বরিশালে দৈনিক সমকালের সাবেক ব্যুরোপ্রধান ও বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জির (৫৭) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার সন্ধ্যার পর নগরীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্যারারা রোডে সমকালের বরিশাল ব্যুরো কার্যালয় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ ও সহকর্মীরা জানান, পুলক চ্যাটার্জি দীর্ঘদিন সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর তিনি আর কোনো চাকরিতে ছিলেন না। তবে সাবেক সহকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল, মাঝেমধ্যে সমকাল কার্যালয়ে এসে পত্রিকা পড়তেন। অফিসের একটি বিকল্প চাবিও তার কাছে ছিল।
শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে পুলক চ্যাটার্জি সমকাল কার্যালয়ে ঢোকেন। অফিসের সিসি ক্যামেরায়ও তা ধরা পড়ে। ব্যুরোর বর্তমান অফিস প্রধান সুমন চৌধুরী সে সময় কার্যালয়ে ছিলেন না।
এরপর কীভাবে পুলক চ্যাটার্জির লাশ উদ্ধার হলো, সে বর্ণনা গতকালই পাওয়া গিয়েছিল সুমন চৌধুরীর কাছে, “পুলক চ্যাটার্জি তার স্ত্রীর ফোন ধরছিলেন না। বিষয়টি পুলকের স্ত্রী আমাকে জানান। এরপর শুক্রবার সন্ধ্যায় আমি সমকাল অফিসে আসি। তখন অফিসের ঢোকার দরজা ভেতর থেকে আটকানো দেখতে পাই। পরে দরজার ফাঁক দিয়ে পুলক চ্যাটার্জিকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তার লাশ উদ্ধার করে।”
গতকালই ময়নাতদন্তের জন্য পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম আজ বলেছেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা মনে করছি, এটা আত্মহত্যা। আজ সকালে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বলা যাবে।”
ঘটনাস্থল থেকে পুলক চ্যাটার্জির হাতে লেখা পাঁচটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এগুলোতে তার স্ত্রী ও মেয়ে, ছোট ভাই, পুলিশ প্রশাসন, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে পৃথক বার্তা লেখা ছিল।
স্ত্রী ও মেয়ের উদ্দেশে পুলক চ্যাটার্জির চিরকুট। ছবি: সংগৃহীত
পুলিশ প্রশাসনের উদ্দেশে লেখা চিরকুটের ওপরে লেখা ছিল ‘সুইসাইড নোট’। সেখানে পুলক চ্যাটার্জি লিখে গেছেন, “আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শরীরের রোগ-যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিলাম না। সুস্থ থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। ইন্ডিয়ার ভেলোরে পর্যন্ত ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু সুস্থ হতে পারিনি। অসুস্থতা আমাকে সামাজিকভাবেও পিছিয়ে দিচ্ছে। শরীরের যন্ত্রণার কারণে কোথাও যেতে পারতাম না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কোনো প্রকার হয়রানি না করে আমার লাশ আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।”
স্ত্রী ও মেয়ের জন্য আলাদা চিরকুটে পুলক চ্যাটার্জি লিখেছেন, “আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতি, তুমি পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেও। প্রিয়াংকা, আমার অনুপস্থিতি তোমার জীবনে পূরণ হবার নয়। তারপরও কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। তোমার দীপক (চান) ভাইয়ের সাথে থেকো। দীপক তোমাকে আগলে রাখবে।”
পুলক চ্যাটার্জির স্ত্রী নিলোৎপলা মুখার্জি (ডাকনাম প্রিয়াংকা) সাংবাদিকদের বলেন, ২০২৩ সালের দিকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তারপর থেকে তিনি বেকার ছিলেন।
স্ত্রী ও মেয়ের উদ্দেশে পুলক চ্যাটার্জির চিরকুট। ছবি: সংগৃহীত
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনের উদ্দেশে চিরকুটে পুলক চ্যাটার্জী লিখেছেন, “জাকির, বিদায়। তোমার সাথে আমার অনেক স্মৃতি। আমার মরদেহ হয়রানি ছাড়া পরিবারের কাছে দেওয়ার চেষ্টা করিও। যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহনন করলাম, তাই ময়নাতদন্ত করার প্রয়োজন নাই। পারলে তোমার বৌদি ও প্রকৃতির মাঝে মাঝে খোঁজ নিও।”
এসএম জাকির হোসেন জানান, পুলক চ্যাটার্জি তার অভিভাবকের মতো ছিলেন এবং এই প্রজন্মের সাংবাদিকদের পথপ্রদর্শক ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মেরুদণ্ডের হাড়ের ব্যথা ও কোল্ড অ্যালার্জিতে ভুগছিলেন। চিকিৎসার জন্য ভারতেও গিয়েছিলেন।
জাকির হোসেনের ভাষ্য, সমকালের চাকরি হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সমকালের কাছে তার প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বেশ কিছু পাওনা টাকা ছিল। এসব পাওনার ব্যাপারে তিনি একাধিকবার যোগাযোগও করেছিলেন। চাকরি হারানো, পাওনা টাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের অসুস্থতার যন্ত্রণা–সব মিলিয়ে পুলক চ্যাটার্জি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন বলে মনে করেন জাকির হোসেন।
তবে তিনি জানান, পুলকের বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট ছিল না। নগরীতে তার তিনতলা বাড়ি রয়েছে। তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং ছোট ভাই একজন ভূমি কর্মকর্তা।
ছোট ভাই দীপক ও দীপকের স্ত্রী ইতির উদ্দেশ্যে পুলক চ্যাটার্জি আলাদা চিরকুটে লিখেছেন, “বিদায়। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখিস। তোর ওপর অনেক বড় বোঝা চাপিয়ে দিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিস। মুক্তিযুদ্ধের ভাতা ও আমার ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে দেবাশীষের সাথে আলাপ করে পদক্ষেপ নিস। প্রিয়াংকা ও প্রকৃতিকে তোর কাছে রাখিস।”
পুলক চ্যাটার্জির ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক চ্যাটার্জি বলেন, “চাকরি না থাকার কারণে আমার ভাই কিছুটা হতাশ ছিলেন। সে কারণেও এটা (আত্মহত্যা) হতে পারে। কিন্তু এ কারণে আত্মহত্যা করবেন, সেটা কেউ ভাবিনি।”
ভাইয়ের উদ্দেশে পুলক চ্যাটার্জির চিরকুট। ছবি: সংগৃহীত
পুলক চ্যাটার্জি তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও দৈনিক সমকাল বরিশাল ব্যুরোর বর্তমান প্রধান সুমন চৌধুরীর উদ্দেশে লিখেছেন, “সুমন, বিদায়। তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দুঃখিত। একসাথে প্রায় দেড় যুগ কাজ করেছি, কখনো কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিও। যদি পারো সমকালে আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বৌদির হাতে দিও।”
এই পাওনা টাকা নিয়ে অবশ্য ব্যাখ্যা দিয়েছে দৈনিক সমকাল। পত্রিকাটিতে আজ প্রকাশিত একটি সংবাদে সমকালের মানবসম্পদ বিভাগ জানায়, পুলক চ্যাটার্জির পাওনার হিসাব চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সমকালের বিজ্ঞাপন ও আইটি বিভাগের অনাপত্তি নিয়ে তাঁর সঙ্গে লম্বা সময় আলোচনা চলে। গত মাসে বিভাগ দুটি (বিজ্ঞাপন ও আইটি) তাদের অনাপত্তিপত্র হিসাব বিভাগে জমা দেয় এবং তারা হিসাবটি চূড়ান্ত করছিল।
সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুতে সমকাল পরিবার গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।
চিঠির বিষয়ে সমকালের বরিশাল ব্যুরোর বর্তমান প্রধান সুমন চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
পুলক চ্যাটার্জি সমকাল প্রতিষ্ঠার শুরুর সময় থেকে দীর্ঘদিন বরিশাল ব্যুরোর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকতায় দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বরিশালে সুনাম অর্জন করেন তিনি। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সিনিয়র সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি ন্যাশনাল ডেইলিজ ব্যুরো চিফ অ্যাসোসিয়েশন (এনডিবিএ) বরিশাল শাখার সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।
তার মৃত্যুতে বরিশালের সাংবাদিক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। খবর পেয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে যান।