বাংলাদেশবিহীন ‘মন খারাপের’ এক বিশ্বকাপ!

বাংলাদেশবিহীন ‘মন খারাপের’ এক বিশ্বকাপ!
বাংলাদেশ এই প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপে। ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যা! কিছুক্ষণ আগে আইসিসি ট্রফির অতি গুরুত্বপূর্ণ এক ম্যাচে কেনিয়ার কাছে হেরে গেছে বাংলাদেশ। কেনিয়ার ২৯৫ রানের পাহাড় টপকানোর অভিযানে বাংলাদেশ থেমেছে মাত্র ১৩ রানের দূরত্বে। সেই হারে শেষ হয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। চুরানব্বইয়ের ফেব্রুয়ারি মাসের সেই সন্ধ্যাটা ছিল বড় বিষণ্ন।

সেবারই প্রথম আইসিসি নিয়ম করেছিল, আইসিসি ট্রফির শীর্ষ তিন দল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখেছিল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার। সেই যোগ্যতা বাংলাদেশের ছিল খুব ভালোভাবেই। বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার প্রস্তুতিটাও ছিল দুর্দান্ত। ভারত থেকে কোচ হিসেবে এসেছিলেন মহিন্দর অমরনাথ। বাংলাদেশ দলটায় তখন দারুণ দারুণ সব নাম—মিনহাজুল আবেদীন, ফারুক আহমেদ, গোলাম নওশের, আমিনুল ইসলাম, আকরাম খান, আতহার আলী খান, এনামুল হক…! মাঠের পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ পারেনি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশ্বকাপে খেলা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর গোটা বাংলাদেশ সেদিন ছিল বিমর্ষ! বাংলাদেশের ক্রিকেটের বড় এক হতাশার সময়ই বলা হয় ১৯৯৪ সালের ওই সময়টাকে। এরপর কেটে গেছে ৩২ বছর!

১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়াতে আইসিসি ট্রফি জিতে নেয় বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত
১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়াতে আইসিসি ট্রফি জিতে নেয় বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত

মাঝের তিন দশকে অনেক পরিবর্তন! চুরানব্বইয়ে বিশ্বকাপ কোয়ালিফাই করতে না পারার সেই দুঃস্বপ্নকে চার বছরের মাথায় অতীত বানিয়ে ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়াতে আইসিসি ট্রফি জিতে নিল বাংলাদেশ। সুযোগ এসে গেল ১৯৯৯ বিশ্বকাপ খেলার। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার পর দেশের ক্রিকেট শুধু সামনের দিকেই গেছে। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা। এরপর ভালো-মন্দ মিলিয়ে ক্রিকেটই তো আমাদের আশা-ভরসা আর গর্বের প্রতীক। ১৯৯৯ থেকে এ পর্যন্ত সবকটি বিশ্বকাপ বাংলাদেশ খেলেছে নিজেদের অধিকারেই। ২০০৭ থেকে শুরু হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও নিয়মিতই। ২০২৬-এ এসে এই প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই। না, এবার নিজেদের সিদ্ধান্তেই বাংলাদেশ বিশ্বকাপে নেই। ভারতে আজ থেকে শুরু হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নামই তুলে নিয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর বিশ্বকাপ তো বটেই, এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট থেকে নাম তুলে নিল বাংলাদেশ। ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে না পারার বেদনা মুহ্যমান করেছিল গোটা বাংলাদেশকে। ১৯৯৭ সালে বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ার আনন্দে উদ্বেলিত ছিল পুরো দেশ। ২০২৬-এ একটা বিশ্বকাপ থেকে নাম তুলে নিলেও দেশে এক ধরনের আশ্চর্য নির্লিপ্ততা।

এমনিতেই দেশে নির্বাচনী হাওয়া। জাতীয় নির্বাচনের এক সপ্তাহও বাকি নেই। মানুষের মনযোগ পুরোপুরি নির্বাচন কিংবা রাজনীতির দিকেই। দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন বলে কথা! তবুও ক্রিকেটের একটা বিশ্বকাপ চলছে, দুনিয়ার অন্যতম প্রধান ক্রিকেট খেলিয়ে দেশ হয়েও বাংলাদেশ তাতে দর্শক কিংবা থাকছে না, এটা ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য বেশ অস্বস্তিকরই। সবচেয়ে বড় কথা, ক্রিকেটের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ নেই, এটা হজম করাও তো অনভ্যাসের ব্যাপার। ২০১৩ সালে শেষবার এমনটা হয়েছিল, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। সেবার ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৮ দল খেলেছিল চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। বাংলাদেশ খেলতে পারেনি, যোগ্যতা অর্জন করতে না পারার কারণে, তার একটা একটা কারণ ছিল, এবারের কারণ তো পুরোপুরি রাজনৈতিক।

মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে ‘নিরাপত্তার দিতে না পারার’ অজুহাতে বাদ দেওয়ার পরই আসলে ঘটনার শুরু। হিন্দুত্ববাদীদের হুমকি ছিল মোস্তাফিজকে কেন কলকাতা নাইটরাইডার্স বিশাল অংকে দলে ভিড়িয়েছিল, তা নিয়ে। মোস্তাফিজের দোষ ছিল, তিনি একজন বাংলাদেশি। আর ২০২৪ সালের আগস্টে একটা সরকারের পতনের পর থেকে ভারতে যে বাংলাদেশকে নিয়ে কী পরিমাণ গোস্সা চলছে, সেটা তো সবাই জানি আমরা। মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে যদি নিরাপত্তা-ইস্যুতে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলাটাও ঝুঁকিপূর্ণ—এমন যুক্তিতে আইসিসিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড অনুরোধ করেছিল ভারত থেকে খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু প্রায় মাস খানিক ধরে চলা ‘টাগ অব ওয়ারে’র পর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অনুরোধ, দাবি সবই উপেক্ষা করেছে আইসিসি। এমন নয় যে অতীতে নিরাপত্তা-ইস্যু আইসিসির কোনো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে আসেনি। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারটি নিয়ে আইসিসি যা করেছে, সেটি দৃষ্টিকটূ অবশ্যই। বাংলাদেশের ভারতে খেলার ব্যাপারে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আপত্তি ভোটে দেওয়া হয়েছে। ভোটে বাংলাদেশ পরাজিত হয়েছে বড় ব্যবধানেই। ব্যাপারটা অনেকটাই বাকিদের দিয়ে বাংলাদেশকে চাপ দেওয়ার মতো। অথচ, নিরাপত্তা ঝুঁকিটা বাংলাদেশের। যেখানে আইসিসির সিকিউরিটি অ্যাসেসমেন্ট টিম প্রতিবেদনে বাংলাদেশি ভক্ত-সমর্থকদের ভারতের মাটিতে জাতীয় দলের জার্সি পরাকে ঝুঁকি বলছে, যেখানে তারা বলছে মোস্তাফিজুর রহমান দলে থাকাও এক ধরনের ঝুঁকি, সেখানে আবার আইসিসিই সরাসরি বলে দিয়েছে, ‘হয় ভারতে খেল, নয়তো চলে যাও।’ বাংলাদেশ এ ব্যাপারে বড় ধরনের অবিচারেরই শিকার হয়েছে, এটা বলাই যায়।

১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত
১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত

অতীতে আইসিসির ইভেন্ট থেকে নিরাপত্তাজনিত ইস্যুতে নাম তুলে নেওয়ার ঘটনা আছে বেশ কয়েকটি। এই তো ২০১৬ সালেই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ে খেলেনি, ইংল্যান্ডের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতার কারণে। জিম্বাবুইয়ানদের তখন ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল ইংল্যান্ড। শেষ পর্যন্ত জিম্বাবুয়ে নামই প্রত্যাহার করে নেয়। যদিও জিম্বাবুয়ে সেবার আইসিসির কাছ থেকে অংশগ্রহণ ফি’র পুরোটাই পেয়েছিল। ১৯৯৬ সালে উপমহাদেশে ওয়ানডে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি। শ্রীলঙ্কা ছিল ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে কলম্বোতে এক ট্রাক বোমা বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছিলেন অনেকেই। সে কারণে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কার ম্যাচগুলো না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গ্রুপের দুটি ম্যাচে পূর্ণ পয়েন্ট ওয়াকওভার পেয়ে শ্রীলঙ্কা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে শেষ পর্যন্ত সবাইকে চমকে দিয়ে বিশ্বকাপই জিতে নিয়েছিল। ২০০৩ সালে রাজনৈতিক কারণে জিম্বাবুয়েতে খেলতে যায়নি ইংল্যান্ড, কেনিয়াতে যায়নি নিউজিল্যান্ড—দুটিই ছিল নিরাপত্তাজনিত কারণে।

২০২৫ সালে পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্মৃতি তো টাটকাই। চিরশত্রু পাকিস্তানে খেলতে যাওয়াটা ভারতের জন্য কেমন দেখায়! তাতে কী! আইসিসি নতুন এক মডেলই বের করে ফেলল—‘হাইব্রিড মডেল’। মানে টুর্নামেন্ট হয়েছে পাকিস্তানেই, কিন্তু ভারত নিজেদের ম্যাচগুলো খেলেছে অন্য ভেনুতে! ভাবুন একবার। কিন্তু নিরাপত্তা-ইস্যুতে বাংলাদেশকে ঘাড় ধরে নিরাপত্তাহীন জায়গায় খেলতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। কথা না শোনায় বাদ! এরই নাম আইসিসি। ক্রিকেটের বৈশ্বিক সংস্থা!

মোটকথা, এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নেই বাংলাদেশ, আর এটাই বাস্তবতা। তবে মন খারাপ হতেই পারে, এই প্রজন্মের ক্রিকেটপ্রেমীদের। তাদের তো আর বাংলাদেশবিহীন বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা নেই। যাদের বয়স ৪০-এর বেশি, তারা বাংলাদেশবিহীন ক্রিকেটের যেকোনো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অভ্যস্ত! তবুও দীর্ঘ দিনের অনভ্যাস! ক্রিকেট তো আর ক্রিকেট নেই বহুদিন হলো। ক্রিকেটের ইকোসিস্টেম হাইজ্যাকড—সেটা কয়েকদিন আগেই আলাপচারিতায় দুঃখ করে বলেছিলেন বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক। ইকোসিস্টেমের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বিশ্বকাপ-স্বপ্নও হয়ে গেল ছিনতাই। দুঃখটা এখানেই।

সম্পর্কিত