রুদাবেহ শহীদ

২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচনী মৌসুমের কোনো মূল ভিত্তি যদি থাকে, তবে সেটি হলো ১২ ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশের নির্বাচন। ঢাকায় যখন নির্বাচনী প্রচারণার পারদ তুঙ্গে, তখন এই ভোটের ফলাফল অন্য কোথাও কোনো ভোটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফল নির্ধারণ না করলেও, এটি পরবর্তী তিনটি নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই নির্বাচনগুলো হলো–৫ মার্চের নেপালের সাধারণ নির্বাচন এবং মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধানসভা নির্বাচন।
দক্ষিণ এশিয়ায় এখনকার নির্বাচনী ফলাফলগুলোতে ‘ন্যারেটিভ’ যেহেতু ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। তাই এই তালিকায় প্রথমে বাংলাদেশে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়াটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
এটি সত্যি যে, বাংলাদেশের এই সাধারণ নির্বাচন এমন সব ঘটনায় পরিপূর্ণ, যা সমগ্র অঞ্চলের জন্য প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। আন্দোলনটি ছিল সেই সময়ের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া জেন-জিদের বিক্ষোভগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া এই ভোট এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন সামাজিক বিভাজন ও ধর্মীয় চরমপন্থা বাড়ছে এবং অর্থনীতি ধুঁকছে। প্রতিটি প্রবণতাই বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিরা প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক গতিপথের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হলে তা রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের চেয়ে বরং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় ক্ষমতার বলয়ের টিকে থাকার বার্তাই দেবে। এমন ফলাফল প্রমাণ করবে যে, প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন দলের পতন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে ক্ষমতার চাকা সেই পুরোনো অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে কিন না।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর উত্থান অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ধর্মীয় জাগরণের নির্বাচনী প্রভাবকেই স্পষ্ট করবে, যা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে ইসলামপন্থী শক্তির স্বাভাবিকীকরণের বিষয়ে আঞ্চলিক উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে। অপরদিকে, জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) শক্ত অবস্থান ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের উত্তরাধিকারকেই প্রতিধ্বনিত করবে। যা বোঝায় যে, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ও নতুন প্রজন্মের রাজনীতি রাজপথের আন্দোলন ছাপিয়ে এখন একটি কার্যকর নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তর হচ্ছে।

বাংলাদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয় এবং ক্ষমতার বণ্টন কীভাবে ঘটে–তা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, ভোটার সমাবেশ এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা সম্পর্কিত ধারণাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।
বাংলাদেশের নির্বাচন নেপালের জন্য সতর্কবার্তা
মার্চের শুরুতে নেপালেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশটি সম্প্রতি এক অস্থির সময় পার করেছে। সেখানে জেন-জির নেতৃত্বে গণজাগরণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক ক্ষোভ এবং প্রতিষ্ঠান-বিরোধী শক্তির উত্থান দেখা গেছে। এই দিক থেকে নেপালের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণদের এক অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। এটি মোটেও কাকতালীয় নয়; উভয় দেশেরই মানুষের গড় বয়স প্রায় আঠাশ, যা তাদের একই জনতাত্ত্বিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
নেপাল এবং বাংলাদেশ, উভয় দেশেই তরুণ নেতৃত্বাধীন যে প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো সাবেক শাসনের পতনে ভূমিকা রেখেছিল। তার মূলে ছিল একই ধরণের বিস্ফোরক ‘ঘটনা’র মিশ্রণ। ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতি যা ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে; দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষিত বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাব; জনতাত্ত্বিক স্ফীতির সাথে তাল মেলাতে না পারা চাকরির বাজার; এবং দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতান্ত্রিক বা পৃষ্ঠপোষকতা-ভিত্তিক রাজনীতির প্রতি গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে।
উভয় দেশে শক্তিশালী যুব আন্দোলন চললেও বর্তমানে তা গভীরভাবে প্রোথিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাধার মুখে পড়ছে। পুরোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রভাব এখনো বেশ শক্তিশালী। নেপালে প্রার্থীরা প্রায়ই সরকারি সীমার বাইরে গিয়ে দুই কোটি নেপালি রুপি (প্রায় দেড় লাখ ডলার) বা তারও বেশি ‘অফিসিয়াল’ বহির্ভূত খরচ করেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশে স্থানীয় পেশিশক্তি ও জনবল সংগঠিত করতে প্রার্থীরা প্রায়ই আইনি সীমার চেয়ে ১২ গুণ বেশি ব্যয় করেন। এমন উচ্চ নির্বাচনী ব্যয় এবং প্রতিষ্ঠিত দলীয় অভিজাতদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাজনীতির ময়দানকে এখনো তাদের অনুকূলেই রাখছে। যদিও বাংলাদেশে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এবং নেপালে ‘উজ্জ্বালো নেপাল পার্টি’র মতো নতুন ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ও সংস্কারবাদী দলগুলো এই স্থবিরতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কি সত্যিই এই স্বার্থান্বেষী চক্র ভাঙতে পারবে, নাকি একদল ক্ষমতাধরকে সরিয়ে অন্য একদলকে বসাবে-সেটিই এখন এই অঞ্চলের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রধান প্রশ্ন।
তবে এখানে একটি পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের তুলনায় নেপালের নির্বাচন এখনো ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণমূলক। সেখানে কোনো দলকেই ব্যালট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়নি কিংবা প্রশাসনিক আদেশে কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি। বিপরীতে বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসন করা আওয়ামী লীগকে কার্যকরভাবে নির্বাচনে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনকে মৌলিকভাবে ভিন্ন চারিত্রিক রূপ দিয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক উল্লেখ করেছেন যে, নেপালের উন্মুক্ত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার তুলনায় বাংলাদেশের নির্বাচন পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়।
এই পার্থক্য নেপালের জেন-জি আন্দোলনগুলোকে রাজপথের বিদ্রোহ থেকে সরাসরি নির্বাচনী অংশগ্রহণে রূপান্তরের সুযোগ করে দিয়েছে। নেপালি রাজনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই একটি ‘নেতিবাচক উদাহরণ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি দেখাচ্ছে যে, যখন একটি প্রভাবশালী দলকে ব্যালট বাক্সে পরাজিত না করে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন প্রতিবাদী আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া উত্তরণ নতুন সংস্কারের বদলে ‘বর্জনমূলক’ পথে মোড় নিতে পারে।
এই বৈসাদৃশ্যটি হয়তো নেপালের নির্বাচনী প্রচারণায় সরাসরি প্রাধান্য পাবে না। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন যদি সীমাবদ্ধ বা কেবল বাছাইকৃত প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে নেপালের রাজনৈতিক অভিজাতরা তাদের দেশের অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও একটি গর্বের জায়গা খুঁজে পাবেন। তারা বলতে পারবেন যে, বাংলাদেশের যা নেই, নেপালের তা আছে। একটি বহুদলীয় নির্বাচনী ময়দান আছে, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সমাধান করা হয়।
এই পার্থক্যটি নেপালিদের বৈধতা, সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিয়ে বিতর্কের ধরণকেও প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন বাংলাদেশের এই ভোট অন্তর্বর্তী সরকার-সমর্থিত সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর এক প্রকার গণভোট হিসেবেও কাজ করছে।
সীমান্ত সংঘাত পশ্চিমবঙ্গের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; বরং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এটি একটি কেন্দ্রীয় ‘রেফারেন্স পয়েন্ট’।
ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদেরকে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিস্তার ঠেকানোর শেষ ‘পূর্বাঞ্চলীয় দুর্গ’ হিসেবে তুলে ধরছে। কৌশলটি আগেও নির্বাচনে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গকে তাদের পরবর্তী টার্গেট বা জয়ের দুর্গ হিসেবে দেখছে এবং এই লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশকে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ কোনো বৈদেশিক নীতির উদ্বেগের চেয়েও বেশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি মাধ্যম বা প্রক্সি হিসেবে কাজ করে, যার মধ্য দিয়ে নাগরিকত্ব, জনমিতি এবং জাতীয়তার লড়াই চলে।
বিজেপির কাছে বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি আন্তঃসীমান্ত ইতিহাসকে ছাপিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং জনমিতিক হুমকির একটি আখ্যানে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সরাসরি দেশের মুসলিম সংখ্যালঘুদের নাম না নিয়েও দলটি পশ্চিমবঙ্গকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক সংহতির একটি জাতীয় প্রকল্পের পরবর্তী ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে।
বিপরীতে, তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির এই বাগাড়ম্বরকে একটি ‘বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া চিন্তা’ হিসেবে দেখছে, যা এই অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো বুঝতে ব্যর্থ এবং যা সাধারণ বাঙালিদের জীবনের বিরুদ্ধে নথিপত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এভাবেই বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে ভারতের জাতীয়তাবাদ, কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব এবং নাগরিকত্ব নিয়ে পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর লড়াই চলছে।
দুটি সাম্প্রতিক ঘটনা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রথমটি হলো পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর)। ভারতের নির্বাচন কমিশন একে সাধারণ প্রশাসনিক পরিচ্ছন্নতা বললেও এটি দ্রুত রাজনৈতিক বারুদে পরিণত হয়েছে। বিরোধী নেতাদের দাবি, এটি মুসলিম এবং অভিবাসী বংশোদ্ভূত ভোটারদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে লক্ষ্যবস্তু করছে; অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, অবৈধ ভোট ঠেকাতে এটি প্রয়োজনীয়।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো অনুপ্রবেশ-বিরোধী প্রচারণার তীব্রতা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতারা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার বানানোর’ অভিযোগ এনেছেন। দাবিটি এখন সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের সাথে যুক্ত যেকোনো অস্থিরতা বা সহিংসতা সরাসরি বাংলার নির্বাচনী প্রচারণাকে প্রভাবিত করবে। এটি এই ধারণাকেই আরও জোরালো করবে যে, সীমান্ত শাসন এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা একে অপরের থেকে অবিচ্ছেদ্য।
তৃণমূলের জন্য এটি দুটি ফ্রন্টে একটি আত্মরক্ষামূলক লড়াই। একদিকে একে বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অভিভাবক হিসেবে ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গকে জনমিতিক বিশৃঙ্খলার রাজ্য হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগগুলো খণ্ডন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের নির্বাচন এই বিতর্কে প্রতিদিন নতুন নতুন রাজনৈতিক রসদ যোগাবে।
পূর্ব দিকে দৃষ্টি
বাংলাদেশের প্রভাব যদি পশ্চিমবঙ্গের জন্য রূপক বা প্রতীকী হয়, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের জন্য এটি ঐতিহাসিক এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
আসামের রাজনীতিতে জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক অধিকার এবং জনমিতিক টিকে থাকার লড়াইয়ের বিতর্কে বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরেই একটি প্রধান অনুষঙ্গ। বর্তমান নির্বাচন চক্রের অনেক আগে থেকেই আসামের রাজনীতি এক ধরণের আশঙ্কায় আচ্ছন্ন। আর তা হলো উন্মুক্ত বা অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে আসা অভিবাসনের ফলে আসামের নিজস্ব সংস্কৃতির বিলুপ্তি এবং রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ার ভয়।
এই উদ্বেগগুলোই এক সময় ‘আসাম আন্দোলন’-এর মতো গণসংগ্রামের রূপ নিয়েছিল, যা আজও রাজ্যটির রাজনৈতিক চেতনা থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। এর ওপর, আসাম ভারতের ঐতিহাসিকভাবে অশান্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত, যার সীমান্ত চীন, মিয়ানমার, ভুটান, নেপাল এবং বাংলাদেশের সাথে যুক্ত এবং সেখানে অনেক জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে স্বায়ত্তশাসন বা বিচ্ছিন্নতার দাবি জানিয়ে আসছে।
দশকের পর দশক ধরে আসামের ভোটাররা রাজনীতিকে ‘জনমিতিক উদ্বেগ’-এর চশমা দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। সেখানে মূল প্রশ্ন হলো- কারা প্রকৃত আদিবাসী, কাদের ভোটাধিকার আছে এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের এই আশঙ্কার মাঝে অসমীয়া সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য টিকে থাকবে কি না। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের হাই-স্টেক বা অতিগুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন কোনো দূরবর্তী বিদেশের খবর নয়। বরং এটি অভিবাসন প্রবাহ, জনসংখ্যার ভারসাম্য এবং অসমীয়া রাজনৈতিক কর্তৃত্বের স্থায়িত্ব নিয়ে চলা নানা আলোচনার একটি আসন্ন সংকেত। আসামের নির্বাচনী প্রতিযোগিতা জাতিগত পরিচয় এবং ঐতিহাসিক ক্ষোভের সাথে গভীরভাবে জড়িত, যেখানে প্রতিটি নির্বাচনকে দেখা হয় একটি বিচার হিসেবে- জনমিতিক পরিবর্তনকে কি সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, নাকি নীরবে রাজ্যটির ভোল বদলে দিতে দেওয়া হচ্ছে?
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার এই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে উসকে দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রসঙ্গের সঙ্গে আসামের জনমিতিক ভবিষ্যৎ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং শিলিগুড়ি করিডোরের (যাকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগকারী ‘চিকেন’স নেক’ বলা হয়) নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টি যুক্ত করেছেন।
এই নির্বাচনের মৌসুমে ভৌগোলিক অবস্থানই রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের ফলাফলকে একটি প্রশ্নের উত্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে: অভিবাসন, পরিচয় এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের ভয়গুলো কি সত্য প্রমাণিত হবে, নাকি তা প্রশমিত হবে? সেখানে বিএনপির বিজয় একটি পরিচিত পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির সংকেত দেবে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে যুক্ত নেটওয়ার্কগুলোর প্রতি তাদের কথিত নমনীয়তা বা অস্পষ্ট অবস্থানের কারণে। বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী উত্থান একটি শক্তিশালী ‘ইসলামপন্থী অ্যাজেন্ডা’ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াবে, যা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ককে আরও তীব্র করবে।
‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ এবং ভারতের আধিপত্যবাদী প্রভাব
এই সবকিছুর পর ঝুলে আছে হাসিনাকে নিয়ে ওঠা অমীমাংসিত প্রশ্ন। কয়েক সপ্তাহের সহিংস অস্থিরতার ফলে পনের বছরের শাসনের অবসান হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারতে নির্বাসনে আছেন। তার সেখানকার অবস্থান এখনো রাজনৈতিকভাবে অনুঘটকের কাজ করছে। ঢাকা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানো অনুরোধ করেছিল। গত বছরের নভেম্বরে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়ার এই দাবি তীব্র আকার ধারণ করে। নয়াদিল্লি তাদের অবস্থান থেকে নড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
যেসব তরুণ বাংলাদেশি অ্যাক্টিভিস্টদের কারণে ২০২৪ এর অভ্যুত্থান হয়েছিল, তারা দাবি করছে পুরোনো শাসনব্যবস্থা বাইরের সমর্থনে টিকে আছে। একই সময়ে, ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা, দিল্লির নিরপেক্ষ অবস্থানের দাবিকে জটিল করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষিতে ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও নেপালের আসন্ন নির্বাচনে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। পশ্চিমবঙ্গে, এটি বিজেপির দাবিকে আরও জোরালো করে যে, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্য শক্তিশালী জাতীয় তদারকি প্রয়োজন। আসামে, এটি এই বক্তব্যকে আরও জোরদার করে যে, নিরাপত্তা হুমকি কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিহত করতে হবে।
নেপালের জন্য এটি একটি সতর্কতামূলক দৃষ্টান্ত যে, কীভাবে একটি আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি অনিবার্যভাবে তার প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সেই সন্ধিক্ষণগুলোতে, যা প্রতিষ্ঠিত ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করে।
সামগ্রিকভাবে, আসন্ন এই নির্বাচনগুলো এটিই তুলে ধরে যে, কীভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক বয়ান বা ‘ন্যারেটিভ’ সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে স্থানীয় অর্থ ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেবল এর অভ্যন্তরীণ ফলাফলের নিরিখে নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলে এটি কী বার্তা দিচ্ছে বা কী তাৎপর্য বহন করছে, সে আলোকেও বোঝা প্রয়োজন।
লেখক: আটলান্টিক কাউন্সিলের সাউথ এশিয়া সেন্টারের সিনিয়র ফেলো এবং ওয়েজলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক

২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচনী মৌসুমের কোনো মূল ভিত্তি যদি থাকে, তবে সেটি হলো ১২ ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশের নির্বাচন। ঢাকায় যখন নির্বাচনী প্রচারণার পারদ তুঙ্গে, তখন এই ভোটের ফলাফল অন্য কোথাও কোনো ভোটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফল নির্ধারণ না করলেও, এটি পরবর্তী তিনটি নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই নির্বাচনগুলো হলো–৫ মার্চের নেপালের সাধারণ নির্বাচন এবং মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধানসভা নির্বাচন।
দক্ষিণ এশিয়ায় এখনকার নির্বাচনী ফলাফলগুলোতে ‘ন্যারেটিভ’ যেহেতু ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। তাই এই তালিকায় প্রথমে বাংলাদেশে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়াটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
এটি সত্যি যে, বাংলাদেশের এই সাধারণ নির্বাচন এমন সব ঘটনায় পরিপূর্ণ, যা সমগ্র অঞ্চলের জন্য প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। আন্দোলনটি ছিল সেই সময়ের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া জেন-জিদের বিক্ষোভগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া এই ভোট এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন সামাজিক বিভাজন ও ধর্মীয় চরমপন্থা বাড়ছে এবং অর্থনীতি ধুঁকছে। প্রতিটি প্রবণতাই বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিরা প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক গতিপথের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হলে তা রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের চেয়ে বরং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় ক্ষমতার বলয়ের টিকে থাকার বার্তাই দেবে। এমন ফলাফল প্রমাণ করবে যে, প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন দলের পতন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে ক্ষমতার চাকা সেই পুরোনো অভিজাত শ্রেণির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে কিন না।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর উত্থান অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ধর্মীয় জাগরণের নির্বাচনী প্রভাবকেই স্পষ্ট করবে, যা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে ইসলামপন্থী শক্তির স্বাভাবিকীকরণের বিষয়ে আঞ্চলিক উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে। অপরদিকে, জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) শক্ত অবস্থান ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের উত্তরাধিকারকেই প্রতিধ্বনিত করবে। যা বোঝায় যে, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ও নতুন প্রজন্মের রাজনীতি রাজপথের আন্দোলন ছাপিয়ে এখন একটি কার্যকর নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তর হচ্ছে।

বাংলাদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয় এবং ক্ষমতার বণ্টন কীভাবে ঘটে–তা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, ভোটার সমাবেশ এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা সম্পর্কিত ধারণাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।
বাংলাদেশের নির্বাচন নেপালের জন্য সতর্কবার্তা
মার্চের শুরুতে নেপালেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশটি সম্প্রতি এক অস্থির সময় পার করেছে। সেখানে জেন-জির নেতৃত্বে গণজাগরণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক ক্ষোভ এবং প্রতিষ্ঠান-বিরোধী শক্তির উত্থান দেখা গেছে। এই দিক থেকে নেপালের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণদের এক অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। এটি মোটেও কাকতালীয় নয়; উভয় দেশেরই মানুষের গড় বয়স প্রায় আঠাশ, যা তাদের একই জনতাত্ত্বিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
নেপাল এবং বাংলাদেশ, উভয় দেশেই তরুণ নেতৃত্বাধীন যে প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো সাবেক শাসনের পতনে ভূমিকা রেখেছিল। তার মূলে ছিল একই ধরণের বিস্ফোরক ‘ঘটনা’র মিশ্রণ। ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতি যা ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে; দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষিত বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাব; জনতাত্ত্বিক স্ফীতির সাথে তাল মেলাতে না পারা চাকরির বাজার; এবং দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতান্ত্রিক বা পৃষ্ঠপোষকতা-ভিত্তিক রাজনীতির প্রতি গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে।
উভয় দেশে শক্তিশালী যুব আন্দোলন চললেও বর্তমানে তা গভীরভাবে প্রোথিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাধার মুখে পড়ছে। পুরোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রভাব এখনো বেশ শক্তিশালী। নেপালে প্রার্থীরা প্রায়ই সরকারি সীমার বাইরে গিয়ে দুই কোটি নেপালি রুপি (প্রায় দেড় লাখ ডলার) বা তারও বেশি ‘অফিসিয়াল’ বহির্ভূত খরচ করেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশে স্থানীয় পেশিশক্তি ও জনবল সংগঠিত করতে প্রার্থীরা প্রায়ই আইনি সীমার চেয়ে ১২ গুণ বেশি ব্যয় করেন। এমন উচ্চ নির্বাচনী ব্যয় এবং প্রতিষ্ঠিত দলীয় অভিজাতদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাজনীতির ময়দানকে এখনো তাদের অনুকূলেই রাখছে। যদিও বাংলাদেশে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এবং নেপালে ‘উজ্জ্বালো নেপাল পার্টি’র মতো নতুন ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ও সংস্কারবাদী দলগুলো এই স্থবিরতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কি সত্যিই এই স্বার্থান্বেষী চক্র ভাঙতে পারবে, নাকি একদল ক্ষমতাধরকে সরিয়ে অন্য একদলকে বসাবে-সেটিই এখন এই অঞ্চলের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রধান প্রশ্ন।
তবে এখানে একটি পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের তুলনায় নেপালের নির্বাচন এখনো ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণমূলক। সেখানে কোনো দলকেই ব্যালট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়নি কিংবা প্রশাসনিক আদেশে কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি। বিপরীতে বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসন করা আওয়ামী লীগকে কার্যকরভাবে নির্বাচনে নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনকে মৌলিকভাবে ভিন্ন চারিত্রিক রূপ দিয়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক উল্লেখ করেছেন যে, নেপালের উন্মুক্ত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার তুলনায় বাংলাদেশের নির্বাচন পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়।
এই পার্থক্য নেপালের জেন-জি আন্দোলনগুলোকে রাজপথের বিদ্রোহ থেকে সরাসরি নির্বাচনী অংশগ্রহণে রূপান্তরের সুযোগ করে দিয়েছে। নেপালি রাজনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই একটি ‘নেতিবাচক উদাহরণ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি দেখাচ্ছে যে, যখন একটি প্রভাবশালী দলকে ব্যালট বাক্সে পরাজিত না করে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন প্রতিবাদী আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া উত্তরণ নতুন সংস্কারের বদলে ‘বর্জনমূলক’ পথে মোড় নিতে পারে।
এই বৈসাদৃশ্যটি হয়তো নেপালের নির্বাচনী প্রচারণায় সরাসরি প্রাধান্য পাবে না। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন যদি সীমাবদ্ধ বা কেবল বাছাইকৃত প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে নেপালের রাজনৈতিক অভিজাতরা তাদের দেশের অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও একটি গর্বের জায়গা খুঁজে পাবেন। তারা বলতে পারবেন যে, বাংলাদেশের যা নেই, নেপালের তা আছে। একটি বহুদলীয় নির্বাচনী ময়দান আছে, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সমাধান করা হয়।
এই পার্থক্যটি নেপালিদের বৈধতা, সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিয়ে বিতর্কের ধরণকেও প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন বাংলাদেশের এই ভোট অন্তর্বর্তী সরকার-সমর্থিত সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর এক প্রকার গণভোট হিসেবেও কাজ করছে।
সীমান্ত সংঘাত পশ্চিমবঙ্গের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; বরং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এটি একটি কেন্দ্রীয় ‘রেফারেন্স পয়েন্ট’।
ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদেরকে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিস্তার ঠেকানোর শেষ ‘পূর্বাঞ্চলীয় দুর্গ’ হিসেবে তুলে ধরছে। কৌশলটি আগেও নির্বাচনে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গকে তাদের পরবর্তী টার্গেট বা জয়ের দুর্গ হিসেবে দেখছে এবং এই লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশকে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ কোনো বৈদেশিক নীতির উদ্বেগের চেয়েও বেশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি মাধ্যম বা প্রক্সি হিসেবে কাজ করে, যার মধ্য দিয়ে নাগরিকত্ব, জনমিতি এবং জাতীয়তার লড়াই চলে।
বিজেপির কাছে বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি আন্তঃসীমান্ত ইতিহাসকে ছাপিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং জনমিতিক হুমকির একটি আখ্যানে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সরাসরি দেশের মুসলিম সংখ্যালঘুদের নাম না নিয়েও দলটি পশ্চিমবঙ্গকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক সংহতির একটি জাতীয় প্রকল্পের পরবর্তী ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করতে পারছে।
বিপরীতে, তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির এই বাগাড়ম্বরকে একটি ‘বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া চিন্তা’ হিসেবে দেখছে, যা এই অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো বুঝতে ব্যর্থ এবং যা সাধারণ বাঙালিদের জীবনের বিরুদ্ধে নথিপত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এভাবেই বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে ভারতের জাতীয়তাবাদ, কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব এবং নাগরিকত্ব নিয়ে পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর লড়াই চলছে।
দুটি সাম্প্রতিক ঘটনা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রথমটি হলো পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর)। ভারতের নির্বাচন কমিশন একে সাধারণ প্রশাসনিক পরিচ্ছন্নতা বললেও এটি দ্রুত রাজনৈতিক বারুদে পরিণত হয়েছে। বিরোধী নেতাদের দাবি, এটি মুসলিম এবং অভিবাসী বংশোদ্ভূত ভোটারদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে লক্ষ্যবস্তু করছে; অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, অবৈধ ভোট ঠেকাতে এটি প্রয়োজনীয়।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো অনুপ্রবেশ-বিরোধী প্রচারণার তীব্রতা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতারা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার বানানোর’ অভিযোগ এনেছেন। দাবিটি এখন সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের সাথে যুক্ত যেকোনো অস্থিরতা বা সহিংসতা সরাসরি বাংলার নির্বাচনী প্রচারণাকে প্রভাবিত করবে। এটি এই ধারণাকেই আরও জোরালো করবে যে, সীমান্ত শাসন এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা একে অপরের থেকে অবিচ্ছেদ্য।
তৃণমূলের জন্য এটি দুটি ফ্রন্টে একটি আত্মরক্ষামূলক লড়াই। একদিকে একে বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অভিভাবক হিসেবে ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গকে জনমিতিক বিশৃঙ্খলার রাজ্য হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগগুলো খণ্ডন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের নির্বাচন এই বিতর্কে প্রতিদিন নতুন নতুন রাজনৈতিক রসদ যোগাবে।
পূর্ব দিকে দৃষ্টি
বাংলাদেশের প্রভাব যদি পশ্চিমবঙ্গের জন্য রূপক বা প্রতীকী হয়, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের জন্য এটি ঐতিহাসিক এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
আসামের রাজনীতিতে জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক অধিকার এবং জনমিতিক টিকে থাকার লড়াইয়ের বিতর্কে বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরেই একটি প্রধান অনুষঙ্গ। বর্তমান নির্বাচন চক্রের অনেক আগে থেকেই আসামের রাজনীতি এক ধরণের আশঙ্কায় আচ্ছন্ন। আর তা হলো উন্মুক্ত বা অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে আসা অভিবাসনের ফলে আসামের নিজস্ব সংস্কৃতির বিলুপ্তি এবং রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ার ভয়।
এই উদ্বেগগুলোই এক সময় ‘আসাম আন্দোলন’-এর মতো গণসংগ্রামের রূপ নিয়েছিল, যা আজও রাজ্যটির রাজনৈতিক চেতনা থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। এর ওপর, আসাম ভারতের ঐতিহাসিকভাবে অশান্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত, যার সীমান্ত চীন, মিয়ানমার, ভুটান, নেপাল এবং বাংলাদেশের সাথে যুক্ত এবং সেখানে অনেক জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে স্বায়ত্তশাসন বা বিচ্ছিন্নতার দাবি জানিয়ে আসছে।
দশকের পর দশক ধরে আসামের ভোটাররা রাজনীতিকে ‘জনমিতিক উদ্বেগ’-এর চশমা দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। সেখানে মূল প্রশ্ন হলো- কারা প্রকৃত আদিবাসী, কাদের ভোটাধিকার আছে এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের এই আশঙ্কার মাঝে অসমীয়া সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য টিকে থাকবে কি না। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের হাই-স্টেক বা অতিগুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন কোনো দূরবর্তী বিদেশের খবর নয়। বরং এটি অভিবাসন প্রবাহ, জনসংখ্যার ভারসাম্য এবং অসমীয়া রাজনৈতিক কর্তৃত্বের স্থায়িত্ব নিয়ে চলা নানা আলোচনার একটি আসন্ন সংকেত। আসামের নির্বাচনী প্রতিযোগিতা জাতিগত পরিচয় এবং ঐতিহাসিক ক্ষোভের সাথে গভীরভাবে জড়িত, যেখানে প্রতিটি নির্বাচনকে দেখা হয় একটি বিচার হিসেবে- জনমিতিক পরিবর্তনকে কি সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, নাকি নীরবে রাজ্যটির ভোল বদলে দিতে দেওয়া হচ্ছে?
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার এই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে উসকে দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রসঙ্গের সঙ্গে আসামের জনমিতিক ভবিষ্যৎ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং শিলিগুড়ি করিডোরের (যাকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগকারী ‘চিকেন’স নেক’ বলা হয়) নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টি যুক্ত করেছেন।
এই নির্বাচনের মৌসুমে ভৌগোলিক অবস্থানই রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের ফলাফলকে একটি প্রশ্নের উত্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে: অভিবাসন, পরিচয় এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের ভয়গুলো কি সত্য প্রমাণিত হবে, নাকি তা প্রশমিত হবে? সেখানে বিএনপির বিজয় একটি পরিচিত পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির সংকেত দেবে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে যুক্ত নেটওয়ার্কগুলোর প্রতি তাদের কথিত নমনীয়তা বা অস্পষ্ট অবস্থানের কারণে। বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী উত্থান একটি শক্তিশালী ‘ইসলামপন্থী অ্যাজেন্ডা’ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াবে, যা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ককে আরও তীব্র করবে।
‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ এবং ভারতের আধিপত্যবাদী প্রভাব
এই সবকিছুর পর ঝুলে আছে হাসিনাকে নিয়ে ওঠা অমীমাংসিত প্রশ্ন। কয়েক সপ্তাহের সহিংস অস্থিরতার ফলে পনের বছরের শাসনের অবসান হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারতে নির্বাসনে আছেন। তার সেখানকার অবস্থান এখনো রাজনৈতিকভাবে অনুঘটকের কাজ করছে। ঢাকা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানো অনুরোধ করেছিল। গত বছরের নভেম্বরে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়ার এই দাবি তীব্র আকার ধারণ করে। নয়াদিল্লি তাদের অবস্থান থেকে নড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
যেসব তরুণ বাংলাদেশি অ্যাক্টিভিস্টদের কারণে ২০২৪ এর অভ্যুত্থান হয়েছিল, তারা দাবি করছে পুরোনো শাসনব্যবস্থা বাইরের সমর্থনে টিকে আছে। একই সময়ে, ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা, দিল্লির নিরপেক্ষ অবস্থানের দাবিকে জটিল করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষিতে ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও নেপালের আসন্ন নির্বাচনে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। পশ্চিমবঙ্গে, এটি বিজেপির দাবিকে আরও জোরালো করে যে, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্য শক্তিশালী জাতীয় তদারকি প্রয়োজন। আসামে, এটি এই বক্তব্যকে আরও জোরদার করে যে, নিরাপত্তা হুমকি কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিহত করতে হবে।
নেপালের জন্য এটি একটি সতর্কতামূলক দৃষ্টান্ত যে, কীভাবে একটি আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি অনিবার্যভাবে তার প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সেই সন্ধিক্ষণগুলোতে, যা প্রতিষ্ঠিত ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করে।
সামগ্রিকভাবে, আসন্ন এই নির্বাচনগুলো এটিই তুলে ধরে যে, কীভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক বয়ান বা ‘ন্যারেটিভ’ সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে স্থানীয় অর্থ ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেবল এর অভ্যন্তরীণ ফলাফলের নিরিখে নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলে এটি কী বার্তা দিচ্ছে বা কী তাৎপর্য বহন করছে, সে আলোকেও বোঝা প্রয়োজন।
লেখক: আটলান্টিক কাউন্সিলের সাউথ এশিয়া সেন্টারের সিনিয়র ফেলো এবং ওয়েজলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট