ফরেন পলিসির নিবন্ধ
ফরিদ জাকারিয়া

ইতিহাসজুড়ে দেখা গেছে, সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর বন্ধু খুঁজে পেতে প্রায়ই বেগ পেতে হয়। কোনো রাষ্ট্র যখন প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তখন অন্যরা সাধারণত তার বিরুদ্ধে ভারসাম্য গড়ে তুলতে চায়। পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার প্রতিবেশীদের দিকে তাকান–বিশ্ব যখন সুযোগ দিল, তখনই দেশগুলো হুড়োহুড়ি করে ন্যাটোতে ঢুকে পড়ল। এশিয়ায় চীনের আশপাশের দেশগুলোর দিকেও তাকান–জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশ বেইজিংয়ের উত্থানের প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার সঙ্গে এবং নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা ক্রমাগত জোরদার করেছে।
কিন্তু এরপর আমেরিকার দিকে তাকালে এই তত্ত্বটা একটু ধাক্কা খায়।
আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। তবু বিশ্বের অনেক ধনী ও সক্ষম রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে ভারসাম্য গড়ে তোলে না, বরং তার সঙ্গেই জোট বাঁধে। তারা মূল নিরাপত্তা প্রশ্নে আমেরিকার ওপর নির্ভর করে। তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকে। নিজেদের সামরিক বাহিনীকে তারা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করে। আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘ ধারায় এটা স্বাভাবিক নয়। বরং বলা যায়, এটি প্রায় অনন্য।
কেন এমনটা হয়েছে? আমেরিকা নিষ্কলুষ বলেই নয়, বরং কারণ হলো, সে প্রথাগত কোনো আধিপত্যবাদীর মতো আচরণ করেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত আট দশক ধরে আমেরিকা সাধারণত তার শক্তিকে এমন কিছুর মধ্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা অন্যরা গ্রহণ করতে পারে–নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও বৈধতা। সে খাজনা-ভিত্তিক ব্যবস্থা নয়, জোট গড়েছে। আর প্রায়ই নীতির ভাষায় কথা বলেছে, সমষ্টিগত নিরাপত্তা, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, উন্মুক্ত বাণিজ্য–যদিও বাস্তবে সে সবসময় ওই মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।
আমেরিকার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রায়ই যে ঘটনার কথা বলা হয়, তা হলো ইরাক যুদ্ধ। আমি যুদ্ধটির যৌক্তিকতা তুল ধরছি না। আমি বড় একটি বিষয়ে আলোকপাত করছি, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি। জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন ২০০২ সালে কংগ্রেসের অনুমোদন চেয়েছিল এবং তা পেয়েছিল। তারা জাতিসংঘেও গিয়েছিল এবং নিরাপত্তা পরিষদের ১৪৪১ নম্বর প্রস্তাব আদায়ে ভূমিকা রেখেছিল। পাশাপাশি, তারা ৪৯টি দেশের একটি জোট গড়েছিল, যারা এই অভিযানে সমর্থন দিয়েছিল। ওয়াশিংটনের মনে হয়েছিল, তাদের যুক্তি তুলে ধরতেই হবে, অংশীদার জোগাড় করতেই হবে, এমন ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে যা অন্যদের কাছেও গ্রহণযোগ্য।
শক্তিকে বৈধতায় রূপ দেওয়ার এই প্রচেষ্টাই ছিল আমেরিকার প্রাধান্যের অদৃশ্য স্তম্ভ। আমেরিকা যখন চাঁদাবাজের মতো নয়, বরং নিয়মপ্রণেতার মতো আচরণ করে, তখন সে ভয়ের চেয়েও মূল্যবান কিছু অর্জন করে–সম্মতি। এই সম্মতিই আধিপত্যকে নেতৃত্বে রূপ দেয়, আর নেতৃত্বকে এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত করে, যা অন্য রাষ্ট্রগুলো বেশি পছন্দ করে। এটাই সেই উপাদান, যা ভারসাম্য গড়ে তোলার প্রবণতাকে দমিয়ে রাখে।
আর ভেনেজুয়েলার ঘটনাই এখন ঠিক এই জায়গাটাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সমস্যা শুধু নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযান নয়; বরং আইন, নীতি, জোট ও কূটনীতির প্রতি চরম অবজ্ঞা, যা আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে এক স্পষ্ট লংঘনকে চিহ্নিত করছে।
সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার সোজাসাপটা বলেন, “আমেরিকাই ভেনেজুয়েলা চালাচ্ছে,”। তিনি ‘আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার’ উড়িয়ে জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব চলে ‘শক্তি…বলপ্রয়োগ… ক্ষমতা’–এই নিয়মে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, একটি ‘রূপান্তর’ না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকা ভেনেজুয়েলা চালাবে এবং তার তেল নেবে। এটি ছিল আমেরিকার কোষাগারের স্বার্থে করা এক নগ্ন আগ্রাসন।
