কাজী সাজিদুল হক

কালা ভুনা জিনিসটা একটি হট সেলিং আইটেম। মাংসের তেলতেলে এই পদ গরম ভাতের সাথে মিলে যে সুর তোলে, তার অনুরণন অনেকক্ষণ মনে (আসলে পেটে) বাজতে থাকে। কোনো খাদ্যরসিক বন্ধুকে কালা ভুনার কথা বললে তিনি হয়তো অনেকগুলো রেস্টুরেন্টের নাম বলে দেবে। আর সেখানে হয়তো আপনি ভালো স্বাদের কালা ভুনা পেয়েও যাবেন। কিন্তু, কালো রংয়ের ভুনা মানেই কি কালা ভুনা?
অনেকে বলেন, এই কালা ভুনা বস্তুটি একান্ত চট্টগ্রামের। কেউ কেউ বলেন, ঢাকার। তবে, মাংস সংরক্ষণ পদ্ধতির কথা যদি ধরতে হয়, তাহলে হয়ত সব এলাকারই কালা ভুনার মালিকানা দাবি করার অধিকার আছে। আর এখানে ‘হাইলি সাসপিশাস’ কোনো ব্যাপার নেই। তবে একটা বিষয়ে খটকা আছে।
‘জাহাজি কালিয়া’ বলে একটি পদ আমাদের উপমহাদেশের আদিকালের নাবিকরা খেতেন। আর সেটা তারা রান্না করা শিখেছিলেন আরবদের কাছ থেকে। আরবরা বহু বহু বছর আগে থেকে আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করতেন। মাসের পর মাস তাদের জাহাজে চড়ে ইউরোপ পর্যন্ত যেতে হতো। মশলা নিয়ে বাণিজ্য করে বেড়াত দিকদিগন্তে। জয়তুন তেল ব্যবহার করে গরু বা খাসির মাংস থেকে এই কালিয়া তৈরি করা হতো। রাখা হতো চিনামাটির পাত্রে। এই খাবার কয়েক মাস পর্যন্ত ভালো থাকত।
জাহাজি কালিয়া পরিবেশনে শুধু শুকনো কাঠের চামচ ব্যবহার করা হতো। কারণ, ভেজা চামচে মাংস নষ্ট হয়ে যেত। জাহাজি কালিয়া থেকে কালা ভুনা এসেছে-এমন অকাট্য প্রমাণ নেই। হতে পারে কালা ভুনা আর কালিয়ার মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই কিংবা হয়তো অনেক দূরের কোনো একটা সম্পর্ক আছে।

কালা ভুনা মানে এখন অনেকে বিশ্বাস করেন কষিয়ে কষিয়ে মাংস কালো করে ফেলার একটা রেস্টুরেন্টকেন্দ্রিক গল্প। কিন্তু মানুন আর না মানুন, এটা কালা ভুনা নয়।
কোরবানির ঈদের সময় যখন মাংসের প্রচুর সরবরাহ থাকে, তখন সেগুলোকে সংরক্ষণ করার দরকার পড়ে। আজ থেকে বছর ২০ আগেও গ্রামে ফ্রিজ ছিল না। ফ্রিজ তো দূরের কথা ইলেকট্রিসিটিও যেত, আর আসত। এসব জানা গল্প। কিন্তু সে সময়ও মানুষ খাবার সংরক্ষণ করত। খাবার সংরক্ষণ করার নানা উপায়ও ছিল। যেমন, এই জাহাজি কালিয়া।
সেরকমই একটি পদ্ধতি হলো, অনেক মাংস এক সঙ্গে হাঁড়িতে জ্বাল দিয়ে রাখা। প্রতিদিন অল্প অল্প জ্বাল পড়তো। হাড়সুদ্ধ মাংস বেশি করে রাখা হতো, যাতে নরম করে খাওয়া যায়। চর্বিও পড়ত তাতে। চর্বি দেওয়ার বিষয়টি আরেক জায়গার গল্প মনে করিয়ে দেয়। কাজাখস্তানে যাযাবররা একসময় পশু মেরে মাংস খেয়ে বাকিটা তারই চর্বিতে জ্বাল দিয়ে রাখত। তাতে মাংস নষ্ট হতো না। বেশ কিছুদিন রাখা যেত।
গ্রাম-বাংলায় মাংস জ্বাল দেওয়ার প্রক্রিয়া চলত তিন-চারদিন ধরে। এরপর জ্বাল দেওয়া সেই মাংস হাঁড়ি থেকে মাংস তুলে আলাদাভাবে হালকা মসলা দিয়ে রান্না করা হতো। যেহেতু প্রতিদিন মাংসের হাঁড়িতে জ্বাল দেওয়া হতো, তাই মাংস নরম হয়ে ধীরে ধীরে কালচে রং ধারণ করতো। কিন্তু মাংসের ভেতরটা থাকত গোলাপি। আর এই রংটায় যে কত মায়া, তা খাদ্যরসিকেরা জানেন। হতে পারে এটাই কালা ভুনার আদি উৎস।
চট্টগ্রামের কালা ভুনার খ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে গেছে। চট্টগ্রামের বিশেষ খ্যাতি থাকলেও মাংস সংরক্ষণ করার এ পদ্ধতি অনেক প্রাচীন এবং এটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই প্রচলিত। তবে রন্ধনপ্রণালি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম আছে। আছে মসলা ব্যবহারের ভিন্নতাও।
ক্রনিকাল খানা ডটকমে শেফ শুভদীপ জানিয়েছেন, অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে কালা ভুনা প্রথম পরিবেশন করা হয় বলে মনে করা হয়। উৎপত্তির নির্দিষ্ট ইতিহাস ‘অস্পষ্ট’ বলেও শুভদীপ জানিয়েছেন। তার মতে, কেউ কেউ মনে করেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রভাব এতে ছিল, আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহর দরবারে পরিবেশিত হয়েছিল।
শুভদীপ কলকাতার গোলবাড়ির কষা মাংসের সঙ্গে বাংলাদেশি কালা ভুনার সাযুজ্য খুঁজেছেন। যারা গোলবাড়ির কষা মাংস খেয়েছেন তারা ব্যাপারটা মেলাতে পারবেন। গোলবাড়ির এই খাবার খাসির মাংসের, আর কালাভুনা সাধারণত গরুর মাংস দিয়ে তৈরি করা হয়। দুইটি খাবারের মধ্যে ঐতিহাসিক বিশেষ লিখিত ঐতিহাসিক সংযোগ পাওয়া কঠিন।
শেফ শুভদীপ টেক্সাসের ব্রিস্কেটের সঙ্গেও কালাভুনার মিল পেয়েছেন। মার্কিন মুলুকের টেক্সাসের ব্রিস্কেটও অনেকটা সময় নিয়ে বারবিকিউ করা হয়। ওপরটা কালো রংয়ের হয় ভেতরটা মায়াময় গোলাপি। যদিও দুটো খাবারের ধরন আলাদা। তবুও বন্দরনগরী তো আর সেদিনকার নগর নয়। বহু বছরের বা লেখা ভালো, কয়েক শ বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দর নিজ গুণে বিরাজমান। এর সৌন্দর্যের খ্যাতি গ্রিসেও পৌঁছে গিয়েছিল। হতেই পারে নানা কিছু লেনদেনের মতো রন্ধনপ্রণালীরও অদল-বদল হয়েছে।
এবার যখন কোনো রেস্টুরেন্টে বসে কালা ভুনা খাবেন, মনে রাখবেন, মাত্র ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে রান্না করে যে পদটি আপনার সামনে এসেছে, সেটা আদতে কালো রংয়ের ভুনা। ‘কালা ভুনা’ নয়।

কালা ভুনা জিনিসটা একটি হট সেলিং আইটেম। মাংসের তেলতেলে এই পদ গরম ভাতের সাথে মিলে যে সুর তোলে, তার অনুরণন অনেকক্ষণ মনে (আসলে পেটে) বাজতে থাকে। কোনো খাদ্যরসিক বন্ধুকে কালা ভুনার কথা বললে তিনি হয়তো অনেকগুলো রেস্টুরেন্টের নাম বলে দেবে। আর সেখানে হয়তো আপনি ভালো স্বাদের কালা ভুনা পেয়েও যাবেন। কিন্তু, কালো রংয়ের ভুনা মানেই কি কালা ভুনা?
অনেকে বলেন, এই কালা ভুনা বস্তুটি একান্ত চট্টগ্রামের। কেউ কেউ বলেন, ঢাকার। তবে, মাংস সংরক্ষণ পদ্ধতির কথা যদি ধরতে হয়, তাহলে হয়ত সব এলাকারই কালা ভুনার মালিকানা দাবি করার অধিকার আছে। আর এখানে ‘হাইলি সাসপিশাস’ কোনো ব্যাপার নেই। তবে একটা বিষয়ে খটকা আছে।
‘জাহাজি কালিয়া’ বলে একটি পদ আমাদের উপমহাদেশের আদিকালের নাবিকরা খেতেন। আর সেটা তারা রান্না করা শিখেছিলেন আরবদের কাছ থেকে। আরবরা বহু বহু বছর আগে থেকে আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্য করতেন। মাসের পর মাস তাদের জাহাজে চড়ে ইউরোপ পর্যন্ত যেতে হতো। মশলা নিয়ে বাণিজ্য করে বেড়াত দিকদিগন্তে। জয়তুন তেল ব্যবহার করে গরু বা খাসির মাংস থেকে এই কালিয়া তৈরি করা হতো। রাখা হতো চিনামাটির পাত্রে। এই খাবার কয়েক মাস পর্যন্ত ভালো থাকত।
জাহাজি কালিয়া পরিবেশনে শুধু শুকনো কাঠের চামচ ব্যবহার করা হতো। কারণ, ভেজা চামচে মাংস নষ্ট হয়ে যেত। জাহাজি কালিয়া থেকে কালা ভুনা এসেছে-এমন অকাট্য প্রমাণ নেই। হতে পারে কালা ভুনা আর কালিয়ার মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই কিংবা হয়তো অনেক দূরের কোনো একটা সম্পর্ক আছে।

কালা ভুনা মানে এখন অনেকে বিশ্বাস করেন কষিয়ে কষিয়ে মাংস কালো করে ফেলার একটা রেস্টুরেন্টকেন্দ্রিক গল্প। কিন্তু মানুন আর না মানুন, এটা কালা ভুনা নয়।
কোরবানির ঈদের সময় যখন মাংসের প্রচুর সরবরাহ থাকে, তখন সেগুলোকে সংরক্ষণ করার দরকার পড়ে। আজ থেকে বছর ২০ আগেও গ্রামে ফ্রিজ ছিল না। ফ্রিজ তো দূরের কথা ইলেকট্রিসিটিও যেত, আর আসত। এসব জানা গল্প। কিন্তু সে সময়ও মানুষ খাবার সংরক্ষণ করত। খাবার সংরক্ষণ করার নানা উপায়ও ছিল। যেমন, এই জাহাজি কালিয়া।
সেরকমই একটি পদ্ধতি হলো, অনেক মাংস এক সঙ্গে হাঁড়িতে জ্বাল দিয়ে রাখা। প্রতিদিন অল্প অল্প জ্বাল পড়তো। হাড়সুদ্ধ মাংস বেশি করে রাখা হতো, যাতে নরম করে খাওয়া যায়। চর্বিও পড়ত তাতে। চর্বি দেওয়ার বিষয়টি আরেক জায়গার গল্প মনে করিয়ে দেয়। কাজাখস্তানে যাযাবররা একসময় পশু মেরে মাংস খেয়ে বাকিটা তারই চর্বিতে জ্বাল দিয়ে রাখত। তাতে মাংস নষ্ট হতো না। বেশ কিছুদিন রাখা যেত।
গ্রাম-বাংলায় মাংস জ্বাল দেওয়ার প্রক্রিয়া চলত তিন-চারদিন ধরে। এরপর জ্বাল দেওয়া সেই মাংস হাঁড়ি থেকে মাংস তুলে আলাদাভাবে হালকা মসলা দিয়ে রান্না করা হতো। যেহেতু প্রতিদিন মাংসের হাঁড়িতে জ্বাল দেওয়া হতো, তাই মাংস নরম হয়ে ধীরে ধীরে কালচে রং ধারণ করতো। কিন্তু মাংসের ভেতরটা থাকত গোলাপি। আর এই রংটায় যে কত মায়া, তা খাদ্যরসিকেরা জানেন। হতে পারে এটাই কালা ভুনার আদি উৎস।
চট্টগ্রামের কালা ভুনার খ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে গেছে। চট্টগ্রামের বিশেষ খ্যাতি থাকলেও মাংস সংরক্ষণ করার এ পদ্ধতি অনেক প্রাচীন এবং এটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই প্রচলিত। তবে রন্ধনপ্রণালি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম আছে। আছে মসলা ব্যবহারের ভিন্নতাও।
ক্রনিকাল খানা ডটকমে শেফ শুভদীপ জানিয়েছেন, অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে কালা ভুনা প্রথম পরিবেশন করা হয় বলে মনে করা হয়। উৎপত্তির নির্দিষ্ট ইতিহাস ‘অস্পষ্ট’ বলেও শুভদীপ জানিয়েছেন। তার মতে, কেউ কেউ মনে করেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রভাব এতে ছিল, আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহর দরবারে পরিবেশিত হয়েছিল।
শুভদীপ কলকাতার গোলবাড়ির কষা মাংসের সঙ্গে বাংলাদেশি কালা ভুনার সাযুজ্য খুঁজেছেন। যারা গোলবাড়ির কষা মাংস খেয়েছেন তারা ব্যাপারটা মেলাতে পারবেন। গোলবাড়ির এই খাবার খাসির মাংসের, আর কালাভুনা সাধারণত গরুর মাংস দিয়ে তৈরি করা হয়। দুইটি খাবারের মধ্যে ঐতিহাসিক বিশেষ লিখিত ঐতিহাসিক সংযোগ পাওয়া কঠিন।
শেফ শুভদীপ টেক্সাসের ব্রিস্কেটের সঙ্গেও কালাভুনার মিল পেয়েছেন। মার্কিন মুলুকের টেক্সাসের ব্রিস্কেটও অনেকটা সময় নিয়ে বারবিকিউ করা হয়। ওপরটা কালো রংয়ের হয় ভেতরটা মায়াময় গোলাপি। যদিও দুটো খাবারের ধরন আলাদা। তবুও বন্দরনগরী তো আর সেদিনকার নগর নয়। বহু বছরের বা লেখা ভালো, কয়েক শ বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দর নিজ গুণে বিরাজমান। এর সৌন্দর্যের খ্যাতি গ্রিসেও পৌঁছে গিয়েছিল। হতেই পারে নানা কিছু লেনদেনের মতো রন্ধনপ্রণালীরও অদল-বদল হয়েছে।
এবার যখন কোনো রেস্টুরেন্টে বসে কালা ভুনা খাবেন, মনে রাখবেন, মাত্র ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে রান্না করে যে পদটি আপনার সামনে এসেছে, সেটা আদতে কালো রংয়ের ভুনা। ‘কালা ভুনা’ নয়।