গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। এর কিছুক্ষণের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা শুরু করে ইসলামিক রেভল্যুনশারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যতটা সহজে ইরানে জয়লাভের আশা করেছিলেন তা সম্ভব না হওয়ার পেছনেও রয়েছে এই আইআরজিসি।
ইরানের বিরোধী সংগঠন ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেসির গবেষণা পরিচালক খসরো ইসফাহানি নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদে মোজতাবা খামেনির নিয়োগ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হয়নি। তার ভাষ্য, গত সপ্তাহে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস যখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন আইআরজিসি তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি কার্যত চাপিয়ে দেয়।
চলমান যুদ্ধ বন্ধে আইআরজিসিকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকরা এই সম্ভাবনাকে একদম অসম্ভব বলে মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ইরান দেখতে একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মতো মনে হতে পারে এবং এর সরকারি আদর্শ দৃঢ়ভাবে শিয়া ইসলামের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে আইআরজিসিই রাষ্ট্রব্যবস্থার মেরুদণ্ড। বিশ্লেষকদের মতে, তাদের বিস্তৃত সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবই ইরানে শাসন পরিবর্তন বা যেকোনো ধরনের পরিবর্তনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
আইআরজিসি কী?
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত আরবি ভাষার সংবাদপত্র আল হুররার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরানে ক্ষমতায় আসার তিন মাস পর সিদ্ধান্ত নেন যে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর সমান্তরালে একটি নতুন বাহিনী গঠন করা হবে। এই বাহিনীর প্রধান কাজ হবে নতুন শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা এবং বিপ্লবকে বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়া।
এই বাহিনীটি পরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নামে পরিচিত হয়। ফারসি ভাষায় একে বলা হয় ‘সেপাহ-এ পাসদারান-এ এঙ্গেলাব-এ এসলামি’।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, এই বাহিনীর মূল সদস্যরা ছিল বিভিন্ন এলাকার কমিটির সদস্য, যেগুলো সাধারণত কোনো মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। এসব কমিটি তাদের এলাকাকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বিপ্লবের শত্রু হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। ছবি: রয়টার্স১৯৮০-এর দশকে আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধ এই বাহিনীকে আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করে। তখন এই সামরিক বাহিনীকে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়, এরমধ্যে প্রায় শূন্য থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি গড়ে তোলা। বিপ্লবের পরে ইরানে প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করায় এই উদ্যোগ নিতে হয়েছিল।
এরপর ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি আইআরজিসিকে একটি অভিজাত শক্তিতে পরিণত করেন। তিনি তার নেতৃত্বের সঙ্গে আইআরজিসির ক্ষমতাকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেন এবং একই সঙ্গে তাদের রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও বিস্তার ঘটানোর সুযোগ দেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের দাবি, ইরাক যুদ্ধের পর পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আইআরজিসি একটি আলাদা শাখা গঠন করে। ওই সংস্থাটি এখনো সড়ক, বাঁধসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করে। পাশাপাশি তারা ইরানে পণ্য বিশেষ করে তেল পাচার করে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও দক্ষ হয়ে ওঠে। ২০০২ সালে ইরানের গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি প্রকাশ পাওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলো যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তার প্রেক্ষাপটেই এই পাচার কার্যক্রম আরও বাড়ে।
ওয়াশিংটনের ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির এর জ্যেষ্ঠ ফেলো বেহনাম বেন তালেবুর মতে, বর্তমানে আইআরজিসি ইরানের অর্থনীতির অন্তত ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আর প্রকৃত হিসাব সম্ভবত এর দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে, তখন মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায় আইআরজেসে। তাদের বিশেষ বাহিনী কুদস ফোর্সের মাধ্যমে তারা লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েশেন ও গাজা উপত্যকায় প্রধানত শিয়া মুসলিম বেসামরিক বাহিনীর একটি জোট গড়ে তোলে। এর ফলে আইআরজিসি ইরানের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
আইআরজিসির কাঠামো কেমন?
