নারীবিদ্বেষকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আমাদের এত সময় কেন লাগল?
নারীবিদ্বেষী পুরুষদের তথাকথিত অনলাইন জগত বা ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ বহু বছর ধরেই বিষবাষ্প ছড়িয়ে চলেছে। কিন্তু মূলধারার সংস্কৃতি দীর্ঘ সময় ধরে এর বিপরীতে কেবল এক অসহায় নীরবতা পালন করে এসেছে। যদিও নারীবিদ্বেষ ছড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন। কিন্তু নারীদের প্রতি পুরুষতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতার এই চিত্রটি অত্যন্ত পরিচিত।
এই শতকের শুরুর দিকে, একদল ক্ষুব্ধ ও সমাজবিচ্ছিন্ন পুরুষ অনলাইনে চরম নারীবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডে মেতে ওঠে। তারা জনসমক্ষে থাকা নারীদের লক্ষ্য করে নিয়মিত হুমকি, অপমান, হয়রানি ও হ্যাকিং শুরু করে। এমনকি ‘রিভেঞ্জ পর্ন’-এর মতো জঘন্য উপায়ে তাদের হেনস্তা করা হতে থাকে। এখন শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও, সেই সময়ে অনলাইন জগতকে বাস্তব জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয় হিসেবে দেখা হতো।
অন্তত আমাকে তো এমনটাই বলা হয়েছিল যখন আমি একজন তরুণ কলামিস্ট হিসেবে প্রথমবার প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম। তাদের সাফ কথা ছিল, “কিছুই করার নেই, কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় যা ঘটে তা বাস্তব নয় এবং এর কোনো গুরুত্ব নেই।” আমাকে বলা হয়, আমার যদি এসব ভালো না লাগে, তবে যেন আমি অফলাইনে চলে যাই এবং সম্ভবত রোটারি ফোন আর ফ্যাক্স ব্যবহার করে আমার কাজ চালিয়ে যাই।
আমরা যারা শুরুর দিকে এই ম্যানোস্ফিয়ার-এর লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলাম, তাদের কাছে বিষয়টিকে উপেক্ষা করার মতো বিলাসিতা ছিল না। আমাদের জন্য এটা বোঝা খুব সহজ ছিল যে, এটি সম্পূর্ণ নতুন কিন্তু গুরুতর কিছু। আমাদের ওপর যে কৌশলগুলো প্রয়োগ করা হচ্ছিল, সেগুলো যে ভবিষ্যতে অন্য কোথাও ব্যবহার করা হবে এবং পরিস্থিতি কতটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে তা আমরা তখনই আঁচ করতে পেরেছিলাম।
সাইবার বুলিংয়ের শিকার এক নারী। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি২০১৪ সালে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। ওই বছরের মে মাসে সন্ত্রাসী এলিয়ট রজার ছয়জনকে হত্যা করেন। এই ঘটনার পরে যৌন লালসা ও আক্ষেপ থেকে উগ্রপন্থী হওয়া একদল যুবকের প্রতি বিশ্ববাসীর মনোযোগ দেয়। যাদেরকে বলে ইনসেল।
এর তিন মাস পরেই ঘটে গেমারগেট কেলেঙ্কারি। এটা হলো ভিডিও গেম ইন্ডাস্ট্রির নারীদের লক্ষ্য করে শুরু হওয়া এক সংঘবদ্ধ অনলাইন হয়রানি। এর সূত্রপাত হয়েছিল যখন গেম নির্মাতা জো কুইন তার এক সাবেক প্রেমিকের প্রতিহিংসার শিকার হন। ওই ব্যক্তি যৌন ও পেশাগত ঈর্ষা থেকে কুইনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ এক বিষোদগারপূর্ণ লেখা প্রকাশ করেন। এই তুচ্ছ ঘটনাটিই হাজার হাজার পুরুষ গেমারদের ক্ষেপিয়ে তোলে। তারা মনে করত, গেমের জগতটি কেবল তাদের ব্যক্তিগত আধিপত্যের জায়গা এবং সেখানে নারীদের উপস্থিতি তাদের সহ্য হচ্ছিল না।
ফোর চ্যানের মতো বেনামী ফোরামগুলোতে একদল পুরুষ সাংবাদিকতার নীতি রক্ষার অজুহাতে পরিকল্পিতভাবে গালিগালাজ ও হেনস্তা শুরু করে। কুইনসহ অন্য নির্মাতারা প্রাণভয়ে ঘর ছাড়তে বাধ্য হন, কিন্তু ততক্ষণে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে এই ইনসেলরা একের পর এক গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকে। কমিকস থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র ও টিভি-বিনোদনের প্রতিটি মাধ্যম অবসেসিভ ট্রোলের কবলে পড়ে। তারা তখন নিজেদেরকে যারা সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে লড়াই করে তাদের বিরুদ্ধে সাহসী বিদ্রোহী হিসেবে জাহির করতে থাকে। যেহেতু তারা পার পেয়ে যাচ্ছিল, একসময় এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তাদের কাছে এক ধরনের খেলায় পরিণত হলো।
গেমারগেট মূলত সেই সব ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের মানুষদের একই সুতোয় গেঁথেছিল, যাদের আমরা এখন সমষ্টিগতভাবে ম্যানোস্ফিয়ার বলি। সেখানে ছিল সুযোগসন্ধানী পিকআপ আর্টিস্ট, কট্টর খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী, তিক্ততায় ভরা ইনসেল, আর তাদের সেই সব ক্ষুব্ধ ভক্তরা যারা কোনো গল্পে নিজেদের মতো কাউকে নায়ক হিসেবে দেখতে না পেলেই সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠত। এই সব অগোছালো চিন্তাগুলো কালক্রমে একটি সুসংহত মতাদর্শে রূপ নেয়, যেখানে মনে করা হয় নারীদের কারণে তারা বঞ্চিত হয়। তাদের নিজস্ব ভাষা হলো, যেমন এস্কেপিং দ্য ম্যাট্রিক্স কিংবা টেকিং দ্য রেড পিল (কঠোর সত্য মেনে নেওয়া) এবং তারা নিজেদের এক অদ্ভুত বীরোচিত কিন্তু বেচারা হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করল, যাদের শত্রু হলো নারীদের যৌন ক্ষমতা। পুঁজিবাদী অর্থনীতির সংকটে দিশেহারা ও সমাজবিচ্ছিন্ন পুরুষদের এই ক্ষোভ ও একাকীত্বকে একটি সাধারণ লক্ষ্যের দিকে চালানো হয়েছিল। এটা ইতিহাসের জঘন্যতম কুশীলবরা খুব ভালোভাবেই ব্যবহার করেছিল।
এই শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি সময়েও মূলধারার গণমাধ্যমগুলো ম্যানোস্ফেয়ার বা পুরুষতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্ববাদী এই অনলাইন গোষ্ঠীর শক্তিকে অবজ্ঞা করে গিয়েছিল। তবে চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো সেই ভুল করেনি। গেমারগেট বিতর্কটি নব্য অল্ট-রাইট মতাদর্শের প্রধান প্রচারকরা বেশ ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছিল।
ব্রাইটবার্ট নিউজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং তুখোড় রাজনৈতিক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন এই ক্ষুব্ধ তরুণ গোষ্ঠীর মধ্যকার সম্ভাবনাকে বুঝতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্ব নেন এবং এই বিশাল ভোটব্যাংককে ট্রাম্পের পক্ষে টানতে সক্ষম হন। ট্রাম্প এমন একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যার মধ্যে নব্য পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদের সকল কাঙ্ক্ষিত গুণ ছিল, যিনি প্রকাশ্যে যৌন সহিংসতা নিয়ে দম্ভোক্তি করতেন। নিজের খামখেয়ালিপনা দিয়ে গোটা বিশ্বকে অস্থির করে রাখতেন।
প্রতীকী ছবি
ঠিক একইভাবে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের উত্থানকেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছিল, যতক্ষণ না পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে নারীবাদী এবং কৃষ্ণাঙ্গ, কুইয়ার ও নারী নির্মাতাদের ওপর যে কৌশলে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, পরবর্তীতে উন্নত বিশ্বের কট্টর ডানপন্থি আন্দোলনগুলোতেও ঠিক একই ফর্মুলা ব্যবহার করা হয়। আর এর প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় এক ধরনের নীরব নিরপেক্ষতা বা উভয় পক্ষকেই দোষারোপ করার প্রবণতা।
তখনকার মতো এখনো অনেক রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং শিল্পোদ্যোক্তারা ম্যানোস্ফেয়ারের চরম বাড়াবাড়ির সমালোচনা করলেও স্পষ্ট কোনো অবস্থান নিতে রাজি নন। কারণ, নৈতিক সততা দেখাতে গিয়ে পাছে আবার যদি তাদেরই সমর্থক গোষ্ঠীকে চটিয়ে ফেলেন।
২০১০ এর দশক পেরিয়ে ২০২০ এর দশকে ঢোকার সাথে সাথে ‘ম্যানোস্ফেয়ার’ এর পরিধি আরও বিস্তৃত হতে থাকে। এরা তাদের অনুসারীদের উগ্র এবং একইসাথে প্রকাশ্য বর্ণবাদী মতাদর্শের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ঠিক সেই সময়েই ‘সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়র’ বা সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ যারা করে, তাদেরকে মানব স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখানোটা এক ধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়।
