কেইথ জনসন

যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কয়েক ডজন উন্নত অর্থনীতির দেশ বুধবার জরুরি তেল রিজার্ভ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তীব্রভাবে কেঁপে ওঠা জ্বালানি বাজারকে শান্ত করার মরিয়া প্রচেষ্টায় এটা কোনো কাজে আসেনি। অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। কারণ ইরান পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজ এবং কাছাকাছি উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও বন্দর অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়িয়ে দিচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর বুধবার ঘোষিত রিজার্ভ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য ছাড়ার সিদ্ধান্ত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের শুরুতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে পরিমাণ ছিল কম।
এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিমধ্যেই অনেক কমে যাওয়া কৌশলগত তেল রিজার্ভের প্রায় অর্ধেক ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এটা ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহে যে বিঘ্ন ঘটেছে তা শিগগির শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি এমনকি তখনো সত্য, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বলছে যে যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে।
ওয়াশিংটনের জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্লেয়ারভিউ এনার্জি পাটনার্স-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেভিন বুক বলেন, “৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে এল, অথচ দাম বেড়ে গেল। সম্ভবত বাজার এখন সমস্যার প্রকৃত মাত্রা বুঝতে শুরু করেছে।” তিনি বলেন, “একদিকে বাজার বলে– ‘আহা, ধন্যবাদ।’ কিন্তু অন্যদিকে বাজার বুঝতে পারে– ‘হায় ঈশ্বর’।”
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হয়েছে, যা ওই দিনেই ৮ শতাংশ বেড়েছে। সমস্যার একটি অংশ হলো– রিজার্ভ থেকে তেল ছাড়ার এই ব্যবস্থা, যা সাধারণত চরম সরবরাহ সংকটের সময় নেওয়া এক ধরনের শেষ চেষ্টা, তা কয়েক মাস ধরে অল্প অল্প করে বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু তেল উৎপাদন ও ট্যাঙ্কার চলাচলের বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘটছে এখনই।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে, তারা চার মাসে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়বে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল। লন্ডনভিত্তিক জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্ট জানিয়েছে যে, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি কখনোই প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেলের বেশি রিলিজ করতে পারেনি। অতএব সর্বোচ্চ আশাবাদী পরিস্থিতিতেও এই ‘শেষ অস্ত্র’, যা মাত্র একবারই ব্যবহার করা যায়। আর এটা সর্বোচ্চ ৩ মিলিয়ন ব্যারেল ঘাটতি পূরণ করতে পারবে। যেখানে মোট ঘাটতি প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য।
হরমুজ বন্ধ বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যা। চীন ও জাপান ব্যতিক্রম, কারণ তাদের নিজস্ব রিজার্ভ রয়েছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে লুইজিয়ানার রিজার্ভার থেকে যে মার্কিন তেল বের করা হবে, তা এশিয়ার বাজারে পৌঁছাতে অন্তত মে মাস পর্যন্ত সময় লাগবে। এনার্জি অ্যাসপেক্ট এই তথ্য দিয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোর জন্য খুবই সামান্য সান্ত্বনা, যারা ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রভাব টের পাচ্ছে। বাংলাদেশ জ্বালানি সংকটজনিত সমস্যা মেটাতে সৈন্য পাঠাচ্ছে এবং রাশিয়ার তেল আমদানির জন্য ছাড় চাইছে। ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়া জ্বালানির দাম সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তান জ্বালানি সংকটের কারণে স্কুল বন্ধ করছে এবং মিতব্যয়ী হতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে দেশগুলো অফিস বন্ধ করছে, ভ্রমণ সীমিত করছে এবং পরিবহন ও শিল্পের ক্রমবর্ধমান খরচ কমানোর চেষ্টা করছে।
আর জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক রিজার্ভ থাকলেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বা এলএনজির ক্ষেত্রে এমন কোনো রিজার্ভ নেই– যা এশিয়ার আরেকটি বড় মাথাব্যথা। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় বিশেষ সংকট তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর ফলে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব এশিয়ার শিল্প কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উৎপাদন ও রপ্তানি পুনরায় শুরু হতে দেরি হওয়ায় এর প্রভাব কয়েক মাস পর্যন্ত থাকতে পারে।
জরুরি পদক্ষেপগুলো নেওয়ার পরেও তেলের অস্থির বাজার শান্ত হয়নি। কারণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রয়েছে। এবং ইরানের নতুন নেতৃত্ব তাদের প্রধান কৌশলগত চাপের মাধ্যম হিসেবে এটিকে এভাবেই রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মাত্র কয়েকটি ট্যাঙ্কার ও জাহাজ এই সীমাবদ্ধ জলপথ থেকে বের হতে পেরেছে। এর বেশির ভাগই ইরানের সঙ্গে যুক্ত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ট্যাঙ্কার অথবা কিছু চীনা ট্যাঙ্কার। খবর অনুযায়ী, যুদ্ধের আগের তুলনায় এখন ইরান আরও বেশি তেল রপ্তানি করছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধ আরও বাড়িয়ে চলেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে চান বলে সংকেত দিয়েছেন। বুধবারের পর থেকে পারস্য উপসাগরের ভেতরে পাঁচটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি ট্যাঙ্কার। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে কমপক্ষে ২০টি হামলা বা ঘটনার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এই তথ্য দিয়েছে ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপরেসন্স।
ইরান অঞ্চলজুড়ে স্থলভাগের অবকাঠামোর ওপর হামলাও বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাহরাইনে একটি জ্বালানি ট্যাঙ্ক এবং ওমানে একটি তেল স্থাপনা। সৌদি আরবের বড় তেলক্ষেত্রগুলো আবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এবং কুয়েতে বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। ইরান চাইলে এই বিঘ্ন আরও অনেক বাড়াতে পারে।
এই সপ্তাহে খবর এসেছে যে, ইরান হরমুজ প্রণালীতে অন্তত ১০টি নৌ-মাইন পেতে দিয়েছে। এর ফলে ট্রাম্প তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানের কাছে আনুমানিক ৫–৬ হাজার মাইন রয়েছে। এর মধ্যে কিছু পুরনো কনট্যাক্ট মাইন আছে, যেগুলো তুলনামূলকভাবে সহজে পরিষ্কার করা যায়। তবে আরও উন্নত ধরনের মাইনও আছে, যেগুলো নিষ্ক্রিয় করা কঠিন। সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্র এ বছরের শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শেষ মাইন-পরিষ্কারকারী জাহাজ অবসরে পাঠিয়েছে। এবং ব্রিটেনের মাইন পরিষ্কার করার সক্ষমতাও অনেক কমে গেছে। যদিও অতীতে ১৯৯১ ও ২০০৩ সালে এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মাইন পেতে দেওয়া জাহাজগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। তবুও তেহরানের কাছে শত শত ছোট নৌকা আছে যেগুলো এই কাজ করতে পারে। ওয়াশিংটন আশা করছে যে, মাইন-সুইপিং মডিউলযুক্ত কমব্যাট জাহাজ এবং বিভিন্ন ধরনের মানববিহীন পানির নিচের যান ব্যবহার করে দ্রুত মাইন পরিষ্কার করা যাবে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই যুদ্ধের মধ্যে থেকে এই প্রণালী পরিষ্কার করতে পারবে কি না তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। কেভিন বুক বলেন, “বাজার কেবল নৌ-মাইনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবই নয়, জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র থামানো কঠিন হতে পারে– এই সম্ভাবনাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।”
ট্রাম্পের ট্যাঙ্কারকে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা দেওয়ার প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এবং খুব শিগগির হওয়ার সম্ভাবনাও কম। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী এই সপ্তাহের শুরুতে সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছিলেন যে নিরাপত্তা দেওয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে বাজারে সাময়িক উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। কিন্তু পরে দেখা যায় এটি ভুল তথ্য। পোস্টটি দ্রুত মুছে ফেলা হয়। পরে বলা হয় জ্বালানি বিভাগের কর্মীরা ভিডিওটির ক্যাপশন ভুল দিয়েছিল।
এখন মন্ত্রী স্বীকার করেছেন, এই ধরনের নিরাপত্তা অভিযান শুরু হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। এরই মধ্যে জাহাজ চলাচল খাতকে একই কথা বলছে মার্কিন নৌবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক বীমা বাজারকে সহায়তা করার পরিকল্পনাও এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। যদিও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। ইউএস ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন জানিয়েছে তারা বড় বীমা কোম্পানি শাব (Chubb)-এর সঙ্গে কাজ করে নির্দিষ্ট কিছু জাহাজের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্বীমা দেবে। কিন্তু এই কভারেজ তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কভার করবে না। যা ট্যাঙ্কার মালিকদের জন্য বড় দায়। তার ওপর এটি জাহাজ মালিক ও নাবিকদের জীবনের ঝুঁকি কাটানোর জন্যও যথেষ্ট নয়।
বুধবার কুয়েতের কাছে কয়েকটি ট্যাঙ্কার য়খন আগুনে জ্বলতে শুরু করে তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, “প্রণালী এখন খুব ভালো অবস্থায় আছে।” সব মিলিয়ে এসব কারণে প্রায় সব শিপিং লাইন হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেতে অনিচ্ছুক। ফলে হারিয়ে যাওয়া কার্গো, আটকে থাকা জাহাজ এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া তেল ও গ্যাস উৎপাদনের পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও খারাপ হচ্ছে।
অন্য কথায়, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের যে পরিণতি তৈরি হয়েছে তা কমানোর জন্য তাদের সব নীতি-উপকরণ– সামরিক, আর্থিক ও জ্বালানি– ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সবই ব্যর্থ হয়েছে। এই মুহূর্তে জ্বালানি বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায় হলো ইরানের হুমকি ও বাস্তব হামলা বন্ধ হওয়া। আর সেটি এমন কিছু নয় যা ট্রাম্প কেবল ইচ্ছাশক্তি বা বিজয় ভাষণের মাধ্যমে শেষ করতে পারবেন।
লেখক: ফরেন পলিসি পত্রিকার স্টাফ লেখক এবং জিও–ইকোনমিক্স ও জ্বালানি বিষয় নিয়ে কাজ করেন।
(লেখাটি ফরেন পলিসির সৌজন্যে প্রকাশিত)

যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কয়েক ডজন উন্নত অর্থনীতির দেশ বুধবার জরুরি তেল রিজার্ভ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তীব্রভাবে কেঁপে ওঠা জ্বালানি বাজারকে শান্ত করার মরিয়া প্রচেষ্টায় এটা কোনো কাজে আসেনি। অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। কারণ ইরান পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজ এবং কাছাকাছি উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও বন্দর অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়িয়ে দিচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর বুধবার ঘোষিত রিজার্ভ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য ছাড়ার সিদ্ধান্ত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের শুরুতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে পরিমাণ ছিল কম।
এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিমধ্যেই অনেক কমে যাওয়া কৌশলগত তেল রিজার্ভের প্রায় অর্ধেক ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এটা ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহে যে বিঘ্ন ঘটেছে তা শিগগির শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি এমনকি তখনো সত্য, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বলছে যে যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে।
ওয়াশিংটনের জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্লেয়ারভিউ এনার্জি পাটনার্স-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেভিন বুক বলেন, “৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে এল, অথচ দাম বেড়ে গেল। সম্ভবত বাজার এখন সমস্যার প্রকৃত মাত্রা বুঝতে শুরু করেছে।” তিনি বলেন, “একদিকে বাজার বলে– ‘আহা, ধন্যবাদ।’ কিন্তু অন্যদিকে বাজার বুঝতে পারে– ‘হায় ঈশ্বর’।”
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হয়েছে, যা ওই দিনেই ৮ শতাংশ বেড়েছে। সমস্যার একটি অংশ হলো– রিজার্ভ থেকে তেল ছাড়ার এই ব্যবস্থা, যা সাধারণত চরম সরবরাহ সংকটের সময় নেওয়া এক ধরনের শেষ চেষ্টা, তা কয়েক মাস ধরে অল্প অল্প করে বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু তেল উৎপাদন ও ট্যাঙ্কার চলাচলের বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘটছে এখনই।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে, তারা চার মাসে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়বে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল। লন্ডনভিত্তিক জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্ট জানিয়েছে যে, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি কখনোই প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেলের বেশি রিলিজ করতে পারেনি। অতএব সর্বোচ্চ আশাবাদী পরিস্থিতিতেও এই ‘শেষ অস্ত্র’, যা মাত্র একবারই ব্যবহার করা যায়। আর এটা সর্বোচ্চ ৩ মিলিয়ন ব্যারেল ঘাটতি পূরণ করতে পারবে। যেখানে মোট ঘাটতি প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য।
হরমুজ বন্ধ বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যা। চীন ও জাপান ব্যতিক্রম, কারণ তাদের নিজস্ব রিজার্ভ রয়েছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে লুইজিয়ানার রিজার্ভার থেকে যে মার্কিন তেল বের করা হবে, তা এশিয়ার বাজারে পৌঁছাতে অন্তত মে মাস পর্যন্ত সময় লাগবে। এনার্জি অ্যাসপেক্ট এই তথ্য দিয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোর জন্য খুবই সামান্য সান্ত্বনা, যারা ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রভাব টের পাচ্ছে। বাংলাদেশ জ্বালানি সংকটজনিত সমস্যা মেটাতে সৈন্য পাঠাচ্ছে এবং রাশিয়ার তেল আমদানির জন্য ছাড় চাইছে। ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়া জ্বালানির দাম সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তান জ্বালানি সংকটের কারণে স্কুল বন্ধ করছে এবং মিতব্যয়ী হতে ব্যবস্থা নিচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে দেশগুলো অফিস বন্ধ করছে, ভ্রমণ সীমিত করছে এবং পরিবহন ও শিল্পের ক্রমবর্ধমান খরচ কমানোর চেষ্টা করছে।
আর জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক রিজার্ভ থাকলেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বা এলএনজির ক্ষেত্রে এমন কোনো রিজার্ভ নেই– যা এশিয়ার আরেকটি বড় মাথাব্যথা। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় বিশেষ সংকট তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর ফলে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব এশিয়ার শিল্প কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উৎপাদন ও রপ্তানি পুনরায় শুরু হতে দেরি হওয়ায় এর প্রভাব কয়েক মাস পর্যন্ত থাকতে পারে।
জরুরি পদক্ষেপগুলো নেওয়ার পরেও তেলের অস্থির বাজার শান্ত হয়নি। কারণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রয়েছে। এবং ইরানের নতুন নেতৃত্ব তাদের প্রধান কৌশলগত চাপের মাধ্যম হিসেবে এটিকে এভাবেই রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মাত্র কয়েকটি ট্যাঙ্কার ও জাহাজ এই সীমাবদ্ধ জলপথ থেকে বের হতে পেরেছে। এর বেশির ভাগই ইরানের সঙ্গে যুক্ত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ট্যাঙ্কার অথবা কিছু চীনা ট্যাঙ্কার। খবর অনুযায়ী, যুদ্ধের আগের তুলনায় এখন ইরান আরও বেশি তেল রপ্তানি করছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধ আরও বাড়িয়ে চলেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে চান বলে সংকেত দিয়েছেন। বুধবারের পর থেকে পারস্য উপসাগরের ভেতরে পাঁচটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি ট্যাঙ্কার। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে কমপক্ষে ২০টি হামলা বা ঘটনার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এই তথ্য দিয়েছে ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপরেসন্স।
ইরান অঞ্চলজুড়ে স্থলভাগের অবকাঠামোর ওপর হামলাও বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাহরাইনে একটি জ্বালানি ট্যাঙ্ক এবং ওমানে একটি তেল স্থাপনা। সৌদি আরবের বড় তেলক্ষেত্রগুলো আবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এবং কুয়েতে বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। ইরান চাইলে এই বিঘ্ন আরও অনেক বাড়াতে পারে।
