২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। আপনার বয়স তখন কত ছিল? ৭ বছর, ১০ বছর বা আপনি তখনো স্কুলের গণ্ডিও পার করেননি? হয়তো আপনি তখন ঢাকায় নিজের পড়ার ঘরে বসে ছিলেন, কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে। কিন্তু সেদিন ভেঙে পড়া দুটো টাওয়ার শুধু ধুলোয় মিশে যায়নি–আমাদের চেনা পৃথিবীটার ভিত্তিকেই চিরতরে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই টুইন টাওয়ারের গুঁড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য টিভিতে দেখেছিলেন কি? তখন কি মনে হয়েছিল যে, এই ঘটনা ওলটপালট করে দেবে দুনিয়াকে?
আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে জন্মেছি, আমাদের শৈশবের মাঝপথেই পৃথিবীটা তার নির্ভার রূপ হারিয়ে ফেলে। আর এতে অন্যতম বড় প্রভাবক হয়ে দেখা দিয়েছিল এই ঘটনা।
৯/১১ কোনো সাধারণ দুর্ঘটনার সংবাদ ছিল না। এটি ছিল ইতিহাসের এমন এক ‘টার্নিং পয়েন্ট’, যার পর থেকে পুরো দুনিয়া বদলে যায়। বদলায় নিরাপত্তার সংজ্ঞা। বদলে যায় আমাদের পরিচয়ও। আমরা হয়ে উঠি ‘জেনারেশন নাইন ইলাভেন’।
যাদের পরিবার বা স্বজন তখন দেশের বাইরে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন, তাদের দৈনন্দিন জীবনটা কেমন হয়ে উঠেছিল? একটি নাম, একটি নির্দিষ্ট পরিচয় কিংবা পাসপোর্টের সিল–হঠাৎ করেই কারো কারো অস্তিত্বের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াল। এয়ারপোর্টের দীর্ঘ ও কড়া চেকিংয়ের লাইন, চারপাশের সন্দেহজনক দৃষ্টি, আর অদৃশ্য এক আতঙ্কের ছায়া–এই সবকিছুর মাঝেই বড় হতে হয়েছে আমাদের প্রজন্মকে। অন্যান্য প্রজন্মের কাছে যুদ্ধের গল্প হয়তো ইতিহাসের পাতায় লেখা কোনো দূরবর্তী অধ্যায়।
কিন্তু আমাদের কাছে, মানে জেনারেশন নাইন ইলাভেনের কাছে? যুদ্ধ এবং নিরাপত্তাহীনতার সেই বিশ্বরাজনীতি ছিল একদম চোখের সামনে ঘটে যাওয়া কঠিন দৈনন্দিন বাস্তবতা। আমরা উন্মুক্ত ও সীমানাহীন বিশ্বের স্বপ্ন দেখে বড় হতে গিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম–চারপাশের দেয়ালগুলো রাতারাতি আগের চেয়ে অনেক বেশি উঁচু হয়ে গেছে।
জেনারেশন নাইন ইলাভেন হলো মূলত মিলেনিয়াল এবং জেন-জি-এর প্রথমাংশ–যারা ২০০১ সালের হামলার সময় শিশু, কিশোর বা তরুণ ছিল। এদের জন্ম আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০০-এর শুরুতে। এরা এমন একটি প্রজন্ম, যাদের শৈশব বা কৈশোর কেটেছে ৯/১১ হামলার বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করে। হামলার আগের শান্ত পৃথিবীকে তারা কিছুটা মনে রাখতে পারলেও, প্রাপ্তবয়স্ক জীবন গড়ে উঠেছে নিয়ন্ত্রিত ও অনিরাপদ এক পৃথিবীতে।
৯/১১ হামলা কেবল সামরিক অঙ্গনে নয়, তরুণ প্রজন্মের মানসিকতায়ও নাড়া দিয়ে যায়। আমরা টিভিতে দেখেছি ‘ওয়ার অন টেরর’-এর খবর। দেখেছি কীভাবে চোখের সামনে ভিসা নীতি কঠিন হয়ে গেল, সামাজিক মেরুকরণ বাড়ল, আর প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে নজরদারির এক নতুন জালে আটকে ফেলল।
নাগরিকের জন্য কঠোর নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তার চেয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি এরা শৈশব থেকেই দেখে এসেছে। পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয়দের প্রতি বৈষম্য এবং ইসলামোফোবিয়ার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
৯/১১ সন্ত্রাসী হামলা মিডিয়ার ন্যারেটিভ পরিবর্তন করে দেয়। ছবি: রয়টার্স
আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের সূচনা চোখের সামনে দেখার ফলে এই প্রজন্মের মাঝে অতি-দেশপ্রেমের পাশাপাশি যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিপ্রিয় মনোভাব তৈরি হয়।
স্যাটেলাইট টিভি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাইভ এই ট্র্যাজেডি দেখার ফলে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রজন্ম দ্রুত সচেতন হয়ে ওঠে।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী বাঁক এনে দিয়েছিল।
মার্কিন সরকারের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে প্রত্যক্ষ ব্যয় আট ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। সামরিক ব্যয় বাড়ায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেট সংকুচিত হয়। এভিয়েশন ও পর্যটন খাতে ধস নামে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি হয়। এর প্রভাব আমাদের বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পড়েছে। ঠিক এখন যেমন পড়ছে ইরান যুদ্ধের সময়ে। Once again, history is repeating itself!
বিশ্বজুড়ে ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদের বিস্তার ঘটে। ‘প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট’-এর মতো আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের নজরদারির আইনি বৈধতা তৈরি হয় এবং অভিবাসন নীতি কঠোর হয়ে ওঠে। এয়ারপোর্ট পার হয়ে পশ্চিমা দেশে ঢোকা যেন ‘পুলসিরাত’ পার হওয়ার মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়।
যেকোনো স্থানে সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে–এই আতঙ্ক দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। গণমাধ্যমের ন্যারেটিভ পরিবর্তন হয়। এতে ধ্বংসযজ্ঞ বারবার দেখার ফলে আমরা ভুক্তভোগীদের মতো আক্রান্ত হই পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেসে। সবার মতো আমাদের মাঝেও তৈরি হয় ‘আমরা বনাম তারা’ মানসিকতা।
ইতিহাসের পাতায় হয়তো ঘটনাটি এক দিনের। কিন্তু এর প্রভাব আমরা বহন করছি বছরের পর বছর ধরে–আমাদের চিন্তায়, প্রবাসে থাকা প্রিয়জনদের অভিজ্ঞতায়, নিজেদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় আর বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমাদের কাছে নাইন ইলাভেন আসলে কখনোই শেষ হয়নি। আমাদের কাছে ‘9/11 to be continued’.