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইআরজিসির সদস্যসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজারের মধ্যে। বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশসহ ইরানের মোট নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। তবে সব আইআরজিসি সদস্য সশস্ত্র নয়, অনেকেই নির্মাণকাজ বা সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মতো ক্ষেত্রেও কাজ করেন।
এই বাহিনীর চারটি প্রধান সামরিক শাখা রয়েছে-স্থল, নৌ ও মহাকাশ বাহিনী এবং বিদেশি অভিযানের দায়িত্বে থাকা কুদস ফোর্স। এছাড়া গার্ডস তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা এবং এলাকাভিত্তিক আধাসামরিক বাহিনী বাসিজসহ বিভিন্ন মিত্র সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করে।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, আইআরজিসি একটি তথাকথিত ‘মোজাইক’ কৌশল অনুসরণ করে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সময় ইরাকে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দ্রুত ভেঙে পড়া এবং ২০০৯ সালে ইরানে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করার অভিজ্ঞতা থেকে এই কৌশলের উদ্ভব। এই বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামোর লক্ষ্য হলো—যদি কোনো সময় প্রদেশগুলো রাজধানী তেহরান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, অথবা সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তবুও আইআরজিসি যেন দেশীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের পর বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে এই কৌশল আরও পরিমার্জন করা হয়।
বার্লিনের জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যালনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি বলেন, “তারা তাদের নির্ধারিত কৌশল অনুযায়ীই কাজ করছে। খামেনি না থাকলেও ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।”
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা অনুসরণ করলেও আঞ্চলিক কমান্ডারদের কিছু স্বাধীনতা রয়েছে। যেমন কখন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালানো হবে তা সিদ্ধান্ত নেওয়া। ইরানের প্রতিটি প্রদেশের জন্য মোট ৩১টি কমান্ড রয়েছে, এবং প্রায় প্রতিটি এলাকায় ছোট ছোট শাখা রয়েছে, যেগুলো দেশের বিভিন্ন প্রতিবাদ দ্রুত দমন করার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে।
গার্ডসকে কে নেতৃত্ব দেন?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আইআরজিসির দুইজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন। একজন গত জুনে এবং আরেকজন ২৮ ফেব্রুয়ারি।
এরপর ১ মার্চ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদিকে আইআরজিসির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়াহিদি ১৯৮৮ সালে কুদস ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা কমান্ডারদের একজন ছিলেন এবং আট বছর এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইআরজিসির ভূমিকা
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুদস ফোর্স মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি বলছে, তেহরানে এই গোষ্ঠীগুলোর জোটকে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত। এসব গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইরান বিদেশে তার প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় হামলা শুরু করে। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে এই জোটের অনেক অংশ ভেঙে পড়েছে বা দুর্বল হয়ে গেছে।
কুদস ফোর্সের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী কমান্ডার কাশেম সোলাইমানি। ছবি: রয়টার্সকুদস ফোর্স নিজেও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। গত জুনে ইরানে ইসরায়েলের হামলায় তাদের অনেক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হয়। আর কুদস ফোর্সের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী কমান্ডার কাশেম সোলাইমানি ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হন।
সামনে কী হতে পারে
আলী খামেনির ছেলে ও বর্তমানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইরাক যুদ্ধের সময় আইআরজিসিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং তখন থেকেই এই বাহিনীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বাবার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে গত দুই দশকে তিনি এই বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়োগে বড় ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসির অনেকের কাছেই এখন তিনি সবচেয়ে পছন্দের নেতা।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, আইআরজিসির মধ্যেও বিভক্তি রয়েছে। জানুয়ারিতে বিক্ষোভ দমনে কিছু সদস্য হাজার হাজার প্রতিবাদকারীকে দমন করতে সাহায্য করলেও এই বাহিনীর অনেক সদস্যই বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। ফলে তাদের সাধারণ সৈন্যরা অনেকটাই ইরানি সমাজের প্রতিচ্ছবি। যাদের মধ্যে কেউ কেউ ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিরোধীও।
তবে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার কর্মকর্তার একটি মূল গোষ্ঠী রয়েছে, যারা কঠোরপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং যাদের পদমর্যাদা ও সম্পদ সরাসরি এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। বিশ্লেষকদের মতে, এই গোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।