যেখানেই চোখ যায় শুধু পাথর আর পাথর। ছোট, মাঝারি কিংবা বড় নানা আকৃতির পাথরে ভরা চারপাশ। অধিকাংশই সাদা, কোথাও কোথাও চোখে পড়ে কালো ও ধূসর পাথর। এসব পাথরের বুক চিরে বয়ে চলেছে তীব্র স্রোতের স্ফটিকস্বচ্ছ পানি। সীমান্তের ওপারে সবুজে ঢাকা সারি সারি পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঝরনার পানি এঁকেবেঁকে এসে মিশেছে ধলাই নদে।
প্রকৃতির এমন অপরূপ দৃশ্যের দেখা মেলে সিলেটের সীমান্তঘেঁষা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্যরেখার কাছের এই নৈসর্গিক স্থানটি পরিচিত ‘সাদাপাথর’ নামে। পাথর আর স্বচ্ছ পানির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই পর্যটনকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই সিলেটের অন্যতম আকর্ষণ।
সম্প্রতি পাথর চুরির ঘটনায় সাদাপাথরের সৌন্দর্য ও পরিবেশ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এখনো এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। পাহাড়ের সবুজ, নীল আকাশ, সাদা পাথর আর স্বচ্ছ পানির মিলনে এখনো মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটকরা।
ভারত অংশে সবুজে আচ্ছাদিত পাহাড়ের সারি। তার ওপর কখনো সাদা মেঘের ভেলা, কখনো নীল আকাশ। আর বাংলাদেশ অংশে পানির মধ্যে ছড়িয়ে থাকা পাথরের বিছানা। সেই পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা শীতল স্বচ্ছ পানিতে গা ভাসিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকরা।
গতকাল বুধবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও পাথরের স্তূপ, কোথাও আবার পাথরের ফাঁকে চিকচিক করছে বালু। পাথর আর বালুর ফাঁক দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে ধলাই নদ। পাশের আরেকটি প্রবাহপথ দিয়ে পাহাড়ি ঢলের মতো প্রবল বেগে ছুটে আসছে শীতল পানি। পানির এই স্রোতই সাদাপাথরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র। ছবি: চরচা
পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে চলা স্বচ্ছ পানিতে দল বেঁধে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠছেন পর্যটকরা। কেউ পানিতে নেমে সাঁতার কাটছেন, কেউ একে-অপরকে ভিজিয়ে আনন্দ করছেন। আবার কেউ স্বচ্ছ পানির নিচে থাকা পাথরের ওপর বসে ছবি তুলছেন।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, সিলেট শহর থেকে যাত্রীবাহী বাসে সরাসরি ভোলাগঞ্জ যাওয়া যায়। এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশাতেও যাতায়াত করা যায়। ভোলাগঞ্জের ১০ নম্বর সাইটে পৌঁছানোর পর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে যেতে হয় মূল পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথরে। নৌকায় জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ১০০ টাকা। একটি নৌকায় ৮/১২ জন যাত্রী পরিবহনের সুবিধা রয়েছে।
৮ বছর ধরে সাদাপাথর ঘাটে নৌকা চালানো মাঝি আব্দুল হকের সাথে কথা হয়। তার ভাষ্য মতে, পাথর নিয়ে নানা অনিয়ম ও চুরির অভিযোগে সাদাপাথরের প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও পর্যটকদের আগ্রহে এখনো ভাটা পড়েনি। বরং প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন নানা বয়সী মানুষ।
আব্দুল হক বলেন, “প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত এই ঘাটে থাকি৷ আমরা যাওয়া আসা ৩৫০ টাকা করে পেয়ে থাকি। শুক্রবারে সাত কি আটটা ট্রিপ দিতে পারি আর অন্য দিন তো তিনটা কি চারটা হয়। ধরেন প্রতিদিন হাজার টাকার মত ইনকাম হয়। এক সপ্তাহ আগে এক লাখ টাকা দিয়ে লৌকাটা নয়া লয়ছি (নৌকাটা নতুন নিয়েছি)। আমরা এখানে ১২০ জন লৌকার মাঝি আছি।”
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র। ছবি: চরচা
সাদা পাথরের জিরো পয়েন্ট এলাকায় দেখা হয় খুলনা থেকে সপরিবারে আসা রোমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি পেশায় একজন সরকারি কর্মচারী। রোমা আক্তার বলেন, “অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তিন দিনের জন্য সিলেটে এসেছি। আজ প্রথম দিন ছিল। সাদা পাথরে এই প্রথম আসা। ভেবেছিলাম সব পাথর হয়তো চুরি হয়ে গেছে। তবে এখানে এসে পাথর, পাহাড়, প্রকৃতি সব কিছু দেখে মনে হল পাথর চুরির ঘটনায় এখনো সাদা পাথরের সব সৌন্দর্য কেড়ে নিতে পারেনি।”
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাজীব বলেন, “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর- জীবনানন্দের সেই বাণীর স্বরূপ আমি সাদাপাথরে এসে বুঝতে পেরেছি। তবে সাম্প্রতি সময়ে পাথর চুরির যে ঘটনা ঘটেছে তাতে এখানকার প্রকৃতি আজ হুমকির মুখে।”
প্রকৃতির এই সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পাথর লুট বন্ধের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ উসমান গনি বলেন, “সাদাপাথরে দেখতে আসা পর্যটনদের নিরাপত্তা দিতে থানা পুলিশ থেকে শুরু করে ফাঁড়ির পুলিশ সর্বদা কাজ করে চলেছে। ভোলাগঞ্জের পর্যটন অঞ্চলে আসা পর্যটকরা আমাদের অতিথি আমরা তাদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে দায়বদ্ধ।”