Advertisement Banner

অনলাইন ডায়েট অনুসরণ করার আগে যা জানা প্রয়োজন

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
অনলাইন ডায়েট অনুসরণ করার আগে যা জানা প্রয়োজন
প্রতীকী ছবি: ফ্রিপিক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করলেই ওজন কমানো ও ডায়েট প্ল্যানের বিভিন্ন পোস্ট নজরে পড়ে। বিশেষত বিভিন্ন ‘ইনফ্লুয়েন্সারদের’ ডায়েট প্ল্যানে এসব মাধ্যম সয়লাব।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপসে ইনফ্লুয়েন্সারদের কার্যক্রম নিয়ে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। তা সত্ত্বেও পুষ্টিবিদ্যায় যোগ্যতা নেই–এমন সেলিব্রিটিদের কাছ থেকে খাদ্যসংক্রান্ত পরামর্শ সামাজিক মাধ্যমে এখনো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

যদিও অনেক ডায়েটিশিয়ান ও নিউট্রিশনিস্ট মনে করেন, এসব প্ল্যাটফর্ম স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বার্তা পৌঁছানোর ইতিবাচক মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু এত ভ্রান্ত তথ্যের ভিড়ে ভালো আর খারাপ পরামর্শ আলাদা করা কি সহজ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু সহজ লক্ষণ খেয়াল করলে তা বোঝা সম্ভব।

প্রমাণ কি কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা?

লন্ডনের ডায়েটিশিয়ান ক্যাথরিন রাবেস বলেন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প মানুষকে সহজে আকৃষ্ট করে, কারণ এগুলো বাস্তব জীবনের মতো মনে হয় এবং বুঝতেও সহজ। কিন্তু শুধু এসব গল্পের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া পরামর্শ সব সময় ঠিক নাও হতে পারে।

এই বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, যদি কোনো পরামর্শের পেছনে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকে, তাহলে সেটি বিশ্বাস করা ঠিক নয়। কারণ এমন অনেক পরামর্শই সবার জন্য কার্যকর হয় না এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও থাকে না।

নিবন্ধিত ব্রিটিশ পুষ্টিবিদ পিক্সি টার্নার বলেন, সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে নিজের তুলনা করা উচিত নয়। আর যদি কেউ অসুস্থ হয় বা পুষ্টি নিয়ে সমস্যা থাকে, তাহলে ইনফ্লুয়েন্সারদের বদলে অবশ্যই চিকিৎসক বা যোগ্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পরামর্শের আড়ালে কোনো বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে না তো?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন স্পনসর্ড পোস্ট খুব সাধারণ বিষয়। ডায়েট পিল থেকে শুরু করে কুকুরের খাবার—সবকিছুতেই বিজ্ঞাপন হিসেবে হ্যাশট্যাগঅ্যাড লেখা দেখা যায়।

তবে ব্রিটিশ ডায়েটিক অ্যাসোসিয়েশনের ডায়েটিশিয়ান সোফি মেডলিন বলেন, যখন কেউ কোনো পণ্যের জন্য টাকা নেয়, তখন তার মতামত পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই যারা ডায়েট বা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পণ্য প্রচার করছে কিন্তু সেই পণ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কে ভালোভাবে জানে না, তাদের কথা বিশ্বাস করার আগে সাবধান হওয়া উচিত।

প্রতীকী ছবি: ফ্রিপিক
প্রতীকী ছবি: ফ্রিপিক

ব্রিটেনের অ্যাডভার্টাইজিং স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি (এএসএ) বিবিসিকে জানিয়েছে, কোনো সেলিব্রিটি বা সাধারণ মানুষ যদি কোনো পণ্য প্রচারের জন্য টাকা নেয়, তাহলে সেই পণ্যটি ব্যবহার করা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু এক তদন্তে দেখা গেছে, কিছু ইনফ্লুয়েন্সার আসলে পণ্য ব্যবহার না করেই ডায়েট পণ্যের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এছাড়া কিছু ইনফ্লুয়েন্সারের পোস্টে ডায়েট পণ্য নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি করে থাকেন। আবার অনেকে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন কি না তাও স্পষ্ট করেন না।

ডায়েটিশিয়ান সোফি মেডলিন ও হালা এল-শাফি মনে করেন, সামাজিক মাধ্যমে মানুষ এখন ধীরে ধীরে এসব বিজ্ঞাপন সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। তবে আরও নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাচ্ছেন এই দুই বিশেষজ্ঞ।

বিবিসি বলছে, বর্তমানে কিছু ডায়েট ও কসমেটিক সার্জারি সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য সীমিত করা হয়েছে। পাশাপাশি যেকেউ চাইলে ভুল তথ্য, অনিয়ন্ত্রিত পণ্য বা খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত সমস্যাকে উসকে দেয়—এমন পোস্ট রিপোর্ট করতে পারে।

এমন শব্দ ব্যবহার হচ্ছে কি, যার কোনো বৈজ্ঞানিক অর্থ নেই?

সামাজিক মাধ্যমে ‘ডিটক্স’ বা ‘ক্লিনজিং’ শব্দগুলো হামেশাই শোনা যায়। কিন্তু এগুলোর আসলে বৈজ্ঞানিক কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই।

পুষ্টিবিদ পিক্সি টার্নার বিবিসিকে দবলেন, এসব শব্দ সাধারণত যিনি ব্যবহার করেন, তিনিই নিজের মতো করে এর অর্থ বানিয়ে নেন। এগুলো বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত নয়। তিনি আরও বলেন, “যখন কেউ ডিটক্স শব্দ ব্যবহার করেন, তখন বোঝা যায় মানবদেহ কীভাবে কাজ করে তা তিনি ঠিকভাবে বোঝেন না। কারণ আমাদের শরীরে লিভার ও কিডনি আছে, যেগুলো স্বাভাবিকভাবেই শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়।”

ডায়েটিশিয়ান সোফি মেডলিন বলেন, “খাবার নিজে সাধারণত বিষাক্ত নয়। যদি খাবার সত্যিই বিষাক্ত হতো, তাহলে মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ত বা মারা যেত।”

আরেকটি প্রচলিত শব্দ হলো ‘সুপারফুড’,এরও কোনো বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নেই। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে, এই ধারণাটি শুরু হয়েছিল গত শতকের শুরুতে কলা বিক্রির একটি প্রচারণা থেকে।

প্রতীকী ছবি: ফ্রিপিক
প্রতীকী ছবি: ফ্রিপিক

পিক্সি টার্নার বলেন, “অনেক সময় সুপারফুড হিসেবে যেসব খাবার দেখানো হয়, সেগুলো পাওয়া কঠিন, বিদেশি বা অনেক দামী হয়। এতে মনে হয় এগুলো খেলে বিশেষ কিছু হবে, আর অপ্রয়োজনীয়ভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের খরচও বাড়িয়ে দেয়।”

খাবারকে কি অকারণে খারাপভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে অনেক সময় কিছু খাবার বা খাবারের গ্রুপ বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু এটা করলে অন্য খাবার থেকে সেই পুষ্টি পূরণ করা জরুরি।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কার্বোহাইড্রেটকে অনেক সময় খারাপ বলা হয়। কিন্তু ডায়েটিশিয়ান ক্যাথরিন রাবেস বলেন, এগুলো বাদ দিলে শরীরে ক্লান্তি ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে, কারণ এগুলো শরীরের সব সিস্টেমের কাজের জন্য শক্তি জোগায়।

দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার বাদ দিলে অবশ্যই অন্য কোনো ক্যালসিয়াম উৎস খুঁজে নিতে হবে। সোফি মেডলিন বলেন, তা না হলে ভবিষ্যতে হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।

পিক্সি টার্নার আরও বলেন, খাবারকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ হিসেবে আলাদা করলে মানসিক সমস্যাও হতে পারে। এতে মানুষ নিজেকেও ভালো বা খারাপ মানুষ হিসেবে ভাবতে শুরু করতে পারে, যা উদ্বেগ, হতাশা এবং শরীর নিয়ে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিছু খাবার সীমিত করা ঠিক আছে, কিন্তু মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া।

দ্রুত ফলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে?

ডায়েট সংস্থা ব্রিটিশ ডায়েটিক অ্যাসোসিয়েশন বলছে, এমন ডায়েট বা পণ্য এড়িয়ে চলা উচিত যেগুলো কোনো এক জিনিস খেলে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে–এমন দাবি করে।

সোফি মেডলিন বলেন, যদি সত্যিই কোনো ‘ম্যাজিক সমাধান’ থাকত, তাহলে সবাই সেটাই ব্যবহার করত। কোনো ক্যাপসুল বা পিল কখনোই খারাপ খাদ্যাভ্যাস, চাপ বা ব্যায়ামের অভাবকে পুরোপুরি ঠিক করতে পারে না। তিনি পরামর্শ দেন, অপ্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট বা পণ্যে টাকা খরচ না করে ফলমূল ও শাকসবজি কেনার দিকে মনোযোগ দেওয়া ভালো।

কার থেকে পুষ্টি পরামর্শ নেওয়া উচিত?

বিশেষজ্ঞরা বলেন, যাদের যোগ্যতা কম, তাদেরই অনেক সময় বেশি কথা বলতে দেখা যায়। কিন্তু ডায়েটিশিয়ান ও নিবন্ধিত পুষ্টিবিদদের ওপর নিয়ম ও পেশাগত দায়বদ্ধতা থাকে। তাই তাদের দেওয়া তথ্য সাধারণত বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক হয় এবং ভুল হলে তাদের জবাবদিহি করতে হয়। তাই স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সবচেয়ে নিরাপদ পরামর্শ আসে যোগ্য ও নিবন্ধিত বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেই।

সম্পর্কিত