নেলসন ওয়াং

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?
এই প্রশ্নের উত্তরটি চিরাচরিত সামরিক জোটের দ্বিমুখী (হ্যাঁ বা না) সমীকরণে দেওয়া কঠিন। চীন সম্ভবত কোনো সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না কিংবা সেনা পাঠাবে না। তবে একে 'নিষ্ক্রিয়তা' মনে করলে একবিংশ শতাব্দীর 'গ্রেট পাওয়ার কম্পিটিশন' বা বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কৌশল বুঝতে ভুল হবে।
ইরানের প্রতি চীনের সমর্থন বাস্তবসম্মত ও বহুমুখী এবং কিছু ক্ষেত্রে তা সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়েও বেশি টেকসই। চীন কেবল ভিন্ন এক কৌশলগত অবস্থান থেকে কাজ করছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চীন ধারাবাহিকভাবে তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি ব্যবহার করে আসছে। আর তা হলো ভেটো প্রদানের নীতিগত ক্ষমতা। গত মাসে এক জরুরি বৈঠকে চীনা রাষ্ট্রদূত সান লেই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “শক্তিপ্রয়োগ কখনোই সমস্যার সমাধান করতে পারে না, বরং এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও দুরূহ করে তোলে। যেকোনো ধরনের সামরিক হঠকারিতা এই অঞ্চলকে এক অনির্দেশ্য অতল গহ্বরের দিকে ঠেলে দেবে।”
এটি কেবল ফাঁকা বুলি নয়। চীনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্টভাবে ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে। একইসঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ বা হুমকির ঘোর বিরোধী।
জাতিসংঘের সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার মাধ্যমে চীন তেহরানকে এক অমূল্য সম্পদ দিচ্ছে। আর তা হলো বিশ্বমঞ্চে বৈধতা এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী পাল্টা-আখ্যান।
কৌশলগত সমন্বয়
২০২১ সালে যখন ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) পূর্ণ সদস্য হিসেবে চীন, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে যুক্ত হয়, তখন থেকেই কূটনৈতিক সমীকরণ মৌলিকভাবে বদলে যেতে শুরু করে। এরপর তেহরানের ব্রিকস জোটে অন্তর্ভুক্তি এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
এগুলো কোনো সামরিক চুক্তি নয়, তবে এর মাধ্যমে সম্ভবত আরও দীর্ঘস্থায়ী কিছু তৈরি হয়েছে। তা হলো স্থায়ী পরামর্শ এবং কৌশলগত সমন্বয়ের একটি শক্তিশালী কাঠামো।

গত বছর বেইজিংয়ে চীন, রাশিয়া ও ইরানের কূটনীতিকরা মিলিত হন এবং ব্রিকস ও এসসিও-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার বিষয়ে একমত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক সংহতির অর্থ হলো ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসন এখন পরোক্ষভাবে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীন সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চললেও দৃশ্যমান সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কোনো রাখঢাক করছে না। চলতি মাসের শুরুর দিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে এক যৌথ নৌ-মহড়ায় অংশ নিতে চীন ও রাশিয়া তাদের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। ক্রেমলিনের একজন উপদেষ্টা এই মহড়াকে সাগরে পশ্চিমা আধিপত্য রুখতে একটি বহুত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তবে এই সহযোগিতার রূপ কেবল মহড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আরও বাস্তবসম্মত। গত বছর মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরান তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে চীন থেকে আধুনিক ‘সারফেস-টু-এয়ার’ মিসাইল ব্যাটারি সংগ্রহ করেছে। এটি মূলত একটি ‘তেলের বিনিময়ে অস্ত্র’ চুক্তির অংশ, যার মাধ্যমে তেহরান অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
কিছু সূত্রে জানা গেছে, ইরান সম্ভবত চীনের তৈরি অত্যাধুনিক জে-২০ পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার, জে-১০সি যুদ্ধবিমান এবং এইচকিউ-৯ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেতে যাচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত এর কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি।
তবে বস্তুগত সহায়তার চেয়েও এর প্রতীকী গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। চলতি মাসে ইরানের বিমান বাহিনী দিবস উদযাপনকালে একজন চীনা সামরিক অ্যাটাশে ইরানি বিমান বাহিনী প্রধানের হাতে একটি জে-২০ স্টেলথ ফাইটারের প্রতিকৃতি তুলে দেন। এই প্রতীকী সৌজন্যকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার যুগ
চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী সমর্থনটি রণক্ষেত্রে হয়তো দৃশ্যমান নয়, তবে ইরানের জাতীয় অর্থনীতির পরিসংখ্যানে তা অত্যন্ত স্পষ্ট। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও প্রবল ভূ-রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে চীন এখনো ইরানের শীর্ষ জ্বালানি অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই যাচ্ছে চীনা ক্রেতাদের কাছে।
বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই ওয়াশিংটনের নজর এড়ায়নি। গত বছর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ চীনের শানডং প্রদেশের একটি তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ইরানি তেল ক্রয়ের অভিযোগ আনা হয়। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনও একসময় অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা চীনের বাজারে ইরানের এই অবৈধ তেল রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনবে। এর প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এই নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি ও নিয়মকে ক্ষুণ্ণ করে এবং চীনা কোম্পানিগুলোর বৈধ অধিকার ও স্বার্থকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে।
যদিও চীন-ইরান অর্থনৈতিক সম্পর্কে মাঝেমধ্যে কিছুটা টানাপোড়েন দেখা যায়। যেমন, মার্কিন আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে চীনের রাষ্ট্রীয় শোধনাগারগুলো সাময়িকভাবে তেল কেনা স্থগিত রাখে। তবুও সামগ্রিক গতিধারাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। চীন মূলত ইরানকে সেই অর্থনৈতিক ‘অক্সিজেন’ সরবরাহ করছে, যা দেশটিকে বাইরের প্রচণ্ড চাপের মুখেও টিকে থাকার শক্তি জোগাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, চীন যদি ইরানকে কূটনৈতিক সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন, সামরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সঞ্জীবনী শক্তি সবই সরবরাহ করে থাকে, তবে তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে না কেন? কেন তারা সরাসরি যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে না কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপের প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে না?
এর উত্তর নিহিত রয়েছে বেইজিংয়ের কৌশলগত অগ্রাধিকারের মধ্যে। এটি সবার জানা যে, চীনের প্রধানতম লক্ষ্য হলো তাইওয়ান পুনরেকত্রীকরণ। আর এই লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার আগে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না যা আমেরিকার সাথে অহেতুক সংঘাতের পথ প্রশস্ত করতে পারে। চীন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই বিষয়টি এড়িয়ে চলে।

তাছাড়া বেইজিং মনে করে, ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক অভিযান বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করতে পারলেও, সেখানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। এমন বাস্তবতায় চীন সম্ভবত ইউক্রেন সংকটের মতো একটি বিশেষ মডেল অনুসরণ করবে। সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিয়ে আক্রান্ত রাষ্ট্রের সাথে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা, জাতিসংঘে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন জোগানো এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে অর্থনৈতিক লেনদেন অব্যাহত রাখা।
আমরা বর্তমানে যা দেখছি তা কোনো প্রথাগত সামরিক জোটের রাজনীতি নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার উপযোগী এক অভিনব কৌশলগত অংশীদারিত্ব। চীন ইরানকে কূটনৈতিক রক্ষাকবচ, প্রাতিষ্ঠানিক সংহতি, দৃশ্যমান সামরিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক সঞ্জীবনী শক্তি সবই জোগাচ্ছে। তবে কোনোভাবেই সরাসরি সংঘাতের সীমারেখা অতিক্রম করে বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকি নিচ্ছে না।
যারা প্রশ্ন তুলছেন চীন ইরানকে উদ্ধার করবে কি না, তাদের কাছে উত্তরটি মূলত ‘উদ্ধার’ শব্দটির সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে। যদি উদ্ধার বলতে সৈন্যসামন্ত কিংবা রণতরী পাঠানো বোঝায়, তবে উত্তরটি নির্ঘাত ‘না’। কিন্তু যদি এর অর্থ হয় এমন এক পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যেখানে ইরান টিকে থাকতে পারবে, বাইরের চাপ রুখে দেবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী অবস্থান থেকে দরকষাকষি করতে পারবে তবে এর উত্তরটি নিঃশব্দে, দৃঢ়ভাবে এবং কৌশলগতভাবে হবে ‘হ্যাঁ’।
চীনের এই বিশেষ কৌশলটি ইতিমধ্যেই অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং প্রতিপক্ষের জন্য এর মোকাবিলা করাও বেশ দুরূহ। যুদ্ধের কালো ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে চীন তার মিত্রের জন্য এমন এক অনন্য ‘বর্ম’ তৈরি করেছে, যা কেবল ইস্পাত দিয়ে গড়া নয়; বরং তা নির্মিত হয়েছে কৌশলগত ধৈর্য, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং উদীয়মান এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার বুনিয়াদ দিয়ে।
লেখক: সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর প্রেসিডেন্ট
নিবন্ধটি মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?
এই প্রশ্নের উত্তরটি চিরাচরিত সামরিক জোটের দ্বিমুখী (হ্যাঁ বা না) সমীকরণে দেওয়া কঠিন। চীন সম্ভবত কোনো সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না কিংবা সেনা পাঠাবে না। তবে একে 'নিষ্ক্রিয়তা' মনে করলে একবিংশ শতাব্দীর 'গ্রেট পাওয়ার কম্পিটিশন' বা বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কৌশল বুঝতে ভুল হবে।
ইরানের প্রতি চীনের সমর্থন বাস্তবসম্মত ও বহুমুখী এবং কিছু ক্ষেত্রে তা সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়েও বেশি টেকসই। চীন কেবল ভিন্ন এক কৌশলগত অবস্থান থেকে কাজ করছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চীন ধারাবাহিকভাবে তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি ব্যবহার করে আসছে। আর তা হলো ভেটো প্রদানের নীতিগত ক্ষমতা। গত মাসে এক জরুরি বৈঠকে চীনা রাষ্ট্রদূত সান লেই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “শক্তিপ্রয়োগ কখনোই সমস্যার সমাধান করতে পারে না, বরং এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও দুরূহ করে তোলে। যেকোনো ধরনের সামরিক হঠকারিতা এই অঞ্চলকে এক অনির্দেশ্য অতল গহ্বরের দিকে ঠেলে দেবে।”
এটি কেবল ফাঁকা বুলি নয়। চীনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্টভাবে ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে। একইসঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ বা হুমকির ঘোর বিরোধী।
জাতিসংঘের সনদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার মাধ্যমে চীন তেহরানকে এক অমূল্য সম্পদ দিচ্ছে। আর তা হলো বিশ্বমঞ্চে বৈধতা এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী পাল্টা-আখ্যান।
কৌশলগত সমন্বয়
২০২১ সালে যখন ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) পূর্ণ সদস্য হিসেবে চীন, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে যুক্ত হয়, তখন থেকেই কূটনৈতিক সমীকরণ মৌলিকভাবে বদলে যেতে শুরু করে। এরপর তেহরানের ব্রিকস জোটে অন্তর্ভুক্তি এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
এগুলো কোনো সামরিক চুক্তি নয়, তবে এর মাধ্যমে সম্ভবত আরও দীর্ঘস্থায়ী কিছু তৈরি হয়েছে। তা হলো স্থায়ী পরামর্শ এবং কৌশলগত সমন্বয়ের একটি শক্তিশালী কাঠামো।

গত বছর বেইজিংয়ে চীন, রাশিয়া ও ইরানের কূটনীতিকরা মিলিত হন এবং ব্রিকস ও এসসিও-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার বিষয়ে একমত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক সংহতির অর্থ হলো ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসন এখন পরোক্ষভাবে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীন সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চললেও দৃশ্যমান সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কোনো রাখঢাক করছে না। চলতি মাসের শুরুর দিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে এক যৌথ নৌ-মহড়ায় অংশ নিতে চীন ও রাশিয়া তাদের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। ক্রেমলিনের একজন উপদেষ্টা এই মহড়াকে সাগরে পশ্চিমা আধিপত্য রুখতে একটি বহুত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তবে এই সহযোগিতার রূপ কেবল মহড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আরও বাস্তবসম্মত। গত বছর মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরান তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে চীন থেকে আধুনিক ‘সারফেস-টু-এয়ার’ মিসাইল ব্যাটারি সংগ্রহ করেছে। এটি মূলত একটি ‘তেলের বিনিময়ে অস্ত্র’ চুক্তির অংশ, যার মাধ্যমে তেহরান অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
কিছু সূত্রে জানা গেছে, ইরান সম্ভবত চীনের তৈরি অত্যাধুনিক জে-২০ পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার, জে-১০সি যুদ্ধবিমান এবং এইচকিউ-৯ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেতে যাচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত এর কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি।
তবে বস্তুগত সহায়তার চেয়েও এর প্রতীকী গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। চলতি মাসে ইরানের বিমান বাহিনী দিবস উদযাপনকালে একজন চীনা সামরিক অ্যাটাশে ইরানি বিমান বাহিনী প্রধানের হাতে একটি জে-২০ স্টেলথ ফাইটারের প্রতিকৃতি তুলে দেন। এই প্রতীকী সৌজন্যকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার যুগ
চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী সমর্থনটি রণক্ষেত্রে হয়তো দৃশ্যমান নয়, তবে ইরানের জাতীয় অর্থনীতির পরিসংখ্যানে তা অত্যন্ত স্পষ্ট। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও প্রবল ভূ-রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে চীন এখনো ইরানের শীর্ষ জ্বালানি অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই যাচ্ছে চীনা ক্রেতাদের কাছে।
বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই ওয়াশিংটনের নজর এড়ায়নি। গত বছর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ চীনের শানডং প্রদেশের একটি তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ইরানি তেল ক্রয়ের অভিযোগ আনা হয়। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনও একসময় অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা চীনের বাজারে ইরানের এই অবৈধ তেল রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনবে। এর প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এই নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি ও নিয়মকে ক্ষুণ্ণ করে এবং চীনা কোম্পানিগুলোর বৈধ অধিকার ও স্বার্থকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে।
যদিও চীন-ইরান অর্থনৈতিক সম্পর্কে মাঝেমধ্যে কিছুটা টানাপোড়েন দেখা যায়। যেমন, মার্কিন আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে চীনের রাষ্ট্রীয় শোধনাগারগুলো সাময়িকভাবে তেল কেনা স্থগিত রাখে। তবুও সামগ্রিক গতিধারাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। চীন মূলত ইরানকে সেই অর্থনৈতিক ‘অক্সিজেন’ সরবরাহ করছে, যা দেশটিকে বাইরের প্রচণ্ড চাপের মুখেও টিকে থাকার শক্তি জোগাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, চীন যদি ইরানকে কূটনৈতিক সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন, সামরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সঞ্জীবনী শক্তি সবই সরবরাহ করে থাকে, তবে তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে না কেন? কেন তারা সরাসরি যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে না কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপের প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে না?
এর উত্তর নিহিত রয়েছে বেইজিংয়ের কৌশলগত অগ্রাধিকারের মধ্যে। এটি সবার জানা যে, চীনের প্রধানতম লক্ষ্য হলো তাইওয়ান পুনরেকত্রীকরণ। আর এই লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার আগে এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না যা আমেরিকার সাথে অহেতুক সংঘাতের পথ প্রশস্ত করতে পারে। চীন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই বিষয়টি এড়িয়ে চলে।

তাছাড়া বেইজিং মনে করে, ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক অভিযান বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করতে পারলেও, সেখানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। এমন বাস্তবতায় চীন সম্ভবত ইউক্রেন সংকটের মতো একটি বিশেষ মডেল অনুসরণ করবে। সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিয়ে আক্রান্ত রাষ্ট্রের সাথে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা, জাতিসংঘে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন জোগানো এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে অর্থনৈতিক লেনদেন অব্যাহত রাখা।
আমরা বর্তমানে যা দেখছি তা কোনো প্রথাগত সামরিক জোটের রাজনীতি নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার উপযোগী এক অভিনব কৌশলগত অংশীদারিত্ব। চীন ইরানকে কূটনৈতিক রক্ষাকবচ, প্রাতিষ্ঠানিক সংহতি, দৃশ্যমান সামরিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক সঞ্জীবনী শক্তি সবই জোগাচ্ছে। তবে কোনোভাবেই সরাসরি সংঘাতের সীমারেখা অতিক্রম করে বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকি নিচ্ছে না।
যারা প্রশ্ন তুলছেন চীন ইরানকে উদ্ধার করবে কি না, তাদের কাছে উত্তরটি মূলত ‘উদ্ধার’ শব্দটির সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে। যদি উদ্ধার বলতে সৈন্যসামন্ত কিংবা রণতরী পাঠানো বোঝায়, তবে উত্তরটি নির্ঘাত ‘না’। কিন্তু যদি এর অর্থ হয় এমন এক পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যেখানে ইরান টিকে থাকতে পারবে, বাইরের চাপ রুখে দেবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি শক্তিশালী অবস্থান থেকে দরকষাকষি করতে পারবে তবে এর উত্তরটি নিঃশব্দে, দৃঢ়ভাবে এবং কৌশলগতভাবে হবে ‘হ্যাঁ’।
চীনের এই বিশেষ কৌশলটি ইতিমধ্যেই অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং প্রতিপক্ষের জন্য এর মোকাবিলা করাও বেশ দুরূহ। যুদ্ধের কালো ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে চীন তার মিত্রের জন্য এমন এক অনন্য ‘বর্ম’ তৈরি করেছে, যা কেবল ইস্পাত দিয়ে গড়া নয়; বরং তা নির্মিত হয়েছে কৌশলগত ধৈর্য, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং উদীয়মান এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার বুনিয়াদ দিয়ে।
লেখক: সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর প্রেসিডেন্ট
নিবন্ধটি মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট