সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার দাবি করেছেন। এই ঘটনা ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। তবে আমেরিকা কর্তৃক কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করার ঘটনা এই প্রথম না। এর আগেও আমেরিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করেছে বা দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে।
নিচে এরকম কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানের কথা তুলে ধরা হলো–
ম্যানুয়েল নরিয়েগা (পানামা)
পানামার সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আমেরিকা গ্রেপ্তার করে ১৯৯০ সালের জানুয়ারির মাসে। একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তাকে আটক করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন জাস্ট কজ’। এই ঘটনা তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
একসময় আমেরিকার সঙ্গে নরিয়েগার সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকলেও পরবর্তীতে তিনি মার্কিনবিরোধী হয়ে ওঠেন। তার বিরুদ্ধে আমেরিকার আদালতে মাদক ও অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। একই সঙ্গে পানামায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের ওপর হামলা এবং পানামা খাল নিয়ে বিরোধের জেরে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর আমেরিকা পানামায় সামরিক অভিযান শুরু করে। অভিযানের লক্ষ্য ছিল নরিয়েগাকে ক্ষমতা থেকে সরানো, মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা। অল্প সময়ের মধ্যেই নরিয়েগার বাহিনী ভেঙে পড়ে, তবে নরিয়েগা পালিয়ে গিয়ে পানামা সিটিতে অবস্থিত ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নেন। কূটনৈতিক এলাকা হওয়ায় এখানে মার্কিন সেনারা প্রবেশ করে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ফলে সরাসরি অভিযান চালানোর পরিবর্তে আমেরিকা অন্য কৌশল গ্রহণ করে।
মার্কিন বাহিনী দূতাবাসটি ঘিরে ফেলে এবং নরিয়েগার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করার জন্য উচ্চশব্দে গান ও অন্যান্য শব্দ দীর্ঘ সময় ধরে বাজাতে থাকে, যাতে তিনি বিশ্রাম নিতে না পারেন। এই কৌশলটি বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হলেও শেষ পর্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়।
প্রায় ১০ দিন পর, ১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি ম্যানুয়েল নরিয়েগা আত্মসমর্পণ করেন। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ১৯৯২ সালে, আমেরিকার ফেডারেল আদালত তাকে মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। কয়েক বছর কারাদণ্ড ভোগের পর শেষ পর্যন্ত তিনি পানামায় ফিরে আসেন এবং ২০১৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
সাদ্দাম হোসেন (ইরাক)
সাদ্দাম হোসেন ১৯৭৯ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ বছর ইরাকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সাথে ইরাকের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ২০০৩ সালের মার্চ মাসে আমেরিকা ও মিত্র দেশগুলো ‘সাদ্দাম সরকারের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে’–এই অভিযোগে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে। যদিও পরে এই অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই অভিযানের ফলে ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে মার্কিন বাহিনী ইরাকের রাজধানী বাগদাদ দখল করে ফেলে এবং সাদ্দাম হোসেন আত্মগোপনে চলে যান।
২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর মার্কিন সেনারা তাকে ইরাকের তিকরিত শহরের কাছে একটি গ্রামীণ এলাকায় খুঁজে পায়। তিনি একটি ভূগর্ভস্থ গর্তে লুকিয়ে ছিলেন। এই অভিযানটির নাম ছিল ‘অপারেশন রেড ডন’। সাদ্দাম হোসেনকে জীবিতাবস্থায় গ্রেপ্তার করে প্রথমে আমেরিকার হেফাজতে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সাদ্দাম হোসেনকে ইরাকি সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ইরাকের বিশেষ আদালতে ২০০৬ সালে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মামলাটি ছিল ১৯৮২ সালে দুজাইল শহরে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইরাকের আইন অনুযায়ী ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
নিকোলাস মাদুরো (ভেনেজুয়েলা)
