প্রথম দিনের লাঞ্চে কী বার্তা দিলেন জোহরান

প্রথম দিনের লাঞ্চে কী বার্তা দিলেন জোহরান
আলুর দম, পনির টিক্কা ভারতীয় খাবার হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। মোমো তীব্বতীয় এবং বাও চাইনিজ খাবার। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র হিসেবে প্রথম দিনের শুরুতেই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন জোহরান মামদানি।
তার প্রথম দিনটি শুরু হয়েছিল ডেমোক্র্যাট দলের নেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজের সঙ্গে। দক্ষিণ এশীয় বিশেষ করে ভারতীয় খাবার দিয়ে তারা মধ্যাহ্ন ভোজ সারেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই রাজনীতিক তার ‘ব্যস্ত প্রথম দিন’-এর কিছু ছবি স্যোশাল মিডিয়া এক্সে শেয়ার করে লিখেছেন, “আপনাদের নবনির্বাচিত মেয়র হিসেবে একটি ব্যস্ত প্রথম দিন: ভোরবেলার বৈঠক, ক্ষমতা হস্তান্তর সংক্রান্ত ঘোষণা এবং বৈঠক। এসব বিষয়ে আগামীকাল আরও বলব। তবে বিশেষ মুহূর্ত ছিল, আমার কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজের সঙ্গে জ্যাকসন হাইটসের লালিগুরাস বিস্ট্রোতে মধ্যাহ্নভোজ।”

ছবিতে দেখা যায়, ওকাসিও-কর্তেজ ও জোহরান মোমো, আলুর দম, পনির টিক্কা, বাও খাচ্ছেন। সঙ্গে ছিল দুধ চা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি দুপুরের খাবারের মেন্যু তুলে ধরে লিখেছে, “মামদানির দক্ষিণ এশীয় ঐতিহ্যের প্রতি এক অনন্য শ্রদ্ধা।”

আলুর দম, পনির টিক্কা ভারতীয় খাবার হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। মোমো তীব্বতীয় এবং বাও চাইনিজ খাবার। জোহরান এবং ওকাসিও যে চা পান করেছেন তা উপমহাদেশে খুবই পরিচিত। ছোট কাচের গ্লাসে দুধ চা।

লালিগুরাস বিস্ট্রো নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যাকসন হাইটসে অবস্থিত একটি ভারতীয় ও নেপালি রেস্তোরাঁ।

ডেমোক্র্যাট দলের নেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজের সঙ্গে জোহরান মামদানি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
ডেমোক্র্যাট দলের নেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজের সঙ্গে জোহরান মামদানি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

সাধারণভাবে আলুর দম উপমহাদেশে খুবই দৈনন্দিন একটি খাবার। বড় উদযাপনে হয়ত এটি খাওয়া হয় না। আর আলু এমন একটি সবজি যা সব তরকারিতে যায়। আলুর দমকে হয়ত জোহরান সেই জায়গা থেকে দেখেছেন। এমন একটি খাবার যা প্রতিদিন খাওয়া হয়। আর তিনি সেই মেয়র হতে চান যাকে সবাই নিজের মনে করেন।

চায়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে দেখা যায়। জোহরান যে দুধ চা পান করেছেন তা ছোট কাচের গ্লাসে পরিবেশন করা হয়েছে। উপমহাদেশে এভাবে চা পরিবেশন খুবই সাধারণ ও জনপ্রিয়। বিশেষ করে ভারতে। মুম্বাইবাসীর কাছে ‘কাটিং চা’ তাদের নিজেদের; প্রতিদিনের জীবন যাপনের অংশ। জোহরান মামদানি তেমনই নিউইয়র্কের দক্ষিণ এশীয়দের মেয়র হতে চান। ট্রাম্পের বর্ণবাদী, কট্টর জাতীয়তাবাদী মনোভাবের বিরুদ্ধে অভিবাসীদের জন্য নিউইয়র্ককে সহজ করতে চান। মোমো এবং বাও-এর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। দুটি খাবারই সাধারণ। যেমনটি হতে চান জোহরান।

জোহরান মামদানির নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে জয়লাভ বহু দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা শুধু নয় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই শহরের প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় মেয়র জোহরান। গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে তরুণ মেয়রও তিনি। ধনবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই ও সাশ্রয়ী জীবনযাপনের পক্ষে ‘বামপন্থী এজেন্ডা’ নিয়ে প্রচার চালিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

তবে জোহারান মামদানির এই বিজয় শুধু তার পরিচয়ের জন্য নয়, বরং যেভাবে তিনি সেই পরিচয়কে আপন করে নিয়েছেন, তার জন্যও তা এক মাইলফলক।

বিজয় ভাষণে তিনি যখন মঞ্চ ছাড়েন, উৎসাহী জনতার করতালিতে ভরে যায় জায়গাটি। আর স্পিকারে বাজছিল নিউইয়র্ক নিয়ে কোনো গান নয়, বরং বলিউডের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘ধুম’ সিনেমাটার টাইটেল সং।

জোহরান বলেন, আমি তরুণ, যদিও বয়স বাড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি। আমি মুসলিম, আমি একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী।”

দক্ষিণ এশীয়রা বর্তমানে আমেরিকার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল জনগোষ্ঠী, যাদের সংখ্যা ৫০ লক্ষাধিক। এই জনগোষ্ঠী আমেরিকার রাজনীতিতেও অনেক এগিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের কথাও মনে করা যেতে পারে।

তবে একসময়ের প্রভাবশালী ভারতীয়–আমেরিকান রাজনীতিক রিপাবলিকান গভর্নর নিকি হ্যালি ও ববি জিন্দাল অবশ্য একটু ভিন্ন ছিলেন। দুজনেই রক্ষণশীল দক্ষিণী অঙ্গরাজ্যের নেতা। নিজেদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার গল্পকে বারবার তুলে ধরেছেন।

কিন্তু জোহরানের দক্ষিণ এশীয় পরিচয় সবসময় সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তিনি উগান্ডায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মা দুইজন বিশিষ্ট ভারতীয় বংশোদ্ভূত। বাবা মাহমুদ মামদানি একজন প্রখ্যাত একাডেমিক, এবং তার মা মীরা নায়ার একজন পানজাবি হিন্দু চলচ্চিত্র নির্মাতা।

মামদানি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেন, জ্যাকসন হাইটসের এক কাবাব দোকানই তার প্রিয় রেস্তোরাঁ। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে তিনি লাগার্ডিয়া বিমানবন্দরে গাড়ি গাড়ি ঘুরে প্রচারণা চালান দক্ষিণ এশীয় ট্যাক্সি চালকদের মধ্যে।

নিউ ইয়র্ক শহরে ভারতীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা গত বেশ কিছু বছরে এই অঞ্চলের খাবারেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। শুধু দক্ষিণ এশীয়রাই নন, শেতাঙ্গ আমেরিকানদের মধ্যেও এই খাবার জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যা মূলত ভারতীয় খাবার হিসেবেই পরিচিত।

নিউ ইয়র্ক তথা আমেরিকার দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের দক্ষিণ এশীয়দের জন্য, খাবার হলো তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগগুলির মধ্যে অন্যতম। ঐতিহ্যবাহী খাবার একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, স্মৃতি এবং পরিচয়কে সংরক্ষণ করে।

সপ্তাহ শেষে হালুয়া পুরি দিয়ে সকালের নাস্তা বা গভীর রাতে চাট খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা শুধু রুটিন নয়-এগুলো হলো উদযাপন।

মনস্তাত্ত্বিক গবেষণাগুলো বলছে, একজনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া আত্মমর্যাদা এবং মানসিক সুস্থতা বৃদ্ধি করে। আর এই কারণেই হয়ত জোহরান তার মেয়র হিসেবে প্রথম কর্মদিবসে দক্ষিণ এশীয় খাবার দিয়ে উদযাপন করলেন।

জোহরান হয়ত বোঝাতে চাইলেন, শেতাঙ্গ আমেরিকানদের চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ এশীয়রা। যারা দুই প্রজন্ম ধরে আমেরিকার অর্থনীতিতে অবদান রাখখেন। আর সেজন্যই তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রতীকী উপস্থাপন তিনি সাধারণ খাবার দিয়ে দেখাতে চাইলেন।

সম্পর্কিত