Advertisement Banner

ডায়েট বয়স কমাতে পারে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ডায়েট বয়স কমাতে পারে?
কিছু ডায়েট জৈবিক বয়স কমাতে পারে বলে প্রমাণ করেছেন গবেষকেরা। ছবি: ম্যাগনিফিক

সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্যকর ডায়েট বা খ্যাদাভ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। এই কথাটা জানা। তবে ডায়েটের মাধ্যমে বয়স কমানো যায়-এই ধারণা হয়ত অনেকেরই নেই। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমনটাই দেখা গিয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব সিডনির একটি নতুন গবেষণা অনুযায়ী, যেসকল বয়স্ক ব্যক্তিরা তাদের খাদ্যতালিকা থেকে চর্বি অথবা প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন, তাদের মাঝে জৈবিকভাবে তরুণ বা কম বয়সী হয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা গেছে। সায়েন্স ডেইলিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

‘এজিং সেল’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৬৫ থেকে ৭৫ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্করা মাত্র চার সপ্তাহ নির্দিষ্ট একটি ডায়েট মেনে চলার পর তাদের আনুমানিক জৈবিক বয়স কমে গেছে। গবেষকদের মতে, এই ফলাফল এটাই নির্দেশ করে যে জীবনের শেষভাগে এসেও খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনা হলে তা বার্ধক্য এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সাথে জড়িত সূচকগুলোর দ্রুত উন্নতি ঘটাতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব সিডনি’র ‘স্কুল অব লাইফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস’-এর গবেষক ক্যাটলিন অ্যান্ড্রুজ এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলাফলগুলো আশাব্যঞ্জক হলেও বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, ডায়েট বা খাদ্যতালিকা বার্ধক্যকে উল্টে দিতে পারে-এই গবেষণাটি তার চূড়ান্ত কোনো প্রমাণ নয়, বরং কেবলই একটি প্রাথমিক ধারণা দেয়। তারা বলছেন, সময়ের সাথে সাথে এই জৈবিক পরিবর্তনগুলো রোগব্যাধির ঝুঁকি কমায় কি না এবং অন্যান্য বয়সীদের মধ্যেও একই প্রভাব দেখা যায় কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও বড় পরিসরে এবং দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার প্রয়োজন।

জৈবিক বয়স কী?

ক্রোনোলজিক্যাল বয়স বা কালানুক্রমিক বয়স দিয়ে পরিমাপ করা হয় একজন মানুষ কত বছর বেঁচে আছেন, কিন্তু জৈবিক বয়স নির্দেশ করে তার শরীর কতটা ভালোভাবে কাজ করছে। স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা এবং শারীরিক, মানসিক ধকল ও রোগব্যাধি থেকে শরীরের সেরে ওঠার ক্ষমতার মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে জৈবিক বার্ধক্য একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।

জৈবিক বয়স অনুমান করার জন্য বিজ্ঞানীরা ‘বায়োমার্কার’ বিশ্লেষণ করেন, যা মূলত সময়ের সাথে সাথে শারীরিক স্বাস্থ্যের পরিমাপযোগ্য নির্দেশক। দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য এবং সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল বোঝার জন্য এই বায়োমার্কারগুলোকে প্রায়শই কালানুক্রমিক বয়সের চেয়ে বেশি কার্যকরী মনে করা হয়।

এই গবেষণার জন্য গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের জৈবিক বয়সের স্কোর গণনা করতে ২০টি বায়োমার্কারের তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। এর মধ্যে কোলেস্টেরল, ইনসুলিন এবং সি-রিয়্যাক্টিভ প্রোটিনের মাত্রার মতো বিভিন্ন পরিমাপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই উপাত্তগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের চার্লস পারকিন্স সেন্টারে পরিচালিত ‘নিউট্রিশন ফর হেলদি লিভিং’ নামক একটি গবেষণা থেকে নেওয়া হয়েছে।

চারটি ভিন্ন ডায়েট প্ল্যান পরীক্ষা

এই গবেষণায় ১০৪ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন, যাদের লটারির ভিত্তিতে চারটি ডায়েটের যেকোনো একটি মেনে চলার জন্য বলা হয়েছিল। প্রতিটি ডায়েটেই মোট শক্তির ১৪ শতাংশ আসত প্রোটিন থেকে।

এর মধ্যে দুটি ডায়েট ছিল সর্বভুক (উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয়ের ওপর নির্ভরশীল), যেখানে প্রোটিনের অর্ধেক আসত প্রাণিজ উৎস থেকে এবং বাকি অর্ধেক উদ্ভিদ থেকে। অন্য দুটি ছিল আধা-নিরামিষ  ডায়েট, যেখানে প্রোটিনের ৭০ শতাংশই আসত উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে।

