ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি । যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ গতকাল শনিবার শুরুই হয়েছিল আলী খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েই। এই সামরিক অভিযান শুধু ইরানের পারমানবিক স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া–ই নয়, এই সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘ মেয়াদি অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এ সামরিক অভিযানের লক্ষ্য যে ৪৬ বছর ধরে ইরানে চলে আসা রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূলোৎপাটন—সেটি না বোঝার কোনো কারণ নেই।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস–এর সিনিয়র ফেলো করিম সাদজাদপোর পুরো অভিযানটির বিশ্লেষণ করেছেন। আলী খামেনির মৃত্যু ইরান, মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে, এর গভীরতর রাজনৈতিক , সামাজিক ও কৌশলগত দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে করিম সাদজাদপোরের বিশ্লেষণে। তাঁর বিশ্লেষণটি ছাপা হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্সে।
সাদজাদপোরের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ সামরিক অভিযানকে ইতিহাস কখনোই ‘অপরিহার্য যুদ্ধ’ বা ‘ওয়ার অব নেসেসিটি’ হিসেবে দেখবে না। এমনটা দেখার সুযোগও খুব সীমিত। ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে হামলার হুমকি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের পক্ষ থেকে কোনো তাৎক্ষণিক পারমানবিক হামলা বা সামরিক হামলার হুমকি ছিল না। এ অভিযান সম্পূর্ণ কৌশলগত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এক্ষেত্রে সুযোগের সদ্ব্যবহারই করেছে। গত জুনের সংঘাতের পর থেকে ইরান নিজের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহ, হামাসের মতো ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই দুর্বলতাকেই চূড়ান্ত আঘাতের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ট্রাম্পের জন্য এটি কেবল ভূ-রাজনীতি নয়, বরং ব্যক্তিগত ‘ক্রেডিবিলিটি’ বা বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। জানুয়ারি মাসে অন্তত নয়বার তিনি রেডলাইন টেনেছিলেন যে, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়, তবে আমেরিকা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। ফলে এই অভিযান ট্রাম্পের দেওয়া প্রতিশ্রুতির একটি সামরিক বাস্তবায়ন।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিই ছিলেন এই অভিযোনের কেন্দ্রবিন্দু বা লক্ষ্য। সাদজাদপোরের মতে, খামেনির মৃত্যু একটি ডুবন্ত জাহাজে শক্তিশালী কামানের গোলার আঘাতের মতো। ইরান এমনিতেই বিশ্বব্যাপী একঘরে একটি দেশ। দেশটির শাসনব্যবস্থা ‘একাকি’ ও ‘বিচ্ছিন্ন’। এই শাসনব্যবস্থার কোনো এক্সিট ওয়ে বলতে কিছু নেই।
খামেনি নিহত হলে এই শাসনব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে। যদিও সাদজাদপোর মনে করেন খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এবং রেভল্যুশনরি গার্ড টিকে থাকার জন্য অনেক বেশি নৃশংস হয়ে উঠবে। তবে আশঙ্কা আছে, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পুরো ব্যবস্থাটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। দীর্ঘ ৪০ বছরের একচ্ছত্র শাসনের পর হঠাৎ তৈরি হওয়া এই ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করা সহজ হবে না, যা ইরানকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এদিকে খামেনিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী হত্যা করার পর ইরানের সাধারণ মানুষ মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। খামেনির ব্যাপারে ইরানের জনসাধারণের চিন্তাচেতনা বেশ খানিকটা জটিলই বলা চলে। একদিকে খামেনির কম্পাউন্ডে ধোঁয়া দেখে মানুষের উল্লাস করার ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে, দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বোমা হামলায় কয়েক ডজন শিশুর মৃত্যু যুদ্ধের চরম অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত করেছে।
সাদজাদপোর মনে করেন, ইরানি সম্প্রতি যেভাবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নৃশংস পন্থায় দমন করা হয়েছে, তা দেখতে দেখতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত । তারা এখন অপেক্ষা করছে দেখার জন্য যে, এই অভিযান কতদূর গড়ায়। ট্রাম্প ইরানের জনগণকে দেশ ‘পুনরুদ্ধারের’ আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু প্রশ্ন হলো—নিরস্ত্র জনগণ কি উচ্চ সজ্জিত নিরাপত্তা বাহিনীর সামনে দাঁড়াতে পারবে? ইরানের বিরোধীরা সংখ্যায় অনেক হলেও তারা অসংগঠিত এবং তাদের কোনো কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কাঠামো নেই।
যেকোনো সফল বিপ্লবের জন্য দুটি উপাদান জরুরি: অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক নেতৃত্ব। ইরানের ক্ষেত্রে রেজা পাহলভি অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা হলেও তার সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিপ্লবের একটি বড় হলো—মানুষ তখনই এতে যোগ দেয় যখন তারা মনে করে এটি ‘সফল’ হবে। কেউই আত্মঘাতী হতে চায় না। তাই যতক্ষণ না ইরানিরা বিশ্বাস করবে যে দমনের যন্ত্রগুলো সত্যিই অকেজো হয়ে গেছে, ততক্ষণ তারা গণ-অভ্যুত্থানে নামতে দ্বিধা করবে।
সাদজাদপোর এই সংঘাতের দুই ধরনের পরিণতির কথা বলেছেন। সবচেয়ে খারাপ চিত্রটি হলো একটি ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’। ইরান যদি হার নিশ্চিত দেখে আত্মঘাতী পথ বেছে নেয় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত) তেল ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে শুরু করে, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।
অভ্যন্তরীণভাবে, ইরান উত্তর কোরিয়ার মতো একটি বদ্ধ এবং আরও নৃশংস রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। অথবা জাতিগত উত্তেজনার ফলে সিরিয়ার মতো গৃহযুদ্ধের কবলে পড়তে পারে। তবে একটি ইতিবাচক সম্ভাবনাও আছে—যদি ইরানিরা এই সুযোগে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি প্রতিনিধি-মূলক ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ইরানের যে বিশাল মানবসম্পদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তাতে দেশটি বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনীতির একটি হওয়ার যোগ্য।
মোট কথা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি সরকারের পতন নয়, বরং একটি সভ্যতার পুনর্গঠনের প্রশ্ন। করিম সাদজাদপোরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টানেলের শেষে আলো থাকলেও সেই টানেলটি ধসে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। ইরানের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর: আমেরিকান-ইসরায়েলি অভিযানের স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা বাহিনীর আনুগত্যের ফাটল এবং সাধারণ মানুষের সাহসিকতার মাত্রা। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার এই খেলায় ইরান এখন এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন।