নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে সম্মেলন ঘিরে ভারতের এবারের প্রকাশ্য আয়োজন তিন বছর আগে জি-২০ সম্মেলনের সময়ের মতো জাঁকজমকপূর্ণ নয়। আয়োজন সাদামাটা হলেও সম্মেলনটির গুরুত্ব কমে যায়নি। উদীয়মান বড় অর্থনীতি ও গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতাদের এই বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
হংকং-ভিত্তিক ইংরেজি সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দুই দেশ ভারত ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সম্মেলন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হতে পারে।
এই সম্মেলনের মাধ্যমে প্রায় সাত বছর পর ভারতে সফর করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের ফাঁকে শনিবার সি চিনপিংয়ের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে সি চিনপিংয়ের। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা। এর আগে মোদি ও সি চিনপিংয়ের বৈঠকের দিকে ওয়াশিংটন থেকে মস্কো পর্যন্ত নজর থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। অন্যদিকে, রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ও জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে ২০ বছর আগে ব্রিকস জোট গঠিত হয়। পরে দক্ষিণ আফ্রিকাও এতে যোগ দেয়। ধনী ও উন্নত দেশগুলোর জোট জি৭-এর প্রভাবের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করাই ছিল ব্রিকস গঠনের অন্যতম লক্ষ্য।
এখন ব্রিকস গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ জোট। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এতে রয়েছে।
এই জোটে জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ, বড় উৎপাদনকারী দেশ এবং দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে এসব দেশের সম্পর্ক একরকম নয়।
নয়াদিল্লির এই সম্মেলন মূলত একটা ‘টেস্ট কেস’। এতে বোঝা যাবে ব্রিকস জোট নিজেদের স্বার্থে একসঙ্গে কতটা কাজ করতে পারে।
জি-৭ এর মতো ব্রিকসের কোনো শক্তিশালী বা নির্দিষ্ট নেতৃত্ব নেই। তাই দেশগুলোর মধ্যে আরও বেশি মিল খুঁজে বের করতে হবে এবং সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তবে এত ভিন্ন দেশের জোট হয়েও ব্রিকস এখন পর্যন্ত অনেক দূর এগিয়েছে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, নয়াদিল্লির এই সম্মেলন ব্রিকস দেশগুলোর ঐক্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জোটের সদস্যরা এখন বুঝতে পারছেন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় তাদের একসঙ্গে কাজ করা দরকার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কঠোর ও সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতি এবং বিশ্বের অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও রয়েছে।
এই কারণেই সম্মেলনের এবারের মূল স্লোগানও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এবারের স্লোগানও হলো- ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ।’
অনেক দিন ধরেই চীন ও ভারতের সম্পর্কের কারণে ব্রিকসে কিছু সমস্যা রয়েছে। সীমান্ত নিয়ে বিরোধের কারণে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাও আছে। ব্রিকসের বৈঠকে যোগ দিয়ে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করে সি চিনপিং দুই দেশের সম্পর্ক ভালো করতে চাইছেন। তিনি দুই দেশের মতপার্থক্যও কমাতে চাইছেন।
এটি ব্রিকসের জন্য ভালো খবর। চীন ও ভারতের সম্পর্ক ভালো হলে এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বাড়বে। একই সঙ্গে ব্রিকসও আরও শক্তিশালী হবে।
এশিয়ায় স্থিতিশীল পরিবেশ ধরে রাখতে সি চিনপিং গত এক মাসে কয়েকটি দেশ সফর করেছেন। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রথমে তিনি সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশন সম্মেলনে যোগ দিতে কিরগিজস্তান সফর করেন। এরপর ১০ বছর পর প্রথমবারের মতো মিশর সফর করেন। এবার তিনি ভারত সফরে এসেছেন।
বছরের শুরুতে সি চিনপিং বেশিরভাগ সময় বেইজিংয়ে ছিলেন। তখন তিনি বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এশিয়ায় স্থিতিশীলতার এই বার্তা চীনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় চীন আরও শক্ত অবস্থান থেকে কথা বলতে পারবে।
চীন ও ভারতের জন্য এই সপ্তাহের বৈঠকগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এসব বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি ও সি চিনপিং সীমান্তের উত্তেজনা আরও কমানোর চেষ্টা করতে পারেন।
বিতর্কিত সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কিছু সমঝোতা হয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা কমানো এবং সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়েও তারা ধীরে ধীরে একমত হয়েছে। তবে মাঝে মাঝে আবার উত্তেজনার খবর পাওয়া যায়।
আশা করা যায়, সি চিনপিংয়ের এই সফরের পর দুই দেশ আগের সমঝোতা আরও ভালোভাবে মানবে। এতে দুই দেশের সম্পর্কও ধীরে ধীরে ভালো হতে পারে।
অর্থনৈতিক দিকেও ভারত সমস্যায় আছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি ভারত থেকে বিদেশি বিনিয়োগও কমছে। চীন ও ভারতের সম্পর্ক ভালো হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও বাড়তে পারে। ভারতে চীনের বিনিয়োগও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ব্রিকসের এবারের সম্মেলন গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হয়ে উঠছে।