ট্রাম্পের কেন গ্রিনল্যান্ড লাগবেই?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ট্রাম্পের কেন গ্রিনল্যান্ড লাগবেই?
ট্রাম্পের মনে গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেওয়ার ইচ্ছা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন বাহিনী যখন ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করল, তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ‘অতিরঞ্জিত’ হুমকি বাস্তবে রূপ নিল।

পরবর্তী দিনগুলোতে, তার বৈদেশিক নীতি সংক্রান্ত আকাঙ্ক্ষার তালিকায় থাকা অন্যান্য বিষয়গুলো নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে। কয়েক মাস ধরে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে থাকার পর তিনি আবারও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সরব হয়েছেন। ট্রাম্পের মনে ডেনমার্কের শাসনাধীন বিশাল আর্কটিক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি দখল করে নেওয়ার ইচ্ছা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

এদিকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন সোমবার আবারও জোর দিয়ে ডেনমার্কের অবস্থান খুব স্পষ্ট করে দিয়েছেন এবং গ্রিনল্যান্ডও বারবার বলেছে যে, তারা আমেরিকার অংশ হতে চায় না।

দীর্ঘদিনের মিত্র ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখল ন্যাটো জোটের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করবে এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ইউরোপীয় নেতাদের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে। এমনকি ফ্রেডেরিকসেন এই মর্মে সতর্কবাণীও দিয়েছেন যে, গ্রিনল্যান্ড দখল ন্যাটো বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু কোনো কিছুকেই গায়ে মাখছেন না ট্রাম্প।

গ্রিনল্যান্ডের অনেক বাসিন্দার কাছেই আমেরিকা কর্তৃক তাদের অঞ্চলটি দখল করে নেওয়ার এই আলোচনা ‘চরম অসম্মানের বহিঃপ্রকাশ’।

তাহলে ট্রাম্প কেন ইউরোপের সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টি করে গ্রিনল্যান্ড দখলের পায়তারা করছেন?

কৌশলগতভাবে গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব

জলবায়ু সংকটের কারণে আরও প্রকট হয়ে ওঠা তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত বিষয় গ্রিনল্যান্ডকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত করেছে–এর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং চারপাশের সম্ভাব্য উত্তরমুখী নৌপথ।

গ্রিনল্যান্ড আমেরিকা এবং ইউরোপের মাঝখানে অবস্থিত। এটি তথাকথিত ‘জিআইইউকে গ্যাপ’ বরাবর বিস্তৃত,যা গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মধ্যবর্তী একটি সামুদ্রিক পথ। এই ‘গ্যাপ’ আর্কটিক বা সুমেরু মহাসাগরকে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এমন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা, উভয় ক্ষেত্রেই উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত অপরিহার্য।

গ্রিনল্যান্ডের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স
গ্রিনল্যান্ডের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল, গ্যাস ও বিরল খনিজসহ গ্রিনল্যান্ডের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে যখন চীন এই বিরল খনিজ শিল্পের ওপর তার আধিপত্যকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। এই খনিজগুলো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং উইন্ড টারবাইন থেকে শুরু করে সামরিক সরঞ্জাম, সবকিছু তৈরির জন্যই এগুলোর প্রয়োজন হয়।

জলবায়ু সংকটের কারণে আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় গ্রিনল্যান্ডের এই বিশাল খনিজ ভাণ্ডার আহরণ করা হয়তো সহজতর হয়ে উঠবে। তবে এখানকার পাহাড়ি ভূখণ্ড, অবকাঠামোর অভাব এবং বিদ্যমান পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে প্রকৃতপক্ষে এগুলো খনন করে তোলা বেশ কঠিন হবে।

বরফ গলে যাওয়ার ফলে উত্তরমুখী নৌপথগুলো বছরের দীর্ঘ সময় জুড়ে চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠছে, যা বাণিজ্য ও নিরাপত্তা, উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্বকে ট্রাম্প কিছুটা খাটো করে দেখিয়েছেন। গত মাসে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন, খনিজের জন্য নয়।”

কিন্তু তার সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ট্রাম্পের আসল নজর ছিল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরই। তিনি ফক্স নিউজকে জানিয়েছিলেন, গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে প্রশাসনের মূল মনোযোগ ছিল ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ’ এবং ‘প্রাকৃতিক সম্পদের’ দিকে।

এই সবকিছুর অর্থ হলো, জলবায়ু সংকট যখন এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি বদলে দিচ্ছে, তখন আমেরিকা, চীন এবং রাশিয়া এখন আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একে অপরের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত।

সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ভূখণ্ডের এক-চতুর্থাংশের বেশি অংশ আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত, তাই মস্কো সবসময়ই এই অঞ্চলটিকে তাদের প্রতিরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনও এই লড়াইয়ে যোগ দিয়েছে। ২০১৮ সালে তারা নিজেকে একটি ‘আর্কটিক-নিকটবর্তী দেশ’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং সুমেরু অঞ্চলের নৌ-চলাচলের জন্য একটি ‘মেরু সিল্ক রোড’ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।

ট্রাম্প যা বলছেন

ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড কেনার সম্ভাবনা নিয়ে খোঁজখবর নিয়েছিলেন এবং দ্বীপটির পক্ষ থেকে ‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়’ বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি পুনরায় সেই দাবি উত্থাপন করেন। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তা এবং বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতার স্বার্থে, গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ নেওয়া আমাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।”

২০২৫ সালের মার্চ মাসে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দ্বীপটি সফর করেন। সেখানে তিনি বলেন, দ্বীপটির ডেনিশ নেতৃত্বে পরিবর্তন দেখা ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি’। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদেরই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা উচিত। গ্রিনল্যান্ডের জনমত জরিপগুলোতে আমেরিকার অংশ হওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট বিরোধিতা দেখা গেছে।

গত বছরের মার্চ মাসে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ড সফর করেন। ছবি: রয়টার্স
গত বছরের মার্চ মাসে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ড সফর করেন। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের মতে, পুরো গ্রিনল্যান্ড রুশ ও চীনা জাহাজে ছেয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে এই বিষয়টি তার সহ্য হওয়ার কথা নয়।

যেভাবে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারেন

হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক আলোচনা অনুযায়ী, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব প্রতিহত করতে এবং খনিজ সম্পদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে ট্রাম্প সম্ভাব্য তিনটি উপায়ে গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার অংশ করতে পারেন।

সরাসরি কিনে নেওয়া: ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ হলো ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার জন্য একটি বড় ‘চুক্তি’ করা। ২০১৯ সালেও তিনি এমন আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, সঠিক মূল্যের বিনিময়ে ডেনমার্ক এই দ্বীপটি বিক্রয় করতে রাজি হতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক বাহিনীর ব্যবহারকে 'কৌশলগত চাপ' হিসেবে দেখছেন। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক বাহিনীর ব্যবহারকে 'কৌশলগত চাপ' হিসেবে দেখছেন। ছবি: রয়টার্স

সামরিক শক্তির ব্যবহার: হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে ট্রাম্প সামরিক বাহিনীকে ব্যবহারের বিকল্পটি খোলা রেখেছেন। যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এটিকে ‘তাৎক্ষণিক আক্রমণ’ নয় বরং একটি কৌশলগত চাপ হিসেবে দেখিয়েছেন। তবুও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হয়েছে।

চুক্তি ও প্রভাব বিস্তার: সরাসরি দখল বা কেনা সম্ভব না হলে, ‘কম্প্যাক্ট অব ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন’ জাতীয় চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হতে পারে। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রচারণার মাধ্যমে দ্বীপটির ওপর মার্কিন প্রভাব বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে একে আমেরিকার ‘কেন্দ্র’-এ পরিণত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ন্যাটোর কী হবে?

আমেরিকা যদি গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে এটি ন্যাটো জোটের মধ্যে ফাটল ধরাতে পারে।

মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করেন যে, গ্রিনল্যান্ড দখল ন্যাটো বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। ছবি: রয়টার্স
মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করেন যে, গ্রিনল্যান্ড দখল ন্যাটো বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। ছবি: রয়টার্স

ফ্রেডেরিকসেন সোমবার বলেন, “আমেরিকা যদি অন্য কোনো ন্যাটো সদস্য দেশে সামরিক হামলা চালান, তবে সবকিছু থেমে যাবে। এর মধ্যে ন্যাটো এবং সেই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিশ্চিত হওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত।”

মঙ্গলবার ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলোর নেতৃবৃন্দ ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। তারা জানান, আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলের নিরাপত্তা অবশ্যই আমেরিকাসহ অন্যান্য ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বজায় রাখতে হবে।

ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন, ব্রিটেন ও ডেনমার্কের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “গ্রিনল্যান্ড তার জনগণের। ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের।”

সম্পর্কিত