গত কয়েক বছর ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনোই সি চিনপিংয়কে প্রশংসা করার সুযোগ ছাড়েননি। চিনপিংকে তিনি কখনো বলেছেন বুদ্ধিমান, কখনো বা দুর্ধর্ষ, এমনকি বলেছেন যে গোটা হলিউডেও তার মতো আর কেউ নেই।
দ্বিতীয় মেয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও এক কাঠি এগিয়েছেন। তিনি এখন চীনের সি চিনপিংয়ের নীতি ও ভাষা সরাসরি অনুকরণ করতে শুরু করেছেন। এ বছরের এপ্রিল মাসে যখন তিনি নতুন শুল্ক ঘোষণা করেন, তখন সেই দিনটিকে ‘লিবারেশন ডে’ বা ‘মুক্তি দিবস’ নামে অভিহিত করেন। চীনে দীর্ঘ সময় কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বললে, ট্রাম্পের এই কথা আমার কাছে একেবারেই বেইজিংয়ের প্রচলিত ভাষার মতো শোনায়, কোনো পুঁজিবাদী শক্তির মতো নয়।
আমেরিকানরা সাধারণত স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার কথা বলেন। কিন্তু চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের কুওমিনতাঙের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয়কে ‘স্বাধীনতাযুদ্ধ’ নাম দিয়েছে। কিন্তু এই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি’র মাধ্যমে।
অর্থনৈতিক বিষয়েও ট্রাম্প চীনকে অনুকরণ করছেন। এমনকি আমেরিকার করপোরেট আইকন ইনটেলকেও একপ্রকার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এ রূপ দিতে চেয়েছেন। তিনি ইউএস স্টিল কোম্পানিতে সরকারের জন্য একটি গোল্ডেন শেয়ার দাবি করেন। এই বিষয়টা পশ্চিমা পরিভাষায় পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয় চীনের কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যেখানে রাষ্ট্রকে একটি প্রতীকী মালিকানা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া গত আগস্টে খারাপ চাকরির প্রতিবেদন প্রকাশের পর শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রধানকে বরখাস্ত করে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ন করেছেন। এটাও একপ্রকার চীনকেই অনুসরণ করা।
এছাড়া সামরিক শোভাযাত্রার কথাও উল্লেখযোগ্য। ৩০ সেপ্টেম্বর ট্রাম্পের যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ জেনারেল ও অ্যাডমিরালদেরকে চীনের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এর পার্টি সভার মতো অডিটোরিয়ামে একত্রিত করেছিলেন। তবে বেইজিংয়ের সামরিক শোভাযাত্রা ট্রাম্পের মতো এত হাস্যকর ছিল না।
ট্রাম্প চান তার সব নীতি এবং নীতির পরিবর্তনকেও মানুষ প্রশংসা করুক। সি চিনপিংও আশা করেন, তার প্রতি সবাই আনুগত্য দেখাবে। এই দুই নেতাই আশা করেন যে তাদের সবকিছুতেই তাদের সমর্থকেরা নিঃশর্ত সমর্থন করবে। অন্যথায় উভয়েই বিরোধিতার অপরাধে করপোরেট প্রধানদের প্রকাশ্যে দণ্ডিত করতে দ্বিধা করেন না। তবে চিনপিং সবাইকে ডেকে এনে তাদেরকে দিয়ে নিজের প্রশংসা আবার টিভিতে দেখাতে যান না ট্রাম্পের মতো।
ট্রাম্পের চীনকে অনুকরণের আরও উদ্বেগজনক দিক হলো যেসব মানুষকে রাষ্ট্র দুর্বল মনে করে, তাদের প্রতি ব্যাপক নিষ্ঠুরতা। উভয় নেতা যেসব মানুষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে না, তাদেরকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। আমেরিকা ও চীনে একইভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা রাষ্ট্রের ক্রোধের শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। দুইদেশেই প্রতিটি সংকটের জন্য দায়ী করা হয় বিদেশি বা রাষ্ট্রদ্রোহীদের।
তবে ট্রাম্প সি চিনপিংয়কে অনুকরণ করলেও তার ইতিবাচক দিকগুলো রপ্ত করতে পারছে না। তাই আমেরিকা চীনের কর্তৃত্ববাদের স্বাদ ঠিকই পাচ্ছে, কিন্তু সেটার যা ভাল দিক আছে ততটুকু বাদ দিয়ে। কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি বড় কারণ হলো তাদের মানুষের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা। গত চার দশকে চীনের মানুষ ব্যাপক সরকারি সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করেছে। যদিও দেশের মানুষজনকে এর বদলে অন্য অনেক নির্মমতা সহ্য করতে হয়।
