ইসরায়েলের শক্তি, অর্থনীতি ও মিত্রতা কঠিন পরীক্ষার মুখে
ডেভিড ই. রোজেনবার্গ
ইসরায়েলের শক্তি, অর্থনীতি ও মিত্রতা কঠিন পরীক্ষার মুখে
ডেভিড ই. রোজেনবার্গ
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২০: ০৮
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ইরানের ওপর শুরু হয়, তখন ইসরায়েলকে এক আঞ্চলিক শক্তি–এমনকি একটি সম্ভাব্য বৃহৎ শক্তি–হিসেবেই দেখা যাচ্ছিল। যেমনটি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন। এই দাবিকে সন্দেহ করার মতো তেমন কারণও ছিল না। এর আগের আড়াই বছরে ইসরায়েল যেন হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরান–তাদের প্রধান শত্রুদের মোকাবিলায় সাফল্য দেখিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দেখিয়েছে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পেজার হামলার মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রদর্শন করেছে, এবং ইরান ও ইয়েমেনের হুথিদের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, নেতানিয়াহু যে যুদ্ধকে ‘সব যুদ্ধের শেষ যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন–ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে–তা যেন একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবেই মনে হয়েছিল।
কিন্তু ছয় সপ্তাহ পর চিত্রটি ভিন্ন। ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, অর্থনীতি বিপর্যস্ত, অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত, এবং রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত–তবুও যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি। ইরানের সরকার এখনো ক্ষমতায় রয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তাদের হাতে আছে, এবং তাদের কাছে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে সক্ষম। একই সময়ে, হিজবুল্লাহ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং নিরস্ত্র হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে–যুদ্ধের পর ইসরায়েল কি আগের চেয়ে শক্তিশালী, নাকি দুর্বল? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নেতানিয়াহু যেমন একদিকে এই যুদ্ধকে বিশাল সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে তিনি বলছেন যে লড়াই এখনও শেষ হয়নি। তার ভাষায়, “আমাদের এখনো লক্ষ্য অর্জন বাকি আছে, এবং আমরা তা হয় চুক্তির মাধ্যমে, নয়তো যুদ্ধ পুনরায় শুরু করে অর্জন করব…আমাদের আঙুল এখনো ট্রিগারে রয়েছে।”
ইসরায়েলের যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থান আংশিকভাবে নির্ভর করছে ইরান ও হিজবুল্লাহর ওপর–তাদের ক্ষতির মাত্রা এবং পুনর্গঠনের সক্ষমতা সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হবে। কিন্তু ইসরায়েলের নিজস্ব শক্তি ও সক্ষমতা মূল্যায়ন করা তুলনামূলক সহজ এবং সেই চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়।
ইসরায়েলের শক্তি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে: সামরিক শক্তি, অর্থনীতি ও জনগণের যুদ্ধ সহ্য করার সক্ষমতা, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা। এই তিন ক্ষেত্রেই নেতানিয়াহু তার দেশের সক্ষমতাকে চূড়ান্ত সীমায় ঠেলে দিয়েছেন– এবং আরও বেশি কিছু দাবি করছেন।
সামরিক দিক থেকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল অনেক কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এর জন্য ব্যয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, জনশক্তি ও অর্থ। ইসরায়েল ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আগের সংঘর্ষগুলোতে ৬৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশটির প্রায় ১১৬ বিলিয়ন ডলার সরাসরি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের খরচ ১১ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও ইরান ও লেবাননের অভিযান দ্রুত শেষ হয়ে যায়, তবুও প্রতিরক্ষা ব্যয় কমবে না। গাজা, দক্ষিণ সিরিয়া এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন অব্যাহত রয়েছে। নতুন বসতি স্থাপন রক্ষার জন্য সেনা বাড়ানো হয়েছে। লেবাননের দক্ষিণে একটি তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরির কথাও বলা হচ্ছে, যার জন্য আরও সেনা প্রয়োজন হবে। নেতানিয়াহু কোনো জায়গা থেকে সেনা প্রত্যাহারের আগ্রহ দেখাননি। বরং তিনি বলেছেন, “আমরাই আক্রমণ শুরু করি, আমরাই শত্রুকে চমকে দিই।”
কিন্তু সেনাবাহিনীর সম্পদ সীমাহীন নয়। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বাড়ানো বা অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের জন্য ছাড় বাতিলের প্রস্তাব এখনো অনুমোদিত হয়নি। ফলে রিজার্ভ সেনাদের দীর্ঘ সময় ধরে ডাকা হচ্ছে। সেনাপ্রধান এয়াল জামির সতর্ক করে বলেছেন, প্রায় ১৫ হাজার সেনার ঘাটতির কারণে ‘আইডিএফ নিজেই ভেঙে পড়তে পারে’। অস্ত্র ও সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহে।
অর্থনীতির দিক থেকে, গত দুই দশকে ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। ২০২৩ সালের হামাস হামলার পর এবং ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে জিডিপি কমে গেলেও দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে। উচ্চ প্রযুক্তি খাত ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা অর্থনৈতিক চাপ কমিয়েছে।
কিন্তু এই স্থিতিস্থাপকতা এখন চাপে পড়ছে। যুদ্ধের খরচ মেটাতে সরকার কর বাড়ানো বা সামাজিক খাতে ব্যয় কমানো এড়িয়ে গেছে, ফলে অর্থনীতি সচল থাকলেও সরকারি ঋণ বেড়ে গেছে। গাজা যুদ্ধের আগে যেখানে ঋণ জিডিপির ৬০ শতাংশ ছিল, তা ২০২৬ সালের শেষে ৭০.৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা খাতে আরও ১১৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে।
তৃতীয় স্তম্ভ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটিও ঝুঁকির মুখে। ২০২৩ সালের হামাস হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে নজিরবিহীন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ সেই সমর্থনকে আরও গভীর করেছে বলে মনে হলেও, বাস্তবে এটি হয়তো সম্পর্কের সর্বোচ্চ সীমা।
এই যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে চাপ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে ব্যর্থতার দায় ইসরায়েলের ওপর চাপানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যুদ্ধের পক্ষে রাজি করিয়েছিলেন– যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।
এছাড়া, মার্কিন জনমতে ইসরায়েলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ আমেরিকান এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি হলেও রিপাবলিকানদের মধ্যেও সমর্থন কমছে। ট্রাম্পপন্থী অনেক নেতাও এখন এই যুদ্ধের সমালোচনা করছেন।
এই তিনটি স্তম্ভই যখন দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন নেতানিয়াহু আগের মতোই এগিয়ে যাচ্ছেন। তার বিকল্প কী?
সমালোচকেরা বলেন, সামরিক সাফল্যকে কূটনৈতিক চুক্তিতে রূপান্তর করা উচিত ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহু জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চুক্তির ওপর আস্থা রাখেন না। কিছু ক্ষেত্রে এটি যুক্তিসঙ্গতও– লেবানন ও সিরিয়ার সরকার দুর্বল, আর ইরান ও হামাস আদর্শগতভাবে ইসরায়েলের অস্তিত্বই স্বীকার করে না।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েও শত্রুদের সম্পূর্ণভাবে দমন করা যায়নি। হামাস প্রায় সব সামরিক সক্ষমতা হারিয়েও আত্মসমর্পণ করেনি। ফলে ইসরায়েল এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে অনিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলতেই থাকবে। আর তা হবে কমে যাওয়া সম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন ছাড়াই।
লেখক: ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ-এর ইংরেজি সংস্করণের অর্থনীতি বিষয়ক সম্পাদক ও কলামিস্ট
(লেখাটি ফরেন পলিসির সৌজন্যে প্রকাশিত)
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ইরানের ওপর শুরু হয়, তখন ইসরায়েলকে এক আঞ্চলিক শক্তি–এমনকি একটি সম্ভাব্য বৃহৎ শক্তি–হিসেবেই দেখা যাচ্ছিল। যেমনটি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন। এই দাবিকে সন্দেহ করার মতো তেমন কারণও ছিল না। এর আগের আড়াই বছরে ইসরায়েল যেন হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরান–তাদের প্রধান শত্রুদের মোকাবিলায় সাফল্য দেখিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দেখিয়েছে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পেজার হামলার মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রদর্শন করেছে, এবং ইরান ও ইয়েমেনের হুথিদের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, নেতানিয়াহু যে যুদ্ধকে ‘সব যুদ্ধের শেষ যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন–ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে–তা যেন একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবেই মনে হয়েছিল।
কিন্তু ছয় সপ্তাহ পর চিত্রটি ভিন্ন। ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, অর্থনীতি বিপর্যস্ত, অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত, এবং রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত–তবুও যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি। ইরানের সরকার এখনো ক্ষমতায় রয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তাদের হাতে আছে, এবং তাদের কাছে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে সক্ষম। একই সময়ে, হিজবুল্লাহ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং নিরস্ত্র হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে–যুদ্ধের পর ইসরায়েল কি আগের চেয়ে শক্তিশালী, নাকি দুর্বল? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নেতানিয়াহু যেমন একদিকে এই যুদ্ধকে বিশাল সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে তিনি বলছেন যে লড়াই এখনও শেষ হয়নি। তার ভাষায়, “আমাদের এখনো লক্ষ্য অর্জন বাকি আছে, এবং আমরা তা হয় চুক্তির মাধ্যমে, নয়তো যুদ্ধ পুনরায় শুরু করে অর্জন করব…আমাদের আঙুল এখনো ট্রিগারে রয়েছে।”
ইসরায়েলের যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থান আংশিকভাবে নির্ভর করছে ইরান ও হিজবুল্লাহর ওপর–তাদের ক্ষতির মাত্রা এবং পুনর্গঠনের সক্ষমতা সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হবে। কিন্তু ইসরায়েলের নিজস্ব শক্তি ও সক্ষমতা মূল্যায়ন করা তুলনামূলক সহজ এবং সেই চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়।
ইসরায়েলের শক্তি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে: সামরিক শক্তি, অর্থনীতি ও জনগণের যুদ্ধ সহ্য করার সক্ষমতা, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা। এই তিন ক্ষেত্রেই নেতানিয়াহু তার দেশের সক্ষমতাকে চূড়ান্ত সীমায় ঠেলে দিয়েছেন– এবং আরও বেশি কিছু দাবি করছেন।
সামরিক দিক থেকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল অনেক কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এর জন্য ব্যয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, জনশক্তি ও অর্থ। ইসরায়েল ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আগের সংঘর্ষগুলোতে ৬৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশটির প্রায় ১১৬ বিলিয়ন ডলার সরাসরি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের খরচ ১১ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও ইরান ও লেবাননের অভিযান দ্রুত শেষ হয়ে যায়, তবুও প্রতিরক্ষা ব্যয় কমবে না। গাজা, দক্ষিণ সিরিয়া এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন অব্যাহত রয়েছে। নতুন বসতি স্থাপন রক্ষার জন্য সেনা বাড়ানো হয়েছে। লেবাননের দক্ষিণে একটি তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরির কথাও বলা হচ্ছে, যার জন্য আরও সেনা প্রয়োজন হবে। নেতানিয়াহু কোনো জায়গা থেকে সেনা প্রত্যাহারের আগ্রহ দেখাননি। বরং তিনি বলেছেন, “আমরাই আক্রমণ শুরু করি, আমরাই শত্রুকে চমকে দিই।”
কিন্তু সেনাবাহিনীর সম্পদ সীমাহীন নয়। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বাড়ানো বা অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের জন্য ছাড় বাতিলের প্রস্তাব এখনো অনুমোদিত হয়নি। ফলে রিজার্ভ সেনাদের দীর্ঘ সময় ধরে ডাকা হচ্ছে। সেনাপ্রধান এয়াল জামির সতর্ক করে বলেছেন, প্রায় ১৫ হাজার সেনার ঘাটতির কারণে ‘আইডিএফ নিজেই ভেঙে পড়তে পারে’। অস্ত্র ও সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহে।
অর্থনীতির দিক থেকে, গত দুই দশকে ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। ২০২৩ সালের হামাস হামলার পর এবং ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে জিডিপি কমে গেলেও দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে। উচ্চ প্রযুক্তি খাত ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা অর্থনৈতিক চাপ কমিয়েছে।
কিন্তু এই স্থিতিস্থাপকতা এখন চাপে পড়ছে। যুদ্ধের খরচ মেটাতে সরকার কর বাড়ানো বা সামাজিক খাতে ব্যয় কমানো এড়িয়ে গেছে, ফলে অর্থনীতি সচল থাকলেও সরকারি ঋণ বেড়ে গেছে। গাজা যুদ্ধের আগে যেখানে ঋণ জিডিপির ৬০ শতাংশ ছিল, তা ২০২৬ সালের শেষে ৭০.৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা খাতে আরও ১১৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে।
তৃতীয় স্তম্ভ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটিও ঝুঁকির মুখে। ২০২৩ সালের হামাস হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে নজিরবিহীন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ সেই সমর্থনকে আরও গভীর করেছে বলে মনে হলেও, বাস্তবে এটি হয়তো সম্পর্কের সর্বোচ্চ সীমা।
এই যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে চাপ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে ব্যর্থতার দায় ইসরায়েলের ওপর চাপানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যুদ্ধের পক্ষে রাজি করিয়েছিলেন– যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।
এছাড়া, মার্কিন জনমতে ইসরায়েলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ আমেরিকান এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি হলেও রিপাবলিকানদের মধ্যেও সমর্থন কমছে। ট্রাম্পপন্থী অনেক নেতাও এখন এই যুদ্ধের সমালোচনা করছেন।
এই তিনটি স্তম্ভই যখন দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন নেতানিয়াহু আগের মতোই এগিয়ে যাচ্ছেন। তার বিকল্প কী?
সমালোচকেরা বলেন, সামরিক সাফল্যকে কূটনৈতিক চুক্তিতে রূপান্তর করা উচিত ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহু জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চুক্তির ওপর আস্থা রাখেন না। কিছু ক্ষেত্রে এটি যুক্তিসঙ্গতও– লেবানন ও সিরিয়ার সরকার দুর্বল, আর ইরান ও হামাস আদর্শগতভাবে ইসরায়েলের অস্তিত্বই স্বীকার করে না।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েও শত্রুদের সম্পূর্ণভাবে দমন করা যায়নি। হামাস প্রায় সব সামরিক সক্ষমতা হারিয়েও আত্মসমর্পণ করেনি। ফলে ইসরায়েল এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে অনিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলতেই থাকবে। আর তা হবে কমে যাওয়া সম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন ছাড়াই।
লেখক: ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ-এর ইংরেজি সংস্করণের অর্থনীতি বিষয়ক সম্পাদক ও কলামিস্ট