তাইজার সান বর্তমানে মিয়ানমারের সবচেয়ে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ ব্যক্তি। কৃশকায়, চশমা পরা এই চিকিৎসক ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ওই অভ্যুত্থান দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে। এরপরের বছরগুলোতে সাধারণ মানুষের সহায়তায় তিনি একের পর একবার গ্রেপ্তার এড়িয়ে গেছেন এবং জান্তা-বিরোধী আন্দোলনের প্রতীকী মুখে পরিণত হয়েছেন।
ডিসেম্বরের শুরুতে তিনি হঠাৎ করেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে আবির্ভূত হন। সামরিক সদর দপ্তরের ঠিক পাশের একটি বাজারে দাঁড়িয়ে তিনি ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া জান্তার তথাকথিত নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। তাকে এক নজর দেখেই উল্লসিত জনতা করতালি দেয়, তিন আঙুলের স্যালুট তোলে, যা সামরিক শাসনের বিরোধিতার আন্তর্জাতিক প্রতীক। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাইজার সান আবার লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। এটি ছিল তার অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ।
কিন্তু এই নাটকীয় দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। এমন এক সময়ে এই প্রতিবাদ ঘটল, যখন মিয়ানমারের বিপ্লবীদের জন্য ২০২৫ সাল শেষ হতে চলেছে একের পর এক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় সক্রিয় সংখ্যালঘু জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো জান্তার কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে পড়েছে। দেশের মধ্যাঞ্চলে লড়াইরত তরুণ বিদ্রোহীরাও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের এক নিবন্ধে বলা হয়, এই প্রেক্ষাপটেই জান্তা সরকার আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভূখণ্ড পুনর্দখলের জন্য নৃশংস অভিযান জোরদার করেছে। তিন ধাপে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন আগামী ২৫ জানুয়ারি শেষ হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে যত বেশি সম্ভব এলাকা ‘নিরাপদ’ দেখানোই এখন জান্তার প্রধান লক্ষ্য।
মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। ছবি: রয়টার্স২০২৪ সালের শেষদিকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হয়েছিল। তখন গুজব ছড়িয়েছিল যে বিদ্রোহীরা মান্দালয় ঘেরাও করতে যাচ্ছে, এমনকি সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু সেই আশাবাদ দ্রুতই মিলিয়ে যায়। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রথমত, চীনের ভূমিকা। জান্তার পতনে সীমান্তজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কায় চীন বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রসদ সরবরাহ কার্যত বন্ধ করে দেয়। ২০২৪ সালে চীন দুটি বড় বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে তাদের দখল করা এলাকা সরকারের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাপ দেয়। একটি গোষ্ঠী অস্বীকৃতি জানালে, চীন তাদের নেতাকে অপহরণ করে এবং জান্তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সই করার পরই তাকে মুক্তি দেয়। পাশাপাশি, ওই গোষ্ঠীগুলোকে অন্য বিদ্রোহীদের কাছে গোলাবারুদ বিক্রি বন্ধ করতে বলা হয়। এর ফলে বিদ্রোহীরা মারাত্মক বুলেট সংকটে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, ইউএসএআইডি বন্ধ হওয়া ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি বিলুপ্ত হওয়ায় বিদ্রোহীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। যদিও সংস্থাটি সরাসরি অস্ত্র দিত না, তবে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকা সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য ও মানবিক সহায়তা সরবরাহ করত। এই সহায়তা বন্ধ হওয়ায় বিদ্রোহীদের নিজেদের সীমিত সামরিক বাজেট থেকেই মানবিক ব্যয় মেটাতে হয়। উদাহরণ হিসেবে, থাই সীমান্তঘেঁষা কারেন রাজ্যে বিদ্রোহীরা ২০২৩ সালের শেষদিকে বড় সাফল্য পেলেও, ২০২৫ সালে তাদের সামরিক বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ মানবিক খাতে ব্যয় করতে বাধ্য হয়। ফলে জান্তার পাল্টা আক্রমণে তারা রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো হারায়।
তৃতীয়ত, বাধ্যতামূলক সৈন্য নিয়োগ ও মাদকের ব্যবহার। ২০২৪ সালে জান্তা সরকার তরুণদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ নতুন সৈন্য যুক্ত হয়েছে। এই তরুণদের অনেককেই অ্যামফিটামিন জাতীয় মাদকে আসক্ত রাখা হচ্ছে এবং ধারণা করা হয়, তারা ইউক্রেন যুদ্ধে অভিজ্ঞ রুশদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছে। তাদেরকে বিদ্রোহীরা গোলাবারুদের অভাবে ঠেকাতে পারছে না।
চতুর্থত, আকাশপথে প্রযুক্তির আগ্রাসী ব্যবহার। যুদ্ধের শুরুতে ড্রোন ব্যবহারে পিছিয়ে থাকলেও, এখন জান্তা ব্যাপকভাবে চীনা ড্রোন ব্যবহার করছে। এমনকি মোটরচালিত প্যারাগ্লাইডার দিয়ে বিদ্রোহী এলাকায় স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালানো হচ্ছে । এই আকাশপথের হামলা বিদ্রোহীদের পক্ষে দখলকৃত এলাকা শাসন ও ধরে রাখা কঠিন করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে তথাকথিত নির্বাচন জান্তার জন্য একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার। যুদ্ধের কারণে দেশের বিশাল অংশে ভোট দেওয়া সম্ভব হবে না। তবুও জান্তার সিদ্ধান্ত যদি কোনো এলাকায় মাত্র একটি ভোটকেন্দ্রও খোলা যায়, সেখান থেকেই একজন এমপি নির্বাচিত হবে। এই লক্ষ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে হামলা ও দমন অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
কাগজে কলমে মিয়ানমারে প্রায় ৫৫টি দল নির্বাচনে অংশ নিতে নিবন্ধিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কার্যকর সব বিরোধী দল নিষিদ্ধ। ইতিমধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে ২০০’র বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও আছেন, যারা কেবল মান্দালয়ে তাইজার সানের মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন।
মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচি। ছবি: রয়টার্সতা সত্ত্বেও, এই নির্বাচন জান্তার জন্য এক ধরনের বাহ্যিক ‘বৈধতা’ এনে দিতে পারে। ২০২১ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের পর মিয়ানমার আঞ্চলিকভাবে প্রায় একঘরে হয়ে পড়েছিল। আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলন থেকে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংকে বাদ দেওয়া হয়, অনেক দেশ রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে। তবে এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ এই কঠোর অবস্থান নিয়ে পুনর্বিবেচনা করছে এবং জান্তার সঙ্গে আবার সংলাপের অজুহাত খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনটি জান্তার অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। সেনাবাহিনীর কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা মিন অং হ্লাইংকে অযোগ্য মনে করেন এবং ২০২৪ সালের সামরিক ব্যর্থতার জন্য তাকে দায়ী করেন। কূটনৈতিক সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনের পর তিনি হয় রাষ্ট্রপতি অথবা সেনাপ্রধান এই দুই পদের একটি ছেড়ে দিতে পারেন। এতে প্রকৃত ক্ষমতা না হারিয়েই ভেতরের বিরোধ শান্ত করার চেষ্টা থাকতে পারে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এতে একটি তুলনামূলক ‘সম্মিলিত নেতৃত্ব’ গড়ে উঠতে পারে,যা চীনের কাছেও গ্রহণযোগ্য। কারণ মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে কাজ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল।
তবে এসব কৌশলের কোনোটিই মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনবে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। তাইজার সান ও তার সহযোদ্ধারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, একটি প্রহসনের নির্বাচন কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। পাঁচ বছর ধরে মিছিল, আত্মগোপন ও সশস্ত্র প্রতিরোধের পরও তারা এখনো একটি সত্যিকারের, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অপেক্ষায় অনড় রয়েছেন।