এই সপ্তাহে খবর এসেছে যে, ইরান হরমুজ প্রণালীতে অন্তত ১০টি নৌ-মাইন পেতে দিয়েছে। এর ফলে ট্রাম্প তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানের কাছে আনুমানিক ৫–৬ হাজার মাইন রয়েছে। এর মধ্যে কিছু পুরনো কনট্যাক্ট মাইন আছে, যেগুলো তুলনামূলকভাবে সহজে পরিষ্কার করা যায়। তবে আরও উন্নত ধরনের মাইনও আছে, যেগুলো নিষ্ক্রিয় করা কঠিন। সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্র এ বছরের শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শেষ মাইন-পরিষ্কারকারী জাহাজ অবসরে পাঠিয়েছে। এবং ব্রিটেনের মাইন পরিষ্কার করার সক্ষমতাও অনেক কমে গেছে। যদিও অতীতে ১৯৯১ ও ২০০৩ সালে এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মাইন পেতে দেওয়া জাহাজগুলোতে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। তবুও তেহরানের কাছে শত শত ছোট নৌকা আছে যেগুলো এই কাজ করতে পারে। ওয়াশিংটন আশা করছে যে, মাইন-সুইপিং মডিউলযুক্ত কমব্যাট জাহাজ এবং বিভিন্ন ধরনের মানববিহীন পানির নিচের যান ব্যবহার করে দ্রুত মাইন পরিষ্কার করা যাবে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই যুদ্ধের মধ্যে থেকে এই প্রণালী পরিষ্কার করতে পারবে কি না তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক চলছে। কেভিন বুক বলেন, “বাজার কেবল নৌ-মাইনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবই নয়, জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র থামানো কঠিন হতে পারে– এই সম্ভাবনাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।”
ট্রাম্পের ট্যাঙ্কারকে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা দেওয়ার প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এবং খুব শিগগির হওয়ার সম্ভাবনাও কম। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী এই সপ্তাহের শুরুতে সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছিলেন যে নিরাপত্তা দেওয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে বাজারে সাময়িক উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। কিন্তু পরে দেখা যায় এটি ভুল তথ্য। পোস্টটি দ্রুত মুছে ফেলা হয়। পরে বলা হয় জ্বালানি বিভাগের কর্মীরা ভিডিওটির ক্যাপশন ভুল দিয়েছিল।
এখন মন্ত্রী স্বীকার করেছেন, এই ধরনের নিরাপত্তা অভিযান শুরু হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। এরই মধ্যে জাহাজ চলাচল খাতকে একই কথা বলছে মার্কিন নৌবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক বীমা বাজারকে সহায়তা করার পরিকল্পনাও এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। যদিও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। ইউএস ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন জানিয়েছে তারা বড় বীমা কোম্পানি শাব (Chubb)-এর সঙ্গে কাজ করে নির্দিষ্ট কিছু জাহাজের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্বীমা দেবে। কিন্তু এই কভারেজ তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কভার করবে না। যা ট্যাঙ্কার মালিকদের জন্য বড় দায়। তার ওপর এটি জাহাজ মালিক ও নাবিকদের জীবনের ঝুঁকি কাটানোর জন্যও যথেষ্ট নয়।
বুধবার কুয়েতের কাছে কয়েকটি ট্যাঙ্কার য়খন আগুনে জ্বলতে শুরু করে তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, “প্রণালী এখন খুব ভালো অবস্থায় আছে।” সব মিলিয়ে এসব কারণে প্রায় সব শিপিং লাইন হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেতে অনিচ্ছুক। ফলে হারিয়ে যাওয়া কার্গো, আটকে থাকা জাহাজ এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া তেল ও গ্যাস উৎপাদনের পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও খারাপ হচ্ছে।
অন্য কথায়, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের যে পরিণতি তৈরি হয়েছে তা কমানোর জন্য তাদের সব নীতি-উপকরণ– সামরিক, আর্থিক ও জ্বালানি– ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সবই ব্যর্থ হয়েছে। এই মুহূর্তে জ্বালানি বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায় হলো ইরানের হুমকি ও বাস্তব হামলা বন্ধ হওয়া। আর সেটি এমন কিছু নয় যা ট্রাম্প কেবল ইচ্ছাশক্তি বা বিজয় ভাষণের মাধ্যমে শেষ করতে পারবেন।
লেখক: ফরেন পলিসি পত্রিকার স্টাফ লেখক এবং জিও–ইকোনমিক্স ও জ্বালানি বিষয় নিয়ে কাজ করেন।
(লেখাটি ফরেন পলিসির সৌজন্যে প্রকাশিত)

২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের জেন-জি বিপ্লবের সবচেয়ে বড় চমক হলো জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন সেই গণঅভ্যুত্থান শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, যার শাসনামলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ‘ইসলামপন্থী’ দল জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু গত মাসের নির্বাচনে জামায়াত প্রায় এক-তৃত