ads

গালিবাফ ও আরাঘচিকে হত্যার ইসরায়েলি পরিকল্পনা ভেস্তে দিল যুক্তরাষ্ট্র

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
গালিবাফ ও আরাঘচিকে হত্যার ইসরায়েলি পরিকল্পনা ভেস্তে দিল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল ইসরায়েল। এই তালিকায় শীর্ষস্থানীয় ইরানি প্রতিনিধিদেরও রাখা হয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইরানি নেতাদের এই হত্যা পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার শান্তি আলোচনা চিরতরে ভেস্তে দিতে ইসরায়েল এই ষড়যন্ত্র করেছিল।

গত ৩ জুলাই শুক্রবার প্রকাশিত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে নিউ ইয়র্ক টাইমস এই তথ্য প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটি তাদের এই বিশেষ প্রতিবেদনে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত মার্কিন সরকারি সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে এই তথ্যটি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে যে, ইসরায়েলের এই চরমপন্থী ও বিপজ্জনক সামরিক পরিকল্পনাটি জানার পর মার্কিন প্রশাসন নীরব দর্শক হিসেবে বসে থাকেনি। তারা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে এই সম্ভাব্য গুপ্তহত্যা প্রতিরোধ করার জন্য সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মধ্যস্থতা ও হস্তক্ষেপ করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, কোনোভাবেই এই শান্তি আলোচনা যাতে ব্যাহত না হয়।

এই সংবেদনশীল ঘটনার গভীরতা ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত মার্কিন-ইরান কারিগরি পর্যায়ের শান্তি আলোচনার সাইডলাইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠককে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গত ২১ জুন অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ অসীম মুনির যৌথভাবে ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে একটি বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন।

যখন পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো এই শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং মার্কিন-ইরান সম্পর্কের বরফ গলানোর জন্য বুর্গেনস্টকে কাজ করছিল, ঠিক সেই সময়ে ইসরায়েলের তরফ থেকে ইরানের এই দুই মূল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে সামনে এনে দেখানো হয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কীভাবে ইসরায়েলের এই একক ও আগ্রাসী রণকৌশলকে তাদের নিজস্ব কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য একটি বিশাল বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন তখন নিশ্চিতভাবে জানতে পেরেছিল যে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অন্ততপক্ষে ইসরায়েলের 'টার্গেট লিস্ট'-এর অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই তথ্যটি জানার পরপরই ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়।

কারণ গালিবাফ ও আরাঘচি দুজনেই ছিলেন মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনার মূল চালিকাশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে নিশ্চিত করেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন এই টার্গেট লিস্টের কথা জানার পর কালবিলম্ব না করে অত্যন্ত কঠোরভাবে ইসরায়েলকে অনুরোধ করে যেন তারা কোনোভাবেই মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে লক্ষ্যবস্তু না বানায় এবং এই ধরনের আত্মঘাতী পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি অনুরোধ বা এক প্রকার নিষেধাজ্ঞা এটিই নির্দেশ করে যে, তখন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন রণকৌশলের মধ্যে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও গভীর ফাটল তৈরি হয়েছিল। যেখানে আসলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান চাচ্ছিল এবং ইসরায়েল চাচ্ছিল চরম আঘাতের মাধ্যমে আলোচনা টেবিলকে গুঁড়িয়ে দিতে।

এই প্রতিবেদনে ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি নিয়েও বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধের একেবারে সূচনালগ্ন থেকেই ইরানের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক নেতৃত্বকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা বা হত্যা করা ইসরায়েলের সামগ্রিক যুদ্ধের একটি প্রধান এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ইসরায়েল সবসময়ই বিশ্বাস করে এসেছে যে, ইরানি নেতৃত্বকে নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমেই তারা তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্বেগটি তীব্রতম আকার ধারণ করে বিশেষ করে গত এপ্রিল মাসে, যখন আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনা শুরু হয়।

এপ্রিল মাসে এই সংবেদনশীল যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে আব্বাস আরাঘচি ও মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সরাসরি এই শান্তি প্রক্রিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। ওয়াশিংটন তখন বুঝতে পারে যে এই দুই নেতার ওপর কোনো ধরনের হামলা বা তাদের হত্যাকাণ্ড কেবল দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াবে না, বরং তা চিরতরে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাকে কবর দিয়ে দেবে। ফলে এপ্রিল থেকে শুরু করে জুনের বুর্গেনস্টক বৈঠক পর্যন্ত পুরো সময়টাতেই মার্কিন গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক মহল ইসরায়েলের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের ওপর কড়া নজরদারি বজায় রেখেছিল।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনের সেই গভীর আশঙ্কার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত যে কোনো একটি গুপ্তহত্যা সফল হলে তা সমগ্র যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে লাইনচ্যুত বা চিরতরে ধ্বংস করে দেবে। এই ভয়াবহ কূটনৈতিক বিপর্যয় এড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইসরায়েলের ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা একটি অত্যন্ত চতুর ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করেছিল।

মার্কিন সূত্রগুলো প্রকাশ করেছে যে, চরম ভীতি ও উদ্বেগ থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অন্যান্য বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর কাছে জরুরি ভিত্তিতে অনুরোধ জানিয়েছিল যেন তারা অবিলম্বে ইরানের সরকারকে এই বিষয়ে সতর্ক বার্তা পৌঁছে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল, আঞ্চলিক দেশগুলোর মাধ্যমে ইরানকে এটি জানানো যে ইসরায়েল যেকোনো মুহূর্তে তাদের প্রধান দুই আলোচক আব্বাস আরাঘচি ও মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে টার্গেট করে হামলা চালাতে পারে। এই সতর্কবার্তা দেওয়ার মূল লক্ষ্য ছিল যাতে ইরানে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয় এবং তারা যেন কোনোভাবেই ইসরায়েলের পাতা ফাঁদে পা না দেয়, যার ফলে শান্তি আলোচনাটি টিকে থাকে।

সামগ্রিকভাবে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই বিশেষ প্রতিবেদনের মাধ্যমে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে কারিগরি পর্যায়ের শান্তি আলোচনা চলছিল, তা কতটা ভঙ্গুর ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল। একদিকে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুদ্ধের একটি স্থায়ী ও কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার জন্য সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে ইরানের শীর্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্পিকারের সাথে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ আলোচনায় ব্যস্ত ছিল, ঠিক অন্য দিকে তাদেরই পরম মিত্র ইসরায়েল সেই সব আলোচকদেরকে হত্যা করার জন্য টার্গেট লিস্ট তৈরি করছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ অসীম মুনিরের সাথে ইরানি প্রতিনিধিদের জুনের সেই বৈঠক প্রমাণ করে যে বিশ্বনেতারাও এই শান্তি প্রক্রিয়ার পক্ষে ছিলেন।

কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উন্মোচিত মার্কিন কর্মকর্তাদের এই স্বীকারোক্তি এটিই প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে সৃষ্ট কূটনৈতিক সংকট কাটাতে এবং শান্তি আলোচনাকে বাঁচিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল এবং কীভাবে তারা আঞ্চলিক দেশগুলোকে ব্যবহার করে ইরানের সাথে এক প্রকার পরোক্ষ নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে তুলেছিল। এই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে মিত্রদের মধ্যকার স্বার্থের সংঘাত এবং শান্তির পেছনে থাকা অন্ধকার ও জটিল গোয়েন্দা লড়াইয়ের বাস্তব চিত্রটি নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে।

সম্পর্কিত