Advertisement Banner

নাহিদকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটেও হুলস্থুল

নাহিদকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটেও হুলস্থুল
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে নাহিদ রানা। ছবি: বিসিবি

“নাহিদ চাইলে বিগ বিশ লিগে অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সে যোগ দিতে পারে।”

নাক উঁচু স্বভাবের অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারের কাতারে ঠিক পড়েন না অ্যালেক্স কেরি। খেলার মাঠে থাকেন হাসিমুখেই, মাঠের বাইরেও ঠিক তাই। এই কারণেই প্রথম ওয়ানডেতে বিশাল হারের পর নাহিদ রানাকে নিয়ে প্রশংসায় কার্পণ্য করেননি তিনি। অকপটে তাই বিগ বিশ লিগে তার দল অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সে দেখতে চেয়েছেন তাকে। বাংলাদেশি এই গতি তারকার প্রতি তার মুগ্ধতা এতটাই যে, আগ বাড়িয়ে তাকে নিজের দলে পেতে চাইছেন তিনি!

আমরা কি বুঝতে পারছি, নাহিদ নিজেকে ক্রমশ ঠিক কোন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন? যুগ যুগ ধরে যে দেশের পেসাররা বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করেছেন, যাদের ক্রিকেট সংস্কৃতি ভীষণ সমৃদ্ধ, ছয় বার যারা বিশ্বকাপ জিতেছে, সেই অস্ট্রেলিয়ানরা পরম আগ্রহের সঙ্গে নাহিদকে তাদের দেশের লিগে দেখতে চাচ্ছেন? বাংলাদেশের একজন পেসারকে নিয়ে এমন মাতামাতি হবে, সেটা যতই দেখবেন, ততই যেন বিস্মিত হবেন। ঘোর কাটলেও মনে হবে, আসলেই কি সত্যি?

তবে এটাই সত্যি। এটাই বাস্তব। আমের রাজধানী চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে উঠে আসা নাহিদ অবশ্য বছর দুয়েক, আর স্পষ্ট করে বললে মাস ছয়েক ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিশ্ব দরবারে ভিন্ন আঙ্গিকেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। দর্শকেরা টিকিট কেটে স্টেডিয়ামে যাচ্ছেন, টেলিভিশন ও মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখছেন স্রেফ তার বোলিং দেখার জন্য। এক সাকিব আল হাসান ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এতটা প্রভাব এর আগে অন্তত বাংলাদেশের কেউ রাখতে পারেননি।

তোমরা একটা জেনারেশনাল প্রতিভা পেয়ে গেছ। অভিনন্দন। আমি আগেও নাহিদ রানার বোলিং দেখেছি। কিন্তু মিরপুরে ছেলেটা যে বোলিং করল, আর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের মনে যেভাবে ভয় ধরিয়ে দিল, একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি এটা দেখে ভীষণ আনন্দিত। ব্রেট লি, শোয়েব আক্তারদের পর সম্ভবত ক্রিকেটের পরবর্তী গতিতারকা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের নাহিদ রানাই। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আমি ওর বোলিং দেখতে মুখিয়ে আছি।

কারণ, সাকিবের মতো নাহিদের মধ্যেও আছে সেরাদের সেরা হওয়ার সব রসদ। তিনি জোরে বল করতে পারেন। এতটাই যে, এরই মধ্যে হয়ে গেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার। বিশ্ব ক্রিকেটে তার মতো গতিময় বোলার এখন আছেনই হাতেগোনা কয়েকজন। তবে একই সময়ে তিন ফরম্যাটেই গতির ঝড় তোলা বোলার তো বিরলই আধুনিক ক্রিকেটে।

স্বাভাবিকভাবেই নাহিদ তাই যে দলের বিপক্ষেই খেলছেন, ব্যাটসম্যানদের রীতিমতো নাচিয়ে ছাড়ছেন। বাংলাদেশ দল জিতুক বা হারুক, ২৩ বছর বয়সী এই পেসারের প্রতিটি বলই হয়ে দাঁড়িয়েছে থ্রিলার সিনেমার টুইস্টের মতোই রোমাঞ্চকর। নাহিদ ঘণ্টায় কত গতিতে বল করলেন–চার-ছক্কা বা উইকেট ছাপিয়ে সেটাই এখন সবার কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিগব্যাশে নাহিদ রানাকে নিয়ে পোস্ট। ছবি: ফেসবুক
বিগব্যাশে নাহিদ রানাকে নিয়ে পোস্ট। ছবি: ফেসবুক

আর প্রচণ্ড জোরে বল করতে পারা পেসারদের এটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। তারা প্রতিটি ডেলিভারিকেই ইভেন্টে পরিণত করার ক্ষমতা রাখেন। তাদের রান-আপ থেকে শুরু করে বল ছোড়ার প্রতিটি মুহূর্তই একজন ক্রিকেটভক্তকে শিহরিত করবে।

অস্ট্রেলিয়ায় এখন ঠিক সেটাই হচ্ছে। আগে-পরে নিশ্চিতভাবেই নাহিদের কথা শুনলেও বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ দিয়েই দেশটির ক্রিকেটার, সংবাদমাধ্যম ও দর্শকরা প্রথমবার স্বাদ পেয়েছেন নাহিদের বোলিংয়ের। খর্বশক্তির অস্ট্রেলিয়া তার সামনে উড়ে যাওয়ায় দেশটিতে তাকে নিয়ে উন্মাদনা যেন আকাশ ছোঁয়ার জোগাড়।

অস্ট্রেলিয়ার ফ্রিল্যান্স ক্রিকেট সাংবাদিক ও লেখক এডাম কলিন্স প্রথম ম্যাচের পর এই প্রতিবেদককে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিয়ে ঠিক সেটারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “তোমরা একটা জেনারেশনাল প্রতিভা পেয়ে গেছ। অভিনন্দন। আমি আগেও নাহিদ রানার বোলিং দেখেছি। কিন্তু মিরপুরে ছেলেটা যে বোলিং করল, আর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের মনে যেভাবে ভয় ধরিয়ে দিল, একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি এটা দেখে ভীষণ আনন্দিত। ব্রেট লি, শোয়েব আক্তারদের পর সম্ভবত ক্রিকেটের পরবর্তী গতিতারকা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের নাহিদ রানাই। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আমি ওর বোলিং দেখতে মুখিয়ে আছি।”

আগামী আগস্টে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে যাবে বাংলাদেশ। কলিন্স সেই সিরিজে নাহিদকে দেখার অপেক্ষায় আছেন। শুধু তিনিই নন, অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ সংবাদমাধ্যমে বুধবার বারবার এসেছে নাহিদের নাম। দেশটিতে গিয়ে তিনি কেমন বোলিং করবেন, বিগ ব্যাশ লিগে কোন দলের তাকে নেওয়া উচিত, সে সব নিয়ে আলোচনা করছেন দর্শকরা।

নিজ দলের পরাজয় ছাপিয়ে তাদের নাহিদকে নিয়ে মাতামাতিই বলে দেয়, তিনি এখন ক্রিকেট দুনিয়ারও সম্পদ হয়ে উঠছেন। যার বোলিং দল-মত নির্বিশেষে সবাইকেই বিনোদিত করছে।

অস্ট্রেলিয়ানদের কাছ থেকে এমন সম্মান পাওয়া একজন ক্রিকেটারের জন্য পরম পাওয়া। তারা আগ্রাসী ক্রিকেট যেমন খেলে, প্রতিপক্ষের কাছ থেকেও সেটাই প্রত্যাশা করে। ভারতীয় কিংবদন্তি বিরাট কোহলি এই কারণেই অস্ট্রেলিয়ায় ভীষণ জনপ্রিয়। এক ম্যাচেই নাহিদ যেন সেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পথেই চলে গেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মহলে নজর কেড়েছে নাহিদের আগ্রাসন। যার সামনে নাভিশ্বাস উঠেছে জস ইংলিস-ক্যামেরন গ্রিনদের মত ব্যাটসম্যানদেরও। তাদের দিকে তেড়ে গেছেন, আবার বাউন্সারে বিভ্রান্তও করেছেন। এমন দৃশ্য যুগ যুগ ধরে উপহার দিয়েছেন ডেনিস লিলি, ব্রেট লি, মিচেল জনসন বা মিচেল স্টার্করা। সেই দেশের বিপক্ষে বাংলাদেশের এক তরুণের রুদ্রমূর্তি ধারণ তাই মনে ধরেছে অস্ট্রেলিয়ানদের।

নিজ দলের পরাজয় ছাপিয়ে তাদের নাহিদকে নিয়ে মাতামাতিই বলে দেয়, তিনি এখন ক্রিকেট দুনিয়ারও সম্পদ হয়ে উঠছেন। যার বোলিং দল-মত নির্বিশেষে সবাইকেই বিনোদিত করছে।

আন্তর্জাতিক তারকা হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ এটাই। নাহিদ কী পারবেন পরের ধাপগুলো পেরিয়ে চূড়ায় যেতে?

সম্পর্কিত