২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের জেন-জি বিপ্লবের সবচেয়ে বড় চমক হলো জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন সেই গণঅভ্যুত্থান শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, যার শাসনামলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ‘ইসলামপন্থী’ দল জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু গত মাসের নির্বাচনে জামায়াত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দল হয়েছে। জামায়াতের এমন প্রত্যাবর্তন খুব কম মানুষই আশা করেছিল।
দলটি তাদের ঐতিহ্যগত অবস্থান থেকে একটু দূরে সরে এসে নতুন কিছু বিষয় গ্রহণের বার্তা দিয়ে এই প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে। বর্তমান নেতা শফিকুর রহমানের অধীনে দলটি তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে কিছুটা আড়ালে রেখে নিজেদের অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট বা প্রচলিত শাসনব্যবস্থা বিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতের অতীতেরও কিছু দায়ভার রয়েছে। ১৯৭১ সালে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। বাংলাদেশ ৯০ শতাংশের বেশি মুসলিম প্রধান দেশ হলেও দেশটিতে মধ্যপন্থী ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির একটি গর্বিত ঐতিহ্য রয়েছে।
তাই জামায়াত নিজেকে পরিবর্তন, দুর্নীতিবিরোধী এবং সুশাসনের দল হিসেবে ব্র্যান্ডিং করেছে। বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর অধিকাংশ সময় ধরে পালাক্রমে ক্ষমতায় থাকা দুটি বড় দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ঠিক বিপরীত ব্র্যান্ডিং। এই দুটি দল অনেকটাই পারিবারিক ব্যবসার মতো পরিচালিত হয়েছে এবং ব্যাপক দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
জামায়াতের সবচেয়ে চতুর পদক্ষেপ ছিল ক্যাম্পাস রাজনীতি। গত বছর তাদের ছাত্র সংগঠন (ছাত্রশিবির) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাঁচটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে। তারা শুধু ধর্মীয় আলোচনা না করে স্টাডি সেশন পরিচালনা, জনকল্যাণমূলক গ্রুপ গঠন, হলের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করেছে। সম্প্রতি তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘হিজাব র্যালি’র আয়োজন করেছে, যেটি এমনকি ইসলামপন্থীদের প্রতি কম সহানুভূতিসম্পন্ন নারীসহ অনেককেই আকৃষ্ট করেছে। হিজাব এখন পরিচয় প্রকাশের একটি আধুনিক ও প্রচলিত-সংস্কৃতি বিরোধী মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
জামায়াত জেন-জি বিপ্লবীদের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির সঙ্গে একটি নির্বাচনী জোট গড়ে। যে কারণে অনেকেই এনসিপি ছাড়েন। নির্বাচনে দলটি মাত্র ছয়টি আসন পেয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে জামায়াত রাজনৈতিকভাবে ভোলবদল করতে সক্ষম হয়েছে এবং নিজেদের গণঅভ্যূত্থানের বিজয়ী পক্ষে হাজির ও প্রদর্শন করতে পেরেছে।
ফলে জামায়াত এখন একটি সমীহ করার মতো শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিএনপির নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমি নিশ্চিত নই তাদের দর্শন আসলে কী! সমস্যা হলো জামায়াত এখন মধ্যপন্থা ও কট্টরপন্থার মধ্যে বিভক্ত। খোদ দলীয় প্রধানও কিছুটা অননুমেয়।”
মাঝেমধ্যেই নির্ধারিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বাংলাদেশি নারীদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেন। যেমন একবার তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো জৈবিক প্রয়োজনীয়তার কারণে নারীদের রাজনৈতিক নেতা হওয়া কঠিন।
জামায়াত পরবর্তী নির্বাচনে জয়ের স্বপ্ন দেখছে। ক্ষমতায় গেলে কী করবে–এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান গতানুগতিক মধ্য-ডানপন্থী মতাদর্শের কথা বলেন। তিনি ব্যবসায়িক সহায়তা, শ্রমবাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিবাজ বা দলবাজ আমলাদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শরিয়া আইনের প্রতি জামায়াত যে তাত্ত্বিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ, তা মূলত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জনকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের অস্পষ্ট নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন আর হয়তো এটাই তাদের মূল কৌশল। জামায়াত আসলে কেমন বাংলাদেশ গড়বে, তা সম্ভবত সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।