সি চিনপিংয়ের নতুন অর্থনৈতিক ডকট্রিন ও চীনের ভবিষ্যৎ
ড্যামিয়েন মা
সি চিনপিংয়ের নতুন অর্থনৈতিক ডকট্রিন ও চীনের ভবিষ্যৎ
ড্যামিয়েন মা
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ০৫
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স
ইরানে যুদ্ধ শুরু হলে দেশটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। প্রণালিটির সংকটে যখন বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল, তখন নিজে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নকশায় অনুমোদন দিচ্ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টে চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়, যার মেয়াদ ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘উচ্চমানের উন্নয়ন’ অগ্রাধিকার দেওয়া। এটি এখন আর শুধু একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য নয়, বরং সি-এর নিজস্ব নীতির অংশ হয়ে গেছে। নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় এই ‘উচ্চমানের উন্নয়ন কথাটি আগের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এই ধারণাটি একদিকে যেমন অর্থনীতির দিক নির্দেশনা দিচ্ছে, অন্যদিকে সি-এর রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্বের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
চীন অনেকটাই বড় করপোরেশনগুলোর মতো পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা চক্রে পরিচালিত হয়। যা রাজনীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব পরিকল্পনা বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে অন্তত দুই বছর ধরে প্রস্তুত করা হয় এবং সেখানে শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে।
পরিকল্পনা প্রকাশের পর সেটি বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় প্রশাসন থেকে প্রাদেশিক পর্যায় পর্যন্ত পুরো আমলাতন্ত্রকে সক্রিয় করা হয়, যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এড়ানো যায়। যদিও পরিকল্পনায় স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কিছু সুযোগ থাকে, তবুও সরকারের প্রতিটি স্তরকে নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে থেকেই কাজ করতে হয়। তাদের কর্মদক্ষতা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও এই বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল।
চীন অনেকটাই বড় করপোরেশনগুলোর মতো পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা চক্রে পরিচালিত হয়। ছবি: রয়টার্স
চীনের অর্থনীতি পুনর্গঠনে বহু বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সি, তবে সাফল্য এসেছে মিশ্রভাবে। তিনি প্রথমে চতুর্দশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপি লক্ষ্যমাত্রার গুরুত্ব কমিয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন। এর কয়েক বছরের মধ্যে সম্পত্তি খাতে আকস্মিক কড়াকড়ি আরোপ করেন, যা অনেককে বিস্মিত করে। এরপর আবার বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেন। তার পুরো মেয়াদজুড়েই বড় ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে বিরত থাকার প্রবণতা বাজারে হতাশা সৃষ্টি করেছে।
তবে চীনের অর্থনীতি পুনর্গঠন কেবল নীতিমালা নির্ধারণের বিষয় নয়। পরিকল্পনায় যা বলা হয় এবং বাস্তবে যা ঘটে–এই দুইয়ের মধ্যে যে ফাঁক, তা মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির সমস্যা, কেবল নীতির নয়।
সি মনে করেন চীনের বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল জিডিপি পূজা- অর্থাৎ সবকিছুই জিডিপি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করা। তার মতে, জিডিপি শুধু অর্থনৈতিক সূচক ছিল না, এটি কর্মকর্তাদের কাজের প্রধান মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছিল। ফলে কোনো অঞ্চলের জিডিপি বাড়লে, সেখানকার কর্মকর্তাদেরও সফল হিসেবে ধরা হতো। তারা আসলেই কতটা কার্যকর উন্নয়ন করেছেন, তা অনেক সময় গুরুত্ব পেত না।
তবে এই সূচক সহজেই বিকৃত করা সম্ভব ছিল। জিডিপি বাড়াতে প্রায়ই অপ্রয়োজনীয়ভাবে উৎপাদন সক্ষমতা ও বিনিয়োগ বাড়ানো হতো, তা প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করুক বা না করুক। উদাহরণ হিসেবে, ২০১০-এর দশকে চীনে ‘ঘোস্ট সিটি’ বা জনবসতিহীন নগরীর ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঘোস্ট সিটিতে অবকাঠামো ছিল, কিন্তু মানুষ থাকত না। এর ফলে একদিকে অপচয় বেড়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে ঋণের চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এসব কারণেই সি এই ধরনের জিডিপি-নির্ভর পদ্ধতি অপছন্দ করেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই নতুন উচ্চমানের উন্নয়ন নীতির মূল বিষয় কী। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন বোঝার একটি সহজ উপায় হলো—এখন গুরুত্ব পাচ্ছে মোট উৎপাদনশীলতা বা টোটাল ফ্যাক্টর প্রোডাক্টিভিটি (টিএফপি), জিডিপি নয়। অর্থনীতির ভাষায়, এটি বিস্তৃত প্রবৃদ্ধি থেকে নিবিড় প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর।
বিস্তৃত প্রবৃদ্ধি মূলত বেশি শ্রম, বেশি যন্ত্র ও বেশি পুঁজি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভরশীল, যা পরিমাণভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এক পর্যায়ে এই পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধতা আসে, কারণ অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহারের পর তা আর অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর থাকে না।
তবুও এই ধরনের প্রবৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি নতুন সড়ক নির্মাণে জিডিপি বাড়ে। কিন্তু যদি সেটি ব্যবহার কম হয়, তবে প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য তেমন তৈরি হয় না। তবুও স্থানীয় জিডিপি বাড়লে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদোন্নতির সম্ভাবনা বাড়ে, ফলে এই মডেল অনুসরণে রাজনৈতিক প্রণোদনা শক্তিশালী থাকে।
চীনের বিশাল অর্থনীতিতে এই প্রবৃদ্ধি মডেল দীর্ঘদিন ধরেই টিকে আছে, যা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। সাধারণত, সস্তা শ্রম কমে গেলে (যাকে ‘লুইস টার্নিং পয়েন্ট’ বলা হয়) এই ধরনের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসে। তখন শ্রম ব্যয় বাড়তে শুরু করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দেশগুলো নিবিড় প্রবৃদ্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এই নিবিড় প্রবৃদ্ধি সীমিত সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রযুক্তি, প্রক্রিয়া ও জ্ঞান উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর করে। সংক্ষেপে, এটি টিএফপি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি। সি-এর মতে এটিই উচ্চমানের উন্নয়ন। এখন আর শুধু জিডিপি বাড়ানোই মূল লক্ষ্য নয়। বরং স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেখাতে হবে যে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা কতটা ‘ভালো মানের’ বা কার্যকর উন্নয়ন তৈরি করছে। এই নতুন নিয়মের কারণে ভবিষ্যতে কয়েকটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রথমত, ভবিষ্যতে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার আগের মতো দ্রুত নাও হতে পারে। বরং কম প্রবৃদ্ধি এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন এমন এক পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা বড় আকারের অবকাঠামো ও উৎপাদন সম্প্রসারণের সময় শেষ হচ্ছে। এই সময়েই দেশটি বুলেট ট্রেন, আধুনিক শহর এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো বড় উন্নয়ন প্রকল্পে দ্রুত অগ্রগতি দেখিয়েছে।
চীন এখন এমন এক পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা বড় আকারের অবকাঠামো ও উৎপাদন সম্প্রসারণের সময় শেষ হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
আগামী দিনে চীনা কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য হবে শুধু বেশি উৎপাদন করা নয়, বরং বেশি মূল্য তৈরি করা, অর্থাৎ মান ও দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া। এতে ‘ইনভলিউশন’ বা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার সমস্যা কমানোর চেষ্টা করা হবে, যেখানে কোম্পানিগুলো একে অপরের সঙ্গে কঠোর প্রতিযোগিতায় মুনাফা কমিয়ে ফেলে। এই সমস্যা ইতোমধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরশক্তি ও হাইড্রোজেন খাতে দেখা যাচ্ছে।
এই প্রবণতা উদ্ভাবনের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবে এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কোম্পানিগুলোর মুনাফা থাকলে তারা সহজেই এই বিনিয়োগ করতে পারে। অন্যদিকে, কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকলে উদ্ভাবনের সুযোগ কমে যায়। লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোই বৈশ্বিক উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারে।
সি-এর লক্ষ্য হলো চীনকে প্রযুক্তিতে আরও স্বনির্ভর করা। এখন চীনা কোম্পানিগুলোকে শুধু পুরোনো প্রযুক্তি উন্নত করা নয়, বরং একেবারে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করতে বলা হচ্ছে। একে বলা হচ্ছে ‘০ থেকে ১’ উদ্ভাবন। যেমন যুক্তরাষ্ট্র ইন্টারনেট ও মাইক্রোপ্রসেসরের মতো নতুন প্রযুক্তি তৈরি করেছিল।
তবে এই পরিবর্তন দ্রুত করা সহজ নয়। পাঁচ বছরের মধ্যে এত বড় অর্থনীতিকে নতুন পথে নিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। কারণ, এত বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতেই সি চিনপিংয়ের এক দশকের বেশি সময় লেগেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো–এই নীতিগুলো বাস্তবে কতটা সফলভাবে কার্যকর করা যায়।
