও কাজে লাগিয়েছে।
এ ব্যাপারে কিছু তথ্য পাওয়া যায় মইনুল হোসেন চৌধুরীর লেখায়। তিনি লিখেছেন, “...১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে আমি ক্যাডেট কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে সস্ত্রীক চট্টগ্রাম ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগদান করি। রাতে জিওসি জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে ব্যক্তিগত নৈশভোজে অংশগ্রহণ করি। সেখানে আলাপচারিতায় মঞ্জুরের স্ত্রী জিয়ার ওপর খুব বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় খোলামেলাভাবে সরকার ও সেনাকর্তৃত্বের সমালোচনা করতে শুরু করেন। এতে আমি ও আমার স্ত্রী অস্বস্তিবোধ করেছিলাম এবং অন্য প্রসঙ্গ টানতে চেষ্টা করি। যাহোক খাওয়াদাওয়ার পর আমরা চলে আসি। কিন্তু সামরিক গোয়েন্দারা অতিরঞ্জিত ও কাল্পনিকভাবে সাজিয়ে সেই নৈশভোজের কথা সেনাপ্রধান এরশাদ ও জিয়ার কানে তোলে।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা ১১৮)
এ ছাড়া জিয়াউর রহমান তখন আন্তর্জাতিক খ্যাতির আশায় দীর্ঘদিন সময় ধরে চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে ১৯৮০-৮১ সালে দুতিয়ালীতে ব্যস্ত ছিলেন। জানা যায়, এ সময় জিয়া দেশের অনেক সমস্যার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিকেও তিনি মনোযোগ দেননি। এই সুযোগ চতুরতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন সেনাপ্রধান এরশাদ। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের দাবিয়ে রেখে পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনা কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেন। তখন মেজর জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে মাত্র চারজন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। চারজনের একজন ছিলেন মেডিকেল কোরে। বাকি তিনজন যথাক্রমে ছিলেন এম এ মঞ্জুর, মীর শওকত আলী ও মইনুল হোসেন চৌধুরী। এম এ মঞ্জুর ও মীর শওকত আলীর সম্পর্ক আবার ভালো ছিল না।
এ ব্যাপারে আমরা তথ্য পাই মইনুল হোসেন চৌধুরীর লেখায়। তিনি লিখেছেন, “...পাকিস্তান-প্রত্যাগত এরশাদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ১৯৭৩ সালে। এরপর মাত্র সাত বছরে তিনি লে. কর্নেল থেকে তরতর করে লে. জেনারেল ও সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে যান। আর আট বছরের মাথায় তিনি সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে যান।…
…আমি আগেই উল্লেখ করেছি, তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অনৈক্যের একটা প্রধান কারণ ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা সেনা-অফিসারদের দ্বন্দ্ব। এরশাদ উপসেনাপ্রধান হওয়ায় এ সুযোগকে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে কাজে লাগান। তিনি এদের মধ্যে বিভেদের ফাটল সৃষ্টি করেন। মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের দাবিয়ে রেখে অমুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধার পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেন। তখন মেজর জেনারেল পদমর্যাদার সেনা অফিসারদের মধ্যে চারজন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই চারজনের মধ্যে একজন ছিলেন ডা. শামসুল হক। বাকি তিনজন মীর শওকত, মঞ্জুর ও আমি। আবার এঁদের মধ্যে দুজন–শওকত ও মঞ্জুরের সম্পর্ক ভালো ছিল না, যা আগেই বলেছি। …এদিকে এরশাদ ধীরে ধীরে জিয়ার কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বস্ততা ও আস্থাভাজন হওয়ার পথ করলেন। ছলনা ও চতুরতার মাধ্যমে এরশাদ জিয়ার খুব প্রিয়পাত্র হলেন। জিয়াও তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করলেন। ...সেনাপ্রধান হওয়ার পর এরশাদ অত্যন্ত সুকৌশলে পদক্ষেপ নিতে লাগলেন। তাঁর নিজের পছন্দের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বসম্পন্ন পদগুলোতে বহাল করলেন। মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের পার্বত্য বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হলো। কৌশলে স্পর্শকাতর পদগুলো থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়া হলো। সেনা ও সামরিক গোয়েন্দা বিভাগগুলোতে তিনি নিজের কাছের লোকদের নিয়োগ করলেন। পরে ক্ষমতা দখলের সময় এসব লোক তাঁকে সহায়তা করে এবং তাঁর রাজনীতির দোসর হয়। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো লে. জেনারেল (মেজর জেনারেল) মহব্বত (মহাব্বত) জান চৌধুরী, যিনি পরে মন্ত্রী হন। বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য নিজের পছন্দমতো লোকদের পাঠিয়ে তাঁর প্রতি আনুগত্যের জন্য পুরস্কৃত করতেন। আর্মি হেডকোয়ার্টারের একজন পিএসও হিসেবে এসব বিষয়ে আমার সঙ্গে তাঁর পরামর্শ করার কথা। কিন্তু এরশাদ সেটা এড়িয়ে যেতেন।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা ১১৪-১১৬)
জিয়া নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সেনাপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তখন অনেকেই আশা করেছিলেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকেই সেই পদে নিয়োগ দেবেন। কিন্তু জিয়া কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে সেনাপ্রধান করেননি।