এই বিভাগগুলোর মধ্যেই অংশগ্রহণকারীদের হয় একটি উচ্চ-চর্বি ও কম-কার্বোহাইড্রেট ডায়েট, অথবা একটি কম-চর্বি ও উচ্চ-কার্বোহাইড্রেট ডায়েট দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে চারটি ডায়েট গ্রুপ তৈরি হয়:

  • ওমনিভোরাস হাই-ফ্যাট (ওএইচএফ): সর্বভুক উচ্চ-চর্বিযুক্ত ডায়েট
  • ওমনিভোরাস হাই-কার্বোহাইড্রেট (ওএইচসি): সর্বভুক উচ্চ-কার্বোহাইড্রেটযুক্ত ডায়েট
  • সেমি-ভেজিটেরিয়ান হাই-ফ্যাট (ভিএইচএফ): আধা-নিরামিষ উচ্চ-চর্বিযুক্ত ডায়েট
  • সেমি-ভেজিটেরিয়ান হাই-কার্বোহাইড্রেট (ভিএইচসি): আধা-নিরামিষ উচ্চ-কার্বোহাইড্রেটযুক্ত ডায়েট

অংশগ্রহণকারীদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ছিল ২০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে। তারা সবাই ছিলেন অধূমপায়ী ও আমিষভোজী এবং তাদের কোনো গুরুতর শারীরিক জটিলতা (যেমন: টাইপ-২ ডায়াবেটিস মেলিশিয়া, ক্যান্সার, কিডনি বা লিভারের রোগ) কিংবা কোনো খাবারে অ্যালার্জি বা সহনশীলতার অভাব ছিল না।

কোন ডায়েট সবচেয়ে বড় পরিবর্তন?

গবেষকরা দেখেছেন যে, ওএইচএফ গ্রুপের অংশগ্রহণকারীদের বায়োমার্কারে জৈবিক বয়সের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। উল্লেখ্য, এই গ্রুপের ডায়েট বা খাদ্যতালিকাটি ছিল গবেষণার আগে তারা সাধারণত যা খেতেন, তার সবচেয়ে কাছাকাছি।

উদ্ভিজ্জ ডায়েট শরীর সুস্থ রাখতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ছবি: পেক্সেল ডট কম
উদ্ভিজ্জ ডায়েট শরীর সুস্থ রাখতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ছবি: পেক্সেল ডট কম

তবে অন্য তিনটি গ্রুপের সবার ক্ষেত্রেই জৈবিক বয়স কমে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী পরিসংখ্যানগত প্রমাণ পাওয়া গেছে ওএইচসি গ্রুপ থেকে, যারা উচ্চ-কার্বোহাইড্রেট এবং কম-চর্বিযুক্ত একটি সর্বভুক ডায়েট অনুসরণ করেছিলেন। এই গ্রুপটির ক্ষেত্রে মোট শক্তির ১৪ শতাংশ এসেছিল প্রোটিন থেকে, ২৮-২৯ শতাংশ চর্বি থেকে এবং ৫৩ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট থেকে।

যদিও এই ফলাফলগুলো ইঙ্গিত করে যে ডায়েট দ্রুত জৈবিক বার্ধক্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তবুও গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে এই উন্নতিগুলো দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে কি না বা জৈবিক বয়স স্থায়ীভাবে কমিয়ে রাখে কি না, তা এখনও অজানা।

দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার আহ্বান গবেষকদের

গবেষণাটির তত্ত্বাবধানকারী, স্কুল অব লাইফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস এবং চার্লস পারকিন্স সেন্টারের সহযোগী অধ্যাপক অ্যালিস্টেয়ার সিনিয়র বলেন, “খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তনগুলো বয়সজনিত রোগব্যাধির ঝুঁকি কমাতে পারে কি না, তা মূল্যায়নের জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদী ডায়েট পরিকল্পনার প্রয়োজন।”

গবেষক অ্যান্ড্রুজ বলেন, “খাদ্যতালিকায় সুনির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন আপনার আয়ু বাড়িয়ে দেবে-তা এখনই চূড়ান্তভাবে বলাটা ঠিক না। তবে জীবনের শেষভাগে এসে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার সম্ভাব্য সুবিধাগুলো কেমন হতে পারে, এই গবেষণাটি তারই একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত দেয়।”

অ্যান্ড্রুজ আরও বলেন, “ভবিষ্যতের গবেষণায় এটা খতিয়ে দেখা উচিত যে, এই ফলাফলগুলো অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি না এবং এখানে নথিভুক্ত হওয়া পরিবর্তনগুলো দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে কিংবা সুদূরপ্রসারী ফলাফলের পূর্বাভাস দেয় কি না।” 

সম্পর্কিত