ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য উইক-কে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর
চরচা ডেস্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, জুলাই আন্দোলনের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞদের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক। গুরুত্ব বিবেচনায় পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করছে চরচা।
দ্য উইক: ২০২৪ সালের ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সেই সংকটময় সময়ে আপনাকে সেনাপ্রধান ডেকেছিলেন। সেই মুহূর্ত এবং এরপর কী ঘটেছিল, আমাদের একটু বলবেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: ৫ আগস্ট মধ্যরাতের কিছু পর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আমাকে জানানো হয়, পরদিন সকালে সেনাপ্রধান আমাকে দেখতে চান। সেসময় দিনগুলো ছিল ভয়ংকর উত্তেজনাপূর্ণ। ঝুঁকির বিষয়টি সবাই বুঝছিল। আমার সন্তানরা বিদেশে থাকে, পরিবার ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু আমার জন্য সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল। আমি একজন সেনা কর্মকর্তা। সেনাপ্রধান ডাকলে সাড়া দিতে হয়। সকাল ঠিক ১০টায় আমি তার বাসভবনে যাই। তিনি আগেই সেখানে ছিলেন।
বসার আগেই তিনি তিনটি বিষয় একেবারে পরিষ্কার করে দেন। প্রথমত, তিনি আর কোনো রক্তপাত চান না। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার কোনো ইচ্ছা তার নেই। তৃতীয়ত, এই সংকটের সমাধান হতে হবে প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
তিনি মনে করতেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে বিলম্ব হলে বিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা শুরু হবে। তিনি আমাকে ডেকেছেন, কারণ তার ধারণা ছিল–রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে সমাজের বিভিন্ন অংশে আমি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব। তিনি আমাকে দ্রুততম সময়ে আলোচনা আয়োজন করতে বলেন। আমি বলি, যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
কথা শেষের দিকে। সময় তখন প্রায় সকাল ১০টা ২৫–তিনি আমাকে জানান, পাঁচ মিনিটের মধ্যে ভারতীয় সেনাপ্রধান তার সঙ্গে কথা বলবেন। তিনি আমাকে থাকতে বলেন, কিন্তু আমি না করি। ভবিষ্যতে ভুল ব্যাখ্যা বা বিশ্বাসহানির কোনো সুযোগ রাখতে চাইনি। আমি সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে যাই।
দ্য উইক: রাজনৈতিক নেতারা কখন এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: দুপুর ১টা বা ১টা ১৫ মিনিটের দিকে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের সেনাপ্রধানের দপ্তরে আসতে বলতে। আমি বিএনপিসহ প্রধান অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেই বৈঠকেই সেনাপ্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে গেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আগাম কোনো পরামর্শ হয়নি।
দ্য উইক: এই ঘোষণায় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: এক ধরনের স্বস্তি কাজ করছিল। সবাই ক্লান্ত ছিলেন। তাৎক্ষণিক অনুভূতি ছিল: সহিংসতা থেমেছে, বড় ধরনের রক্তপাত ছাড়াই সংকট শেষ হয়েছে। তখন কেউ প্রক্রিয়াগত বা আইনি প্রশ্নে মন দেয়নি। সবার দৃষ্টি ছিল সামনে–স্থিতিশীলতা ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে।
দ্য উইক: অনেকে বলছেন, তাকে চলে যেতে দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কি না। আপনি কীভাবে দেখেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। বহু নাগরিক মনে করেন, তাকে হেফাজতে নিয়ে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা উচিত ছিল, বিশেষ করে বছরের পর বছর দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে। এই অনুভূতি বোঝা যায়। কিন্তু সংকট ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তাকে চলে যেতে দেওয়ায় ব্যাপক রক্তপাত এড়ানো গেছে।
সব দিক থেকে জনতা এগিয়ে আসছিল। সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাতে পারত না। একটি জাতীয় সেনাবাহিনী নিজের জনগণের ওপর গুলি চালাতে পারে না। সে সময় সহিংসতা বেড়ে গেলে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনী অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ত। সে অর্থে, তার প্রস্থান দেশকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেছে।
দ্য উইক: তাকে ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কত দ্রুত নেওয়া হয়?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: খুব দ্রুত। ফোনকল, বিমানের গতিবিধি, ট্রান্সপন্ডারের অনুপস্থিতি–সব মিলিয়ে বোঝা যায়, এটি কেবল একতরফা বাংলাদেশি সিদ্ধান্ত ছিল না। শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে আমি মনে করি, ভারতও তাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। না হলে তার প্রাণনাশের বাস্তব আশঙ্কা ছিল।
দ্য উইক: এতে কি প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারতের ওপর দায়িত্ব পড়ে?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: হ্যাঁ। বল এখন স্পষ্টতই ভারতের কোর্টে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বানানো নয়, জাতিসংঘের প্রতিবেদনসহ নথিভুক্ত। যদি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকে, তাহলে এটি রাজনৈতিক সুবিধার নয়, আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত।
দ্য উইক: আপনি বলেছেন, তার শাসনামলে এভাবে কথা বলা সম্ভব ছিল না। কেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: কারণ ভয় সমাজের প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়েছিল। গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ, ব্যবসায়ী মহল, নিরাপত্তা বাহিনী, সামাজিক এলিট–সবাই তীব্র চাপের মধ্যে ছিল। হয় অনুগত থাকতে হতো, নীরব থাকতে হতো, নয়তো পরিণতি ভোগ করতে হতো। নীরবতা মানে সমর্থন নয়–নীরবতা মানে বেঁচে থাকা।
আজ আমি কথা বলছি, কারণ সেই চাপ সরে গেছে। ১৫ বছর আগে এমন কথা বলার সাহস আমার হতো না, ঘুষ দিয়েও নয়। আমার পরিবার ও নিজের নিরাপত্তার মূল্য খুব বেশি ছিল।
দ্য উইক: জুলাই অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কতটা নির্ধারক ছিল?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: নির্ধারক ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, সেনাবাহিনী সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার না করলে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন সফল হয় না। আমি রাজনৈতিক নেতাদের বহুবার বলেছি– মিছিল-সমাবেশে কিছু বদলায় না, যতক্ষণ না সেনাবাহিনী বলে, ‘এবার যথেষ্ট’ হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে যা নজিরবিহীন ছিল, তা হলো, দীর্ঘ সময় পর সেনাবাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি রাস্তায়। সৈনিকরা সরাসরি মুখোমুখি হয় বৈধ অধিকার দাবি করা সাধারণ মানুষের সঙ্গে। সৈনিকরা সমাজ থেকেই আসে–একই পরিবার, একই গ্রাম, একই বাস্তবতা। সেই মুহূর্তে দমন অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেটাই ঘটেছে।
দ্য উইক: বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: ঐতিহাসিকভাবে সেনাবাহিনীর প্রভাব বড়। সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় সংকটে মানুষ সেনাবাহিনীর দিকেই তাকায়। কারণ এটি দলীয় নয়, একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়।
আদর্শভাবে সেনাবাহিনীর রাজনীতি থেকে দূরে থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে, যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে বা বৈধতা হারায়, তখন সমাজ সেনাবাহিনীকে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখে।
এই সংকটেও সেনাবাহিনী সমাজের চাওয়াকেই প্রতিফলিত করেছে। পরিহাস হলো, হাসিনা সরকারই সেনাবাহিনীকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিয়েছে। তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগ্য কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়েছেন, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নেতৃত্ব উঠে এসেছে। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী জনগণের ওপর দমন চালাতে অস্বীকার করেছে। এতে প্রমাণ হয়, পৃষ্ঠপোষকতা আনুগত্য নিশ্চিত করে না। পেশাদারত্ব ও যোগ্যতাই আসল। সেনাবাহিনীকে তার সাংবিধানিক ভূমিকায় থাকতে দিতে হবে।
দ্য উইক: অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: দায়িত্ব ছিল বিশাল, প্রত্যাশা আরও বেশি। তারা অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করতে পেরেছে, যা জরুরি ছিল। কারণ শত শত বিলিয়ন টাকা বছরের পর বছর বাইরে পাচার হয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা হিমশিম খেয়েছে। কারণ পুলিশসহ প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাতারাতি সংস্কার সম্ভব ছিল না।
দ্য উইক: নির্বাচন বিলম্বিত হলে আরেকটি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কি ছিল?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: আমি তা মনে করি না। অন্তর্বর্তী সরকার, সেনাপ্রধান ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা ছিল–নির্বাচন দরকার। সেনারা অনির্দিষ্টকাল রাস্তায় থাকতে পারে না। নির্বাচনই ছিল একমাত্র প্রস্থানপথ।
