Advertisement Banner

বিল গেটসের বহু বছর ধরে তৈরি ভাবমূর্তিতে বড় ফাটল

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিল গেটসের বহু বছর ধরে তৈরি ভাবমূর্তিতে বড় ফাটল
বিল গেটস। ছবি: রয়টার্স

মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী বিল গেটসের বছরের পর বছর ধরে অত্যন্ত যত্ন সহকারে তৈরি করা ইতিবাচক জনভাবমূর্তি এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ার মুখে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত সাংবাদিক এমিলি গ্লেজারের একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সাথে বিল গেটসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের ফলে গেটসের দীর্ঘদিনের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। যে বিল গেটসকে ২০১৯ সালের এক বৈশ্বিক জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে প্রশংসিত বা অনুকরণীয় পুরুষ হিসেবে পোপ ফ্রান্সিস ও দালাই লামার ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছিল, আজ তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবন এবং অতীতের কিছু ভুলের কারণে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও বয়কটের মুখোমুখি হচ্ছেন। ৭০ বছর বয়সী এই বিলিয়নেয়ার জনহিতৈষী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে মেলে ধরার জন্য কোটি কোটি ডলার খরচ করে বিশাল জনসংযোগ দল নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু এপস্টাইন কাণ্ডের গভীরতা ও বিচার বিভাগের নথিপত্র প্রকাশের পর সেই তৈরি করা মিথ বা চিত্রনাট্য এখন পুরোপুরি ব্যর্থ প্রমাণিত হচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, বিল গেটসের ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের কাছে কতটা নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা হতো, তা তার জনসংযোগ দলের কাজের ধরণ দেখলেই বোঝা যায়। ডজন ডজন কর্মী নিয়ে গঠিত গেটসের এই দল তার পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে চশমা পর্যন্ত সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করত। এমনকি সপ্তাহের একেক দিনের জন্য নির্ধারিত পোশাক পরীক্ষা করতে একটি নির্দিষ্ট আকারের ম্যানিকুইন বা পুতুলও রাখা হতো একটি অফ-সাইট ভবনে, যেখানে নিউট্রাল টোনের সোয়েটার, শার্ট এবং সিলভার লাইনিং অপটিশিয়ানসের বিশেষ চশমা মজুত থাকত। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিল গেটসকে একজন শান্ত, অমায়িক এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা, যেন মানুষ তার অতীতের মাইক্রোসফট আমলের একচেটিয়া ব্যবসায়ী বা কঠোর ভাবমূর্তি ভুলে একজন মহান দাতা বা সমাজসেবক হিসেবে তাকে গ্রহণ করে।

কিন্তু এই নিখুঁত কাঠামোর আড়ালে থাকা সত্যগুলো যখনই যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ফাইলের মাধ্যমে সামনে আসতে শুরু করেছে, তখনই পুরো পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজের ফাউন্ডেশনের কর্মীদের সাথে এক অভ্যন্তরীণ সভায় গেটস নিজেই স্বীকার করেছেন যে রুশ নারীদের সাথে তার দুটি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল, যা এপস্টাইনের ইমেইলে উল্লেখ ছিল। তবে গেটসের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে যে তার বিবাহবিচ্ছেদের সময় মূলত ২০টিরও বেশি নারীদের সাথে সম্পর্কের অভিযোগ উঠেছিল, যা তার পূর্বের সাফাইকে পুরোপুরি মিথ্যা প্রমাণ করে।

বিচার বিভাগের ফাইল থেকে আরও জানা যায়, বিল গেটস তার তৎকালীন স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের স্পষ্ট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও জেফরি এপস্টাইনের সাথে একাধিকবার গোপন ও আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। এপস্টাইন কেবল গেটসের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন বিষয়গুলোই জানতেন না, বরং গেটসের দুই ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ২০১৯ সাল পর্যন্ত এপস্টাইনের সাথে শত শত বার্তা আদান-প্রদান করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, বিল গেটস এবং তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন যে এপস্টাইনের সাথে তার যোগাযোগ ছিল স্রেফ জনহিতৈষী বা দাতব্য কাজের উদ্দেশ্যে এবং সেই বৈঠকগুলোতে কোনো নারী উপস্থিত ছিলেন না।

কিন্তু ফাঁস হওয়া নথিপত্র এবং ছবি বিশ্লেষণ করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নিশ্চিত হয়েছে যে, নোবেল শান্তি কমিটির প্রধানের সাথে গেটসের পরিচয় করিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে গেটসের কর্মচারীদের সাথে ব্যবসায়িক আলোচনা– সবখানেই এপস্টাইনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এমনকি বিভিন্ন বৈঠকে গেটসকে এপস্টাইন এবং তার চারপাশে থাকা নারীদের সাথে ছবি তুলতেও দেখা গেছে, যা গেটসের পূর্বের সব বক্তব্যকে অসত্য প্রমাণিত করে।

