স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব নাভারা ল’ স্কুল-এর সেন্টার ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের গবেষক নিকোলাস এসতেভেজ বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে এক গবেষণা নিবন্ধ লিখেছেন।
গবেষণা নিবন্ধের সারসংক্ষেপে নিকোলাস লিখেছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের পতন এবং এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর।
নিকোলাস এসতেভেজের এই নিবন্ধে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে, চীন-পাকিস্তান অক্ষের সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা কেবল একটি সাময়িক বিষয় নয়, বরং একটি কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস। এই নিবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কীভাবে অভ্যন্তরীণ ‘মুক্তিকামী মূল্যবোধ’ এবং ঐতিহাসিক ভারতবিরোধী মনোভাব এই কৌশলগত বহুমুখীকরণের জন্য একটি প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
তাছাড়া নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, কীভাবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই নতুন বিন্যাসকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। এতে দেখানো হয়েছে যে, বাংলাদেশ যদিও ‘ধারণাগত ভারতীয় আধিপত্যের’ ভারসাম্য করতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে চীনা প্রভাবের নতুন ও গভীরতর নির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য যে, এই গবেষণা নিবন্ধটি চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরুর দিকেই প্রকাশিত হয়েছে। এ নিবন্ধের অধ্যায়ভিত্তিক কিছু অংশ হুবহু অনুবাদ করা হলো। আজ প্রকাশিত হচ্ছে এর শেষ পর্ব। এই পর্বে নিকোলাস এসতেভেজের পুরো গবেষণার উপসংহার অংশটি উল্লেখ করা হলো।
নিকোলাস এসতেভেজের গবেষণার শেষ কথা
আওয়ামী লীগ ও হাসিনা সরকারের নির্বাসনের পর, ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণকে চিহ্নিত করেছে।
এই বিশ্লেষণে এটা দেখানো হয়েছে যে, বাংলাদেশ ও চীন-পাকিস্তান অক্ষের মধ্যে উদীয়মান সম্পর্ক কেবল গণঅভ্যুত্থানের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়াশীল ফল নয়। বরং এটি একটি কাঠামোগত রূপান্তর, যা নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপট এবং ভারতবিরোধী অসন্তোষের মধ্যে গড়ে উঠেছে।
সাধারণভাবে বলতে গেলে, বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব ভারতের সঙ্গে আগের সম্পর্ককে অসম হিসেবে বিবেচনা করেছে। তবুও বাস্তবে ভারতকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা বা পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বর্তমান পরিবর্তন সত্ত্বেও বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে তার প্রতিবেশীকে উপেক্ষা করতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক চাপ (অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উভয়ই) অবশ্যম্ভাবীভাবে আলোচনায় ফিরতে বাধ্য করবে, যেখানে ভারত এখনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ধরে রাখবে।
এই পরিবর্তন থেকে ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যার জন্য উভয় পক্ষেরই খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। ঢাকায় প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিষয়ে নয়াদিল্লির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের ক্ষয় ‘নেইবারহুড ফার্স্ট পলিসি’কে দুর্বল করছে এবং ভারতের জন্য শিলিগুড়ি করিডোরের ব্যবস্থাপনাকেও জটিল করে তুলছে। ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং ‘সম্প্রীতি’র মতো যৌথ মহড়ার স্থগিতাদেশ, এর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য চীনা যুদ্ধবিমান ক্রয়—এসবই এই পরিবর্তনের উদাহরণ মাত্র।
বাংলাদেশি রাজনীতিতে ইতিহাসের রাজনৈতিক ব্যবহার, সেই মতকে প্রতিফলিত করে, যেখানে বলা হয়েছে—রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ততার অভাব সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে। যে সম্পর্ক এখন ভেঙে পড়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াএছাড়াও, হাসিনাকে অব্যাহত আশ্রয় দেওয়া একটি প্রতীকী সংকীর্ণতার সৃষ্টি করেছে, যা মোদি ও ইউনূসের মধ্যে বাস্তবধর্মী সম্পর্কের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এবং ইউনূসকে বেইজিং ও ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার যুক্তি ও কারণ দিয়েছে। তবুও, পরিস্থিতি যদি সাময়িক হয় এবং শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন, তবুও ভারতের উচিত হবে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে তার সম্পর্ক পরিচালনার পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সূক্ষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করা, যা ভারতবিরোধী মনোভাব কমাবে সাহায্য করবে। যেহেতু ভারত বাস্তববাদী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য পরিচিত, তাই দেশটির ঘনিষ্ঠ বন্ধু শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত দণ্ডিত হলেও বাংলাদেশের ভেতরে জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া চলতে দেওয়াই উচিত। এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারক হবে।
সম্পর্কের মাত্রা নিম্নমুখী থেকে গেলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ভারতের উচিত হবে তার বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গভীর করা এবং এমন একটি কূটনৈতিক কৌশলে বিনিয়োগ করা, যা চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ জোটের চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে পারবে। এই কাজটি এমন একটি নমনীয় ও উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে করা উচিত, যা সহযোগিতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার দিকে লক্ষ্য রাখবে। ভারতের উচিত নিজেকে একটি আধিপত্যবাদী শক্তি থেকে এমন একটি অবস্থানে পুনঃসমন্বয় করা, যা অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য সমতা নিশ্চিত করবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব বজায় রাখবে।
পানি বণ্টন চুক্তি ঘিরে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো ভারত ও বাংলাদেশ এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তঃসীমান্ত পানিসম্পদের বিরোধপূর্ণ ব্যবস্থাপনা অবশ্যই কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চ্যানেলের মাধ্যমে বজায় রাখতে হবে, যাতে গঙ্গার মতো চুক্তিগুলো টিকে থাকে এবং সহযোগিতার সক্ষমতার শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা, সম্পদের স্বল্পতা এবং প্রাপ্য সম্পদের যথাযথ ব্যবহার যেহেতু দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে, তাই একে অপরকে সমর্থন করার জন্য উন্মুক্ত উপায় টিকিয়ে রাখা উচিত। সংঘাত বা জনবোষের দিকে নিয়ে যেতে পারে, তেমন স্বার্থপর বা জাতীয় স্বার্থের বশবর্তী হওয়া উচিত নয়।
সামাজিক-সাংস্কৃতিক মাত্রার ক্ষেত্রে, উভয় রাষ্ট্রের জন্যই তাদের ভূখণ্ডে বসবাসকারী অপর দেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি সম্মান ও সৌজন্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু স্থল সীমানা চুক্তিগুলো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, তাই তাদের নিশ্চিত করা উচিত যাতে ছিটমহলবাসী ও নৃগোষ্ঠীগুলো শান্তিতে বসবাস করতে পারে, নাগরিক সংহতি বৃদ্ধি করতে পারে। এটি ভবিষ্যতে জাতীয় সম্পর্কের আরও উন্নতি করবে।
বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল বৈদেশিক নীতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা সময়োচিত হবে না। তবে এর কিছু অংশ নতুন সরকারের অধীনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণের হাতে। তারা কি অতীত কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে এবং একটি নতুন ‘এশিয়ান টাইগার’ হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে? যদিও আঞ্চলিক শক্তির গতিশীলতায় পূর্ণভাবে জড়িত হওয়ার আগে তাদের অভ্যন্তরীণ অনেক চ্যালেঞ্জের সমাধান করা প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিহাসিনা-পরবর্তী যুগে বাংলাদেশে যে দলই শাসন করুক না কেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক রাখার গুরুত্ব তাদের উপেক্ষা করা উচিত নয়। যদিও এটি অনস্বীকার্য যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে বৈষম্য ছিল। তবুও ভারত বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির জন্য একটি ভিত্তিপ্রস্তর ছিল। এর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে, পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়ে সহযোগিতা করে, অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করে এবং এমনকি কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের সময়ও তারা বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন পেতে সাহায্য করেছিল। তবে বাংলাদেশকে তাদের সতর্কতামূলক কৌশলের অন্তর্নিহিত ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
তিস্তা নদী ও সামরিক সক্ষমতায় চীনের বিনিয়োগ ও সমর্থন অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামরিক প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদী সমাধান দিতে পারে। কিন্তু ভারতের প্রভাবমুক্ত থাকা অথবা নয়াদিল্লির পরিবর্তে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম রেখা রয়েছে। অধিকন্তু, পাকিস্তানের দেওয়া নতুন বাণিজ্যিক বিকল্পটি দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য টেকসই কি না, অথবা চীনের সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ বা প্রধান সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার ছেড়ে দেওয়া দাবি করবে কি না, তা এখনো মূল্যায়ন করা বাকি।
সবশেষে, গঙ্গা চুক্তির আসন্ন মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে রয়ে গেছে। উভয় দেশের উচিত পরিবেশগত নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করা। কোনো বহির্শক্তি এখানে কোনো পক্ষের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ইসলামাবাদকে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার সময় তাই অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।