আপনি যদি কানাডিয়ান, জার্মান, দক্ষিণ কোরীয় বা মেক্সিকান হন, মিলারের কথায় শিউরে ওঠারই কথা। এই ভয়ে নয় যে আমেরিকা অটোয়া বা বার্লিনে হামলা করতে যাচ্ছে, বরং এই কারণে যে যুক্তির কাঠামোটাই বদলে গেছে। এখন আর বলা হচ্ছে না যে আমেরিকার শক্তি এমন নীতির সেবায় ব্যবহৃত হয়, যা অন্যরা গ্রহণ করতে পারে–গণতন্ত্র, সমষ্টিগত নিরাপত্তা, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। এখন বলা হচ্ছে, শক্তি মানেই অধিকার। যে পারে, সে-ই শাসন করবে। আর ঠিক এই ধরনের মহাশক্তির আচরণই প্রতিবেশীদের নার্ভাস করে তোলে।
ট্রাম্প এই অভিযানের পক্ষে যুক্তি দেখাতে মনরো নীতির কথা বলেছেন। মনে রাখা দরকার, ১৮২৩ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে মনরো নীতিকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হিসেবেই দেখা হতো–এর লক্ষ্য ছিল পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী হস্তক্ষেপ ঠেকানো। পরে, বিশেষ করে ১৯০৪ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের সংযোজনের পর, এই নীতিই লাতিন আমেরিকাজুড়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের লাইসেন্সে পরিণত হয়। সেই সাম্রাজ্যবাদী পর্ব খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং অঞ্চলটির জন্যও, আমেরিকার সুনামের জন্যও, ভালোভাবে শেষ হয়নি।
গত চার দশকে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা মিলে এই অঞ্চলের জন্য এক নতুন দ্বিদলীয় কৌশল গড়ে তুলেছিলেন। এতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে সামরিক জান্তা থেকে সরে এসে গণতন্ত্রের পথে এগোতে উৎসাহ দেওয়া হয়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো হয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সহায়তা করা হয় এবং মাদক ও অভিবাসন সমস্যায় সহযোগিতা করা হয়। মেক্সিকো এই পরিবর্তনের প্রতীক। যে দেশ একসময় ওয়াশিংটনের প্রতি গভীর সন্দেহে ভরা ছিল, সেটিই পরে আমেরিকার অন্যতম ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। (এবং একবিংশ শতাব্দীর বড় অংশজুড়ে আমেরিকায় মেক্সিকানদের নিট অভিবাসন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল।)
দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা এই কৌশলগত পুঁজি এখন নষ্ট করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে, যে আমেরিকা বিশ্বমঞ্চে কেবলমাত্র স্বার্থপর শিকারির মতো আচরণ করবে, সে আরও শক্তিশালী হবে না; সে আরও একা হয়ে পড়বে। মিত্ররা বিকল্প খুঁজবে। অংশীদাররা দূরত্ব রাখবে। নিরপেক্ষরা ধীরে ধীরে সরে যাবে। আর ইতিহাস যে ভারসাম্য সৃষ্টির কথা বলেছিল, তা হয়তো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িতই হবে–আমেরিকা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে নয়, বরং সে তার প্রকৃত শক্তির উৎসটাই ভুলে গেছে বলে।
ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য যেন আমেরিকাকে পুতিনের রাশিয়ার মতো বানানো–একটি আক্রমণাত্মক রাষ্ট্র, যা খোলাখুলিভাবে নিজের স্বার্থই অনুসরণ করে। মিলার ঠিকই বলেছেন, ইতিহাসের বড় অংশজুড়ে শক্তিশালীরা এমনভাবেই আচরণ করেছে। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল আমেরিকা। বহু ভুল ও টানাপোড়েন সত্ত্বেও, আমেরিকা গত আট দশক ধরে এক ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছে এবং এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেটিকে এখন বেপরোয়াভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
[এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ওয়াশিংটন পোস্ট-এ এবং ফারিদ জাকারিয়ার লেখার নিয়মিত সিন্ডিকেশনের অংশ হিসেবে তা ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত। এখানে ফরেন পলিসির সৌজন্যে প্রকাশ করা হলো।]

ইতিহাসজুড়ে দেখা গেছে, সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর বন্ধু খুঁজে পেতে প্রায়ই বেগ পেতে হয়। কোনো রাষ্ট্র যখন প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তখন অন্যরা সাধারণত তার বিরুদ্ধে ভারসাম্য গড়ে তুলতে চায়। পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার প্রতিবেশীদের দিকে তাকান–বিশ্ব যখন সুযোগ দিল, তখনই দেশগুলো হুড়োহুড়ি করে ন্যাটোতে ঢুকে পড়ল। এশিয়ায় চীনের আশপাশের দেশগুলোর দিকেও তাকান–জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশ বেইজিংয়ের উত্থানের প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার সঙ্গে এবং নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা ক্রমাগত জোরদার করেছে।
কিন্তু এরপর আমেরিকার দিকে তাকালে এই তত্ত্বটা একটু ধাক্কা খায়।
আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। তবু বিশ্বের অনেক ধনী ও সক্ষম রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে ভারসাম্য গড়ে তোলে না, বরং তার সঙ্গেই জোট বাঁধে। তারা মূল নিরাপত্তা প্রশ্নে আমেরিকার ওপর নির্ভর করে। তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকে। নিজেদের সামরিক বাহিনীকে তারা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করে। আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘ ধারায় এটা স্বাভাবিক নয়। বরং বলা যায়, এটি প্রায় অনন্য।
কেন এমনটা হয়েছে? আমেরিকা নিষ্কলুষ বলেই নয়, বরং কারণ হলো, সে প্রথাগত কোনো আধিপত্যবাদীর মতো আচরণ করেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত আট দশক ধরে আমেরিকা সাধারণত তার শক্তিকে এমন কিছুর মধ্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা অন্যরা গ্রহণ করতে পারে–নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও বৈধতা। সে খাজনা-ভিত্তিক ব্যবস্থা নয়, জোট গড়েছে। আর প্রায়ই নীতির ভাষায় কথা বলেছে, সমষ্টিগত নিরাপত্তা, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, উন্মুক্ত বাণিজ্য–যদিও বাস্তবে সে সবসময় ওই মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারেনি।
আমেরিকার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রায়ই যে ঘটনার কথা বলা হয়, তা হলো ইরাক যুদ্ধ। আমি যুদ্ধটির যৌক্তিকতা তুল ধরছি না। আমি বড় একটি বিষয়ে আলোকপাত করছি, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি। জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন ২০০২ সালে কংগ্রেসের অনুমোদন চেয়েছিল এবং তা পেয়েছিল। তারা জাতিসংঘেও গিয়েছিল এবং নিরাপত্তা পরিষদের ১৪৪১ নম্বর প্রস্তাব আদায়ে ভূমিকা রেখেছিল। পাশাপাশি, তারা ৪৯টি দেশের একটি জোট গড়েছিল, যারা এই অভিযানে সমর্থন দিয়েছিল। ওয়াশিংটনের মনে হয়েছিল, তাদের যুক্তি তুলে ধরতেই হবে, অংশীদার জোগাড় করতেই হবে, এমন ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে যা অন্যদের কাছেও গ্রহণযোগ্য।
শক্তিকে বৈধতায় রূপ দেওয়ার এই প্রচেষ্টাই ছিল আমেরিকার প্রাধান্যের অদৃশ্য স্তম্ভ। আমেরিকা যখন চাঁদাবাজের মতো নয়, বরং নিয়মপ্রণেতার মতো আচরণ করে, তখন সে ভয়ের চেয়েও মূল্যবান কিছু অর্জন করে–সম্মতি। এই সম্মতিই আধিপত্যকে নেতৃত্বে রূপ দেয়, আর নেতৃত্বকে এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত করে, যা অন্য রাষ্ট্রগুলো বেশি পছন্দ করে। এটাই সেই উপাদান, যা ভারসাম্য গড়ে তোলার প্রবণতাকে দমিয়ে রাখে।
আর ভেনেজুয়েলার ঘটনাই এখন ঠিক এই জায়গাটাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সমস্যা শুধু নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযান নয়; বরং আইন, নীতি, জোট ও কূটনীতির প্রতি চরম অবজ্ঞা, যা আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে এক স্পষ্ট লংঘনকে চিহ্নিত করছে।
সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার সোজাসাপটা বলেন, “আমেরিকাই ভেনেজুয়েলা চালাচ্ছে,”। তিনি ‘আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার’ উড়িয়ে জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব চলে ‘শক্তি…বলপ্রয়োগ… ক্ষমতা’–এই নিয়মে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, একটি ‘রূপান্তর’ না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকা ভেনেজুয়েলা চালাবে এবং তার তেল নেবে। এটি ছিল আমেরিকার কোষাগারের স্বার্থে করা এক নগ্ন আগ্রাসন।
