ads

শুধু ইরানি ফুটবলারদেরই কেন রাজনীতির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
শুধু ইরানি ফুটবলারদেরই কেন রাজনীতির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়?
গত ২৬ জুন সিয়াটল স্টেডিয়ামে মিসর বনাম ইরান ম্যাচের আগে গ্রুপ ছবিতে ইরানি খেলোয়াড়রা। ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি বিশ্বকাপ ম্যাচ চলাকালে এক ওয়াচ পার্টিতে দক্ষিণ আফ্রিকান কমেডিয়ান ট্রেভর নোয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন, “আফ্রিকান বা মধ্যপ্রাচ্যের দলগুলোকে কেন তাদের সরকারের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, যেখানে ইউরোপীয় দলগুলোকে তা করতে হয় না?”

মূলত ইরান দলের ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমা সাংবাদিকদের প্রশ্নবানের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই মন্তব্য করেন। তবে এই প্রশ্নটি কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক সাংবাদিকতার একটি পরিচিত বৈষম্যমূলক স্তরবিন্যাসকে সামনে এনে দেয়, যেখানে কিছু খেলোয়াড়কে কেবলই ক্রীড়াবিদ হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, আর অন্যদের রূপান্তর করা হয় দেশের দূত, আসামি বা নৈতিকতার প্রদর্শনীতে।

বিশ্বকাপকে প্রায়শই রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি আসর হিসেবে প্রচার করা হলেও, এটি সবসময়ই একটি মিথ্যা ধারণা ছিল। খেলাধুলায় রাজনীতি ও ভণ্ডামি বরাবরের মতোই মিশে আছে। সরকারি নীতির কারণে বহু দলকে অতীতে নিষিদ্ধ বা বয়কট করা হয়েছে। যেমন ইউক্রেনে আক্রমণের কারণে রাশিয়া নিষিদ্ধ হয়েছে এবং বর্ণবাদের কারণে একসময় দক্ষিণ আফ্রিকা নিষিদ্ধ হয়েছিল।

অথচ ফিলিস্তিন, লেবানন ও সিরিয়া দখল এবং গাজায় গণহত্যা ও বর্ণবাদের বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল ঠিকই বাছাইপর্বে খেলার সুযোগ পায়। ঠিক তেমনি, বহু আগ্রাসী যুদ্ধ চালানো সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রকে কখনো নিষিদ্ধ করা হয়নি। এই ধরনের সিলেক্টিভ বা পক্ষপাতমূলক জবাবদিহিতা কেবল ক্রীড়া সংস্থাতেই নয়, প্রেস বক্সেও দৃশ্যমান।

সম্প্রতি সিয়াটলে ইরান ও মিশরের মধ্যকার একটি ম্যাচের আগে, উভয় দলকেই এলজিবিটিকিউ অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। ফিফা কর্মকর্তা কেবল খেলা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অনুরোধ জানালেও সাংবাদিকেরা নাছোড়বান্দা ছিলেন।

কিন্তু এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়দের কখনই মার্কিন বোমাবর্ষণ, সীমান্ত নীতি, বর্ণবাদ বা ইসরায়েলকে সমর্থনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় না। ইংলিশ বা ফরাসি খেলোয়াড়দের তাদের দেশের ঔপনিবেশিক অতীত বা সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। যখনই ইউরোপীয় দলগুলো রাজনীতিতে জড়িয়েছে–যেমন কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি দলের মুখে হাত দেওয়া বা ইউরো ২০২০-এ হাঁটু গেড়ে বসা–সেগুলো ছিল তাদের নিজস্ব ইচ্ছার প্রতিবাদ, কোনো জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নয়।

পশ্চিমা ফুটবলারদের এমন এক ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় যারা কেবল একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। অপরদিকে ইরান, মিশর, মরক্কো বা সেনগালের মতো গ্লোবাল সাউথের খেলোয়াড়দের খুব সহজেই তাদের দেশের শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধি বানিয়ে ফেলা হয়। তাদের জন্য সংবাদ সম্মেলনগুলো যেন এক একটি আদর্শিক চেকপয়েন্ট, যেখানে কৌশল বা ইনজুরি নিয়ে কথা বলার আগে তাদের সমাজ, ধর্ম বা যুদ্ধ নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়।

এই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমা গণমাধ্যমের সেই পুরনো আখ্যানকেই টিকিয়ে রাখছে–যেখানে পশ্চিমারাই হলো নৈতিকতার একমাত্র মাপকাঠি, আর বাকি বিশ্বকে প্রতিনিয়ত তাদের কাছে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে। আসল কথা হলো, রাজনীতি সবসময়ই খেলাধুলায় ছিল। তবে প্রশ্ন হলো কাকে সেই রাজনীতির বোঝা বইতে বাধ্য করা হচ্ছে আর কাকে স্বাধীনভাবে শুধু খেলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

আল জাজিরা অবলম্বনে

সম্পর্কিত