এই ন্যাক্কারজনক তথ্য ফাঁসের ফলে বিল গেটসের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান দ্রুত ধসে পড়ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি মাইক্রোসফটের বার্ষিক সিইও সামিট এবং বিখ্যাত বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের শেয়ারহোল্ডারদের বার্ষিক সভা থেকে বিল গেটসকে কার্যত বাদ দেওয়া হয়েছে, যা তিনি বিগত বহু বছর ধরে নিয়মিতভাবে অংশ নিয়ে আসছিলেন। গেটসের ব্যক্তিগত অফিস ‘গেটসের ভেঞ্চার্স’ এবং ৮৯ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল সমৃদ্ধ 'গেটস ফাউন্ডেশন' নিয়মিতভাবে তার জনপ্রিয়তার ওপর জরিপ চালিয়ে আসছিল। তাদের নিজস্ব মিডিয়া বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এপস্টাইন ফাইল প্রকাশের পর থেকে গেটস এবং তার ফাউন্ডেশনকে নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নেতিবাচক এবং সমালোচনামূলক খবরের পরিমাণ ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের একটি সাক্ষাৎকার, ভারতের একটি প্রযুক্তি সম্মেলন থেকে গেটসের আকস্মিক নাম প্রত্যাহার এবং ফাউন্ডেশনের অভ্যন্তরীণ সভায় গেটসের নিজের স্বীকারোক্তির পর এই নেতিবাচক প্রচারের জোয়ার আছড়ে পড়ে।

এই সংকটের মুখে বিল গেটস আগামী মাসের শুরুতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস ওভারসাইট কমিটি) সামনে স্বেচ্ছায় উপস্থিত হয়ে তার এবং এপস্টাইনের সম্পর্কের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। যদিও তার আইনজীবী দলের প্রচেষ্টায় এই জিজ্ঞাসাবাদ ভিডিও রেকর্ডিংয়ের বাইরে রাখার চুক্তি হয়েছে। তবুও কমিটির সদস্যরা তাকে বেশ কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে প্রশ্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালের কিছু ইমেইল রয়েছে যেখানে এপস্টাইন দাবি করেছিলেন যে গেটস একটি যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তার স্ত্রীকে গোপনে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার বিষয়ে কথা বলেছিলেন। যদিও গেটসের মুখপাত্র এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও গেটস ফাউন্ডেশনের ভেতরে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক সুজম্যান কর্মচারীদের কাছে স্বীকার করেছেন যে, এপস্টাইনের সাথে যেকোনো ধরণের সংযোগের কারণে তিনি নিজেও লজ্জিত ও কলঙ্কিত বোধ করছেন, যা ফাউন্ডেশনের বিশ্বব্যাপী কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

বিল গেটসের এই ইমেজ সংকটের প্রভাব তার অন্যান্য ব্যবসায়িক ও জলবায়ু বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়েছে। গেটসের পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘টেরাপাওয়ার’-এর সিইও ক্রিস লেভেসকি কর্মীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন যে এই কেলেঙ্কারির সাথে টেরাপাওয়ারের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু কর্মচারীরা গোপনে আলোচনা করছেন যে এটি সত্য নয়, কারণ গেটস যে রুশ নারীর সাথে সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছেন, তিনি মূলত এক পারমাণবিক পদার্থবিদ যিনি ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত টেরাপাওয়ারেই কর্মরত ছিলেন এবং গেটসের সাথে তার ছবিও রয়েছে। এর বাইরে, জ্বালানি শিল্পের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন ‘সেরা-উইক’ (CERAWeek) থেকেও গেটসের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে আয়োজকদের আপত্তির কারণে। একই সাথে জলবায়ু তহবিলের জন্য গঠিত ‘ব্রেকথ্রু এনার্জি’ নতুন তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা গেটসের এই ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি এবং এপস্টাইন সংযোগ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে বিল গেটসের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের কাছ থেকে। বাফেট, যিনি একসময় গেটস ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রধান দাতা ছিলেন, তিনি ২০২১ সালেই ট্রাস্টি বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেছিলেন এবং ২০২৪ সালে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তার মৃত্যুর পর তার সম্পদের কোনো অংশ গেটস ফাউন্ডেশনে যাবে না। ২০২৬ সালের মার্চের শেষে সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৯৫ বছর বয়সী বাফেট সাফ জানিয়ে দেন যে, এপস্টাইন ফাইল প্রকাশের পর থেকে বিল গেটসের সাথে তার কোনো কথা হয়নি। এবং তিনি জুন মাসের শেষে তার বার্ষিক অনুদান দেওয়ার আগে এই নথিপত্রগুলো আরও ভালো করে খতিয়ে দেখতে চান। এমনকি গেটস, বাফেট এবং মেলিন্ডার যৌথ উদ্যোগে গঠিত ‘গিভিং প্লেজ’-এর সাম্প্রতিক বার্ষিক সম্মেলনে বাফেট এবং মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস– উভয়েই অনুপস্থিত ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই বিশদ বিবরণ থেকে স্পষ্ট যে, বিল গেটস দাতব্য কাজের আড়ালে নিজের যে চমৎকার ও অনুকরণীয় ভাবমূর্তি তৈরি করেছিলেন, তা এখন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে এবং বিশ্বনেতা থেকে শুরু করে তার নিকটতম বন্ধুরাও এখন তার থেকে দূরত্ব বজায় চলছেন।

সম্পর্কিত