ট্রাম্প নিজেই এখন ভেনেজুয়েলা 'চালাতে' চান। ছবি: রয়টার্স
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো কয়েক মাস ধরে বেশ নিশ্চিন্তে ছিলেন। নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ফোনালাপকে তিনি সৌহার্দ্যপূর্ণ বলে দাবি করেছিলেন। ট্রাম্পের সব অভিযোগ অস্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হুমকিকে তিনি গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমেরিকা থেকে আসা যেকোনো হুমকিকে তিনি ‘থোড়াই কেয়ার’ করেছেন।
মাদুরো কী পরিকল্পনা করেছিলেন তা এখন জানার কোন উপায় নেই। মাদুরোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যা-ই থাকুক, গত শনিবার রাতে কারাকাসে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এক নজিরবিহীন অভিযানে তিনি সস্ত্রীক আটক হন। এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় এক দশকের মাদুরো-শাসনের অবসান ঘটল। বর্তমানে মাদুরো নিউইয়র্কের ব্রুকলিন বন্দিশিবিরে আছেন এবং তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে ২০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদুরোর পতন ভেনেজুয়েলার প্রবাসী ও বিরোধীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে আনলেও দেশের অভ্যন্তরে উদ্বেগ কাটেনি। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলা এখন থেকে আমেরিকা ‘পরিচালনা’ করবে। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি ভেনেজুয়েলার জনপ্রিয় বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো কিংবা ২০২৪-এর নির্বাচনে জয়ী এডমুন্ডো গঞ্জালেসকে পাশ কাটিয়ে মাদুরোর ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ট্রাম্পের দাবি, রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলাকে আবার মহান করে তোলার মার্কিন উদ্যোগে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি চান, একটি অনুগত সরকারের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল খনিগুলোতে মার্কিন পুঁজিবাদের প্রসার ঘটানো। ট্রাম্প মনে করেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং সেই রাজস্ব দিয়ে দেশ পুনর্গঠন করে অবশেষে একটি ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ দেওয়া হবে। তবে এই পুরো পরিকল্পনা রদ্রিগেজের আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ডেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মাদুরোকেই একমাত্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করে এই অভিযানকে ‘বর্বরোচিত’ বলে আখ্যা দেন। তিনি ঘোষণা করেন, "আমরা কখনোই কোনো সাম্রাজ্যের উপনিবেশ হব না।"
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি হয়তো নিজ দেশের জনগণকে শান্ত করার একটি কৌশল। রদ্রিগেজ যদি গোপনে ট্রাম্পের সাথে সমঝোতা করেনও, তবুও তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রভাবশালী সামরিক নেতাদের সমর্থন ধরে রাখা।
রদ্রিগেজ যিনি একই সাথে ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং তেল মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বরত, তাকে এই শাসনব্যবস্থার অন্যান্যদের তুলনায় বেশ শিক্ষিত ও সচেতন হিসেবে দেখা হয়। ফ্রান্সে আংশিক শিক্ষা গ্রহণ করা এই নেত্রীর ভাই হোরহে রদ্রিগেজ জাতীয় পরিষদের প্রধান। তাদের বাবা ছিলেন একজন বামপন্থী বিপ্লবী, যাকে ১৯৭৬ সালে সম্ভবত হত্যা করেছিল। কারাকাসের ব্যবসায়ী মহলে তাকে বাস্তববাদী হিসেবে দেখা হয়। যদিও তাকে এবং তার ভাইকে মাঝে মাঝে দেশের পুরনো অভিজাত শ্রেণি (যার মধ্যে মাচাদোও আছেন), ‘প্রতিশোধপরায়ণ’ হিসেবে বিবেচনা করে।
ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী মার্কিন শক্তির সামনে নতিস্বীকার করলেও তাদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির ঝুঁকি প্রবল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো এবং ক্ষমতাধর নেতা দিওসদাদো কাবেলোর অবস্থান এখনও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। যদি রদ্রিগেজ জেনারেলদের দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারেন, তবেই তারা অনুগত থাকতে পারে। অন্যথায় সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ বা বিভক্তি দেখা দিলে দেশটি চরম অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
রোববার সকালে কারাকাসের রাস্তায় শাসনব্যবস্থার সমর্থক সশস্ত্র গ্যাংদের টহল দিতে দেখা গেছে। এছাড়া কলম্বিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ এবং ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’-র মতো মাদক চোরাচালানকারী চক্রগুলোও ভেনেজুয়েলায় সক্রিয়। ট্রাম্প মনে করছেন যে, আরও হামলার হুমকি দিয়ে এই সব পক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু যদি বড় কোনো সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তবে শৃঙ্খলা ফেরাতে ভেনেজুয়েলার মাটিতে মার্কিন সৈন্য মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে। ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন যে, সৈন্য পাঠাতে তিনি ‘ভীত নন’।
কারাকাসের ব্যবসায়ী মহলে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে বাস্তববাদী হিসেবে দেখা হয়। ছবি: রয়টার্স
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী রদ্রিগেজ ও ট্রাম্পের এই আপাত পরিকল্পনাকে সমর্থন করবে কি না। মার্কিন সামরিক শক্তির মুখে তারা নতিস্বীকার করেছে এবং সম্ভবত ট্রাম্পের হুমকিকে ফাঁকা বুলি ভেবে উড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে তারা ভয় পাচ্ছে। এই শাসনব্যবস্থার অধীনে অনেক জেনারেল মাদক পাচার এবং দুর্নীতি থেকে বিপুল অর্থ কামিয়েছেন। যদি রদ্রিগেজ আরও অর্থ উপার্জনের সুযোগ দেন, অথবা অন্ততপক্ষে তাদের লুট করা সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তা দেন, তবে তারা তার অনুগত হতে পারে। এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলেছেন।
তবে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি তৈরি হওয়ার একটি ঝুঁকি রয়ে গেছে। কিছু উপদল হয়তো রদ্রিগেজকে সমর্থন করবে। অন্যরা ক্ষমতা নিজেদের কুক্ষিগত করতে চাইতে পারে অথবা পাদ্রিনোকে সমর্থন দিতে পারে। আবার অল্প কিছু অংশ হয়তো প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যাওয়া বিদ্রোহী সেনাদের সাথে যুক্ত হয়ে মাচাদোর প্রত্যাবর্তনের জন্য চাপ দিতে পারে। একটি বিভক্ত সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিপজ্জনক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বর্তমান শাসনব্যবস্থার সামনেও অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভেনেজুয়েলার মিত্ররা খুব সামান্যই সমর্থন জুগিয়েছে। কিউবান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা, যারা দীর্ঘদিন ধরে মাদুরোকে রক্ষা করতে এবং সেনাবাহিনী থেকে বিরোধীদের নির্মূল করতে কাজ করেছেন, তারা তাদের মক্কেলকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছেন। হাভানার কর্মকর্তারা, যারা ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন সম্ভবত মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত হওয়া যেকোনো নেতার পক্ষ নেবেন। কিন্তু কিউবা এখন মারাত্মকভাবে দুর্বল এক মিত্র, যারা বর্তমানে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোমুক্ত ভেনেজুয়েলার স্বপ্ন সত্যি হলেও মাচাদো নিজেকে এখন কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলেও সফল হননি। অন্যদিকে, কয়েক দশকের দমন-পীড়ন এবং তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ এখন ক্লান্ত। ২০১৫ সাল থেকে প্রায় ৮০ লাখ তরুণ ও সক্রিয় মানুষ দেশত্যাগ করায় নতুন করে কোনো গণ-অভ্যুত্থান সংগঠিত করা মাচাদোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