আপনি যদি কানাডিয়ান, জার্মান, দক্ষিণ কোরীয় বা মেক্সিকান হন, মিলারের কথায় শিউরে ওঠারই কথা। এই ভয়ে নয় যে আমেরিকা অটোয়া বা বার্লিনে হামলা করতে যাচ্ছে, বরং এই কারণে যে যুক্তির কাঠামোটাই বদলে গেছে। এখন আর বলা হচ্ছে না যে আমেরিকার শক্তি এমন নীতির সেবায় ব্যবহৃত হয়, যা অন্যরা গ্রহণ করতে পারে–গণতন্ত্র, সমষ্টিগত নিরাপত্তা, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। এখন বলা হচ্ছে, শক্তি মানেই অধিকার। যে পারে, সে-ই শাসন করবে। আর ঠিক এই ধরনের মহাশক্তির আচরণই প্রতিবেশীদের নার্ভাস করে তোলে।
ট্রাম্প এই অভিযানের পক্ষে যুক্তি দেখাতে মনরো নীতির কথা বলেছেন। মনে রাখা দরকার, ১৮২৩ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে মনরো নীতিকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হিসেবেই দেখা হতো–এর লক্ষ্য ছিল পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী হস্তক্ষেপ ঠেকানো। পরে, বিশেষ করে ১৯০৪ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের সংযোজনের পর, এই নীতিই লাতিন আমেরিকাজুড়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের লাইসেন্সে পরিণত হয়। সেই সাম্রাজ্যবাদী পর্ব খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং অঞ্চলটির জন্যও, আমেরিকার সুনামের জন্যও, ভালোভাবে শেষ হয়নি।
গত চার দশকে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা মিলে এই অঞ্চলের জন্য এক নতুন দ্বিদলীয় কৌশল গড়ে তুলেছিলেন। এতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে সামরিক জান্তা থেকে সরে এসে গণতন্ত্রের পথে এগোতে উৎসাহ দেওয়া হয়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো হয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সহায়তা করা হয় এবং মাদক ও অভিবাসন সমস্যায় সহযোগিতা করা হয়। মেক্সিকো এই পরিবর্তনের প্রতীক। যে দেশ একসময় ওয়াশিংটনের প্রতি গভীর সন্দেহে ভরা ছিল, সেটিই পরে আমেরিকার অন্যতম ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। (এবং একবিংশ শতাব্দীর বড় অংশজুড়ে আমেরিকায় মেক্সিকানদের নিট অভিবাসন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল।)
দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা এই কৌশলগত পুঁজি এখন নষ্ট করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে, যে আমেরিকা বিশ্বমঞ্চে কেবলমাত্র স্বার্থপর শিকারির মতো আচরণ করবে, সে আরও শক্তিশালী হবে না; সে আরও একা হয়ে পড়বে। মিত্ররা বিকল্প খুঁজবে। অংশীদাররা দূরত্ব রাখবে। নিরপেক্ষরা ধীরে ধীরে সরে যাবে। আর ইতিহাস যে ভারসাম্য সৃষ্টির কথা বলেছিল, তা হয়তো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িতই হবে–আমেরিকা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে নয়, বরং সে তার প্রকৃত শক্তির উৎসটাই ভুলে গেছে বলে।
ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য যেন আমেরিকাকে পুতিনের রাশিয়ার মতো বানানো–একটি আক্রমণাত্মক রাষ্ট্র, যা খোলাখুলিভাবে নিজের স্বার্থই অনুসরণ করে। মিলার ঠিকই বলেছেন, ইতিহাসের বড় অংশজুড়ে শক্তিশালীরা এমনভাবেই আচরণ করেছে। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল আমেরিকা। বহু ভুল ও টানাপোড়েন সত্ত্বেও, আমেরিকা গত আট দশক ধরে এক ভিন্ন পথ অনুসরণ করেছে এবং এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেটিকে এখন বেপরোয়াভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
[এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ওয়াশিংটন পোস্ট-এ এবং ফারিদ জাকারিয়ার লেখার নিয়মিত সিন্ডিকেশনের অংশ হিসেবে তা ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত। এখানে ফরেন পলিসির সৌজন্যে প্রকাশ করা হলো।]

ভেনেজুয়েলার প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নীতির কৌশলগত যৌক্তিকতা নিয়ে আপনি যদি বিভ্রান্ত বোধ করেন, তবে আপনাকে দোষ দেওয়া যায় না। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সাম্প্রতিক ‘অপহরণের’বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব যুক্তি দেওয়া হয়েছে তার বেশিরভাগই হাস্যকর।