এ ব্যাপারে সেনাকর্মকর্তা মইনুল হোসেন চৌধুরীর লেখা প্রনিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, “…একসময় জিয়া এরশাদকে সেনাপ্রধান করে নিজে ওই পদ থেকে সরে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। এ পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্বে জিয়া একদিন আর্মি হেডকোয়ার্টারের সামনের লনে হাঁটতে হাঁটতে কথা প্রসঙ্গে আমার মতামত জানতে চাইলেন। আমি জেনারেল মঞ্জুরকে সেনাপ্রধান করার কথা বললাম। জিয়া আমার ওই মতামতকে অন্যভাবে নিলেন। ভাবলেন, আমি আর মঞ্জুর একই পক্ষের। তাই জিয়া আমার দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ করে বললেন, তোমরা দুজনেই চিফ হবে, তবে অপেক্ষা করতে হবে। শুধু আমি নই, জিয়ার অন্যান্য সুহৃদ, শুভাকাঙ্ক্ষী, অনুগত ও বন্ধুবান্ধবরা এরশাদকে সেনাপ্রধান করার বিপক্ষে ছিলেন। …এতকিছু সত্ত্বেও জিয়া ১৯৭৯ সালের ২৯ এপ্রিল এরশাদকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করেন।” (এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক, পৃষ্ঠা ১১৬)
সেনাবাহিনীর এই দ্বন্দ্বের আরও কিছু বিবরণ আমরা পাই ১৯৮১ সালের ৩০ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেজর মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেনের এক সাক্ষাৎকারে। এই সাক্ষাৎকারে তিনি তখনকার সেনাবাহিনীর ভেতরে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কের বিবরণ দিয়েছিলেন। মোজাফফরের ভাষ্যে আমরা জানতে পারি, ৩০ মে সকালে মঞ্জুর চট্টগ্রামের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মাঝে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যাকাণ্ড।
মোজাফফর বলেন, “জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পরই তার মুক্তিযুদ্ধের অতীত থেকে সরে যেতে শুরু করলেন। সামরিক বাহিনীর ভেতরে থাকা অমুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান ফেরত সামরিক অফিসাররা তার খুব কাছের লোক হয়ে দাঁড়াল। আর সুবিধাবাদী অমুক্তিযোদ্ধারাও জিয়ার এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের হীন স্বার্থ হাসিল করে চলেছিল।…
…অন্যদিকে শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের বিদেশে চাকরি দিলেন। সেটা না করে খুনিদের বিচার করতে পারতেন জিয়া। তাতে তার ভাবমূর্তি কমত না বরং বাড়ত। আর সেটা না হওয়ার কারণেই এরপর বিদ্রোহের আগ্রহ সৃষ্টি হয় অনেকের মনে। সাহসী হয়ে ওঠে তারা। আর ফারুক-রশিদের বিষয়টিও ক্রমে ক্রমে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের দূরে ঠেলে দিচ্ছিল জিয়ার কাছ থেকে। সামরিক বাহিনীর ভেতরে অমুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের প্রতি কিছুটা পক্ষপাতিত্ব স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযোদ্ধা পক্ষকে হতাশ করেছিল। এর একটা পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করেছিলেন অনেকেই। প্রয়োজনবোধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনাও মুক্তিযোদ্ধা পক্ষের অনেকের মাথার ঠাঁই পেতে শুরু করে।…
…অমুক্তিযোদ্ধা পক্ষও চুপ করে বসে ছিল না। তারাও মনেপ্রাণে চাচ্ছিল সামরিক অভ্যুত্থান ঘটুক। কৌশলে তারা মুক্তিযোদ্ধা পক্ষকে উসকানি দিতে শুরু করেছিল, যাতে মুক্তিযোদ্ধা পক্ষই অভ্যুত্থান ঘটায়। সম্ভবত সে কারণেই মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের বদলি করে নির্দিষ্ট সেনানিবাসগুলোতে সমবেত করতে অদৃশ্যভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল তারা। যাতে এক জায়গায় মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা থাকলে অভ্যুত্থান ঘটানোর সুবিধা হয় এবং অভ্যুত্থানের দায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযুক্ত করা যায়।”
মোজাফফর আরও একটি ঘটনার কথা বলেন, “চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহের দিন পনেরো আগে জেনারেল মঞ্জুর সামরিক বাহিনীর ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ এবং এর আশু প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াকে একটা চিঠি লেখেন। জিয়াকে দেওয়ার জন্য জিয়ার তৎকালীন পিএস কর্নেল মাহফুজকে দিয়েছিলেন চিঠিটি। জিয়ার কাছে পৌঁছানোর আগেই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চিঠিটা হাতিয়ে নেন। এর পরবর্তী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যায়, এই চিঠি আদৌ জিয়ার কাছে পৌঁছেনি। তাহলে হয়তো পরবর্তী ঘটনা এমন হতো না। শুধু তাই নয়, সেনাবিদ্রোহের তিন মাস পর কর্নেল মাহফুজকে অভ্যুত্থানের দায়ে জড়িয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়। চিঠির বিষয়টি জানতেন বলেই মাহফুজকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অনেকের ধারণা।” (দৈনিক ভোরের কাগজ, ২ জুন ১৯৯৪, রহস্যাবৃত জিয়া হত্যা-৪)
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বিশেষত প্রগতিশীল অংশকে আরও কোণঠাসা এবং বাকি সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতেই পরিকল্পিতভাবে এই অভ্যৃত্থান সংঘটন করা হয়।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক