ads

জিদান যেদিন কাঁদিয়েছিলেন ব্রাজিলকে

জিদান যেদিন কাঁদিয়েছিলেন ব্রাজিলকে
ছবি : এক্স

জিনেদিন জিদান নামটি শুনলেই প্রথমেই আপনার চোখে কি ভেসে ওঠে? উত্তরটা পৃথিবীর যে কোনায় হোক না কেন, অধিকাংশই হয়ত একবাক্যে বলবেন মার্কো মাতেরাজ্জিকে দেওয়া তার সেই বিখ্যাত ‘ঢুঁস’! অবিশ্বাস্যই বটে। একজন মিডফিল্ডার, যিনি জিতেছেন বিশ্বকাপ এবং থাকেন সর্বকালের সেরাদের আলোচনায়, সেই একই ফুটবলার কিনা প্রবল স্মরণীয় অমন একটা কাণ্ডের জন্য!

তবে বল পায়ে ‘জিজু’ জিদান যে কত বড় মাপের একজন শিল্পী, সেটা ফরাসি কিংবদন্তি অজস্রবার দেখিয়েছেন। ১৯৯৮ বিশ্বকাপই যেমন। ঘরের মাটিতে সেই বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে নিয়ে মাতামাতি ছিল কমই। তাই এই দলটি কেমন বা জিদান নামে যে একজন মিডফিল্ড গ্রেট আছেন, সেটা অনেকের কাছেই ছিল অজানা। আর বাংলাদেশে সবার আকর্ষণ কেবল একজনকে ঘিরেই। আর সেটা ব্রাজিলের কিংবদন্তি ‘দ্য ফেনোমেনন’ রোনালদো। ব্রাজিলের খেলা মানেই রোনালদোর পায়ের জাদুতে মোহাবিষ্ট হওয়া। কে জানত, শেষ পর্যন্ত সেই অচেনা ঘাতক জিদানই রোনালদোর কান্নার কারণ হবেন!

সেই বিশ্বকাপে ফাইনালের আগ পর্যন্ত জিদান সেভাবে নিজেকে আলোচনায় আনতে পারেননি, যতোটা পেরেছিলেন ২০০৬ সালে। ১৯৯৮ ফাইনালে জোড়া গোলে ফ্রান্সকে প্রথমবার বিশ্বকাপ এনে দিয়ে চলে আসেন পাদপ্রদীপের চূড়ায়। তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স জিদান উপহার দেন ৮ বছর পর। প্রতিপক্ষ সেই ব্রাজিলই!

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই ম্যাচ নিয়ে রোনাল্ডো বলেছেন, “আমরা বুঝতেই পারছিলাম না জিজুকে কীভাবে থামানো যাবে। ওর পায়ে বল যেন আঠার মত লেগে ছিল সেদিন। জিদান সেদিন যেভাবে খেলেছে, একজন ফুটবলারের জন্য সেটা স্বপ্ন।”

কোয়ার্টার ফাইনালে সেই ম্যাচের আগে কেউই গোনায় ধরছিলেন না ফ্রান্সকে। বলা হচ্ছিল জিদান আর ১০ জন নিয়ে খেলছে দলটি। অন্যদিকে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দল যেন তারকার হাট। রোনালদো, রোনালদিনিয়ো, কাকা, আদ্রিয়ানো, কাফু, রবার্তো কার্লোসদের নিয়ে গড়া সেই দলের সামনে ফ্রান্সকে নিয়ে বাজি ধরার লোক ছিল কমই।

তবে ফ্রান্সের যে ছিলেন একজন জিদান। ৯০ মিনিটের সেই ম্যাচের হাইলাইটস যদি আপনি আজও দেখেন, বিস্ময়ের সব সীমা ছাড়িয়ে যাবে। ব্রাজিলের সব নামীদামী খেলোয়াড়দের স্রেফ পাড়ার ফুটবলার বানিয়ে ড্রিবল করেছেন সেদিন জিদান। কাফু, রবার্তো কার্লোসের মত ইতিহাসের সেরা ডিফেন্ডারদের বারবার বোকা বানিয়ে বল নিয়ে ছুটেছেন।

দলের অন্যরাও জানতেন, এই ম্যাচ জিততে তাদের জিদানকেই লাগবে। তাই প্রায় প্রতিটি আক্রমণের সূচনাই হয়েছিল তার পা থেকেই। কখনও কয়েকজন মিলে তাকে ঘিরে ধরছেন তো কখনও ফাউলের চেষ্টা, তবে কিছুতেই দমানো যায়নি তাকে। রোনাল্ডোর সামনে থেকে একটি বলের দখল নিয়েছিলেন তার মাথার ওপর দিয়ে ভলি করে। ব্রাজিল তারকা শুধু চেয়ে দেখেছেন জিদানের সামনে নিজের অসহায়ত্ব।

শুধু তিনি একাই নন, ব্রাজিল দলের সবার চিত্রটাই ছিল একই। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের জয়সূচক গোলটিও আসে জিদান জাদুতেই। বক্সের অনেক বাইরে থেকে ফ্রি-কিক থেকে ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের ফাঁক গোলে নিখুঁতভাবে খুঁজে নেন থিয়েরি অঁরিকে।

পরিসংখ্যানের দিক থেকেও সেই ম্যাচে জিদান ছিলেন অতুলনীয়, অবিশ্বাস্য, অদম্য। মোট ৭৯ বার বল স্পর্শ করে ৫৮টি সফল পাস দেন। ড্রিবল করেন ১১ বার, বলের দখল রাখেন ১৮ বার (৯৫% সফলতা)। ৬ বার বল পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি ফাউল আদায় করেন ৫টি।

আক্রমণেও ছিলেন সমান উজ্জ্বল। ১৯ বার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন, গোলের বড় সুযোগ তৈরি করেছেন দুই বার। হেনরির গোলে অ্যাসিস্ট বাদে ইন্টারসেপশন করেন ৩টি।

৩৪ বছর বয়সে জিদানের অসাধারণ সেই পারফরম্যান্স তাই বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা মিডফিল্ড মাস্টারক্লাসগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফুটবল দলগত খেলা হলেও একজন খেলোয়াড় কীভাবে পুরো একটা দলকে হারিয়ে দিতে পারেন, সেটা সেদিন টের পেয়েছিল ব্রাজিল।

জিদান এরপর ফ্রান্সকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালেও। পানেনকা পেনাল্টিতে গোলও করেছিলেন ইতালির বিপক্ষে। তবে মাতেরাজ্জিকে এক ঢুঁস মেরে হয়ে যান ট্র্যাজিক হিরো। লাল কার্ড দেখে তিনি মাঠ ছাড়ার পর টাইব্রেকারে হেরে যায় ফরাসিরা।

তবে ২০ বছর পরও ২০০৬ বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ আসলেই ব্রাজিলের বিপক্ষে জিদানের সেই অতিমানবীয় ফুটবলের স্মৃতিই সবার আগে চলে আসতে বাধ্য। জিজু তো এই কারণেই ইতিহাসে অনন্য।

সম্পর্কিত