ads

ভূমিকম্পের পর কী ঘটছে ভেনেজুয়েলায়

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভূমিকম্পের পর কী ঘটছে ভেনেজুয়েলায়
ভেনেজুয়েলা ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে স্বজনদের খুঁজছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি: এপি/ইউএনবি

ভয়াবহ ভূমিকম্পের ছয় দিন পরও লা গুয়াইরার সমুদ্রতীরবর্তী একটি ধসে পড়া ভবনের সামনে অপেক্ষা করছেন অ্যাঞ্জেলিকা মুন্দ্রাইন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন তার ছেলে, ভাতিজি ও ভাতিজা। তাদের মরদেহ উদ্ধারে প্রয়োজন একটি টেলিস্কোপিক ক্রেন, কিন্তু সেটি এখনো সেখানে পৌঁছেনি। কংক্রিটের বিশাল স্ল্যাব ও লোহার মোচড়ানো কাঠামো সরিয়ে তাদের মরদেহ উদ্ধারের জন্য ভারী যন্ত্রপাতির অপেক্ষায় দিন গুনছেন এই সন্তানহারা মা।

শুধু অ্যাঞ্জেলিকা নন, ভূমিকম্প থেকে বেঁচে যাওয়া ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের অসংখ্য মানুষের মনে এখন একই প্রশ্ন—এই উদ্ধারকাজের দায়িত্বে আসলে কে?

গত ২৪ জুন ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশটির লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য, রাজধানী কারাকাস এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বহু বহুতল ভবন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ফার্মেসি ও দোকানপাট ধসে পড়ে। এই দুর্যোগে সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯৪৩ জন নিহত এবং ১০ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এছাড়া হাজারো মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করার কথা থাকলেও ভেনেজুয়েলাজুড়ে দেখা দিয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। উদ্ধার তৎপরতায় ধীরগতি, সমন্বয়হীনতা এবং প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে ক্ষোভে ফুঁসছেন দুর্গতরা। তাদের অভিযোগ, সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে সরকার কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক সরকারের এমন চরম মুহূর্তে নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভের আগুন জ্বলছে সাধারণ মানুষের মনে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিজেদের জনগণের রক্ষক ও সেবাদাতা হিসেবে পরিচয় দিলেও সমাজতান্ত্রিক সরকার দুর্যোগের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময়ে সেই দায়িত্ব পালন করছে না। ভূমিকম্পে দেশজুড়ে যে ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি হয়েছে, তাতে ২৭ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা দেশটির শাসক দলের মৌলিক প্রশাসনিক সক্ষমতার কঙ্কাল রূপটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে দেশটিতে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দেলসি রদ্রিগেজ।

উদ্ধারকাজে এগিয়ে স্থানীয় মানুষ ও বিদেশি দল

ভূমিকম্পের পর প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টাকে উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সময়ে সরকারি তৎপরতা মূলত সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিভিন্ন সড়কের মোড়ে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলেও উদ্ধার অভিযানে তাদের কার্যকর কোনো ভূমিকা ছিল না।

এরই মধ্যে সাধারণ মানুষ নিজেরাই স্বজনদের উদ্ধারে নেমে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা তাদের সহায়তা করেন। তাপ শনাক্তকারী ক্যামেরা, শব্দ শনাক্তকারী যন্ত্র এবং প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করে বিদেশি দলগুলো ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালায়।

এদিকে, দীর্ঘ যানজটে আটকে ছিল অ্যাম্বুলেন্স। হাসপাতালগুলোতে ছিল চিকিৎসাকর্মী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট। জরুরি সেবাকর্মীদেরও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছাড়াই কাজ করতে হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যখন সাধারণ মানুষ ও বিদেশি উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরাতে ব্যস্ত, তখন অনেক সরকারি কর্মকর্তা ও ইউনিফর্ম পরা সদস্যকে শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে কিংবা ছবি তুলতে দেখা গেছে।

ভেঙে পড়েছে প্রশাসনিক সক্ষমতা

গত তিন দশক ধরে ভেনেজুয়েলা নিয়ে গবেষণা করা যুক্তরাষ্ট্রের টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড স্মিল্ডে বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, “এ দুর্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, গত জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী আটকে রাখার ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যর্থতা ছিল না।”

তার ভাষায়, “সরকার মানুষের মরদেহ উদ্ধারের ন্যূনতম কাজটুকুও শুরু করতে পারছে না।”

স্মিল্ড আরও জানান, স্বল্প বেতন, ব্যাপক দুর্নীতি এবং সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির কারণে দেশটির প্রশাসনিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনায় একটি রূপক ব্যবহার করে স্মিল্ডে বলেন, “এটা যেন তিনজন খেলোয়াড় নিয়ে একটি বেসবল দল পরিচালনার চেষ্টা। কে পিচার, কে ক্যাচার আর কে আউটফিল্ডে থাকবে, সেটাই কেউ জানে না।”

ভিআইপিদের জন্য আলাদা সুবিধা, বঞ্চিত সাধারণ মানুষ

এই চরম বিপদেও সরকারের সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সম্পদ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বড় ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, যেসব ধসে পড়া ভবনে সরকারি কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বসবাস করতেন, সেখানে উদ্ধার অভিযান তুলনামূলক দ্রুত ও বেশি গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত হয়েছে।

ভূমিকম্পের পর একটি ধসে পড়া ভবনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও সামরিক অ্যাকাডেমির ক্যাডেটদের উদ্ধার তৎপরতা চালাতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে জানা যায়, সেখানে সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং এক পুলিশের ক্যাপ্টেন ও এক মেজর জেনারেলকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছিল।

লা গুয়াইরায় ভূমিকম্পের দুই দিন পর ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজেদের নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে স্থানীয় বাসিন্দাদের আহাজারি। ছবি: এপি/ইউএনবি
লা গুয়াইরায় ভূমিকম্পের দুই দিন পর ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজেদের নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে স্থানীয় বাসিন্দাদের আহাজারি। ছবি: এপি/ইউএনবি

মুন্দ্রাইনের পরিবারের সদস্যদের মরদেহ উদ্ধারে যে ধরনের টেলিস্কোপিক ক্রেন প্রয়োজন, সেটি কয়েক ঘণ্টা ওই ধসে পড়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু ভবনটির ধনী বাসিন্দাদের স্বজনেরা সেটি ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া করায় তার মতো সাধারণ মানুষের কপালে তা জোটেনি।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “আমাদের ভবনেও যদি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি থাকতেন, তাহলে এখানেও অন্য জায়গার মতো পুরো একটি কার্যকর উদ্ধার ব্যবস্থা নেওয়া হতো।”

সরকারি এই বৈষম্যের কারণে কয়েকটি এলাকায় উদ্ধারযন্ত্রের চালকদের সঙ্গে স্থানীয়দের বাগ্‌বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। এক জায়গায় ক্ষুব্ধ জনতা সরকারি একটি খননযন্ত্র আটকে চালককে কেবিন থেকে নামিয়ে তাকে উদ্ধারকাজে অংশ নিতে বাধ্য করে।

এখনও মিলছে জীবিত মানুষ

সব প্রতিকূলতার মধ্যেও মঙ্গলবার উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে কয়েকজন জীবিতকে উদ্ধার করেন। এতে স্বজনদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হলেও সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা ততই কমে আসছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা থাকলে কয়েক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

বিদ্যুৎ মিস্ত্রি দানিয়েল কাস্তিয়ো ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ধসে পড়া সরকারি আবাসনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে তার মা ও ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করেন। তবে তার ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করতে আরও এক দিন সময় লাগে।

মঙ্গলবার সেনাবাহিনীর একটি ত্রাণকেন্দ্রের সামনে সাবান ও টয়লেট পেপারসহ স্বাস্থ্যসামগ্রী নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাস্তিয়ো। এ সময় ক্ষোভ উগরে দিয়ে সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।

কাস্তিয়ো বলেন, “ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যদের ইউনিফর্ম একেবারে ঝকঝকে, কোথাও ধুলাবালির দাগ নেই। অথচ সাধারণ মানুষ ও বিদেশি উদ্ধারকারীরা দিনের পর দিন ধ্বংসস্তূপে কাজ করতে করতে ধুলাবালিতে একসা হয়ে গেছেন। এই সরকার আসলে আমাদের জন্য কিছুই করছে না।”

সম্পর্কিত