টিনিটাস হলো কানের আঘাত, কানে ময়লা জমা হওয়া বা বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাসের মতো বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার একটি লক্ষণ।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘টিনিটাস’ বলতে বোঝায় কানে বা মাথায় এমন একটি শব্দ শুনতে পাওয়া, যা অন্য কেউ শুনতে পায় না। আপনি হয়তো কানে ঝিঁঝিঁ শব্দ, গুঞ্জন, ভোঁ ভোঁ, কটকট বা বাতাসের তোড়ের মতো শব্দ শুনতে পেতে পারেন। এই শব্দটি খুব মৃদু হতে পারে, আবার এত উচ্চমাত্রারও হতে পারে যে আপনি বাইরের আর কোনো শব্দই শুনতে পাবেন না। এটি একটি বা দুটি কানেই হতে পারে।
তীব্র টিনিটাসের কারণে ঘুম হওয়া বা কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। টিনিটাস কয়েক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যেতে পারে, আবার এটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবেও থেকে যেতে পারে।
টিনিটাস কোনো আলাদা রোগ নয়। এটি মূলত শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার একটি লক্ষণ। তবে অনেক কারণেই টিনিটাস হতে পারে। মূল সমস্যাটির চিকিৎসা করা গেলে এটি থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।
টিনিটাসের কারণ
- দীর্ঘস্থায়ী বা স্থায়ী টিনিটাসে আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় আট থেকে ৯ জনেরই নেপথ্যে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা থাকে। আর বয়সজনিত কারণে কানে কম শোনার বিষয়টিই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
- তীব্র শব্দের সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতা—যেমন গুলির শব্দ বা কোনো কনসার্টের বিকট আওয়াজ টিনিটাসের কারণ হতে পারে। একইভাবে কলকারখানা বা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করার ফলে ক্রমাগত উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলেও এই সমস্যা হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘নয়েজ-ইনডিউসড হেয়ারিং লস’ বলা হয়।
- দাঁত কিংবা মাড়ির সঠিক কামড় বা বিন্যাসে সমস্যা থাকলে টিনিটাস দেখা দিতে পারে।
- কানে অতিরিক্ত ময়লা বা খইল জমা কিংবা ইনফেকশন হলে বাইরের শব্দ শুনতে অসুবিধা হয়, যার ফলে ভেতরের টিনিটাসের শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
- কনকাশন (মাথায় তীব্র ধাক্কা) বা হুইপল্যাশের (ঘাড়ে আকস্মিক হ্যাঁচকা টান) মতো আঘাতের ফলেও টিনিটাস হতে পারে।
- কিছু নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক, বিষণ্নতার ওষুধ, ক্যানসারের ওষুধ এবং ব্যথানাশক এনএসএআইডি জাতীয় ওষুধ গ্রহণের কারণেও এই উপসর্গটি দেখা দিতে পারে।
- চোয়ালের সংযোগস্থলের সমস্যা টিনিটাসের অন্যতম একটি বড় কারণ।
কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরার সমস্যা থেকেও টিনিটাসের সূত্রপাত হতে পারে। এছাড়া নিচের শারীরিক অবস্থাগুলোর উপসর্গ হিসেবেও টিনিটাস দেখা দিতে পারে:
- ইউস্টেচিয়ান টিউব ডিসফংশন
- মেনিয়ার্স ডিজিজ
- ভেস্টিবুলার সোয়ানোমা (কানের স্নায়ুতে হওয়া এক ধরনের বিনাইন টিউমার)
- অটোস্ক্লেরোসিস (কানের ভেতরের হাড়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি)
- যেসব শারীরিক অবস্থার কারণে পালসেটাইল টিনিটাস হয় (যার ফলে কানে নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ পাওয়া যায়)
- অটোইমিউন রোগ, যেমন: লুপাস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস
অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং ঘুমের অভাব টিনিটাসের তীব্রতা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। ফলে কানের মধ্যকার অস্বস্তিকর শব্দটি স্বাভাবিকের চেয়ে আরও বেশি জোরালো মনে হয়, যা পরবর্তীতে আরও ঘুমহীন রাত এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দিনের চক্র তৈরি করে।
চিকিৎসা
টিনিটাসের চিকিৎসা মূলত নির্ভর করে এটি অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে হচ্ছে কি না তার ওপর। যদি অন্য কোনো সমস্যা থেকে থাকে, তবে সেটির সঠিক চিকিৎসা করার মাধ্যমে টিনিটাসের উপসর্গ কমিয়ে আনা সম্ভব। যেমন—চিকিৎসকের দ্বারা কানের ময়লা অপসারণ করা।
উচ্চ রক্তচাপের কারণে টিনিটাস হলে চিকিৎসক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দিতে পারেন, যা উপসর্গ প্রশমিত করতে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত শব্দ বা বয়সজনিত কারণে যদি শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার ফলে টিনিটাস হয়, তবে হিয়ারিং এইড ব্যবহারে বেশ উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।
কোনো নির্দিষ্ট ওষুধের কারণে টিনিটাস হচ্ছে বলে মনে হলে, চিকিৎসক সেটি বন্ধ করা, ডোজ কমানো বা বিকল্প অন্য কোনো ওষুধ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন।
অনেক ক্ষেত্রেই টিনিটাস পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব হয় না। তবে কিছু চিকিৎসার সাহায্যে এর তীব্রতা অনুভূতির বাইরে রাখা যায়, যাতে সমস্যাটি কম অনুভূত হয়। কানের শব্দ আড়াল বা ব্লার করার জন্য চিকিৎসক বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের নির্দেশ দিতে পারেন। যেমন— হোয়াইট নয়েজ মেশিন। রাতে নির্বিঘ্নে ঘুমানোর জন্য আপনি বালিশের পাশে স্পিকারযুক্ত এই মেশিন ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া শোবার ঘরের ফ্যান, হিউমিডিফায়ার, ডিহিউমিডিফায়ার বা এয়ার কন্ডিশনারের মৃদু শব্দও হোয়াইট নয়েজ হিসেবে কাজ করে, যা রাতের বেলা টিনিটাসের অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে।
এছাড়া আছে মাস্কিং ডিভাইস। এটি দেখতে দেখতে অনেকটাই হিয়ারিং এইডের মতো। একজন অডিওলজিস্ট এগুলোকে প্রয়োজনীয় ফ্রিকোয়েন্সিতে সেট করে দেন। এই যন্ত্রগুলো থেকে অনবরত হালকা মানের হোয়াইট নয়েজ নির্গত হয়, যা টিনিটাসের আওয়াজকে চেপে রাখে।
কাউন্সিলিং
আচরণগত চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো উপসর্গগুলো সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনা, যাতে টিনিটাস নিয়েই স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করা যায়। এখানের প্রধান দুই ধরণের কাউন্সিলিং হলো—
টিনিটাস রিট্রেনিং থেরাপি (টিআরটি)। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক উপসর্গ অনুযায়ী তৈরি করা একটি বিশেষ প্রোগ্রাম। একজন অডিওলজিস্টের কাছে বা কোনো টিনিটাস কেয়ার সেন্টারে এই থেরাপি নেওয়া যায়। টিআরটিতে সাউন্ড মাস্কিং এবং বিশেষজ্ঞের দিকনির্দেশনামূলক কাউন্সিলিং প্রদান করা হয়।
কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) ও অন্যান্য কাউন্সিলিং। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানী এমন কিছু কৌশল শেখাতে পারেন যা টিনিটাসের মানসিক ধকল সামলাতে সাহায্য করবে। এছাড়া টিনিটাসের সাথে জড়িত অন্যান্য মানসিক সমস্যা, যেমন—অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা দূর করতেও কাউন্সিলিং দারুণ কাজ করে।
তথ্যসূত্র: আমেরিকান টিনিটাস অ্যাসোসিয়েশন, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, মায়ো ক্লিনিক