নিকিতা স্ম্যাগিন

রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ অর্থাৎ ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার সংঘাত থেকে বেশ কিছু বড় সুবিধা পেয়েছে। এরমধ্যে বিশেষভাবে বলতে হয়, তেলের চড়া দাম থেকে বাড়তি আয় এবং ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমা সামরিক সহায়তা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু এই সংঘাতের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো কার্যকর পথ রাশিয়ার হাতে না থাকায় ক্রেমলিন কিছুটা উদ্বিগ্ন।
তাই ইরানকে ড্রোন এবং যুদ্ধক্ষেত্রের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করার মাধ্যমে মস্কো এই সংঘাতে জড়ানোর সুযোগ খুঁজছে। এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করতে চায়, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি এটা অসম্ভব নয় যে, খোদ ক্রেমলিনের কাছেও এর কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। তবে এই মুহূর্তে রাশিয়ার জন্য সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মস্কো আপাতত শুধু এই সংঘাতে নিজের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বজায় রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই রুশ কর্মকর্তারা বলে আসছেন যে, তারা বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করতে আগ্রহী। কিন্তু তাদের এই প্রস্তাবে কেউ সাড়া দেয়নি।
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র স্বীকার করে নিয়েছেন যে, কোনো পক্ষই রাশিয়ার মধ্যস্থতা প্রয়োজন বলে মনে করছে না। শেষ পর্যন্ত শান্তি আলোচনার আয়োজক হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়া হয়েছে (বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে তুরস্ককে)।
এভাবে গুরুত্বহীন হয়ে পড়া ক্রেমলিনের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক, কারণ এই লড়াই সরাসরি ইরানের বুকে রাশিয়ার স্বার্থে আঘাত হেনেছে। ইসফাহান শহরে অবস্থিত রুশ কনস্যুলেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তেহরানের একটি রুশ অর্থোডক্স গির্জায় হামলা হয়েছে। এমনকি কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়া-ইরান বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র বন্দর আনজালিও ধ্বংস হয়ে গেছে।

তবে মস্কোর জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের চারটি হামলা। এই কেন্দ্রটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের কারিগরি সহায়তায় এবং রাশিয়ার তৈরি লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। এই বোমা হামলায় অন্তত একজন ইরানি কর্মচারী নিহত হয়েছেন এবং রাশিয়া তাদের প্রায় সব নাগরিককে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
গির্জা বা কনস্যুলেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিকে দুর্ভাগ্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, কিন্তু বুশেহর এবং বন্দর আনজালির ক্ষেত্রে তা বলা চলে না। বন্দর আনজালিতে বোমা হামলার পর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান সরাসরি রাশিয়ার অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষতি করছে।
পর্যবেক্ষকদের এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল চাইলে ইরান থেকে রাশিয়াকে পুরোপুরি হটিয়ে দিতে পারে, আর তার জবাবে রাশিয়ার হয়ত কড়া ভাষায় বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। রুশ নেতাদের কাছে এটা হবে খুবই অপমানজনক এবং বিপজ্জনক একটি উদাহরণ।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমাদের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন মধ্যপ্রাচ্য ক্রেমলিনের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এই অঞ্চলের দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের সব কথা অন্ধভাবে মেনে নেয় না এবং তারা এখনো রাশিয়াকে বড় শক্তি হিসেবে সম্মান করে। রাশিয়ার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ব্যবসাপাতি বেড়েছে, যাতায়াতের নতুন পথ তৈরির পরিকল্পনা হয়েছে এবং পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে কীভাবে একে অপরকে সাহায্য করা যায়, সেই চেষ্টাও চলছে। চীন ও রাশিয়া দ্রুত তৎপরতা বাড়াচ্ছে।
চলমান যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার সব পরিকল্পনা এখন হুমকির মুখে। ইরানে রাশিয়ার নর্থ সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর এবং বিশাল গ্যাস হাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে। এসব তো ঝুঁকিতে আছেই, সেইসঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশগুলোর সাথেও রাশিয়ার সম্পর্ক এখন ঝুঁকিতে। ২০২২ সাল থেকে আরব আমিরাতের সাথে রাশিয়ার বাণিজ্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। মাইক্রোচিপের মতো নিষিদ্ধ পণ্যগুলো আমিরাত হয়েই রাশিয়ায় পৌঁছায় এবং আমিরাতের ব্যাংকগুলো রাশিয়ার বৈদেশিক লেনদেনে সহায়তা করে। এখন এই সব সুবিধাই বন্ধ হওয়ার মুখে।
আসলে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার পুরো পররাষ্ট্রনীতিকেই তছনছ করে দিয়েছে। ফলে মস্কো বুঝতে পারছে যে, স্রেফ দর্শক হয়ে বসে না থেকে প্রভাব বজায় রাখার জন্য তাদের এখন নতুন কোনো পথ খুঁজে বের করতে হবে।
এই মুহূর্তে মস্কো ঠিক কতদূর যেতে প্রস্তুত, বিশেষ করে ইরান সরকারকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, ইরান ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা কমছে না বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।
প্রতিরক্ষা সম্পর্কের এক নতুন ধাপে পা রেখে গত মার্চ মাস থেকে রাশিয়া ইরানকে ‘গেরান’ ড্রোন (যা ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের আধুনিক সংস্করণ) সরবরাহ শুরু করেছে। ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া ইরানকে অ্যাটাক হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান এবং হালকা অস্ত্রের মতো বিভিন্ন যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়মিত সরবরাহ করে আসছে। এখন ড্রোন যুক্ত হওয়ায় এমন এক অস্ত্র ইরানের হাতে এল যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর ক্ষতি করতে সক্ষম। যদিও আগে রাশিয়া থেকে সু-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ভার্বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সরবরাহের একটি প্রাথমিক চুক্তি হয়েছিল, তবে ইরান সেগুলো হাতে পেয়েছে কি না তার কোনো নিশ্চিত খবর নেই।

ইরানি হামলাগুলোকে নির্ভুল করতে তেহরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যও শেয়ার করছে মস্কো। অবশ্য রাশিয়ার এই সহায়তার পরিধি আপাতত সীমিত। মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা উপসাগরীয় দেশগুলোকে খুব বেশি ক্ষ্যাপাতে চায় না মস্কো। তাই তারা খুব সাবধানে পা ফেলছে এবং দেখছে ঠিক কতটুকু সাহায্য করা তাদের জন্য নিরাপদ।
এই সব কিছুর বিনিময়ে রাশিয়ার বড় লাভ হলো চলমান এই সংঘাতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। এছাড়া, ইরান নিয়মিত ড্রোন হামলা চালালে যক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ইন্টারসেপ্টরগুলো খরচ করতে বাধ্য হবে। ফলে ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে অস্ত্রের মজুদ কমে আসবে।
ইরানকে সাহায্য করার এই বিষয়টি রাশিয়ার জন্য ভবিষ্যতে একটি বড় তুরুপের তাস হতে পারে। পলিটিকোর তথ্যমতে, মস্কো ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনকে প্রস্তাব দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যদি ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবে রাশিয়াও ইরানের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করা বন্ধ করে দেবে।
আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণ বেশ সীমিত। লড়াইয়ের ফলাফল বদলে দেওয়ার চেয়ে একে ভবিষ্যতের দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার একটি চেষ্টা হিসেবেই বেশি মনে হচ্ছে। এটা ঠিক যেভাবে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছিল সেরকম। অন্যভাবে বলতে গেলে, মস্কো এখন কেবল কিছু কৌশলগত সম্পদ বা তুরুপের তাস গুছিয়ে রাখছে। পরবর্তীতে সুবিধামতো সময়ে কীভাবে সেগুলোকে রাশিয়ার স্বার্থে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই সিদ্ধান্ত তারা ধীরেসুস্থেই নেবে।
নিকিতা স্মাগিন ইরানের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতি, ইসলামিজম, এবং মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার নীতির বিশেষজ্ঞ। তিনি ইরান ফর এভ্রিওয়ান: প্যরাডক্স অব লাইফ ইন অ্যান অটোক্রেসি আন্ডার স্যাংকশন বইটির রচয়িতা।
(লেখাটি কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসিতে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত।)

রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ অর্থাৎ ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার সংঘাত থেকে বেশ কিছু বড় সুবিধা পেয়েছে। এরমধ্যে বিশেষভাবে বলতে হয়, তেলের চড়া দাম থেকে বাড়তি আয় এবং ইউক্রেনের জন্য পশ্চিমা সামরিক সহায়তা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু এই সংঘাতের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো কার্যকর পথ রাশিয়ার হাতে না থাকায় ক্রেমলিন কিছুটা উদ্বিগ্ন।
তাই ইরানকে ড্রোন এবং যুদ্ধক্ষেত্রের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করার মাধ্যমে মস্কো এই সংঘাতে জড়ানোর সুযোগ খুঁজছে। এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করতে চায়, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি এটা অসম্ভব নয় যে, খোদ ক্রেমলিনের কাছেও এর কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। তবে এই মুহূর্তে রাশিয়ার জন্য সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মস্কো আপাতত শুধু এই সংঘাতে নিজের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বজায় রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই রুশ কর্মকর্তারা বলে আসছেন যে, তারা বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করতে আগ্রহী। কিন্তু তাদের এই প্রস্তাবে কেউ সাড়া দেয়নি।
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র স্বীকার করে নিয়েছেন যে, কোনো পক্ষই রাশিয়ার মধ্যস্থতা প্রয়োজন বলে মনে করছে না। শেষ পর্যন্ত শান্তি আলোচনার আয়োজক হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়া হয়েছে (বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে তুরস্ককে)।
এভাবে গুরুত্বহীন হয়ে পড়া ক্রেমলিনের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক, কারণ এই লড়াই সরাসরি ইরানের বুকে রাশিয়ার স্বার্থে আঘাত হেনেছে। ইসফাহান শহরে অবস্থিত রুশ কনস্যুলেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তেহরানের একটি রুশ অর্থোডক্স গির্জায় হামলা হয়েছে। এমনকি কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়া-ইরান বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র বন্দর আনজালিও ধ্বংস হয়ে গেছে।

তবে মস্কোর জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের চারটি হামলা। এই কেন্দ্রটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের কারিগরি সহায়তায় এবং রাশিয়ার তৈরি লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। এই বোমা হামলায় অন্তত একজন ইরানি কর্মচারী নিহত হয়েছেন এবং রাশিয়া তাদের প্রায় সব নাগরিককে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
গির্জা বা কনস্যুলেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিকে দুর্ভাগ্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, কিন্তু বুশেহর এবং বন্দর আনজালির ক্ষেত্রে তা বলা চলে না। বন্দর আনজালিতে বোমা হামলার পর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান সরাসরি রাশিয়ার অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষতি করছে।
পর্যবেক্ষকদের এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল চাইলে ইরান থেকে রাশিয়াকে পুরোপুরি হটিয়ে দিতে পারে, আর তার জবাবে রাশিয়ার হয়ত কড়া ভাষায় বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। রুশ নেতাদের কাছে এটা হবে খুবই অপমানজনক এবং বিপজ্জনক একটি উদাহরণ।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমাদের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন মধ্যপ্রাচ্য ক্রেমলিনের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এই অঞ্চলের দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের সব কথা অন্ধভাবে মেনে নেয় না এবং তারা এখনো রাশিয়াকে বড় শক্তি হিসেবে সম্মান করে। রাশিয়ার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ব্যবসাপাতি বেড়েছে, যাতায়াতের নতুন পথ তৈরির পরিকল্পনা হয়েছে এবং পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে কীভাবে একে অপরকে সাহায্য করা যায়, সেই চেষ্টাও চলছে। চীন ও রাশিয়া দ্রুত তৎপরতা বাড়াচ্ছে।
চলমান যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার সব পরিকল্পনা এখন হুমকির মুখে। ইরানে রাশিয়ার নর্থ সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর এবং বিশাল গ্যাস হাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে। এসব তো ঝুঁকিতে আছেই, সেইসঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশগুলোর সাথেও রাশিয়ার সম্পর্ক এখন ঝুঁকিতে। ২০২২ সাল থেকে আরব আমিরাতের সাথে রাশিয়ার বাণিজ্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। মাইক্রোচিপের মতো নিষিদ্ধ পণ্যগুলো আমিরাত হয়েই রাশিয়ায় পৌঁছায় এবং আমিরাতের ব্যাংকগুলো রাশিয়ার বৈদেশিক লেনদেনে সহায়তা করে। এখন এই সব সুবিধাই বন্ধ হওয়ার মুখে।
আসলে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার পুরো পররাষ্ট্রনীতিকেই তছনছ করে দিয়েছে। ফলে মস্কো বুঝতে পারছে যে, স্রেফ দর্শক হয়ে বসে না থেকে প্রভাব বজায় রাখার জন্য তাদের এখন নতুন কোনো পথ খুঁজে বের করতে হবে।
এই মুহূর্তে মস্কো ঠিক কতদূর যেতে প্রস্তুত, বিশেষ করে ইরান সরকারকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, ইরান ও রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা কমছে না বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।
প্রতিরক্ষা সম্পর্কের এক নতুন ধাপে পা রেখে গত মার্চ মাস থেকে রাশিয়া ইরানকে ‘গেরান’ ড্রোন (যা ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের আধুনিক সংস্করণ) সরবরাহ শুরু করেছে। ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া ইরানকে অ্যাটাক হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান এবং হালকা অস্ত্রের মতো বিভিন্ন যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়মিত সরবরাহ করে আসছে। এখন ড্রোন যুক্ত হওয়ায় এমন এক অস্ত্র ইরানের হাতে এল যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর ক্ষতি করতে সক্ষম। যদিও আগে রাশিয়া থেকে সু-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ভার্বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সরবরাহের একটি প্রাথমিক চুক্তি হয়েছিল, তবে ইরান সেগুলো হাতে পেয়েছে কি না তার কোনো নিশ্চিত খবর নেই।

ইরানি হামলাগুলোকে নির্ভুল করতে তেহরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যও শেয়ার করছে মস্কো। অবশ্য রাশিয়ার এই সহায়তার পরিধি আপাতত সীমিত। মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা উপসাগরীয় দেশগুলোকে খুব বেশি ক্ষ্যাপাতে চায় না মস্কো। তাই তারা খুব সাবধানে পা ফেলছে এবং দেখছে ঠিক কতটুকু সাহায্য করা তাদের জন্য নিরাপদ।
এই সব কিছুর বিনিময়ে রাশিয়ার বড় লাভ হলো চলমান এই সংঘাতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। এছাড়া, ইরান নিয়মিত ড্রোন হামলা চালালে যক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ইন্টারসেপ্টরগুলো খরচ করতে বাধ্য হবে। ফলে ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে অস্ত্রের মজুদ কমে আসবে।
ইরানকে সাহায্য করার এই বিষয়টি রাশিয়ার জন্য ভবিষ্যতে একটি বড় তুরুপের তাস হতে পারে। পলিটিকোর তথ্যমতে, মস্কো ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনকে প্রস্তাব দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যদি ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবে রাশিয়াও ইরানের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করা বন্ধ করে দেবে।
আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণ বেশ সীমিত। লড়াইয়ের ফলাফল বদলে দেওয়ার চেয়ে একে ভবিষ্যতের দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার একটি চেষ্টা হিসেবেই বেশি মনে হচ্ছে। এটা ঠিক যেভাবে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছিল সেরকম। অন্যভাবে বলতে গেলে, মস্কো এখন কেবল কিছু কৌশলগত সম্পদ বা তুরুপের তাস গুছিয়ে রাখছে। পরবর্তীতে সুবিধামতো সময়ে কীভাবে সেগুলোকে রাশিয়ার স্বার্থে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই সিদ্ধান্ত তারা ধীরেসুস্থেই নেবে।
নিকিতা স্মাগিন ইরানের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতি, ইসলামিজম, এবং মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার নীতির বিশেষজ্ঞ। তিনি ইরান ফর এভ্রিওয়ান: প্যরাডক্স অব লাইফ ইন অ্যান অটোক্রেসি আন্ডার স্যাংকশন বইটির রচয়িতা।
(লেখাটি কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসিতে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত।)

মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যেগুলো কেবল শারীরিক উপকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং সেগুলো মানবতার প্রতীক, সহমর্মিতার নিদর্শন এবং জীবনের ধারক হিসেবে বিবেচিত। রক্ত তার মধ্যে অন্যতম। রক্ত মানেই জীবন, রক্ত মানেই আশার আলো, রক্ত মানেই এক মানুষের জীবন অন্য মানুষের মাধ্যমে রক্ষা পাওয়ার এক অনন