দ্য উইক: পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: শাসনব্যবস্থা–শুধু নির্বাচন জেতা নয়। বিচার বিভাগসহ সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। রাজনীতিকরণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারব্যবস্থা নাগরিককে অনিরাপদ করে তোলে এবং সংবিধানকে অর্থহীন করে দেয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মৌলিক।
এটি আরেকটি ঐতিহাসিক সুযোগ। বাংলাদেশ অতীতে অনেক সুযোগ হারিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম অধৈর্য এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নির্বাচিত নেতারা আবার ব্যর্থ হলে, ইতিহাস বলে– আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটবে এবং সেনাবাহিনী আবারও জনগণের পাশে দাঁড়াবে।
দ্য উইক: ভারতকে ঘিরে কিছু নিরাপত্তা উদ্বেগ জনমনে প্রভাব ফেলছে। এগুলো সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করে?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ও রোহিঙ্গা সংকট জনআস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সীমান্তে মৃত্যু যতই হোক, তা উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সামরিক নয়, আইনশৃঙ্খলার বিষয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণহানি ছাড়াই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর অসহনীয় মানবিক চাপ সৃষ্টি করেছে। মিয়ানমারে ওপর ভারতের কৌশলগত প্রভাব রয়েছে, যা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক গ্যারান্টির মাধ্যমে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল– উভয়ই উপকৃত হবে।
দ্য উইক: আগামী দিনে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: আমি খুব স্পষ্ট করে বলছি, বাংলাদেশের কোনো ভূখণ্ডগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তেই আমরা সন্তুষ্ট। আমরা মানচিত্র বদলাতে চাই না, শক্তি প্রদর্শনও নয়। বাংলাদেশ চায় উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মর্যাদা। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য যখন বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তা জনমনে বিষ ছড়ায়।
ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, ঢাকা-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য উইকের দিল্লি ব্যুরোর প্রধান নম্রতা বিজি আহুজা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, জুলাই আন্দোলনের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞদের ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য উইক। গুরুত্ব বিবেচনায় পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করছে চরচা।
দ্য উইক: ২০২৪ সালের ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সেই সংকটময় সময়ে আপনাকে সেনাপ্রধান ডেকেছিলেন। সেই মুহূর্ত এবং এরপর কী ঘটেছিল, আমাদের একটু বলবেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: ৫ আগস্ট মধ্যরাতের কিছু পর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আমাকে জানানো হয়, পরদিন সকালে সেনাপ্রধান আমাকে দেখতে চান। সেসময় দিনগুলো ছিল ভয়ংকর উত্তেজনাপূর্ণ। ঝুঁকির বিষয়টি সবাই বুঝছিল। আমার সন্তানরা বিদেশে থাকে, পরিবার ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু আমার জন্য সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল। আমি একজন সেনা কর্মকর্তা। সেনাপ্রধান ডাকলে সাড়া দিতে হয়। সকাল ঠিক ১০টায় আমি তার বাসভবনে যাই। তিনি আগেই সেখানে ছিলেন।
বসার আগেই তিনি তিনটি বিষয় একেবারে পরিষ্কার করে দেন। প্রথমত, তিনি আর কোনো রক্তপাত চান না। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার কোনো ইচ্ছা তার নেই। তৃতীয়ত, এই সংকটের সমাধান হতে হবে প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
তিনি মনে করতেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে বিলম্ব হলে বিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা শুরু হবে। তিনি আমাকে ডেকেছেন, কারণ তার ধারণা ছিল–রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে সমাজের বিভিন্ন অংশে আমি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব। তিনি আমাকে দ্রুততম সময়ে আলোচনা আয়োজন করতে বলেন। আমি বলি, যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
কথা শেষের দিকে। সময় তখন প্রায় সকাল ১০টা ২৫–তিনি আমাকে জানান, পাঁচ মিনিটের মধ্যে ভারতীয় সেনাপ্রধান তার সঙ্গে কথা বলবেন। তিনি আমাকে থাকতে বলেন, কিন্তু আমি না করি। ভবিষ্যতে ভুল ব্যাখ্যা বা বিশ্বাসহানির কোনো সুযোগ রাখতে চাইনি। আমি সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে যাই।
দ্য উইক: রাজনৈতিক নেতারা কখন এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: দুপুর ১টা বা ১টা ১৫ মিনিটের দিকে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতাদের সেনাপ্রধানের দপ্তরে আসতে বলতে। আমি বিএনপিসহ প্রধান অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেই বৈঠকেই সেনাপ্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে গেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আগাম কোনো পরামর্শ হয়নি।
দ্য উইক: এই ঘোষণায় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: এক ধরনের স্বস্তি কাজ করছিল। সবাই ক্লান্ত ছিলেন। তাৎক্ষণিক অনুভূতি ছিল: সহিংসতা থেমেছে, বড় ধরনের রক্তপাত ছাড়াই সংকট শেষ হয়েছে। তখন কেউ প্রক্রিয়াগত বা আইনি প্রশ্নে মন দেয়নি। সবার দৃষ্টি ছিল সামনে–স্থিতিশীলতা ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে।
দ্য উইক: অনেকে বলছেন, তাকে চলে যেতে দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল কি না। আপনি কীভাবে দেখেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। বহু নাগরিক মনে করেন, তাকে হেফাজতে নিয়ে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা উচিত ছিল, বিশেষ করে বছরের পর বছর দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে। এই অনুভূতি বোঝা যায়। কিন্তু সংকট ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তাকে চলে যেতে দেওয়ায় ব্যাপক রক্তপাত এড়ানো গেছে।
সব দিক থেকে জনতা এগিয়ে আসছিল। সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাতে পারত না। একটি জাতীয় সেনাবাহিনী নিজের জনগণের ওপর গুলি চালাতে পারে না। সে সময় সহিংসতা বেড়ে গেলে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনী অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ত। সে অর্থে, তার প্রস্থান দেশকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেছে।
দ্য উইক: তাকে ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কত দ্রুত নেওয়া হয়?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: খুব দ্রুত। ফোনকল, বিমানের গতিবিধি, ট্রান্সপন্ডারের অনুপস্থিতি–সব মিলিয়ে বোঝা যায়, এটি কেবল একতরফা বাংলাদেশি সিদ্ধান্ত ছিল না। শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে আমি মনে করি, ভারতও তাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। না হলে তার প্রাণনাশের বাস্তব আশঙ্কা ছিল।
দ্য উইক: এতে কি প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারতের ওপর দায়িত্ব পড়ে?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: হ্যাঁ। বল এখন স্পষ্টতই ভারতের কোর্টে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বানানো নয়, জাতিসংঘের প্রতিবেদনসহ নথিভুক্ত। যদি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকে, তাহলে এটি রাজনৈতিক সুবিধার নয়, আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত।
দ্য উইক: আপনি বলেছেন, তার শাসনামলে এভাবে কথা বলা সম্ভব ছিল না। কেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: কারণ ভয় সমাজের প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়েছিল। গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ, ব্যবসায়ী মহল, নিরাপত্তা বাহিনী, সামাজিক এলিট–সবাই তীব্র চাপের মধ্যে ছিল। হয় অনুগত থাকতে হতো, নীরব থাকতে হতো, নয়তো পরিণতি ভোগ করতে হতো। নীরবতা মানে সমর্থন নয়–নীরবতা মানে বেঁচে থাকা।
আজ আমি কথা বলছি, কারণ সেই চাপ সরে গেছে। ১৫ বছর আগে এমন কথা বলার সাহস আমার হতো না, ঘুষ দিয়েও নয়। আমার পরিবার ও নিজের নিরাপত্তার মূল্য খুব বেশি ছিল।
দ্য উইক: জুলাই অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কতটা নির্ধারক ছিল?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: নির্ধারক ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, সেনাবাহিনী সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার না করলে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন সফল হয় না। আমি রাজনৈতিক নেতাদের বহুবার বলেছি– মিছিল-সমাবেশে কিছু বদলায় না, যতক্ষণ না সেনাবাহিনী বলে, ‘এবার যথেষ্ট’ হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে যা নজিরবিহীন ছিল, তা হলো, দীর্ঘ সময় পর সেনাবাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি রাস্তায়। সৈনিকরা সরাসরি মুখোমুখি হয় বৈধ অধিকার দাবি করা সাধারণ মানুষের সঙ্গে। সৈনিকরা সমাজ থেকেই আসে–একই পরিবার, একই গ্রাম, একই বাস্তবতা। সেই মুহূর্তে দমন অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেটাই ঘটেছে।