লেখক:কার্নেগি চায়নার পরিচালক
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স
ইরানে যুদ্ধ শুরু হলে দেশটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। প্রণালিটির সংকটে যখন বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল, তখন নিজে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নকশায় অনুমোদন দিচ্ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টে চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়, যার মেয়াদ ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘উচ্চমানের উন্নয়ন’ অগ্রাধিকার দেওয়া। এটি এখন আর শুধু একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য নয়, বরং সি-এর নিজস্ব নীতির অংশ হয়ে গেছে। নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় এই ‘উচ্চমানের উন্নয়ন কথাটি আগের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এই ধারণাটি একদিকে যেমন অর্থনীতির দিক নির্দেশনা দিচ্ছে, অন্যদিকে সি-এর রাজনৈতিক অবস্থান ও নেতৃত্বের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
চীন অনেকটাই বড় করপোরেশনগুলোর মতো পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা চক্রে পরিচালিত হয়। যা রাজনীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব পরিকল্পনা বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে অন্তত দুই বছর ধরে প্রস্তুত করা হয় এবং সেখানে শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে।
পরিকল্পনা প্রকাশের পর সেটি বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় প্রশাসন থেকে প্রাদেশিক পর্যায় পর্যন্ত পুরো আমলাতন্ত্রকে সক্রিয় করা হয়, যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এড়ানো যায়। যদিও পরিকল্পনায় স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কিছু সুযোগ থাকে, তবুও সরকারের প্রতিটি স্তরকে নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে থেকেই কাজ করতে হয়। তাদের কর্মদক্ষতা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও এই বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল।
চীন অনেকটাই বড় করপোরেশনগুলোর মতো পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা চক্রে পরিচালিত হয়। ছবি: রয়টার্স
চীনের অর্থনীতি পুনর্গঠনে বহু বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সি, তবে সাফল্য এসেছে মিশ্রভাবে। তিনি প্রথমে চতুর্দশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপি লক্ষ্যমাত্রার গুরুত্ব কমিয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন। এর কয়েক বছরের মধ্যে সম্পত্তি খাতে আকস্মিক কড়াকড়ি আরোপ করেন, যা অনেককে বিস্মিত করে। এরপর আবার বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেন। তার পুরো মেয়াদজুড়েই বড় ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে বিরত থাকার প্রবণতা বাজারে হতাশা সৃষ্টি করেছে।
তবে চীনের অর্থনীতি পুনর্গঠন কেবল নীতিমালা নির্ধারণের বিষয় নয়। পরিকল্পনায় যা বলা হয় এবং বাস্তবে যা ঘটে–এই দুইয়ের মধ্যে যে ফাঁক, তা মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির সমস্যা, কেবল নীতির নয়।
সি মনে করেন চীনের বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল জিডিপি পূজা- অর্থাৎ সবকিছুই জিডিপি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করা। তার মতে, জিডিপি শুধু অর্থনৈতিক সূচক ছিল না, এটি কর্মকর্তাদের কাজের প্রধান মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছিল। ফলে কোনো অঞ্চলের জিডিপি বাড়লে, সেখানকার কর্মকর্তাদেরও সফল হিসেবে ধরা হতো। তারা আসলেই কতটা কার্যকর উন্নয়ন করেছেন, তা অনেক সময় গুরুত্ব পেত না।
তবে এই সূচক সহজেই বিকৃত করা সম্ভব ছিল। জিডিপি বাড়াতে প্রায়ই অপ্রয়োজনীয়ভাবে উৎপাদন সক্ষমতা ও বিনিয়োগ বাড়ানো হতো, তা প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করুক বা না করুক। উদাহরণ হিসেবে, ২০১০-এর দশকে চীনে ‘ঘোস্ট সিটি’ বা জনবসতিহীন নগরীর ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঘোস্ট সিটিতে অবকাঠামো ছিল, কিন্তু মানুষ থাকত না। এর ফলে একদিকে অপচয় বেড়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে ঋণের চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এসব কারণেই সি এই ধরনের জিডিপি-নির্ভর পদ্ধতি অপছন্দ করেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই নতুন উচ্চমানের উন্নয়ন নীতির মূল বিষয় কী। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন বোঝার একটি সহজ উপায় হলো—এখন গুরুত্ব পাচ্ছে মোট উৎপাদনশীলতা বা টোটাল ফ্যাক্টর প্রোডাক্টিভিটি (টিএফপি), জিডিপি নয়। অর্থনীতির ভাষায়, এটি বিস্তৃত প্রবৃদ্ধি থেকে নিবিড় প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর।
বিস্তৃত প্রবৃদ্ধি মূলত বেশি শ্রম, বেশি যন্ত্র ও বেশি পুঁজি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভরশীল, যা পরিমাণভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এক পর্যায়ে এই পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধতা আসে, কারণ অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহারের পর তা আর অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর থাকে না।
তবুও এই ধরনের প্রবৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি নতুন সড়ক নির্মাণে জিডিপি বাড়ে। কিন্তু যদি সেটি ব্যবহার কম হয়, তবে প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য তেমন তৈরি হয় না। তবুও স্থানীয় জিডিপি বাড়লে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদোন্নতির সম্ভাবনা বাড়ে, ফলে এই মডেল অনুসরণে রাজনৈতিক প্রণোদনা শক্তিশালী থাকে।
চীনের বিশাল অর্থনীতিতে এই প্রবৃদ্ধি মডেল দীর্ঘদিন ধরেই টিকে আছে, যা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। সাধারণত, সস্তা শ্রম কমে গেলে (যাকে ‘লুইস টার্নিং পয়েন্ট’ বলা হয়) এই ধরনের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসে। তখন শ্রম ব্যয় বাড়তে শুরু করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দেশগুলো নিবিড় প্রবৃদ্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এই নিবিড় প্রবৃদ্ধি সীমিত সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রযুক্তি, প্রক্রিয়া ও জ্ঞান উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর করে। সংক্ষেপে, এটি টিএফপি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি। সি-এর মতে এটিই উচ্চমানের উন্নয়ন। এখন আর শুধু জিডিপি বাড়ানোই মূল লক্ষ্য নয়। বরং স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেখাতে হবে যে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা কতটা ‘ভালো মানের’ বা কার্যকর উন্নয়ন তৈরি করছে। এই নতুন নিয়মের কারণে ভবিষ্যতে কয়েকটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রথমত, ভবিষ্যতে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার আগের মতো দ্রুত নাও হতে পারে। বরং কম প্রবৃদ্ধি এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন এমন এক পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা বড় আকারের অবকাঠামো ও উৎপাদন সম্প্রসারণের সময় শেষ হচ্ছে। এই সময়েই দেশটি বুলেট ট্রেন, আধুনিক শহর এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো বড় উন্নয়ন প্রকল্পে দ্রুত অগ্রগতি দেখিয়েছে।
চীন এখন এমন এক পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা বড় আকারের অবকাঠামো ও উৎপাদন সম্প্রসারণের সময় শেষ হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
আগামী দিনে চীনা কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য হবে শুধু বেশি উৎপাদন করা নয়, বরং বেশি মূল্য তৈরি করা, অর্থাৎ মান ও দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া। এতে ‘ইনভলিউশন’ বা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার সমস্যা কমানোর চেষ্টা করা হবে, যেখানে কোম্পানিগুলো একে অপরের সঙ্গে কঠোর প্রতিযোগিতায় মুনাফা কমিয়ে ফেলে। এই সমস্যা ইতোমধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরশক্তি ও হাইড্রোজেন খাতে দেখা যাচ্ছে।
এই প্রবণতা উদ্ভাবনের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবে এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কোম্পানিগুলোর মুনাফা থাকলে তারা সহজেই এই বিনিয়োগ করতে পারে। অন্যদিকে, কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকলে উদ্ভাবনের সুযোগ কমে যায়। লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোই বৈশ্বিক উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারে।
সি-এর লক্ষ্য হলো চীনকে প্রযুক্তিতে আরও স্বনির্ভর করা। এখন চীনা কোম্পানিগুলোকে শুধু পুরোনো প্রযুক্তি উন্নত করা নয়, বরং একেবারে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করতে বলা হচ্ছে। একে বলা হচ্ছে ‘০ থেকে ১’ উদ্ভাবন। যেমন যুক্তরাষ্ট্র ইন্টারনেট ও মাইক্রোপ্রসেসরের মতো নতুন প্রযুক্তি তৈরি করেছিল।
তবে এই পরিবর্তন দ্রুত করা সহজ নয়। পাঁচ বছরের মধ্যে এত বড় অর্থনীতিকে নতুন পথে নিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। কারণ, এত বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতেই সি চিনপিংয়ের এক দশকের বেশি সময় লেগেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো–এই নীতিগুলো বাস্তবে কতটা সফলভাবে কার্যকর করা যায়।