রেজা পাহলভি কি ইরানে ফিরতে পারবেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
রেজা পাহলভি কি ইরানে ফিরতে পারবেন?
ইরানের শেষ শাহের (সম্রাট) নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি। ছবি: রয়টার্স

দীর্ঘ ৪৬ বছরের নির্বাসন শেষে ইরানের শেষ শাহের (সম্রাট) নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি কি তবে ফিরছেন? তেহরানের রাজপথ থেকে শুরু করে ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্ক সর্বত্র এখন এই একটিই প্রশ্ন। একদিকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনের বিরুদ্ধে ইরানে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার মাদুরোকে মার্কিন কমান্ডোদের হাতে গ্রেপ্তারের ঘটনায় তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক নতুন এক রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।

২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন কেবল অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের রাজধানী তেহরানসহ অন্তত ২২২টি স্থানে ‘একই যুদ্ধ, একই পথ—পাহলভি ফিরবে এবার’ এবং ‘জাবিদ শাহ’ (দীর্ঘজীবী হোক শাহ) স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে আকাশ-বাতাস। শিয়া ধর্মের অন্যতম কেন্দ্র কোম শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা গাজা ও লেবাননে অর্থ ঢালার প্রতিবাদে এবং দেশের শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।

বিক্ষোভে উত্তাল ইরান। ছবি: রয়টার্স
বিক্ষোভে উত্তাল ইরান। ছবি: রয়টার্স

পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’ দাবি করেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি রাশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। অন্যদিকে, ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের পরিবারের জন্য প্যারিসের ভিসার চেষ্টা চালাচ্ছেন। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ জানিয়েছে, গত ১৩ দিনের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এ পর্যন্ত ৪৫ জন নিহত এবং ২,২৬০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হয়েছেন।

১৯৭৮ সালে ১৭ বছর বয়সে যখন রেজা পাহলভি যুদ্ধবিমানের পাইলট হতে যুক্তরাষ্ট্রে যান, তখনো তিনি জানতেন না যে তাকে ৪৬ বছর নিজ দেশ থেকে দূরে থাকতে হবে। তার পিতা মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের পর খোমেনির নেতৃত্বে যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার আয়ু এখন ফুরিয়ে আসছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

গত ৬ জানুয়ারি যুবরাজ রেজা পাহলভি প্রথমবারের মতো সরাসরি আন্দোলনের ডাক দেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার ইরানি রাজপথে নেমে আসে, যার ফলে সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করতে বাধ্য হয়। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে রেজা পাহলভি বলেছেন, “আমি সারা জীবন দেশের সেবা করার প্রশিক্ষণ নিয়েছি। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আমি চূড়ান্ত বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে ইরানে ফিরতে প্রস্তুত।”

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। ছবি: রয়টার্স
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। ছবি: রয়টার্স

যুবরাজ রেজা পাহলভির জনপ্রিয়তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কানাডিয়ান রাজনীতিবিদ গোল্ডি ঘামারি দাবি করেছেন, পাহলভির প্রতি ইরানিদের সমর্থন প্রায় ৮৫%। তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা একে কিছুটা ‘অতিরঞ্জিত’ বলে মনে করেন।

জার্মান সংস্থা ‘গামান ইনস্টিটিউট’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৩৫ শতাংশ ইরানি সরাসরি রাজতন্ত্র বা পাহলভিকে সমর্থন করেন। বিশ্লেষক শাহিন মোদারেসের মতে, ৩৫ শতাংশ সমর্থন একটি বিশাল শক্তি। তবে প্রশ্ন হলো, ৪৬ বছরেও এই সমর্থন কেন শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করতে পারল না? তবে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের মাইকেল রুবিন মনে করেন, বর্তমান দমনমূলক ব্যবস্থার চেয়ে ইরানিরা পাহলভির আদর্শকেই বেশি পছন্দ করবে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করেছে, তা ইরানের মোল্লাতন্ত্রের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ট্রাম্পের ‘গায়ের জোরই সব’ নীতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা খামেনি প্রশাসনকে শঙ্কিত করে তুলেছে।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প রেজা পাহলভি সম্পর্কে কিছুটা রহস্যজনক অবস্থান নিয়েছেন। ট্রাম্প পাহলভিকে ‘একজন ভালো মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করলেও তার সাথে এই মুহূর্তে বৈঠক করাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে এড়িয়ে গেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের নীতি হলো আগে ইরান ভেতর থেকে ভেঙে পড়ুক, তারপর দেখা যাবে কে ক্ষমতায় আসে। যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত নীরবতা ইঙ্গিত দেয় যে, তারা সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের পথে বড় বাধা কেবল খোমেনি নন, বরং ইরানের বিশাল সামরিক কাঠামো—ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং বাসিজ মিলিশিয়া। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রজার ম্যাকমিলানের মতে, খোমেনির পতন হলেও যদি এই কাঠামো টিকে থাকে, তবে শাসনব্যবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন হবে না।

রেজা পাহলভি কি ২১ শতকের ইরানে একজন আধুনিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ফিরবেন, নাকি তিনি কেবল এক রাজকীয় স্মৃতির প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবেন—তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের পরিস্থিতির ওপর।

সম্পর্কিত