জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটি ফোর প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পর। তবে বইটিকে কেবল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। অরওয়েলের চিন্তার পেছনে ছিল ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান, সোভিয়েত ইউনিয়নের স্তালিনবাদী শাসন, যুদ্ধকালীন প্রচারণা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সত্য ও তথ্য নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা। স্পেনের গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতাও তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ফলে ১৯৮৪ মূলত এমন এক ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা, যেখানে রাষ্ট্র শুধু নাগরিকের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না, বরং তার চিন্তা, ভাষা, স্মৃতি এবং সত্য সম্পর্কে ধারণাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
উপন্যাসের কল্পিত রাষ্ট্র ‘ওশেনিয়া’তে নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসর বলতে কার্যত কিছু নেই। ‘বিগ ব্রাদার’ যেন সর্বত্র উপস্থিত, আর ‘থট পুলিশ’ মানুষের চিন্তাকেও অপরাধে পরিণত করতে পারে। ইতিহাসকে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্লিখন করা হয়, পুরনো সত্য মুছে ফেলা হয় এবং ‘নিউজপিক’ নামের একটি কৃত্রিম ভাষার মাধ্যমে মানুষের চিন্তার পরিসর সংকুচিত করার চেষ্টা করা হয়। অরওয়েলের মূল বক্তব্য ছিল, ক্ষমতা যদি মানুষের চিন্তা ও ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে মানুষের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা আর খুব কঠিন থাকে না। অর্থাৎ, একজন মানুষকে শুধু কী করতে হবে, তা বলে দেওয়া যথেষ্ট নয়; বরং সে কী ভাবতে পারে এবং কীভাবে সেই ভাবনা প্রকাশ করতে পারে, সেটিও যদি নির্ধারণ করে দেওয়া যায়, তবে নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর ও কার্যকর হয়।
প্রায় আট দশক পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে- অরওয়েল যে পৃথিবীর আশঙ্কা করেছিলেন, আমরা কি সেই পৃথিবী থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি? নিঃসন্দেহে পৃথিবী বদলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধে পরিণত হয়েছে। বহু দেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন, মুক্ত গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, ক্ষমতার মৌলিক প্রবণতা পুরোপুরি বদলায়নি।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখনো এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে জনগণের ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ বা চাপের মধ্যে রাখা হয় এবং রাষ্ট্রের সমালোচনাকে কখনো কখনো রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পার্থক্য শুধু পদ্ধতিতে। কোথাও সরাসরি দমন-পীড়ন দেখা যায়, কোথাও আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করা হয়, আবার কোথাও তথ্যের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে নাগরিকের কণ্ঠকে দুর্বল করা হয়।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশও বৃহত্তর বিশ্বের বাইরে নয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা অনেক সময় রাজনৈতিক বিরোধিতা বা শত্রুতার সঙ্গে এক করে দেখা হয়। অথচ গণতন্ত্রের সবচেয়ে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই হলো প্রশ্ন করার অধিকার। নাগরিক প্রশ্ন করবে, সাংবাদিক প্রশ্ন করবে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি প্রশ্ন করবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রশ্ন করবে- এগুলো গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়, বরং তার প্রাণশক্তি। একটি সরকারকে শুধু তার সমর্থকেরা যে প্রশ্ন করবে, এমন কোনো গণতান্ত্রিক ধারণা নেই। বরং সরকারের শক্তি প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে বিরোধী মত, সমালোচনা এবং কঠিন প্রশ্নকে সহ্য করে এবং যুক্তি ও তথ্য দিয়ে তার জবাব দেয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বড় হয়, সেই ক্ষমতার ওপর জবাবদিহির প্রয়োজনও তত বেশি হয়। তাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন গণমাধ্যম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সক্রিয় নাগরিক সমাজ কোনো রাষ্ট্রের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান।
অরওয়েলের সময়ের তুলনায় আজকের পৃথিবীতে আরও একটি বড় পরিবর্তন এসেছে- প্রযুক্তি। ১৯৮৪-এর টেলিস্ক্রিন ছিল সার্বক্ষণিক নজরদারির প্রতীক; আজ বাস্তব পৃথিবীতে স্মার্টফোন, সিসিটিভি ক্যামেরা, ডিজিটাল লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ধরনের ডেটা সংগ্রহ মানুষের আচরণ সম্পর্কে বিপুল তথ্য তৈরি করছে। প্রযুক্তি নিজে স্বৈরতন্ত্র সৃষ্টি করে না, কিন্তু জবাবদিহিহীন ক্ষমতার হাতে প্রযুক্তি চলে গেলে নজরদারি ও জনমত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যকে গণতান্ত্রিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে, আবার মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে মানুষের উপলব্ধিকেও প্রভাবিত করার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে আজকের পৃথিবীতে অরওয়েলের প্রশ্নটি শুধু রাষ্ট্র আমাদের ওপর নজর রাখছে কি না–এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং আমরা কী তথ্য দেখছি, কোন তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, কোন তথ্য হারিয়ে যাচ্ছে এবং কে সেই তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে- এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখানে অরওয়েলের ভাষা সম্পর্কিত সতর্কবার্তাটিও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের ভাষার পরিসর সংকুচিত করা গেলে চিন্তার পরিসরও সংকুচিত করা সম্ভব। আজ আমাদের ‘নিউজপিক’ নেই, কিন্তু রাজনৈতিক ভাষার ব্যবহার অনেক সময় বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে। কোনো কঠিন সত্যকে কোমল শব্দে ঢেকে দেওয়া, কোনো ব্যর্থতাকে সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা, কোনো সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা- এসবই জনপরিসরে সত্যের ধারণাকে দুর্বল করতে পারে। ফলে আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সেন্সরশিপ নয়; বরং এমন একটি তথ্যপরিবেশ তৈরি হওয়া, যেখানে সত্য, মিথ্যা, মতামত ও প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।
অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনটি এমন হওয়ার কথা ছিল না। আধুনিক রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য জনগণকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা দেওয়া, সুযোগ সৃষ্টি করা এবং জনগণের মতামতকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর পৃথিবী সেই শিক্ষাই নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার যে আন্তর্জাতিক কাঠামো পরবর্তী সময়ে গড়ে উঠেছে, তার পেছনে এই উপলব্ধিই কাজ করেছে যে, সীমাহীন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত নাগরিক স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই সেই বিপদ দূর হয় না। প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর রাখতে হয়, স্বাধীন রাখতে হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নাগরিকদের সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা রক্ষার দাবি জানাতে হয়।
এই কারণেই ১৯৮৪ এখনো শুধু একটি উপন্যাস নয়; এটি ক্ষমতার প্রকৃতি বোঝার একটি আয়না। অরওয়েল আমাদের মনে করিয়ে দেন, স্বাধীনতা একবার অর্জিত হলেই তা চিরস্থায়ী হয়ে যায় না। ক্ষমতা সব সময়ই আরও ক্ষমতা চাইতে পারে, রাষ্ট্র সব সময়ই আরও নিয়ন্ত্রণের যুক্তি তৈরি করতে পারে এবং মানুষও কখনো কখনো নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা কিংবা সুবিধার বিনিময়ে নিজের স্বাধীনতার কিছু অংশ ছেড়ে দিতে প্রস্তুত হতে পারে। বিপদটি তখনই গভীর হয়, যখন সমাজ ধীরে ধীরে নজরদারিকে স্বাভাবিক, ভিন্নমতকে বিরক্তিকর, সমালোচনাকে বিপজ্জনক এবং নীরবতাকে শৃঙ্খলা হিসেবে দেখতে শুরু করে। অরওয়েলের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই- তিনি আমাদের শুধু একটি স্বৈরশাসনের ছবি দেখাননি; তিনি সতর্ক করেছেন, স্বাধীনতা হারানোর আগে মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তাই ভুলে যেতে পারে। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, রাষ্ট্রের কাঠামো বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতা ও নাগরিকের সম্পর্কের মৌলিক প্রশ্নটি এখনো একই রয়ে গেছে: রাষ্ট্র কি জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে? সেই প্রশ্নের উত্তর যত দিন গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, তত দিন ১৯৮৪ আমাদের সময়েরও বই হয়ে থাকবে।
লেখক: অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল