Advertisement Banner

মেক্সিকো হতে পারে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজয়ী

ক্যাথরিন ওসবোর্ন
ক্যাথরিন ওসবোর্ন
মেক্সিকো হতে পারে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিজয়ী
মেক্সিকো সিটির পাসেও দে লা রিফর্মা অ্যাভিনিউয়ের গোলচত্বরে জড়ো হয়েছে বিশ্বকাপ দেখতে আসা অসংখ্য ফুটবল-ভক্ত। ছবি: রয়টার্স

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-কে কেন্দ্র করে উত্তর আমেরিকার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র– যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর ভিন্নধর্মী ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের চিত্র ফুটে উঠেছে। গতকাল ১১ জুন মেক্সিকো সিটিতে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবের পর্দা উঠলো। তবে এই যৌথ আয়োজনের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রক্ষণশীল নীতি এবং মেক্সিকোর বৈশ্বিক উদারতার এক বৈপরীত্যপূর্ণ চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

যখন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব থেকে নিজেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ করে ফেলছে, ঠিক তখনই তার সহ-আয়োজক দেশ মেক্সিকো বিশ্ববাসীকে দুই হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানাচ্ছে। ক্রীড়া কূটনীতি ও ভূরাজনীতির এই টানাপোড়েনে মেক্সিকো কীভাবে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বিজয়ী হয়ে উঠতে পারে, তা দেখা যাক।

একটা চমৎকার অভিজ্ঞতার গল্প বলি। গত মার্চ মাসে মেক্সিকোর মন্তেরেই শহরে নিজের জীবনের সেরা ফুটবল ম্যাচ উপভোগের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন বিলাল লাফতা। সাতাশ বছর বয়সী এই ইরাকি-আমেরিকান সফটওয়্যার ডেভেলপার বর্তমানে নিউইয়র্কে বাস করেন। তিনি তার বাবা ও ভাইয়ের সাথে ইরাক জাতীয় দলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের খেলা দেখতে মেক্সিকোর মন্তেরেইতে এসেছিলেন, যেখানে ইরাকের মুখোমুখি হয়েছিল বলিভিয়া। সেখানে তারা মেক্সিকান দর্শকদের অভূতপূর্ব আতিথেয়তা ও ভালোবাসায় মুগ্ধ হন। মেক্সিকান ফুটবল ভক্তরা কেবল ইরাকি দলকে সমর্থনই করেনি, বরং তারা আরবি স্লোগান ও গান শিখে গ্যালারিতে গলা ফাটিয়েছে এবং ইরাকের জীবনযাত্রা সম্পর্কে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে।

লাফতা জানান যে, মেক্সিকান সমর্থকরা তাদের বারবার বলছিল যে উভয় দেশের সংস্কৃতির মধ্যে দারুণ মিল রয়েছে। সেই ম্যাচে ইরাক জয়লাভ করে দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে, যার ফলে পুরো স্টেডিয়াম এবং সংলগ্ন এলাকা উদযাপনে ফেটে পড়ে।

স্টেডিয়ামের বাইরে কর্তব্যরত একজন মেক্সিকান নারী পুলিশ কর্মকর্তা পর্যন্ত ইরাকি সমর্থকদের নিজের গাড়ির ছাদে উঠে জাতীয় পতাকা ওড়াতে এবং আনন্দ নৃত্য করার অনুমতি দেন। লাফতা এই বহুসংস্কৃতিবাদ এবং নিরাপত্তার পরিবেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে একইসাথে তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি উদার ও আনন্দঘন দৃশ্যের কথা কল্পনাও করা যায় না। অথচ এই যুক্তরাষ্ট্রই কানাডা ও মেক্সিকোর সাথে যৌথভাবে এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক ফুটবলপ্রেমীদের মনে এক ধরনের শঙ্কা ও দ্বিধার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান ও অভিযান পরিচালনার নীতি বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মনে এই প্রশ্ন উসকে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আদৌ আন্তর্জাতিক দর্শকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কি না। পররাষ্ট্রনীতি ও ক্রীড়া ইতিহাসের বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, বিশ্বকাপ চলাকালে কাস্টমস বা বিমানবন্দর থেকে শুরু করে সাধারণ রাস্তায় বিদেশি নাগরিকেরা সরকারিভাবে হয়রানির শিকার হতে পারে।

মেক্সিকোর বহুসংস্কৃতিবাদ এবং নিরাপত্তার পরিবেশ দেশটিতে আগত ফুটবল-ভক্তদের মাঝে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
মেক্সিকোর বহুসংস্কৃতিবাদ এবং নিরাপত্তার পরিবেশ দেশটিতে আগত ফুটবল-ভক্তদের মাঝে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

এ ধরনের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’ বা আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে। এর বিপরীতে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে কানাডা ও মেক্সিকো এই টুর্নামেন্ট থেকে তাদের সফট পাওয়ার বা কূটনৈতিক প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। উভয় দেশের সরকারি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সবাইকে আপন করে নেওয়ার মানসিকতাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছেন। বিশেষ করে মেক্সিকো, যার রয়েছে ফুটবলের এক সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, গণউৎসবের সংস্কৃতি এবং পর্যটকদের জন্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী খরচ– সব মিলিয়ে একটি দুর্দান্ত উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরির সব উপাদানই দেশটির রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও সতর্ক করেছেন যে, মেক্সিকোর জন্য প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, ২০০৯ সালের শুরুতে তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত আরতুরো সারুখান প্রথম এই যৌথ বিশ্বকাপের প্রস্তাব করেছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এ লেখা এক নিবন্ধে সারুখান উল্লেখ করেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোকে ‘সাফল্যের অংশীদার’ হিসেবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করার লক্ষ্যেই এই সহ-আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের মধ্যে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই ধারণাকে সমর্থন করেন এবং এতে কানাডাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সমগ্র উত্তর আমেরিকার ঐক্য ও সংহতির এক শক্তিশালী বার্তা বিশ্ববাসীকে দেওয়া। কিন্তু ২০১৮ সালে যখন এই যৌথ আয়োজনের চূড়ান্ত অনুমোদন মেলে, ততদিনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের এক বছর পার হয়ে গেছে এবং এই ঐক্যের ভিত্তি অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ট্রাম্প ইতিমধ্যেই তিন দেশের মধ্যকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করেন। বর্তমান বাস্তবতায় সেই একতার গল্প সম্পূর্ণ অর্থহীন ও অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হয়। ট্রাম্প বর্তমানে উভয় দেশের ওপর বর্ধিত শুল্ক আরোপ করেছেন, কানাডাকে ভবিষ্যতের একটি মার্কিন অঙ্গরাজ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং মেক্সিকোতে সামরিক হামলা বা বোমা মারার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন।

বর্তমানে তিন দেশের এই বাণিজ্য চুক্তিটি, যা ‘ইউএসএমসিএ’ নামে পরিচিত, একটি পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সারুখান তার প্রবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন যে বিশ্বকাপ এখনো ত্রিপক্ষীয় ঐক্যের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। তবে সাধারণ মানুষ এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রচলিত ধারণাটি একেবারেই ভিন্ন।

মেক্সিকোর একজন প্রখ্যাত ফুটবল ভাষ্যকার জেরার্ডো ভেলাজকুয়েজ ডি লিওন স্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, ২০১০-এর দশকের সেই একতার আখ্যানটি ছিল কেবল ‘খেলার আয়োজন করার অধিকার জয় করার জন্য, বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য নয়’। তিনি আরও যোগ করেন যে, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমান বাণিজ্য ও অভিবাসন সংক্রান্ত তীব্র বিরোধের মাঝে প্রকৃতপক্ষে কোনো দৃশ্যমান ঐক্য নেই। তবে টুর্নামেন্টটি যদি একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়, তবে তা আয়োজকদের জন্য ইতিবাচক ভাবমূর্তি বয়ে আনতে পারে।

অবশ্য বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজন কোনো দেশের আন্তর্জাতিক সুনামের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে, তা আগে থেকে জোর দিয়ে বলা ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন, ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের আগে সে দেশে ব্যাপক গণবিক্ষোভের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। কিন্তু খেলা শুরু হতেই কোপাকাবানা সৈকতের বহুসাংস্কৃতিক উৎসবের চিত্র সব নেতিবাচক বিষয়কে ধুয়ে মুছে দেয়।

তা সত্ত্বেও, এবারের বিশ্বকাপের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ইতিমধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেছে, যার একটি হলো টিকিটের আকাশচুম্বী মূল্য। উচ্চ মূল্যের কারণে অনেক সাধারণ ভক্তই খেলা দেখার পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে আসছেন। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে হোটেল বুকিং হার ধারণার চেয়ে অনেক কম ছিল।

ব্রাজিলের একটি নামী ক্রীড়া পর্যটন সংস্থা ‘টুরিস্টা এফসি’-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা জোয়াও পাওলো ফার্নান্দেস জানান যে, টিকিটের চড়া দামের কারণে বহু সমর্থক এবার ভ্রমণের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন। একইসাথে অনেক সম্ভাব্য পর্যটক যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র বিরোধিতা করছেন এবং তারা সেখানে নিজেদের নিরাপদ বা স্বাগত মনে করছেন না।

ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে মার্কিন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বেশ কয়েকজন বিদেশি পর্যটককে কঠোরভাবে আটকে রাখার ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্বজুড়ে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এর বিপরীতে, মেক্সিকো গত ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রাজিলীয় নাগরিকদের জন্য প্রবেশ সংক্রান্ত নিয়মাবলী অনেক শিথিল করেছে। ফার্নান্দেস নিশ্চিত করেছেন যে, এর ফলে তার সংস্থার মাধ্যমে বুকিং করা অনেক ফুটবল ভক্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে মেক্সিকোর ম্যাচগুলো দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পর্যটনের এই ধারাটি কেবল বিশ্বকাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মেক্সিকো বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগমনের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের জোয়ার অনুভব করছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্বকাপের তিনটি আয়োজক দেশের মধ্যে মেক্সিকোই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দেশের নাগরিকদের সম্পূর্ণ ভিসা-মুক্ত প্রবেশের সুবিধা দেয়। ছবি: রয়টার্স
বিশ্বকাপের তিনটি আয়োজক দেশের মধ্যে মেক্সিকোই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দেশের নাগরিকদের সম্পূর্ণ ভিসা-মুক্ত প্রবেশের সুবিধা দেয়। ছবি: রয়টার্স

বিশ্বকাপের তিনটি আয়োজক দেশের মধ্যে মেক্সিকোই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দেশের নাগরিকদের সম্পূর্ণ ভিসা-মুক্ত প্রবেশের সুবিধা দেয়। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘনিষ্ঠ অংশীদার রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও, তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বেশ কিছু সংঘাতময় ও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে। বিশ্ববাসীকে মেক্সিকোর বুকে স্বাগত জানানোর এই উদার মানসিকতা গত মাসে এক বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জাতীয় ফুটবল দলকে তাদের মাটিতে ক্যাম্প করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাম সাংবাদিকদের জানান যে, ইরানি দলটির প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা রাজ্যে একটি বেস ক্যাম্প করার কথা ছিল, কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা মেক্সিকোর টিহুয়ানা শহরে তাদের ক্যাম্প স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হয়। মেক্সিকো কোনো ধরনের রাজনৈতিক দ্বিধা ছাড়াই সানন্দে ইরানি দলকে স্বাগত জানিয়েছে। শিনবাম জোর দিয়ে বলেছেন যে, এতে তাদের কোনো সমস্যাই ছিল না।

যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ম্যাথিউ ব্রাউন এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে, মেক্সিকো আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রকৃত অর্থ বোঝে এবং তারা খেলাধুলা ও ভূরাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই এর সঠিক মূল্যায়ন করে। তিনি মনে করেন, বিশ্বকাপের আসল আদর্শের সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছে দেশটির উদার দৃষ্টিভঙ্গি, যা স্টেডিয়ামের শীর্ষে কেবল একটি বিশেষ দেশের পতাকা নয়, বরং বিশ্বের সব দেশের পতাকার সমাহার ও বৈচিত্র্যকে উদযাপন করে।

তবে ভেরাক্রুজানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ অ্যাক্সেল এলিয়াসের মতে, মেক্সিকোর এই উন্মুক্ততার নীতি অভিবাসনের ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন যে, শিনবাম প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রগামী অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নীরবে বেশ কিছু কঠোর নীতি প্রয়োগ করছে। তবে এলিয়াস এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, এই কঠোরতা মূলত সরকারি নীতির স্তরে সীমাবদ্ধ, সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক বা আতিথেয়তার স্তরে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব নেই।

মেক্সিকোর এই অসাধারণ জনমানুষের সম্পর্ক ও আতিথেয়তা খুব শিগগিরই মাঠের মাপে দেখা যাবে, যখন দেশটির তিনটি প্রধান আয়োজক শহর– গুয়াদালাহারা, মেক্সিকো সিটি এবং মন্তেরেইতে বিশাল ও উন্মুক্ত ফ্যান ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করবে। মেক্সিকান কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই উৎসবগুলোতে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটবে এবং এর সবকটিই জনসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত থাকবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাও এমন উন্মুক্ত উৎসবের পরিকল্পনা করছে। তবে তার সবকটি বিনামূল্যে নয়। যেমন, লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি উৎসবের প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ মার্কিন ডলার।

ইতিহাসবিদদের মতে, এই ফ্যান ফেস্টিভ্যাল প্রবেশ মূল্যের বিষয়টি একটি দেশের ভাবমূর্তি গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডেমন্টফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ হিদার ডিকটার ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের উদাহরণ টেনে বলেন যে, সে সময় জার্মানির বিনামূল্যে আয়োজিত উন্মুক্ত উৎসবগুলো দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রাতারাতি বদলে দিয়েছিল এবং বিশ্ববাসীর কাছে জার্মানির অত্যন্ত ইতিবাচক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিল।

তবে মেক্সিকোর এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা দেশটির ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে। ঠিক তেমনিভাবে, সমস্ত সংশয় কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও একটি অত্যন্ত নিরাপদ ও সহনশীল টুর্নামেন্ট উপহার দিয়ে সবাইকে চমকে দিতে পারে। মেক্সিকোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো, দেশটির সংগঠিত অপরাধচক্র।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে মেক্সিকান সরকারের একটি বড় ধরনের অভিযানের পর, যেখানে একজন কুখ্যাত মাদক চোরাকারবারি নিহত হয়। জ্যালিসকো নিউ জেনারেশন কার্টেল নামক অপরাধী গোষ্ঠীটি প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে গুয়াদালাহারার কাছাকাছি বেশ কিছু প্রধান সড়ক অবরোধ করে। তবে মেক্সিকোর নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন যে, বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তাদের ব্যাপক পরিকল্পনা এবং অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন ভক্তদের সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ-বিরোধী বৈশ্বিক সংস্থার গবেষক সেসিলিয়া ফারফান-মেন্দেজ মনে করেন যে, মেক্সিকোর সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলো ভালো করেই জানে যে বিদেশি পর্যটকদের লক্ষ্যবস্তু করা তাদের নিজেদের ব্যবসার জন্য কতটা ক্ষতিকর। এজন্যই তারা সাধারণত আন্তর্জাতিক ইভেন্টে হস্তক্ষেপ করে না।

নিরাপত্তার পাশাপাশি মেক্সিকোতে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের কারণেও বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা বিঘ্নিত হতে পারে। সম্প্রতি মেক্সিকো সিটিতে বেতন ও পেনশন নীতির পরিবর্তনের দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষক রাস্তায় নেমে বড় ধরনের মিছিল করেছেন। একইসাথে, দেশটিতে অপরাধ চক্রের দ্বারা জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া মানুষদের পরিবারের সদস্যরাও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে এই বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

মেক্সিকোর জাতীয় স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী সার্জিও ভ্যারেলা একটি ভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন যে, এবারের বিশ্বকাপে মেক্সিকোতে ম্যাচের সংখ্যা অত্যন্ত কম– ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে মেক্সিকো পাচ্ছে মাত্র ১৩টি ম্যাচ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একাই আয়োজন করছে ৭৮টি ম্যাচ। ম্যাচের সংখ্যা এত কম হওয়ায় অতীতের ১৯৭০ বা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের মতো মেক্সিকোর সাধারণ মানুষের মধ্যে এবার তেমন উন্মাদনা তৈরি হচ্ছে না। উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী ওই দুই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পেলে এবং আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিরা মেক্সিকোর মাটিতে ফুটবল ইতিহাসের অমর মহাকাব্য রচনা করেছিলেন।

অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক ফুটবলের উগ্র বা অতি-উৎসাহী সমর্থকদের সামলানোর ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে খুব একটা অভিজ্ঞ নয়। এর মধ্যে গত এপ্রিল মাসে বিশ্বের ১২০টিরও বেশি নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণকারী বিশ্বকাপ ভক্তদের জন্য একটি বিশেষ সতর্কবার্তা বা ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি জারি করেছে। তারা সতর্ক করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে আসা ফুটবল ভক্ত, মানবাধিকার কর্মী এবং সাংবাদিকরা বিনা কারণে আটক, আক্রমণাত্মক ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা ফোন তল্লাশি এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমনের মতো কঠোর সরকারি পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে পারেন।

তবে হোয়াইট হাউস বা মার্কিন প্রশাসন এই মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জোরালো ভাষায় বলেছে যে, এই টুর্নামেন্টটি সমস্ত আন্তর্জাতিক ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য একটি অবিশ্বাস্য ও চমৎকার অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সকল প্রকার মানবাধিকারের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল এবং টুর্নামেন্ট চলাকালীন তা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

নিউইয়র্কে বসে ইরাকি-আমেরিকান যুবক লাফতা আশা প্রকাশ করেন যে, তার বর্তমান বাসস্থান যুক্তরাষ্ট্র যেন মেক্সিকোর কাছ থেকে কিছু শিক্ষা নেয় এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল ভক্তদের প্রতি আরও বেশি উন্মুক্ত, ভালোবাসাপূর্ণ ও আন্তরিক আচরণ করে।

লেখক: ফরেন পলিসির সাপ্তাহিক ‘ল্যাটিন আমেরিকা ব্রিফ’-এর লেখক। তিনি ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো-ভিত্তিক একজন সাংবাদিক।

সম্পর্কিত