ইরানে আমেরিকার হামলা ও ‘তেলের রাজনীতি’

গুনেই ইলদিয
গুনেই ইলদিয
ইরানে আমেরিকার হামলা ও ‘তেলের রাজনীতি’
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

শনিবার ভোরে তেহরান, কোম, ইসফাহান, কেরমানশাহর ও কারাজ অভিমুখে একযোগে সমন্বিত বিমান হামলা চালিয়েছে আমেরিকা-ইসরায়েল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে বৃহৎ সামরিক অভিযান হিসেবে ঘোষণা করে ইরানি জনগণকে নিজেদের সরকার পতনের আহ্বান জানান। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ একে ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে একটি প্রতিরোধমূলক আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন খোদ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তার বাসভবন সংলগ্ন তেহরানের প্রশাসনিক এলাকায় সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কাতারের আল-উদিদ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা, কুয়েতের আল-সালেম এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। আবুধাবিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার সময় এর ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একজন নিহত হয়েছেন।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক তৎপরতা। ইতিহাসে এই প্রথম ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র একযোগে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর রাজধানীগুলোতে আঘাত হানল। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রকাশ্য ইচ্ছা এবং অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলা—এই দুইয়ের মেলবন্ধন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির এই ঘটনাকে পারস্য উপসাগরের পূর্ববর্তী সকল সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা দান করেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের ঝুঁকি এখন আর ক্ষণস্থায়ী ‘আবহাওয়া’ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী ‘জলবায়ুতে’ পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে আল-উদিদের কাছে আঘাত হানা মাত্র একটি ক্ষেপণাস্ত্রই এই অঞ্চলের ‘বীমা’ মডেল, পণ্য পরিবহনের ব্যয় এবং এলএনজি টেন্ডারের চেনা ছক বদলে দিয়েছিল। তখন ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, পরিস্থিতির সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে শনিবার ভোরের ধ্বংসযজ্ঞ এটাই প্রমাণ করে যে, প্রস্তুতির গতি পরিস্থিতির ভয়াবহতার তুলনায় মোটেও যথেষ্ট ছিল না।

২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সংঘাতের মধ্যকার পার্থক্য মূলত তিনটি মাত্রার ওপর নির্ভরশীল, যা বর্তমানে প্রতিটি করপোরেট বোর্ড, ট্রেডিং ডেস্ক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করতে হবে।

ব্যাপ্তি: গত জুনের হামলাগুলো ছিল সুনির্দিষ্টভাবে পারমাণবিক স্থাপনা কেন্দ্রিক–যা একটি সীমিত এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে ছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারির এই আক্রমণগুলো একই সাথে ছয়টি শহরের শাসনতান্ত্রিক কেন্দ্র, গোয়েন্দা সদর দপ্তর এবং সামরিক-শিল্প অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। সিএনএনের সূত্রমতে, মার্কিন সামরিক বাহিনী কয়েক দিনব্যাপী ধারাবাহিক হামলার পরিকল্পনা করছে। ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর এই অঞ্চলে এটিই আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক অভিযান।

উদ্দেশ্য: জুনের হামলার লক্ষ্য ছিল মূলত সক্ষমতা খর্ব করা; কিন্তু ফেব্রুয়ারির এই অভিযানের লক্ষ্য গোটা দেশের আমূল পরিবর্তন। ইরানি জনগণকে নিজেদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রতি ট্রাম্পের আহ্বান এবং এই হামলার লক্ষ্য অস্তিত্বের সংকট নির্মূল করা—নেতানিয়াহুর এমন ঘোষণা সরাসরি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বার্তাই দেয়। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের শেষ শাহর নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভী একে একটি মানবিক হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই মুহূর্তে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে কি না, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো—বৈশ্বিক বাজারকে এখন এই পতনের প্রবল সম্ভাবনাকে হিসেবে রেখেই বিনিয়োগ ও ঝুঁকির মূল্যমান নির্ধারণ করতে হবে।

প্রতিশোধের পরিধি: গত জুনে ইরান শুধুমাত্র আল-উদিদ ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল এবং তার আগে আগাম সতর্কবার্তাও দিয়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে আইআরজিসি ঘোষণা করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি সকল সম্পদ এবং স্বার্থই এখন তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু এবং তারা অবিলম্বে তা কার্যকর করেছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে অথবা ভূপাতিত করা হয়েছে। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই আগ্রাসনের পর আর কোনো রেড লাইন বা সীমারেখা অবশিষ্ট নেই।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

হরমুজ সমীকরণ: বাস্তব সময়ে পুনর্লিখিত হচ্ছে ইতিহাস

দৈনিক ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল জ্বালানি–যা বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত মোট তরল পেট্রোলিয়ামের প্রায় ২০ শতাংশ এবং যার বার্ষিক বাণিজ্যমূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি (৫০০ বিলিয়ন) ডলার প্রতিদিন হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। কাতারের উৎপাদিত সমস্ত এলএনজি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমুদ্রবাহিত সবটুকু অপরিশোধিত তেল এবং কুয়েত ও ইরাকের রপ্তানির সিংহভাগই এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের বাজার প্রতি ব্যারেল ৭২.৪৮ ডলারে বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে কয়েক সপ্তাহের সামরিক প্রস্তুতির একটি আগাম প্রভাব আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, সোমবার বাজার খোলার সাথে সাথে এই যুদ্ধকালীন প্রিমিয়াম এক লাফে অনেক উঁচুতে চড়বে। তবে তেলের দর বৃদ্ধির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এর গভীর কাঠামোগত পরিবর্তন।

২০২৫ সালের জুনের পর পারস্য উপসাগরগামী জাহাজগুলোর যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বীমা ইতিমধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের একটি এলএনজি বাহকের ক্ষেত্রে এই বর্ধিত ব্যয় প্রতি মিলিয়ন বিটিইউ-তে ০.১০–০.১৫ ডলারের সমতুল্য। এখন যখন বিশ্বের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সম্পন্ন রাজধানীগুলোতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানছে, তখন এই প্রিমিয়াম আর কেবল দ্বিগুণ হবে না—বরং তা এমন এক স্তরে পৌঁছাবে, যা কোনো মডেলে আগে কখনো দেখা যায়নি; এমনকি বীমাকারীরা বীমা দেওয়াই বন্ধ করে দিতে পারে।

নিরাপত্তা বনাম অভিযোজন

২০২৫ সালের জুনের হামলার পর ইরানের পার্লামেন্ট হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রস্তাব দিলেও তখন তা কার্যকর করা হয়নি। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির এই পরিস্থিতি গুণগতভাবে ভিন্ন। ইরান ইতিমধ্যেই এই জলপথে তাদের অসম যুদ্ধর সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। মাইন স্থাপন বা ক্রমাগত হয়রানির মাধ্যমে প্রবাহের মাত্র ২০–৩০% হ্রাস করা হলেও তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আর যদি এই পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক অনিশ্চয়তায় পড়বে যা আগে কখনো পরীক্ষিত হয়নি।

কারা প্রস্তুত ছিল আর কারা নয়?

জাপানের ‘জেরা’, চীনের ‘পেট্রোচায়না’ বা ভারতের ‘গেইল’ যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিল, তা এখন কেবল সতর্কতামূলক নয় বরং দূরদর্শী বলে প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু যারা এই প্রস্তুতি নেয়নি, তারা আজ চরম সংকটে। ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মতো এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতিগুলো এখন হিসাব কষছে—তাদের হাতে থাকা কৌশলগত জ্বালানি মজুত আর কতদিন তাদের রেশন ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখতে পারবে।

ইরানিরা এখন সংকটে রয়েছে। ছবি: রয়টার্স
ইরানিরা এখন সংকটে রয়েছে। ছবি: রয়টার্স

অদৃশ্য সংকট: মানবসম্পদ

উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ প্রবাসী। আবুধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং একজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু এই প্রবাসীদের মধ্যে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। যদি মাত্র ৩ শতাংশ দক্ষ বিদেশি কর্মী এই অঞ্চল ত্যাগ করেন, তবে রিফাইনারি, বন্দর এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্কগুলো অচল হয়ে পড়বে। কোনো ‘অ্যাসেট ইনটেগ্রিটি ড্যাশবোর্ড’ এই পরিস্থিতির পূর্বাভাস দেয়নি, কিন্তু আজ এটিই নির্মম বাস্তবতা।

শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জুয়া ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ঝুঁকি

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ এই ডাকটিই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

যদি শাসনব্যবস্থা টিকে যায়, তখন অপমানিত ও অস্তিত্বের সংকটে থাকা ইরান তখন সর্বোচ্চ মাত্রার প্রতিহিংসার পথে হাঁটবে। হরমুজ প্রণালী অচল করা এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে তাদের ছায়া বাহিনীগুলোকে সক্রিয় করে তোলা তখন তাদের কাছে যৌক্তিক মনে হবে।

তবে যদি পতন ঘটে, ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের ন্যায় এক চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। ৮ কোটি ৮০ লাখ মানুষের একটি দেশে কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক বিকল্প ছাড়াই এই শক্তিশূন্যতা এমন এক অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে, যা ২০২৫ সালের হামলার তুলনায় অনেক গুণ ভয়াবহ।

আগামী ৯০ দিনের তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট

দৃশ্যপট ‘ক’ (৪০% সম্ভাবনা): নিয়ন্ত্রিত সংঘাত। কয়েকদিনের অভিযানের পর ওমান বা কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি। তেলের দাম ৮০-৯০ ডলারের মধ্যে স্থির হওয়া।

দৃশ্যপট ‘খ’ (৩৫% সম্ভাবনা): সংঘাতের লাগামহীন বিস্তার। মার্কিন বাহিনীতে উল্লেখযোগ্য হতাহত এবং হিজবুল্লাহ-হুথিদের একযোগে সক্রিয় হওয়া। তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে বিশ্বমন্দার ঝুঁকি তৈরি।

দৃশ্যপট ‘গ’ (২৫% সম্ভাবনা): ইরানের অভ্যন্তরে চূড়ান্ত ভাঙন। বাহ্যিক হামলার মুখে ১৯৭৯ সালের পর বৃহত্তম জনবিক্ষোভ এবং বর্তমান ব্যবস্থার পতন বা খণ্ডবিখণ্ড হওয়া। এক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী কোনো কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

বিবর্তনের সময় শেষ গত জুলাইয়ে আমি লিখেছিলাম যে, জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ এখন আর কেবল কৌশল নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। ২৮ ফেব্রুয়ারির এই হামলা সেই পরিবর্তনের জন্য বরাদ্দকৃত সময়কে কয়েক বছরে নয়, বরং কয়েক ঘণ্টায় সংকুচিত করে এনেছে।

নিরাপত্তা সংক্রান্ত ‘জলবায়ু’ পরিবর্তনের রূপকটি ছিল অভিযোজনের একটি ইঙ্গিত। কিন্তু আজ সকালে প্রশ্নটি আরও রূঢ়, যখন এই চরম পরিবর্তন কোনো প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়, এবং সেই প্রজাতিটি যদি হয় স্বয়ং বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা, তবে কী ঘটবে? তেহরান, আবুধাবি আর দোহার আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ার কুণ্ডলী এখন সেই উত্তরই লিখে দিচ্ছে।

লেখক- রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিবিসির সাবেক সাংবাদিক এবং এলএসই ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউটের মেথোডলজির শিক্ষক

সম্পর্কিত