মাদুরোর দীর্ঘদিনের মিত্র কিউবা, চীন ও রাশিয়া এই অভিযানের নিন্দা জানালেও কার্যকর কোনো সহায়তার ইঙ্গিত দেয়নি। কিউবা নিজেই এখন অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে এবং তেলের জন্য তারা রদ্রিগেজের যেকোনো সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। ট্রাম্প এরইমধ্যে কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও মেক্সিকো সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও তারা মূলত শরণার্থী সমস্যা এবং নিজ ভূখণ্ডে মার্কিন হামলার আশঙ্কা নিয়ে বেশি চিন্তিত।
মাদুরোমুক্ত ভেনেজুয়েলায় মাচাদো নিজেকে এখন কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন। ছবি: রয়টার্স
মাদুরোর এই অঞ্চলে কখনোই খুব বেশি বন্ধু ছিল না। ব্রাজিল, কলম্বিয়া এবং মেক্সিকোর বামপন্থী নেতারাই মূলত তাকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্রয় দিতেন। এখন সেই সম্পর্কগুলোও নড়বড়ে মনে হচ্ছে। এই তিনটি দেশের সরকারই মার্কিন হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছে। তবে তাদের কারোরই আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধকে সমর্থন করার সম্ভাবনা নেই। বরং তাদের স্বার্থ এখন আরও সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। তারা এই অঞ্চলে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়া এবং ভেনেজুয়েলান শরণার্থীদের স্রোত ছড়িয়ে পড়া নিয়ে বেশি চিন্তিত। এছাড়া মেক্সিকো এবং কলম্বিয়া নিজেদের ভূখণ্ডেও মার্কিন হামলার আশঙ্কা করছে। ট্রাম্প তার সংবাদ সম্মেলনে মেক্সিকোকে হুমকি দিয়েছেন এবং কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে ‘সাবধানে থাকার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
বিদেশি সমর্থকদের অভাব, সেনাবাহিনীর অনিশ্চিত সমর্থন এবং ট্রাম্পের হুমকির মুখে পড়ে রদ্রিগেজ হয়তো ইতিমধ্যেই একটি সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছেন অথবা শিগগিরই নেবেন। তিনি যে শাসনব্যবস্থার হয়ে কাজ করেন, সেটি অদ্ভুতভাবে দীর্ঘস্থায়ী এবং পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। এটি তাদের আদি নেতা হুগো চাভেজের মৃত্যুর পরেও টিকে ছিল। এখন তাদের তথাকথিত শত্রুর সাথে একটি চুক্তি হয়তো তাদের টিকে থাকার আরেকটি সুযোগ করে দিতে পারে।
ট্রাম্প নিজেই এখন ভেনেজুয়েলা 'চালাতে' চান। ছবি: রয়টার্স
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো কয়েক মাস ধরে বেশ নিশ্চিন্তে ছিলেন। নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ফোনালাপকে তিনি সৌহার্দ্যপূর্ণ বলে দাবি করেছিলেন। ট্রাম্পের সব অভিযোগ অস্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হুমকিকে তিনি গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমেরিকা থেকে আসা যেকোনো হুমকিকে তিনি ‘থোড়াই কেয়ার’ করেছেন।
মাদুরো কী পরিকল্পনা করেছিলেন তা এখন জানার কোন উপায় নেই। মাদুরোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যা-ই থাকুক, গত শনিবার রাতে কারাকাসে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এক নজিরবিহীন অভিযানে তিনি সস্ত্রীক আটক হন। এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় এক দশকের মাদুরো-শাসনের অবসান ঘটল। বর্তমানে মাদুরো নিউইয়র্কের ব্রুকলিন বন্দিশিবিরে আছেন এবং তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে ২০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদুরোর পতন ভেনেজুয়েলার প্রবাসী ও বিরোধীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে আনলেও দেশের অভ্যন্তরে উদ্বেগ কাটেনি। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলা এখন থেকে আমেরিকা ‘পরিচালনা’ করবে। আশ্চর্যজনকভাবে তিনি ভেনেজুয়েলার জনপ্রিয় বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো কিংবা ২০২৪-এর নির্বাচনে জয়ী এডমুন্ডো গঞ্জালেসকে পাশ কাটিয়ে মাদুরোর ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ট্রাম্পের দাবি, রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলাকে আবার মহান করে তোলার মার্কিন উদ্যোগে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি চান, একটি অনুগত সরকারের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল খনিগুলোতে মার্কিন পুঁজিবাদের প্রসার ঘটানো। ট্রাম্প মনে করেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং সেই রাজস্ব দিয়ে দেশ পুনর্গঠন করে অবশেষে একটি ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ দেওয়া হবে। তবে এই পুরো পরিকল্পনা রদ্রিগেজের আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ডেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মাদুরোকেই একমাত্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করে এই অভিযানকে ‘বর্বরোচিত’ বলে আখ্যা দেন। তিনি ঘোষণা করেন, "আমরা কখনোই কোনো সাম্রাজ্যের উপনিবেশ হব না।"
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি হয়তো নিজ দেশের জনগণকে শান্ত করার একটি কৌশল। রদ্রিগেজ যদি গোপনে ট্রাম্পের সাথে সমঝোতা করেনও, তবুও তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রভাবশালী সামরিক নেতাদের সমর্থন ধরে রাখা।
রদ্রিগেজ যিনি একই সাথে ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং তেল মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বরত, তাকে এই শাসনব্যবস্থার অন্যান্যদের তুলনায় বেশ শিক্ষিত ও সচেতন হিসেবে দেখা হয়। ফ্রান্সে আংশিক শিক্ষা গ্রহণ করা এই নেত্রীর ভাই হোরহে রদ্রিগেজ জাতীয় পরিষদের প্রধান। তাদের বাবা ছিলেন একজন বামপন্থী বিপ্লবী, যাকে ১৯৭৬ সালে সম্ভবত হত্যা করেছিল। কারাকাসের ব্যবসায়ী মহলে তাকে বাস্তববাদী হিসেবে দেখা হয়। যদিও তাকে এবং তার ভাইকে মাঝে মাঝে দেশের পুরনো অভিজাত শ্রেণি (যার মধ্যে মাচাদোও আছেন), ‘প্রতিশোধপরায়ণ’ হিসেবে বিবেচনা করে।
ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী মার্কিন শক্তির সামনে নতিস্বীকার করলেও তাদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির ঝুঁকি প্রবল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো এবং ক্ষমতাধর নেতা দিওসদাদো কাবেলোর অবস্থান এখনও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। যদি রদ্রিগেজ জেনারেলদের দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারেন, তবেই তারা অনুগত থাকতে পারে। অন্যথায় সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ বা বিভক্তি দেখা দিলে দেশটি চরম অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
রোববার সকালে কারাকাসের রাস্তায় শাসনব্যবস্থার সমর্থক সশস্ত্র গ্যাংদের টহল দিতে দেখা গেছে। এছাড়া কলম্বিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ এবং ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’-র মতো মাদক চোরাচালানকারী চক্রগুলোও ভেনেজুয়েলায় সক্রিয়। ট্রাম্প মনে করছেন যে, আরও হামলার হুমকি দিয়ে এই সব পক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু যদি বড় কোনো সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তবে শৃঙ্খলা ফেরাতে ভেনেজুয়েলার মাটিতে মার্কিন সৈন্য মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে। ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন যে, সৈন্য পাঠাতে তিনি ‘ভীত নন’।
কারাকাসের ব্যবসায়ী মহলে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে বাস্তববাদী হিসেবে দেখা হয়। ছবি: রয়টার্স
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী রদ্রিগেজ ও ট্রাম্পের এই আপাত পরিকল্পনাকে সমর্থন করবে কি না। মার্কিন সামরিক শক্তির মুখে তারা নতিস্বীকার করেছে এবং সম্ভবত ট্রাম্পের হুমকিকে ফাঁকা বুলি ভেবে উড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে তারা ভয় পাচ্ছে। এই শাসনব্যবস্থার অধীনে অনেক জেনারেল মাদক পাচার এবং দুর্নীতি থেকে বিপুল অর্থ কামিয়েছেন। যদি রদ্রিগেজ আরও অর্থ উপার্জনের সুযোগ দেন, অথবা অন্ততপক্ষে তাদের লুট করা সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তা দেন, তবে তারা তার অনুগত হতে পারে। এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলেছেন।
তবে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি তৈরি হওয়ার একটি ঝুঁকি রয়ে গেছে। কিছু উপদল হয়তো রদ্রিগেজকে সমর্থন করবে। অন্যরা ক্ষমতা নিজেদের কুক্ষিগত করতে চাইতে পারে অথবা পাদ্রিনোকে সমর্থন দিতে পারে। আবার অল্প কিছু অংশ হয়তো প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যাওয়া বিদ্রোহী সেনাদের সাথে যুক্ত হয়ে মাচাদোর প্রত্যাবর্তনের জন্য চাপ দিতে পারে। একটি বিভক্ত সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিপজ্জনক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বর্তমান শাসনব্যবস্থার সামনেও অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভেনেজুয়েলার মিত্ররা খুব সামান্যই সমর্থন জুগিয়েছে। কিউবান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা, যারা দীর্ঘদিন ধরে মাদুরোকে রক্ষা করতে এবং সেনাবাহিনী থেকে বিরোধীদের নির্মূল করতে কাজ করেছেন, তারা তাদের মক্কেলকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছেন। হাভানার কর্মকর্তারা, যারা ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন সম্ভবত মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত হওয়া যেকোনো নেতার পক্ষ নেবেন। কিন্তু কিউবা এখন মারাত্মকভাবে দুর্বল এক মিত্র, যারা বর্তমানে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোমুক্ত ভেনেজুয়েলার স্বপ্ন সত্যি হলেও মাচাদো নিজেকে এখন কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলেও সফল হননি। অন্যদিকে, কয়েক দশকের দমন-পীড়ন এবং তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ এখন ক্লান্ত। ২০১৫ সাল থেকে প্রায় ৮০ লাখ তরুণ ও সক্রিয় মানুষ দেশত্যাগ করায় নতুন করে কোনো গণ-অভ্যুত্থান সংগঠিত করা মাচাদোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
মাদুরোর দীর্ঘদিনের মিত্র কিউবা, চীন ও রাশিয়া এই অভিযানের নিন্দা জানালেও কার্যকর কোনো সহায়তার ইঙ্গিত দেয়নি। কিউবা নিজেই এখন অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে এবং তেলের জন্য তারা রদ্রিগেজের যেকোনো সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। ট্রাম্প এরইমধ্যে কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও মেক্সিকো সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও তারা মূলত শরণার্থী সমস্যা এবং নিজ ভূখণ্ডে মার্কিন হামলার আশঙ্কা নিয়ে বেশি চিন্তিত।
মাদুরোমুক্ত ভেনেজুয়েলায় মাচাদো নিজেকে এখন কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন। ছবি: রয়টার্স
মাদুরোর এই অঞ্চলে কখনোই খুব বেশি বন্ধু ছিল না। ব্রাজিল, কলম্বিয়া এবং মেক্সিকোর বামপন্থী নেতারাই মূলত তাকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্রয় দিতেন। এখন সেই সম্পর্কগুলোও নড়বড়ে মনে হচ্ছে। এই তিনটি দেশের সরকারই মার্কিন হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছে। তবে তাদের কারোরই আমেরিকার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধকে সমর্থন করার সম্ভাবনা নেই। বরং তাদের স্বার্থ এখন আরও সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। তারা এই অঞ্চলে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়া এবং ভেনেজুয়েলান শরণার্থীদের স্রোত ছড়িয়ে পড়া নিয়ে বেশি চিন্তিত। এছাড়া মেক্সিকো এবং কলম্বিয়া নিজেদের ভূখণ্ডেও মার্কিন হামলার আশঙ্কা করছে। ট্রাম্প তার সংবাদ সম্মেলনে মেক্সিকোকে হুমকি দিয়েছেন এবং কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে ‘সাবধানে থাকার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
বিদেশি সমর্থকদের অভাব, সেনাবাহিনীর অনিশ্চিত সমর্থন এবং ট্রাম্পের হুমকির মুখে পড়ে রদ্রিগেজ হয়তো ইতিমধ্যেই একটি সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছেন অথবা শিগগিরই নেবেন। তিনি যে শাসনব্যবস্থার হয়ে কাজ করেন, সেটি অদ্ভুতভাবে দীর্ঘস্থায়ী এবং পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। এটি তাদের আদি নেতা হুগো চাভেজের মৃত্যুর পরেও টিকে ছিল। এখন তাদের তথাকথিত শত্রুর সাথে একটি চুক্তি হয়তো তাদের টিকে থাকার আরেকটি সুযোগ করে দিতে পারে।