তৎকালীন রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্টদের কাছে #MeToo আন্দোলন এক বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এতে একপ্রকার প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যে, নারীবাদীরা সীমা ছাড়িয়ে গেছে যেজন্য তাদের শাস্তি হওয়া উচিত বলেও তারা মনে করতেন। যখন তৃতীয় বা চতুর্থবারের মতো একটি ডকুমেন্টরি টিম আমার সাক্ষাৎকার নিতে এল, তখন আমি বুঝতে পারলাম যে তারা আসলে সাহায্য করতে আসেনি, তামাশা দেখতে এসেছে।
অনেকেই এমনটা করেছিলেন। গেমারগেট কেলেঙ্কারি পরবর্তী সময়ে বিবেকবর্জিত কিন্তু উদ্যমী তরুণদের কাছে এই বিদ্বেষ ছড়ানোই হয়ে দাঁড়াল এক লাভজনক ব্যবসা। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি অনেক কট্টর ডানপন্থী তরুণের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, যারা স্বীকার করেছে যে তাদের আসল লক্ষ্য ছিল ইনফ্লুয়েন্সার বা চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়া। কেবল ক্লিক আর ভিউ পাওয়ার নেশায় তারা বিতর্ক তৈরি করত এবং উগ্র ডানপন্থার সাথে সখ্য গড়ে তুলত। কিন্তু এই লোক দেখানো বিষয়টাই সিরিয়াস হতে খুব বেশি সময় নেয়নি। কার্ট ভনেগাট যেমন তার ফ্যাসিবাদবিরোধী মাস্টারপিস ‘মাদার নাইট’-এ লিখেছিলেন, “আমরা যা হওয়ার ভান করি, দিন শেষে আমরা তা-ই হয়ে যাই। তাই আমরা কী হওয়ার ভান করছি, সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”
এবার এখন আর কেউ একে স্রেফ রসিকতা বলে উড়িয়ে দিচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বুড়ো বয়সে এসেও নির্লজ্জের মতো প্রকাশ্যেই ম্যানোস্ফেয়ারের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। আর জেন জি বা বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা দলে দলে কট্টর ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। গেমারগেটের সেই সামাজিক ধ্বংসলীলা থেকে শুরু করে আজকের পুরুষতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্ববাদী প্রতারকচক্রের মধ্যে এক স্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। এরা তাদের অনুসারীদের এমন এক কাল্পনিক জগতের স্বপ্ন দেখিয়ে বিভ্রান্ত করছে যেখানে নারীরা স্রেফ খেলার ছলে হারিয়ে দেওয়ার মতো জড় বস্তু যাদের জয় করা যাবে, শোষণ করা যাবে কিংবা কোনো বাজারে কেনাবেচা করা যাবে।
অনেক তরুণ তাদের পুরো জীবনটাই কাটিয়েছে এই বিষাক্ত নারীবিদ্বেষের ছায়ায়। আবার ঠিক একইভাবে তরুণীরাও এর শিকার হয়েছে। আর এই ভয়ংকর মতাদর্শ আজও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুণপোকার মতো কামড় বসিয়ে চলেছে।
হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের কথা বলা যাক। মিলার মূলত প্রেসিডেন্টকে গ্রিনল্যান্ড দখলের উসকানি দিতেই ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সময় বের করে কয়েক সপ্তাহ আগে এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট দেন। সেখানে তাকে নতুন স্টার ট্রেক সিরিজটিকে অতিরিক্ত বৈচিত্র্যময় হওয়ার কারণে উপহাস করতে দেখা যায়। ইলন মাস্কও তার জাতিগত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর ট্রান্সফোবিয়া থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে তার সাথে একমত পোষণ করেন।
পুরো বিষয়টি লজ্জাজনক, এবং তা কেবল এজন্য নয় যে যেকোনো শিক্ষিত নার্ড বা স্টার ট্রেক ভক্তই জানেন এটি ১৯৬৬ সাল থেকেই অত্যন্ত প্রগতিশীল। বরং লজ্জার কারণ হলো, এই বিশ্বকে নিজেদের ব্যক্তিগত রণক্ষেত্র বানিয়ে ফেলার পরও শোষক শ্বেতাঙ্গ পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধিরা এখনো খুশি হতে পারছে না। তারা এখনো চায় আমরা যেন তাদের প্রতিটি তুচ্ছ আবদার মেটাই। আর তারা এটি চালিয়েই যাবে, যতক্ষণ না আমরা সবাই মিলে শেষ পর্যন্ত তাদের এই অর্থহীন আস্ফালনকে প্রত্যাখ্যান করছি।
লেখক: সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার
*দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত*