Advertisement Banner

অপঘাতে এখনো মরেননি তো? আপনাকে অভিনন্দন!

অপঘাতে এখনো মরেননি তো? আপনাকে অভিনন্দন!
সড়ক দুর্ঘটনা। ফাইল ছবি

এই লেখার লিংকে কি ক্লিক করেছেন?

পড়া শুরু করেছেন?

স্ক্রল করছেন মোবাইলে বা ডেস্কটপে?

ওপরের এই তিনটি কাজের যেকোনো একটি করে থাকলে আপনাকে অভিনন্দন। না করেও যদি স্পন্দিত হৃৎযন্ত্রের প্রমাণ কোনোভাবে দিয়ে থাকেন, আপনাকে অভিনন্দন জানানোই দরকার। খুবই দরকার।

কারণ, আপনি এখনো বেঁচে আছেন দিব্যি। আপনি অপঘাতে মরে যাননি। একদিনের জন্য হলেও এগিয়ে গেছেন। আপনি জীবনযুদ্ধে এগিয়ে গেছেন, বস্!

জীবনযুদ্ধ। এই শব্দটি আমাদের দেশে অত্যন্ত পরিচিত একটি শব্দ। সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুকের কারণেই শব্দটি এ দেশে বেশ হাস্যরসের। কিন্তু আদতে বাংলাদেশের মানুষ এই যুদ্ধই করে প্রতিদিন, প্রতিটা ঘণ্টায়, প্রতিটা সেকেন্ডে। কারণ, এই দেশের মানুষ চলছে অদৃষ্টের ভরসায়। সেই ভরসায় আর যাই থাকুক, নিশ্চয়তা অন্তত থাকে না।

এ দেশের মানুষ জানে না–কখন রাস্তার ফুটপাত ধরে হাঁটার সময়, তার মাথায় ইট খসে পড়বে। সেই ইটেই তার মাথাটা নানা ভাগে ভাগ হয়ে মৃত্যুটা যে নিশ্চিত করে দেবে, তাও তাদের জানা থাকে না। তাদের পরিবারের সদস্যদেরও জানা থাকে না। তাই কেউই আমরা জানি না, প্রিয়জনের জন্য লাল রঙা জেলি কিনে আনার দিনে আমাদেরই রক্তমাখা মুখ তাদের দেখতে হবে কিনা।

এ দেশের মানুষ জানে না–যে বাসে চড়ে বাড়িতে উৎসব করার উদ্দেশে তার যাত্রা, সেই বাসটি হুট করেই কোনো রেললাইনের ওপরে নিতান্তই মর্জিমতে উঠে দাঁড়িয়ে থাকবে কিনা। ঠিক ওই সময়ই ট্রেন এসে সেই বাসটিকে দুমড়ে-মুচড়ে দেবে কিনা, তাও জানে না।

এ দেশের মানুষ জানে না–মেট্রোরেলের পাশের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে আসার সময়, অন্য কোনো স্বপ্নে বিভোর থাকা একটি মাথায় বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে সব স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন বানিয়ে দেবে কিনা।

এ দেশের মানুষ জানে না–রাজধানীর কোনো সরু রাস্তা দিয়ে রিকশায় করে যাওয়ার সময় হুট করে পাশের অবৈধ উপায়ে গড়ে তোলা কোনো কেমিক্যালের গুদাম থেকে আগুনের হলকা এসে তাকে পুড়িয়ে কয়লা বানিয়ে দেবে কিনা।

এ দেশের মানুষ জানে না–লঞ্চে ওঠার সময় স্রেফ কারও অমনোযোগিতার বলি হিসেবে তাকে নদীতে পড়ে যেতে হবে কিনা। তারা জানে না, অন্য লঞ্চ এসে তাকে অকারণে পিষে দেবে কিনা।

এ দেশের মানুষ জানে না–পরিবারের প্রাণপ্রিয় মানুষগুলোকে নিয়ে কোনো বহুতল ভবনের রেস্টুরেন্টে কাবাব খেতে গিয়ে নিজেরাই জ্বলে-পুড়ে কাবাব হয়ে যাবে কিনা।

এ দেশের মানুষ জানে না–কোনো নির্মীয়মাণ ভবনের পাশে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ানোও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তারা জানে না, নির্মীয়মাণ ভবন থেকে কখন, কোন সময় কোনো রড বা বাঁশ উড়ে এসে তাদের শরীরে বসে সেটিকে লাশ বানিয়ে চলে যাবে কিনা।

ঠিক এইভাবেই রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিতে বসে থাকা যাত্রীরা জানতেন না, এই একটু পরেই বাসটি কোনো যুক্তি ছাড়াই নিজের চাকায় গড়িয়ে টুপ করে পড়ে যাবে পদ্মা নদীতে। ভিডিওটা দেখলে মনে হয়, বাসটি যেন চালকের নিজের ইচ্ছায় গড়িয়ে গড়িয়ে গিয়ে পড়ল প্রমত্তা নদীতে! এতটাই স্বাভাবিক বাসের সেই চলা। যদিও দাবি করা হচ্ছে, আরেক ফেরির ধাক্কায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। আসলে কী হয়েছিল, তা হয়তো তদন্তের পরই জানা যাবে কোনো দিন।

কিন্তু, জানার পর কী হবে? নিহত প্রায় জনা তিরিশেক প্রাণ কি ফেরত আসবে? বাকি জীবিতদের বাদবাকি জীবনের জন্য উপহার দেওয়া ট্রমা বা কান্না কি থেমে যাবে?

বাস দুর্ঘটনা। ছবি: সংগৃহীত
বাস দুর্ঘটনা। ছবি: সংগৃহীত

ও হ্যাঁ, কেউ কেউ কী বলতে চাচ্ছেন, বোঝা যাচ্ছে। এসবের জন্য আর কষ্ট করে শুনতে হয় না। মুখ খোলার চেষ্টা করলেই বোঝা হয়ে যায়। বলতে চাইছেন নিশ্চয়ই যে, ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য ‘উপযুক্ত’ বা ‘কঠোর’ পদক্ষেপ নেওয়া যাবে! আশ্চর্যবোধক চিহ্নটি সত্যিই আশ্চর্য হয়েই দেওয়া। কারণ, এমন ‘উপযুক্ত’ বা ‘কঠোর’ পদক্ষেপ তো আমরা, আম নাগরিকেরা বছরের পর বছর ধরেই প্রত্যক্ষ করে আসছি। উপযুক্ত, কঠোর–এই শব্দগুলোর অর্থই যে বদলে গেছে এ দেশে। অন্তত এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সব সরকারই যারপরনাই সফল।

তাই ঘটনার পরপরই কর্তৃপক্ষীয় করুণ বাক্য আমাদের কাছে প্রত্যাশিত। আমাদের কাছে এও প্রত্যাশিত যে, মৃতদের জীবনের কিছু ক্ষতিপূরণ হয়তো মিলবে, তাতে ক্ষতিপূরণ হোক বা না হোক।

আমাদের কাছে এও প্রত্যাশিত যে, এভাবে আঁৎকা লাশ হয়ে যাওয়া মরা মানুষের মিছিল আসলে এ দেশে বন্ধ হবে না কোনোদিন। কারণ, সকল দুর্ঘটনা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলাজনিত মৃত্যুতে বা সরকারি, বেসরকারি ব্যবস্থার ত্রুটিজনিত কাঠামোগত হত্যায় আসলে কারও কিছুই যায় আসে না। প্রিয়জন হারানোর কান্নাও কর্তৃপক্ষের এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বের হয়ে যায়, কোথাও আটকে থাকে না, ওখানে কোনো ট্র্যাফিক জ্যামও থাকে না কখনো।

তাই এই দেশের মানুষের প্রতিদিন জীবনযুদ্ধ করেই যেতে হয়। এবং সেটি আক্ষরিক অর্থেই। কারণ, এ যুদ্ধটা শুধুই নিজের জীবন ধরে রাখার জন্যই। যদি জীবিত অবস্থায় নিরাপদে বাড়ি ফেরা যায়, তাহলেই সেসব মানুষ জিতে যান। একটি দিনের জন্য হলেও তারা জিতে যান। অপঘাতের ফাঁদে মরতে তো হলো না!

তা, এভাবে প্রতিদিন, প্রতিটা ঘণ্টা বা সেকেন্ডে যে নাগরিকেরা জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ, তাদের কি অভিনন্দন জানানো উচিত নয়? পিঠ চাপড়ে আরও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন নয়? নইলে জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে এত অগণিত মানুষ মনোবল ধরে রাখবেন কীভাবে? কারণ, এ দেশে আর পেট্রল, ডিজেল, চিনি বা ভোজ্যতেল–যাই দুর্লভ হোক না কেন, অপঘাতে মৃত্যু সব সময়ই সুলভ।

সুতরাং, জীবিত অবস্থায় নীড়ে ফিরতে পারলেই, দয়া করে নিজেদের অভিনন্দন জানান আপনমনে। অভিনন্দিত করুন পাশে থাকা প্রিয় মানুষদেরও।

দিনশেষে শ্বাস-প্রশ্বাসে সক্রিয় থাকা সবাই তো এই দেশের করুণ ও ন্যূনতম নিশ্চয়তাহীন জীবনযুদ্ধের অকুতোভয় ও হার না মানা জীবনযোদ্ধা, তাই না? মুখনিঃসৃত একটুখানি ‘অভিনন্দন’ তো প্রাপ্যই আমাদের, ঠিক কিনা?

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত