ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর গ্রিনল্যান্ড দখলের নতুন করে উত্থাপিত পরিকল্পনা ন্যাটো জোটের ৭৭ বছরের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পর্ক এমন এক ভাঙনের পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ইউরোপীয় নেতারা প্রকাশ্যেই ‘প্ল্যান বি’ নিরাপত্তা কাঠামোর কথা বলছেন–যা আর আমেরিকান নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করবে না।
৮ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে একটি নাজুক দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হলেও–তা আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। পরদিন ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে জোটের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে পারেননি। এর পরিবর্তে ট্রাম্প আবারও তার পরিচিত ভাষায় অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের যখন দরকার ছিল, তখন ন্যাটো ছিল না”, যা বাস্তবতার চেয়ে বরং ওয়াশিংটনের বদলে যাওয়া অবস্থানকেই বেশি প্রতিফলিত করে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের মার্কিন উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়াও বিভক্তিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। ইউরোপীয় দেশগুলো ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফুরি’-র আওতায় ইরানের বিরুদ্ধে চালানো মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ তারা এটিকে বেআইনি আগ্রাসন হিসেবে দেখেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের পুরনো হুমকি তুলে ধরেন, যা ট্রান্সআটলান্টিক সংকটকে গভীরতর করে।
এই সংকট কেবল ইরান যুদ্ধের ফল নয়। ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠরা দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বা ‘ব্রেন ডেড’ বলে সমালোচনা করেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোকে ‘ফ্রি-রাইডার’ আখ্যা দিয়েছেন, এমনকি রাশিয়ার আক্রমণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে রক্ষা করবে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এসব বক্তব্য এবং ইউরোপের পক্ষ থেকে মার্কিন সামরিক উদ্যোগে সমর্থন না দেওয়ার ঘটনা–সব মিলিয়ে ন্যাটোর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি হয়েছে। জোটটি হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু এটি তার দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয়ের সূচনা হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন ন্যাটো আগেও সংকট কাটিয়ে উঠেছে, এবারও পারবে। তবে অন্যদের মতে, ইরান যুদ্ধ ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মতো দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে, যা পশ্চিম এশিয়া থেকে শুরু করে বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে। আবার কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ-রাশিয়া উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের মিত্রদের দ্বন্দ্ব–এই দ্বৈত চাপ ন্যাটোকে ভেঙেও দিতে পারে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে যে, ইরান ইস্যুতে সমর্থন না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে। এই আশঙ্কা ইউরোপকে ন্যাটোর বাইরের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, আকাশপথ ও বন্দর ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে। বিশেষ করে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ইতালিতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। যদিও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি বহিষ্কার করা কঠিন, কারণ এতে আইনি ও অর্থনৈতিক জটিলতা রয়েছে।
একই সময়ে উভয় পক্ষই আরও সংঘাতমুখী ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ উভয়ই প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে, যা নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি করছে। এই প্রতিযোগিতা ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সংকটের চেয়েও বেশি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
ন্যাটোর ভেতরের এই বিভাজন ইউরোপে বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। কেউ কেউ ইউরোপ-কেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কম থাকবে। আবার কেউ মনে করেন, ভবিষ্যতে ছোট ছোট আঞ্চলিক জোট গড়ে উঠতে পারে–যেমন ফ্রান্স-জার্মানি-পোল্যান্ড বা বাল্টিক-পোল্যান্ড নিরাপত্তা কাঠামো। একই সঙ্গে ইউরোপ জাপান, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে পারে।
একটি একক বিকল্পের পরিবর্তে ইউরোপে একটি খণ্ডিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনাই বেশি–যেখানে একাধিক জোট ও কাঠামো পাশাপাশি থাকবে। এর ফলে প্রতিরক্ষা ব্যয়, সমন্বয় এবং রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বড় ধরনের মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ইউরোপের ভেতরেই সামরিক প্রতিযোগিতা পুনরায় দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে বালকান অঞ্চল বা গ্রিস-তুরস্ক উত্তেজনায়।
তবে ইউরোপের গভীর অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ, বিশেষ করে ইউরোজোনের ভেতরে–পূর্ণমাত্রার সংঘাতকে অনেকটাই নিরুৎসাহিত করবে। তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে: ইউরোপ আর আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না।
রাশিয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ভয় থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, মস্কো এখনো ইউক্রেনের ডনবাস ও জাপোরিঝিয়ায় ব্যস্ত এবং পুরো ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার মতো সক্ষমতা সীমিত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহের মতো বিতর্কিত প্রস্তাব ইউরোপে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কোনো একক সংকটের ওপর নির্ভর করবে না, বরং আটলান্টিকের দুই পাড়ে নেওয়া ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। যে আস্থা একসময় স্বাভাবিক ছিল, এখন তা শর্তসাপেক্ষ। যে সহযোগিতা একসময় স্বয়ংক্রিয় ছিল, এখন তা আলোচনার বিষয়।
পরিশেষে বলা যায়, যে ন্যাটো শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করেছিল, ভবিষ্যতে সেই একই রূপে তা আর ফিরে আসবে না।
লেখক: মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ
(দ্য ক্রেডেলের সৌজন্যে)