সাংহাইয়ের বাসিন্দারা নতুন পার্কগুলোতে সহজেই যেতে পারেন। গত বছরেই ১৪০টির বেশি পার্ক হয়েছে। আবার পুরো শহরজুড়ে মেট্রো নেটওয়ার্কের জন্য ঘুরে বেড়ানো এখন অনেক সহজ। এমনকি দক্ষিণ-পশ্চিমের দরিদ্র গ্রামীণ এলাকা গুয়িজৌতেও ঝকঝকে হাই-স্পিড রেল রয়েছে, যা আমেরিকার ধনী রাজ্যগুলোতেও সম্ভব নয়। গত ৪০ বছরে চীন বিশাল পোর্ট, রেলওয়ে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং হাইওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। শহরগুলো ক্রমেই আরও বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।
এদিকে চীন নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে ব্যাপক এগিয়ে আছে। চীনে বাতাস ও সৌরশক্তির উৎপাদন আমেরিকার তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। ট্রাম্প কখনো নবায়নযোগ্য শক্তিকে পছন্দ করেননি; তিনি নতুন সৌর প্রকল্প বাতিল করেছেন এবং কয়লাকে পরিষ্কার ও সুন্দর হিসেবে প্রশংসা করেছেন।
সি চিনপিং, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেছেন। চীনের উৎপাদন খাত ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। দেশটির গাড়ি নির্মাতা ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজে পাচ্ছ। অন্যদিকে আমেরিকার নির্মাতারা ক্রমাগত তাদের পণ্যের বাজার হারাচ্ছেন। ইনটেল, বোয়িং এবং ডেট্রয়েটের অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো কৌশলগত ভুলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ফলে বৃহত্তর আমেরিকান উৎপাদন খাত আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে, এবং কথিত লিবারেশন ডে থেকে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছে।
চীন বিদেশি বিনিয়োগ আনতে অত্যন্ত কৌশলগত ও পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে। দেশটির নেতারা অ্যাপল ও টেসলার মতো কোম্পানিকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন, যাতে তারা চীনে উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলে এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি করতে পারে।
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবিএর বিপরীতে, ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন দমন অভিযান চালিয়ে জর্জিয়ার একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি কারখানা থেকে শত শত দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এই দৃশ্য দেখে বিদেশি প্রকৌশলীরা আমেরিকায় কাজের প্রস্তাব গ্রহণের আগে নিশ্চয়ই দু’বার ভাববেন, যে দেশকে স্বাধীনতার ভূমি বলা হয়, সেখানে শৃঙ্খলাবদ্ধ অভিবাসীদের দৃশ্য ভয় ধরিয়ে দেয়।
চীনে মূলত কঠোর কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা। আমেরিকানরা তা সহ্য করতে পারবেন না, এবং সেটাই স্বাভাবিক। তবে চীন যে শৃঙ্খলাপূর্ণ শহর, দক্ষ উৎপাদনব্যবস্থা ও গতিশীল শিল্পখাত গড়ে তুলেছে তা নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের নীতিগুলো মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে, অথচ সাধারণ আমেরিকানদের বাস্তব চাহিদা যেমন উন্নত বাসস্থান ও গণপরিবহন এগুলো মেটাতে ব্যর্থ হবে। ডেমোক্র্যাটিক অঙ্গরাজ্যগুলোর জন্য বরাদ্দ বাজেট প্রতিহিংসাবশত বাতিল করায় সেই ব্যর্থতা আরও প্রকট হচ্ছে।
তার এই কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার ফল হিসেবে আমেরিকা পেয়েছে শুধু ঝলমলে বলরুম, আটক কেন্দ্র, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিতরে গভীর অস্থিরতা।
**দ্য ইকোনোমিস্টে প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত**
ড্যান ওয়াং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হুভার ইনস্টিটিউশনের একজন গবেষণা ফেলো এবং ‘ব্রেকনেক: চায়না’স কোয়েস্ট টু ইঞ্জিনিয়ার দ্য ফিউচার’ বইটির লেখক।