দ্য উইক: বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: ঐতিহাসিকভাবে সেনাবাহিনীর প্রভাব বড়। সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও জাতীয় সংকটে মানুষ সেনাবাহিনীর দিকেই তাকায়। কারণ এটি দলীয় নয়, একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়।
আদর্শভাবে সেনাবাহিনীর রাজনীতি থেকে দূরে থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে, যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে বা বৈধতা হারায়, তখন সমাজ সেনাবাহিনীকে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখে।
এই সংকটেও সেনাবাহিনী সমাজের চাওয়াকেই প্রতিফলিত করেছে। পরিহাস হলো, হাসিনা সরকারই সেনাবাহিনীকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিয়েছে। তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যোগ্য কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়েছেন, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নেতৃত্ব উঠে এসেছে। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী জনগণের ওপর দমন চালাতে অস্বীকার করেছে। এতে প্রমাণ হয়, পৃষ্ঠপোষকতা আনুগত্য নিশ্চিত করে না। পেশাদারত্ব ও যোগ্যতাই আসল। সেনাবাহিনীকে তার সাংবিধানিক ভূমিকায় থাকতে দিতে হবে।
দ্য উইক: অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: দায়িত্ব ছিল বিশাল, প্রত্যাশা আরও বেশি। তারা অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করতে পেরেছে, যা জরুরি ছিল। কারণ শত শত বিলিয়ন টাকা বছরের পর বছর বাইরে পাচার হয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা হিমশিম খেয়েছে। কারণ পুলিশসহ প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাতারাতি সংস্কার সম্ভব ছিল না।
দ্য উইক: নির্বাচন বিলম্বিত হলে আরেকটি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কি ছিল?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: আমি তা মনে করি না। অন্তর্বর্তী সরকার, সেনাপ্রধান ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা ছিল–নির্বাচন দরকার। সেনারা অনির্দিষ্টকাল রাস্তায় থাকতে পারে না। নির্বাচনই ছিল একমাত্র প্রস্থানপথ।
দ্য উইক: পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: শাসনব্যবস্থা–শুধু নির্বাচন জেতা নয়। বিচার বিভাগসহ সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। রাজনীতিকরণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারব্যবস্থা নাগরিককে অনিরাপদ করে তোলে এবং সংবিধানকে অর্থহীন করে দেয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মৌলিক।
এটি আরেকটি ঐতিহাসিক সুযোগ। বাংলাদেশ অতীতে অনেক সুযোগ হারিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম অধৈর্য এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নির্বাচিত নেতারা আবার ব্যর্থ হলে, ইতিহাস বলে– আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটবে এবং সেনাবাহিনী আবারও জনগণের পাশে দাঁড়াবে।
দ্য উইক: ভারতকে ঘিরে কিছু নিরাপত্তা উদ্বেগ জনমনে প্রভাব ফেলছে। এগুলো সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করে?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: সীমান্ত হত্যাকাণ্ড ও রোহিঙ্গা সংকট জনআস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সীমান্তে মৃত্যু যতই হোক, তা উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সামরিক নয়, আইনশৃঙ্খলার বিষয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাণহানি ছাড়াই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর অসহনীয় মানবিক চাপ সৃষ্টি করেছে। মিয়ানমারে ওপর ভারতের কৌশলগত প্রভাব রয়েছে, যা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক গ্যারান্টির মাধ্যমে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল– উভয়ই উপকৃত হবে।
দ্য উইক: আগামী দিনে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর: আমি খুব স্পষ্ট করে বলছি, বাংলাদেশের কোনো ভূখণ্ডগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তেই আমরা সন্তুষ্ট। আমরা মানচিত্র বদলাতে চাই না, শক্তি প্রদর্শনও নয়। বাংলাদেশ চায় উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মর্যাদা। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্মান ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য যখন বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তা জনমনে বিষ ছড়ায়।
ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, ঢাকা-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্য উইকের দিল্লি ব্যুরোর প্রধান নম্রতা বিজি আহুজা।

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট