যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সব ধরনের জাহাজ চলাচল অবরোধের সিদ্ধান্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাবনাকেও বিপন্ন করতে পারে। ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়- যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পথ খোলা ছিল। এই অবরোধের মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত ইরানকে বাধ্য করতে চান, যেন তারা গত সপ্তাহের শেষের দিকে ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যে শর্তগুলো দিয়েছিলেন তা মেনে নেয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে প্রবেশাধিকার সীমিত করার মতো এই উত্তেজনাপূর্ণ পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের ছয় সপ্তাহের সামরিক অভিযান যা অর্জন করতে পারেনি, সেটি অর্জন করতে পারবে– এমন নিশ্চয়তা নেই। ইরান ইতোমধ্যেই হুমকি দিয়েছে, নৌ অবরোধ তুলে না নেওয়া হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর আবার হামলা শুরু করবে, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার মার্কিন হুমকি আঞ্চলিক ও বহির্বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও এই সংঘাতে টেনে আনতে পারে।
এই পদক্ষেপকে পাকিস্তান ও অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের সেই প্রচেষ্টার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা ভঙ্গুর সংলাপ প্রক্রিয়াকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের ‘গানবোট কূটনীতি’ আবারও বিশ্বকে উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে এখনও কিছুটা আশা রয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে তিনি হয়তো এই কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরবেন। তিনি নিজেও গতকাল এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন, বলেছেন– “আগামী দুই দিনের মধ্যে কিছু ঘটতে পারে, এবং আমরা সেখানে (পাকিস্তানে) যাওয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকছি।”
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের বৈঠক ছিল সত্যিই একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত– ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি বসে। যুদ্ধের ছায়া এবং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস সত্ত্বেও, ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনায় কিছুটা বরফ গলেছিল, যদিও কোনো চুক্তি হয়নি। গত ৪৭ বছরে এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, যেখানে নানা বিষয় উঠে আসে, তবে কিছু জটিল ইস্যুর কারণে আলোচনা শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিত থেকে যায়।
কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় দফা বৈঠকের সম্ভাবনা এখনও জোরালো।
প্রথম বৈঠকেই দুই যুদ্ধে লিপ্ত পক্ষের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হবে– এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত ছিল না। তবে অন্তত যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি কাঠামো তৈরির আশা ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেটিও হয়নি, ফলে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় অচলাবস্থার প্রধান দুটি কারণ ছিল– ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানকে অন্তত ২০ বছরের জন্য সব ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখতে হবে।
ইরান বরাবরই বলে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তবে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য হিসেবে নির্দিষ্ট সীমার নিচে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তারা ছাড়তে রাজি নয়। এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। যদিও ইরান কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানকে তাদের সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে। ইরান এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে, বিশেষ করে তাদের মজুদ জ্বালানি দেশের বাইরে পাঠানোর বিষয়ে, যা এখনও বড় একটি অচলাবস্থার কারণ।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ট্রাম্প আগেই দাবি করেছিলেন যে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু ইসলামাবাদের আলোচনা ভেঙে পড়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘নাও, না হয় ছাড়ো’ ধরনের অবস্থানের কারণে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যের অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স
স্পষ্ট ছিল যে ইরান কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে। তারা তাদের পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে, কিন্তু তা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। ইরানি কর্মকর্তারা এই অচলাবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান এবং গভীর অবিশ্বাসকে দায়ী করেছেন। তবুও তেহরান জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক ইস্যুতে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য প্রস্তুত।
হরমুজ প্রণালিতে অবাধ যাতায়াত পুনঃস্থাপন আরেকটি বড় বিতর্কিত বিষয় ছিল, যা চুক্তি না হওয়ার অন্যতম কারণ। ইরান এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয়– যা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, আঞ্চলিক ও অন্যান্য দেশগুলোর কাছেও অগ্রহণযোগ্য, কারণ তারা উন্মুক্ত যাতায়াত চায়। এই বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা প্রয়োজন ছিল।
তবুও কেউ আশা করেনি যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমন একটি কঠোর পদক্ষেপ নেবেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য। এই নৌ অবরোধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থের পরিপন্থী, কারণ এটি ইরানি বন্দরগামী ও সেখান থেকে বের হওয়া সব ধরনের জাহাজ চলাচলে প্রভাব ফেলছে। এই অবরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, যারা ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত মাসেই আন্তর্জাতিক তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ট্রাম্প ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিলেন। এখন তার এই অবস্থান পরিবর্তন তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চীন এই অবরোধের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, একে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। পৃথক এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “আমরা বিশ্বকে জঙ্গলের আইনে ফিরে যেতে দিতে পারি না।” তবে চীনসহ অন্যান্য তেল আমদানিকারক দেশগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করে, তাহলে তা বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কাছ থেকেও সমালোচনার মুখে পড়েছে, যা দেশটির কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়িয়েছে। শুধু ইসরায়েল এই অবরোধকে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্স ও ব্রিটেন প্রায় ৪০টি দেশ নিয়ে একটি সম্মেলনের ডাক দিয়েছে, যাতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার উপায় খোঁজা যায়– যা মার্কিন অবরোধ ঘোষণার সময়ের সঙ্গেই মিলে গেছে।
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেও কিছু গণমাধ্যম বলছে, আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনা পুনরায় শুরু করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক বৈঠক দেশটির কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে দ্বিতীয় দফার আলোচনা সেখানে হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবুও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে– যা দেশটির শান্তি কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
লেখক:পাকিস্তানের একজন সাংবাদিক
(লেখাটি পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন–এর অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। ডন–এর সৌজন্যে লেখাটি প্রকাশ করা হলো।)
ইরান-আমেরিকার পতাকা। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সব ধরনের জাহাজ চলাচল অবরোধের সিদ্ধান্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ভবিষ্যৎ আলোচনার সম্ভাবনাকেও বিপন্ন করতে পারে। ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়- যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পথ খোলা ছিল। এই অবরোধের মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত ইরানকে বাধ্য করতে চান, যেন তারা গত সপ্তাহের শেষের দিকে ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যে শর্তগুলো দিয়েছিলেন তা মেনে নেয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে প্রবেশাধিকার সীমিত করার মতো এই উত্তেজনাপূর্ণ পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের ছয় সপ্তাহের সামরিক অভিযান যা অর্জন করতে পারেনি, সেটি অর্জন করতে পারবে– এমন নিশ্চয়তা নেই। ইরান ইতোমধ্যেই হুমকি দিয়েছে, নৌ অবরোধ তুলে না নেওয়া হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর আবার হামলা শুরু করবে, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার মার্কিন হুমকি আঞ্চলিক ও বহির্বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও এই সংঘাতে টেনে আনতে পারে।
এই পদক্ষেপকে পাকিস্তান ও অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের সেই প্রচেষ্টার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা ভঙ্গুর সংলাপ প্রক্রিয়াকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের ‘গানবোট কূটনীতি’ আবারও বিশ্বকে উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে এখনও কিছুটা আশা রয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে তিনি হয়তো এই কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরবেন। তিনি নিজেও গতকাল এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন, বলেছেন– “আগামী দুই দিনের মধ্যে কিছু ঘটতে পারে, এবং আমরা সেখানে (পাকিস্তানে) যাওয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকছি।”
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের বৈঠক ছিল সত্যিই একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত– ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি বসে। যুদ্ধের ছায়া এবং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস সত্ত্বেও, ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনায় কিছুটা বরফ গলেছিল, যদিও কোনো চুক্তি হয়নি। গত ৪৭ বছরে এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, যেখানে নানা বিষয় উঠে আসে, তবে কিছু জটিল ইস্যুর কারণে আলোচনা শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিত থেকে যায়।
কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় দফা বৈঠকের সম্ভাবনা এখনও জোরালো।
প্রথম বৈঠকেই দুই যুদ্ধে লিপ্ত পক্ষের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হবে– এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত ছিল না। তবে অন্তত যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি কাঠামো তৈরির আশা ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেটিও হয়নি, ফলে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় অচলাবস্থার প্রধান দুটি কারণ ছিল– ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানকে অন্তত ২০ বছরের জন্য সব ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখতে হবে।
ইরান বরাবরই বলে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তবে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য হিসেবে নির্দিষ্ট সীমার নিচে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার তারা ছাড়তে রাজি নয়। এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। যদিও ইরান কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ইরানকে তাদের সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে। ইরান এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে, বিশেষ করে তাদের মজুদ জ্বালানি দেশের বাইরে পাঠানোর বিষয়ে, যা এখনও বড় একটি অচলাবস্থার কারণ।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ট্রাম্প আগেই দাবি করেছিলেন যে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু ইসলামাবাদের আলোচনা ভেঙে পড়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘নাও, না হয় ছাড়ো’ ধরনের অবস্থানের কারণে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যের অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স
স্পষ্ট ছিল যে ইরান কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে। তারা তাদের পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে, কিন্তু তা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। ইরানি কর্মকর্তারা এই অচলাবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান এবং গভীর অবিশ্বাসকে দায়ী করেছেন। তবুও তেহরান জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক ইস্যুতে ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য প্রস্তুত।
হরমুজ প্রণালিতে অবাধ যাতায়াত পুনঃস্থাপন আরেকটি বড় বিতর্কিত বিষয় ছিল, যা চুক্তি না হওয়ার অন্যতম কারণ। ইরান এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয়– যা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, আঞ্চলিক ও অন্যান্য দেশগুলোর কাছেও অগ্রহণযোগ্য, কারণ তারা উন্মুক্ত যাতায়াত চায়। এই বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা প্রয়োজন ছিল।
তবুও কেউ আশা করেনি যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমন একটি কঠোর পদক্ষেপ নেবেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য। এই নৌ অবরোধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থের পরিপন্থী, কারণ এটি ইরানি বন্দরগামী ও সেখান থেকে বের হওয়া সব ধরনের জাহাজ চলাচলে প্রভাব ফেলছে। এই অবরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, যারা ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত মাসেই আন্তর্জাতিক তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ট্রাম্প ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিলেন। এখন তার এই অবস্থান পরিবর্তন তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চীন এই অবরোধের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, একে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। পৃথক এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “আমরা বিশ্বকে জঙ্গলের আইনে ফিরে যেতে দিতে পারি না।” তবে চীনসহ অন্যান্য তেল আমদানিকারক দেশগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করে, তাহলে তা বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের কাছ থেকেও সমালোচনার মুখে পড়েছে, যা দেশটির কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়িয়েছে। শুধু ইসরায়েল এই অবরোধকে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্স ও ব্রিটেন প্রায় ৪০টি দেশ নিয়ে একটি সম্মেলনের ডাক দিয়েছে, যাতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার উপায় খোঁজা যায়– যা মার্কিন অবরোধ ঘোষণার সময়ের সঙ্গেই মিলে গেছে।
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেও কিছু গণমাধ্যম বলছে, আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনা পুনরায় শুরু করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক বৈঠক দেশটির কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে দ্বিতীয় দফার আলোচনা সেখানে হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবুও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে– যা দেশটির শান্তি কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
লেখক:পাকিস্তানের একজন সাংবাদিক
(লেখাটি পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন–এর অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। ডন–এর সৌজন্যে লেখাটি প্রকাশ করা হলো।)