বাসচালক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন নিকোলাস মাদুরো। ২০১৩ সালে তার পূর্বসূরি হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শী ও রাশিয়াপন্থী হওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার বিরাগভাজন ছিলেন। এ ছাড়া আমেরিকা মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার এবং সংগঠিত অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ করে আসছে। আমেরিকার দাবি, ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর থেকেই আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রকে সুরক্ষা ও সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদও এই সংঘাতের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়। সমালোচকদের মতে, লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার ও প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর উপস্থিতি ঠেকানোর লক্ষ্যেও আমেরিকা মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২৫ সালে ক্যারিবীয় অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। আমেরিকা দাবি করে, মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত কিছু স্থাপনা ও নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে তারা সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছিল। মাদুরো বারবার আমেরিকার দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ বলে আখ্যা দেন।
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভোরে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র একটি বৃহৎ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। আমেরিকার পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই অভিযানের সময় নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী অংশ নেয়। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার পর খুব দ্রুত অভিযানের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হয়। মাদুরোকে প্রথমে একটি মার্কিন সামরিক জাহাজে নেওয়া হয় এবং পরে আমেরিকায় স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তার বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা আছে।
আরও যারা আছেন
এই তালিকায় আরও কিছু নাম আছে, যাদেরকে আমেরিকা সরাসরি গ্রেপ্তার না করলেও তাদের পতন বা দেশত্যাগের ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছে।
হুয়ান অরলান্ডো হার্নান্দেজ ছিলেন মধ্য আমেরিকার দেশ হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট। তিনি ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্ষমতা ছাড়ার পরপরই তিনি আমেরিকার একটি মাদক পাচার সংক্রান্ত মামলায় জড়িয়ে পড়েন।
আমেরিকার সরকারপক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ অনুযায়ী, হুয়ান অরলান্ডো হার্নান্দেজ তার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ কোকেন আমেরিকায় পাচারে সহায়তা করেন। অভিযোগে বলা হয়, তিনি মাদক পাচারকারী চক্রের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার ঘুষ গ্রহণ করেন এবং এর বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ও ভারী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়।
২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানী তেগুসিগালপায় নিজ বাসভবন থেকে তিনি হন্ডুরাসের পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। আমেরিকা হন্ডুরাস সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। হন্ডুরাস সরকার তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করে ২১ এপ্রিল।
আমেরিকায় হার্নান্দেজের বিচার হয় নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত ফেডারেল আদালতে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ফেডারেল জুরি তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। ২০০৪ সালের ২৬ জুন আমেরিকার আদালত তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। পাশাপাশি তাকে ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়।
জঁ বারত্রঁ আরিস্তিদ ছিলেন ক্যারিবীয় দেশ হাইতির সাবেক প্রেসিডেন্ট। তিনি প্রথমবার ১৯৯০ সালে এবং পরবর্তীতে ২০০০ সালে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রপতি হন। সাবেক ক্যাথলিক যাজক আরিস্তিদ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তবে তার শাসনামলে রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতির অভিযোগে অস্থিরতা তৈরি হয়।
২০০৩ সালের শেষভাগ ও ২০০৪ সালের শুরুতে হাইতিতে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। দেশটি সশস্ত্র বিদ্রোহ, সাবেক সেনা ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলা, বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। বিদ্রোহীরা রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্স অভিমুখে অগ্রসর হতে শুরু করলে আরিস্তিদ দাবি করেন যে, তার জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। ২০০৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জঁ বারত্রঁ আরিস্তিদ প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করে হাইতি ত্যাগ করেন। তাকে একটি মার্কিন বিমানে করে প্রথমে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ও পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
আরিস্তিদ পরবর্তীকালে দাবি করেন যে, তাকে জোরপূর্বক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমেরিকার কর্মকর্তারা তাকে পদত্যাগ করার জন্য তীব্র চাপ প্রয়োগ করেন এবং কার্যত অপহরণ করে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। আরিস্তিদের সমর্থকেরা এই ঘটনাকে আমেরিকা-সমর্থিত একটি অভ্যুত্থান বলে থাকেন।