অর্ণব সান্যাল

একাধিক একতরফা নির্বাচনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এ দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গত দুটি সংসদ নির্বাচনের স্মৃতি মাথায় নিলে, বলতেই হয় যে, ১২ তারিখের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক। তবে ভোটের কয়েকদিন আগে এই শঙ্কামূলক প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছেই যে - ভোটের পরও বাংলাদেশ কি ফ্যাসিবাদের চক্রেই চক্কর খাবে?
এই প্রশ্ন উঠছে শুধু চলতি বছরের ঘটনাবলীর কারণে নয়। বরং ২০২৪ সালের আগস্টে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই অদ্যাবধি বাংলাদেশ যেমন প্রকৃতির শাসন দেখছে, সেসবই ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা গাঢ় করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আবারও এক ধরনের চাপিয়ে দেওয়া শাসনব্যবস্থাই এই দেশের মানুষের ঘাড়ে চাপতে যাচ্ছে। এমনকি যে আওয়ামী শাসনকে ফ্যাসিবাদী তকমা দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমন শাসনই অন্য মোড়কে ফিরে আসছে কিনা, সেই আশঙ্কাও উঁকি দিচ্ছে জোরেশোরে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বাংলাদেশে আসলে কী ধরনের শাসন ছিল? ছিল একটি রাজনৈতিক দলের একক প্রাধান্যমূলক শাসন। সেটি ছিল আওয়ামী লীগ। সেই দলই সরকার চালাত, সংসদে তাদের বিপুল আসন ছিল, রাষ্ট্রীয় সব সিদ্ধান্তও ওই দলের দলীয় এজেন্ডা অনুসরণ করেই হতো। সবচাইতে বড় কথা, দেশের, প্রশাসনের, সরকারের, রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামো, সবখানেই কেমন যেন গুচ্ছ গুচ্ছ আওয়ামী লীগ উপস্থিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগার না হওয়াটাই ছিল যেন অপরাধ, দেখা হতো বাঁকা চোখে। ফলে সুবিধা নিতে তৈরি হয়েছিল প্রচুর ফড়িয়া গোষ্ঠীও। যারা হয়তো আওয়ামী আদর্শে বিশ্বাস করত না, কিন্তু তাই বলে ‘আপা, আপা’ করতে তাদের জুড়ি মেলা ছিল ভার! এভাবেই দেশটায় এক ধরনের গোষ্ঠীতান্ত্রিক শাসনের সূত্রপাত হয়। জনতার সঙ্গে সরকারের যোগ কমে গিয়েছিল, যদিও সরকার পরিচিত ছিল ‘জনতার সরকার’ হিসেবেই। ভোট হতো ঠিকই, তবে সবাই আগে থেকে জানতই যে জিতবে কারা। আর এই করতেই কখনো বিদ্রোহী প্রার্থী, আবার কখনো সব লাজ ভুলে রাতের ভোটের আয়োজন হতো।
তো, এই শাসনকেই আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী বলে আসছে। যদিও ফ্যাসিবাদ বলতে যা বোঝায়, তার পূর্ণাঙ্গ লক্ষণ বা সব লক্ষণ কখনো বাংলাদেশে দেখা যায়নি। আবার কোনো লক্ষণই ছিল না, এমন শাসনকালও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে স্বাধীনতার পর থেকেই নানাভাবে ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন লক্ষণ দেখে এসেছে এ দেশের মানুষ। এ থেকে পুরোপুরি মুক্তি কখনো পায়নি।
এমন প্রসঙ্গেই এসে যায় কিছু তত্ত্ব কথা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশের যেমন শাসনব্যবস্থা ছিল, তার সাথে মিল পাওয়া যায় গত কয়েক বছর ধরে আলোচনায় থাকা ফ্যাসিবাদের একটি প্রকারের। নাম তার ‘পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’। এই ধারণার প্রবক্তা রবার্ট হিগস। তিনি ইনডিপেনডেন্ট ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ের সিনিয়র ফেলো ছিলেন। এ ছাড়া ইনডিপেনডেন্ট জার্নাল-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকও ছিলেন। তিনি ‘ক্রাইসিস অ্যান্ড লেভিয়াথান’ নামে একটি বই লিখেছিলেন, যা ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ে এবং সংশ্লিষ্ট নানা নিবন্ধে রবার্ট হিগস অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের বিস্তৃত ধারণা দিয়েছেন। তার কথায়, বিশ্বের অনেক দেশেই এখন এই ঘরানার ফ্যাসিবাদ ডানা মেলছে। দেশে দেশে এর উত্থান ঘটছে বলে জোর ধারণা আছে।
একটি বিষয় স্পষ্ট যে, নির্বাচনে যে জোটই জিতুক, আরেকটি একক দলীয় প্রাধান্য এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। যেহেতু সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন তেমন হয়নি, সেহেতু বাংলাদেশে কোনো একক দলের প্রাধান্য ফের প্রতিষ্ঠিত হলে, এই সরকারি-বেসরকারি অভিজাততন্ত্রই আবার ওই একক দলটিকে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ বা পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজমের দিকে ধাবিত করতে পারে।
রবার্ট হিগসের মতে, ‘পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’ একটি সুনির্দিষ্ট শব্দবন্ধ। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানাকে সীমিত আকারে সমর্থন দিয়ে সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করায়ত্ত করা হয়। নানা উপায়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে থাকে নিয়মিত বিরতিতে। বিশেষ করে নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগের আয়োজন হয় হইহই রইরই ভঙ্গিতে। এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এভাবে জনগণের মধ্যে এই ভাব সঞ্চারিত করার চেষ্টা চলে যে, জনগণই আসলে সরকার চালাচ্ছে! কিন্তু ভেতরে ভেতরে পুরো ব্যবস্থাই থাকে ত্রুটিপূর্ণ এবং সেই ব্যবস্থায় ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক আদর্শ যা চায়, তাই শেষ পর্যন্ত হয়। এভাবে জনগণের মধ্যে ‘দেশ নিয়ন্ত্রণ করার’ একটি ভ্রমাত্মক বোধের জন্ম দেওয়া হয়। কারণ এই বোধটি যদি মোড়ক হিসেবেও না থাকে, তবে সরকারকে কর দেবে কে? কারা সরকারি নিষ্পেষণমূলক আইন মেনে চলবে? কারা সাধারণ জনতা হিসেবে নিয়ত অপমানিত হবে? আর এসবের বলির পাঁঠা হিসেবে জনগণকে ব্যবহার করেই এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যেখানে শোষিত হওয়ার পরও বিদ্রোহে শামিল হয় না সাধারণ জনতা। কারণ, তাদের যে নিয়ন্ত্রণের রিমোট কন্ট্রোলের মালিক হওয়ার লেবেঞ্চুষ খাওয়ানো হয়! আর এভাবেই তলে তলে চলতে থাকে ফ্যাসিবাদের ইঞ্জিন।
রবার্ট হিগস মনে করেন, ‘পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’-এর দুটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, এই ব্যবস্থায় অভিজাত মালিকগোষ্ঠীর সহায়তায় ফ্যাসিবাদ তার দেদার অর্থনৈতিক লুণ্ঠনকে বেগবান করে। আর এই কারণেই ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি তুলনায় ধীর গতির উন্নতির শৃঙ্খলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বেছে নিতে চান, যেখানে লুণ্ঠনের সুযোগ অবারিত থাকে। পাশাপাশি মেকি উন্নয়নের যে রঙচঙা মোড়ক দেখা যায়, সেটিতে আপাত মুগ্ধ হওয়া জনতা মনে করতে থাকে, ‘এ তো আমাদেরই অর্জন’! রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় জনতার কিছু মিছে ও পোশাকি অংশগ্রহণে তাদের মনে হতে থাকে, নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি তাদেরই হাতে। এভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সমতা লাভের একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়। যদিও শাসক ও তার সমর্থকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাটিকে ভেতরে ভেতরে নানাভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতযুক্ত করে রাখা হয়, কিন্তু একে বাইরে থেকে দেখলে সেটি মনে হয় না। আবার এমন শাসকের শাসনকে স্তালিন বা হিটলার বা মুসোলিনির মতো একনায়কের সঙ্গে বহিরাবরণে মেলানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদে মানুষ বিশ্বাস করে যে, তারা স্বাধীন। অথচ তাদের সেই স্বাধীনতাকে যে দিনকে দিন কত শত কোপে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে নিয়মিত, সেটি তারা অনুধাবনে ব্যর্থ হয় নিদারুণভাবে।
দ্বিতীয়ত, এই ব্যবস্থাটির মজা হলো, যদি পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়, যদি গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যার উদ্ভব হয়, তবে ফ্যাসিবাদী সরকার ও এর মদদপুষ্ট অভিজাত মালিকগোষ্ঠী বাজার ব্যবস্থার টিকে থাকা অবশিষ্ট উপাদানগুলোর ওপর নির্দ্বিধায় দোষ চাপিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে সবচেয়ে ধনী গোষ্ঠীর ওপরও অদৃশ্য দোষ চাপানো যায়। সব দোষ চলে যায় অন্যদের কাঁধে, আর পবিত্র থেকে যায় শাসক ও তার অনুগত মালিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী।

পাঠক, বুঝতে পারছেন তো? মিল পাওয়া যাচ্ছে?
২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের এমনতর লক্ষণ ততটা প্রকট ছিল না। তবে এর পর থেকে দিনকে দিন লক্ষণগুলো প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেকে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছেন ক্রমে। তার এমন সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয়, যারা নানাভাবে এই কেন্দ্রীভূত ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছেন নিজেদের স্বার্থে। তৈরি হয় স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী বা মালিকগোষ্ঠীও, এরা বিভিন্ন তরিকায় লুণ্ঠনতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাইরে থাকে কথিত উন্নয়নের একটি রঙচঙা মোড়ক। তবে তা দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সম্পূর্ণ চিত্র কখনোই প্রকাশিত হতো না। দেশে আওয়ামী লীগ ব্যতীত অন্য কোনো রাজনৈতিক দল স্বাধীনভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারত না। আওয়ামী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে অন্য সকল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে। তৈরি হয় ভয়ের সংস্কৃতি। এ ছিল এমন এক ভয়ের বলয়, যাতে সরাসরি নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল ‘চাইলেই নিপীড়ন করতে পারি’ শীর্ষক ভয়। কে না জানে, নিপীড়ন চালানোর চেয়ে নিপীড়ন করা সম্ভব–এমন আশঙ্কা বিরোধী মতকে দমাতে বেশি কাজে দেয়। আর এভাবেই গড়ে ওঠে একটি জনতুষ্টিবাদী একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, যেখানে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের লক্ষণগুলো মূর্ত হয়ে ওঠে।
সমস্যা হলো, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকারের বিদায়ের পরও উপরিউক্ত শাসনব্যবস্থার প্রকারে খুব বেশি পরিবর্তন চোখে পড়ে না। উল্টো কখনো কখনো কিছু কিছু খাতে একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য আরও প্রকট হয়ে ধরা দেয়। একটি অরাজনৈতিক দাবি করা অন্তর্বর্তী সরকারও সেই একচেটিয়া বৈশিষ্ট্যকে লাঘব করতে পারেনি, কেবল ফেসবুকে স্ট্যাটাসবাজি বাদে। দেখা গেছে ক্ষমতার দম্ভের প্রদর্শনী। মব কমেনি, আইনশৃঙ্খলার অবস্থা বেগতিক, আগের সরকারের মতোই রাজনৈতিক দলকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করার নিদর্শন আছে। সেই সাথে আছে অধ্যাদেশের পর অধ্যাদেশ দিয়ে জনসংযোগহীন প্রক্রিয়ায় পরিমাণে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী যাবতীয় ধারণাকে চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একের পর এক আইন সংশোধন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন। এমনকি যখন সরকারের হাতে নির্বাচনের আগে ৭ দিনও সময় নেই, তখনও বিভিন্ন চুক্তিতে সাক্ষরের তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে ‘দেশের স্বার্থে’, কিন্তু আদতে যে কার স্বার্থে, কে জানে! যদিও আকলমান্দ কে লিয়ে ইশারাই কাফি হ্যায়!
এমন ধারাবাহিকতাতেই এ দেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। হবে গণভোটও, যেখানে প্রায় ৮৪-এর কাছাকাছি বিষয়ে একমত বা দ্বিমত থাকার বিষয়টি জনতাকে জানাতে হবে একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে। মানে একজন ভোটারকে হয় সবকিছুতে একমত হতেই হবে, নইলে সবকিছুতেই দ্বিমত হতে হবে। সেই গণভোটে আবার অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে কেবল এবং ‘না’ ভোট দেওয়াকে একটা ‘জাতীয় লজ্জা’র পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঠিক যেমনটা করা হতো আগের সরকারের আমলেও। সরকারের বিরোধিতা তখন রাষ্ট্রের বিরোধিতা হিসেবে দেখা হতো, দেওয়া হতো উন্নয়নবিরোধীর তকমা। এক ধরনের ‘ভালো’ পক্ষ বা ‘খারাপ’ পক্ষ যেন তৈরি করা হচ্ছে। এভাবে একসময়ের উন্নয়নবিরোধীর তকমা এখন মোড়ক বদলে যেন হয়ে যাচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের বিরোধিতার শামিল।
আবার যদি ভোটে অংশ নেওয়া দুই প্রধান জোটের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যায়, তবে দেখা যাবে, সেসব জোটেও আদতে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রাধান্যই বেশি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বৈচিত্র্যময়, তুলনায় কিছুটা উদারপন্থী বলে বোধ হয়। তবে সেই জোটে বিএনপি যা বলবে, তাই আসলে হবে। এমনকি আসনবিন্যাস ও মনোনয়ন দেওয়া দেখলেও বোঝা যায় যে, বিএনপি তাদের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বজায় রাখতে কতটা মরিয়া। এমনভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনে জিতে যদি এই জোট সরকার গঠন করে, এবং তারপর যদি কখনো জোটে ভাঙনও ধরে, তাহলেও সরকার কখনো ঝুঁকিতে পড়বে না। জোটের অন্যান্য শরিকদের এত যৎকিঞ্চিৎ আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যে, তা থেকেই বোঝা যায়, জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাদের অবদান রাখার সম্ভাবনা অতীব সামান্য। অনেকটা প্রবল ঝড়ো বাতাসে উড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা!

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের একটি আদর্শিক পরিচয় এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। যতই এনসিপি থাকুক, বা এলডিপি থাকুক, দিনশেষে এটি একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক জোটই। এর শুরুটাই হয়েছিল সব ইসলামী ভোটকে এক বাক্সে আনার ইচ্ছাতেই। এখন ইশতেহারে যতই মধ্যপন্থী ও তুলনায় উদারবাদী বয়ান শোনানো হোক না কেন, আদতে এই জোটের ধর্মীয় মোড়ক অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। আবার এই জোটের ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সংরক্ষণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিসহ প্রগতি ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভাবমূর্তিও প্রবল। জোটের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যে নানা সময়ে তা ফুটেও উঠেছে। যদিও পরে নানা ‘কার্যকারণ’ সামনে এনে সেসব ধোয়া-মোছার চেষ্টা হয়েছে বটে, তবে তাতে সব অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার, এই জোটেও মনোনয়ন দেওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জামায়াতেরই দখলে, এবং নির্বাচিত হলে এই জোটেও সরকার টেকানোর জন্য জামায়াতকে কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না। জোটের শরিকদের নির্বাচন করতে অর্থের জোগানও জামায়াতে ইসলামীই দিচ্ছে, অন্তত এনসিপি’কে তো দিচ্ছেই। আর কথায় তো আছেই–নুন যার, গুণও তার! সেক্ষেত্রে এমন জোটে আদৌ কোনো শরিক দল কখনো জোর গলায় কথা বলতে পারবে কিনা, সেই আশঙ্কা প্রবলই থাকে।
অর্থাৎ, একটি বিষয় স্পষ্ট যে, নির্বাচনে যে জোটই জিতুক, আরেকটি একক দলীয় প্রাধান্য এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। যেহেতু সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন তেমন হয়নি, সেহেতু বাংলাদেশে কোনো একক দলের প্রাধান্য ফের প্রতিষ্ঠিত হলে, এই সরকারি-বেসরকারি অভিজাততন্ত্রই আবার ওই একক দলটিকে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ বা পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজমের দিকে ধাবিত করতে পারে। এই আশঙ্কা কিন্তু থাকছেই। কেননা, গত দেড় বছরের বেশি সময়ে এই দেশের মানুষ ওই দুষ্টচক্র ভেঙে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখেনি, অরাজনৈতিক দাবিকৃত সরকারের আমলেও না। বরং কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের নতুন নতুন গোষ্ঠীর উত্থান দেখেছে।
গবেষকদের মতে, বর্তমানের শাসকদের কাছে এই অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ সবচেয়ে আদরনীয় পন্থা। কারণ এতে সাপও মরে, কিন্তু লাঠিও ভাঙে না। এই ব্যবস্থায় একদিকে সমাজে প্রবল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, অন্যদিকে বিভ্রান্ত জনতাকে বোকাও বানানো যায় এবং ব্যবহারও করা যায়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, বিশ্বের বেশির ভাগ আর্থ-রাজনৈতিক কাঠামোই এখন অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ আত্তীকরণ করছে। কারণ, এতে গাছেরটাও খাওয়া যায়, আবার তলারটাও কুড়ানো যায়। আর এমন সুযোগ পেলে বাংলাদেশে ‘ভালো’ থাকাটা দুর্লভ। কারণ এ দেশে ভালো হতে পয়সা লাগে বলে বোধ হলেও, খারাপ হতে লাগে না!
এমন পরিস্থিতিতে আশাবাদী হওয়াটা বেশ কঠিন। যদিও বাংলায় আছে, আশায় বাঁচে চাষা। আর আমাদের দেশে চাষা প্রকৃতি খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষই সংখ্যাগুরু। তাদের তাই আশা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। আশা করেই তারা বাঁচে, আশা করেই ঠকে। এসব মানুষের সামনে উপায় শুধু তাই ‘যদি লাইগ্যা যায়’!
এখন লাগলেই ভালো।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

একাধিক একতরফা নির্বাচনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এ দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গত দুটি সংসদ নির্বাচনের স্মৃতি মাথায় নিলে, বলতেই হয় যে, ১২ তারিখের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক। তবে ভোটের কয়েকদিন আগে এই শঙ্কামূলক প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছেই যে - ভোটের পরও বাংলাদেশ কি ফ্যাসিবাদের চক্রেই চক্কর খাবে?
এই প্রশ্ন উঠছে শুধু চলতি বছরের ঘটনাবলীর কারণে নয়। বরং ২০২৪ সালের আগস্টে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই অদ্যাবধি বাংলাদেশ যেমন প্রকৃতির শাসন দেখছে, সেসবই ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা গাঢ় করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আবারও এক ধরনের চাপিয়ে দেওয়া শাসনব্যবস্থাই এই দেশের মানুষের ঘাড়ে চাপতে যাচ্ছে। এমনকি যে আওয়ামী শাসনকে ফ্যাসিবাদী তকমা দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমন শাসনই অন্য মোড়কে ফিরে আসছে কিনা, সেই আশঙ্কাও উঁকি দিচ্ছে জোরেশোরে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বাংলাদেশে আসলে কী ধরনের শাসন ছিল? ছিল একটি রাজনৈতিক দলের একক প্রাধান্যমূলক শাসন। সেটি ছিল আওয়ামী লীগ। সেই দলই সরকার চালাত, সংসদে তাদের বিপুল আসন ছিল, রাষ্ট্রীয় সব সিদ্ধান্তও ওই দলের দলীয় এজেন্ডা অনুসরণ করেই হতো। সবচাইতে বড় কথা, দেশের, প্রশাসনের, সরকারের, রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামো, সবখানেই কেমন যেন গুচ্ছ গুচ্ছ আওয়ামী লীগ উপস্থিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগার না হওয়াটাই ছিল যেন অপরাধ, দেখা হতো বাঁকা চোখে। ফলে সুবিধা নিতে তৈরি হয়েছিল প্রচুর ফড়িয়া গোষ্ঠীও। যারা হয়তো আওয়ামী আদর্শে বিশ্বাস করত না, কিন্তু তাই বলে ‘আপা, আপা’ করতে তাদের জুড়ি মেলা ছিল ভার! এভাবেই দেশটায় এক ধরনের গোষ্ঠীতান্ত্রিক শাসনের সূত্রপাত হয়। জনতার সঙ্গে সরকারের যোগ কমে গিয়েছিল, যদিও সরকার পরিচিত ছিল ‘জনতার সরকার’ হিসেবেই। ভোট হতো ঠিকই, তবে সবাই আগে থেকে জানতই যে জিতবে কারা। আর এই করতেই কখনো বিদ্রোহী প্রার্থী, আবার কখনো সব লাজ ভুলে রাতের ভোটের আয়োজন হতো।
তো, এই শাসনকেই আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী বলে আসছে। যদিও ফ্যাসিবাদ বলতে যা বোঝায়, তার পূর্ণাঙ্গ লক্ষণ বা সব লক্ষণ কখনো বাংলাদেশে দেখা যায়নি। আবার কোনো লক্ষণই ছিল না, এমন শাসনকালও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে স্বাধীনতার পর থেকেই নানাভাবে ফ্যাসিবাদী বিভিন্ন লক্ষণ দেখে এসেছে এ দেশের মানুষ। এ থেকে পুরোপুরি মুক্তি কখনো পায়নি।
এমন প্রসঙ্গেই এসে যায় কিছু তত্ত্ব কথা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশের যেমন শাসনব্যবস্থা ছিল, তার সাথে মিল পাওয়া যায় গত কয়েক বছর ধরে আলোচনায় থাকা ফ্যাসিবাদের একটি প্রকারের। নাম তার ‘পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’। এই ধারণার প্রবক্তা রবার্ট হিগস। তিনি ইনডিপেনডেন্ট ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ের সিনিয়র ফেলো ছিলেন। এ ছাড়া ইনডিপেনডেন্ট জার্নাল-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকও ছিলেন। তিনি ‘ক্রাইসিস অ্যান্ড লেভিয়াথান’ নামে একটি বই লিখেছিলেন, যা ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ে এবং সংশ্লিষ্ট নানা নিবন্ধে রবার্ট হিগস অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের বিস্তৃত ধারণা দিয়েছেন। তার কথায়, বিশ্বের অনেক দেশেই এখন এই ঘরানার ফ্যাসিবাদ ডানা মেলছে। দেশে দেশে এর উত্থান ঘটছে বলে জোর ধারণা আছে।
একটি বিষয় স্পষ্ট যে, নির্বাচনে যে জোটই জিতুক, আরেকটি একক দলীয় প্রাধান্য এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। যেহেতু সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন তেমন হয়নি, সেহেতু বাংলাদেশে কোনো একক দলের প্রাধান্য ফের প্রতিষ্ঠিত হলে, এই সরকারি-বেসরকারি অভিজাততন্ত্রই আবার ওই একক দলটিকে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ বা পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজমের দিকে ধাবিত করতে পারে।
রবার্ট হিগসের মতে, ‘পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’ একটি সুনির্দিষ্ট শব্দবন্ধ। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানাকে সীমিত আকারে সমর্থন দিয়ে সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করায়ত্ত করা হয়। নানা উপায়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে থাকে নিয়মিত বিরতিতে। বিশেষ করে নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগের আয়োজন হয় হইহই রইরই ভঙ্গিতে। এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এভাবে জনগণের মধ্যে এই ভাব সঞ্চারিত করার চেষ্টা চলে যে, জনগণই আসলে সরকার চালাচ্ছে! কিন্তু ভেতরে ভেতরে পুরো ব্যবস্থাই থাকে ত্রুটিপূর্ণ এবং সেই ব্যবস্থায় ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক আদর্শ যা চায়, তাই শেষ পর্যন্ত হয়। এভাবে জনগণের মধ্যে ‘দেশ নিয়ন্ত্রণ করার’ একটি ভ্রমাত্মক বোধের জন্ম দেওয়া হয়। কারণ এই বোধটি যদি মোড়ক হিসেবেও না থাকে, তবে সরকারকে কর দেবে কে? কারা সরকারি নিষ্পেষণমূলক আইন মেনে চলবে? কারা সাধারণ জনতা হিসেবে নিয়ত অপমানিত হবে? আর এসবের বলির পাঁঠা হিসেবে জনগণকে ব্যবহার করেই এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যেখানে শোষিত হওয়ার পরও বিদ্রোহে শামিল হয় না সাধারণ জনতা। কারণ, তাদের যে নিয়ন্ত্রণের রিমোট কন্ট্রোলের মালিক হওয়ার লেবেঞ্চুষ খাওয়ানো হয়! আর এভাবেই তলে তলে চলতে থাকে ফ্যাসিবাদের ইঞ্জিন।
রবার্ট হিগস মনে করেন, ‘পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’-এর দুটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, এই ব্যবস্থায় অভিজাত মালিকগোষ্ঠীর সহায়তায় ফ্যাসিবাদ তার দেদার অর্থনৈতিক লুণ্ঠনকে বেগবান করে। আর এই কারণেই ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি তুলনায় ধীর গতির উন্নতির শৃঙ্খলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বেছে নিতে চান, যেখানে লুণ্ঠনের সুযোগ অবারিত থাকে। পাশাপাশি মেকি উন্নয়নের যে রঙচঙা মোড়ক দেখা যায়, সেটিতে আপাত মুগ্ধ হওয়া জনতা মনে করতে থাকে, ‘এ তো আমাদেরই অর্জন’! রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় জনতার কিছু মিছে ও পোশাকি অংশগ্রহণে তাদের মনে হতে থাকে, নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি তাদেরই হাতে। এভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সমতা লাভের একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়। যদিও শাসক ও তার সমর্থকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাটিকে ভেতরে ভেতরে নানাভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতযুক্ত করে রাখা হয়, কিন্তু একে বাইরে থেকে দেখলে সেটি মনে হয় না। আবার এমন শাসকের শাসনকে স্তালিন বা হিটলার বা মুসোলিনির মতো একনায়কের সঙ্গে বহিরাবরণে মেলানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদে মানুষ বিশ্বাস করে যে, তারা স্বাধীন। অথচ তাদের সেই স্বাধীনতাকে যে দিনকে দিন কত শত কোপে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে নিয়মিত, সেটি তারা অনুধাবনে ব্যর্থ হয় নিদারুণভাবে।
দ্বিতীয়ত, এই ব্যবস্থাটির মজা হলো, যদি পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়, যদি গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যার উদ্ভব হয়, তবে ফ্যাসিবাদী সরকার ও এর মদদপুষ্ট অভিজাত মালিকগোষ্ঠী বাজার ব্যবস্থার টিকে থাকা অবশিষ্ট উপাদানগুলোর ওপর নির্দ্বিধায় দোষ চাপিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে সবচেয়ে ধনী গোষ্ঠীর ওপরও অদৃশ্য দোষ চাপানো যায়। সব দোষ চলে যায় অন্যদের কাঁধে, আর পবিত্র থেকে যায় শাসক ও তার অনুগত মালিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী।

পাঠক, বুঝতে পারছেন তো? মিল পাওয়া যাচ্ছে?
২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের এমনতর লক্ষণ ততটা প্রকট ছিল না। তবে এর পর থেকে দিনকে দিন লক্ষণগুলো প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেকে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছেন ক্রমে। তার এমন সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয়, যারা নানাভাবে এই কেন্দ্রীভূত ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছেন নিজেদের স্বার্থে। তৈরি হয় স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী বা মালিকগোষ্ঠীও, এরা বিভিন্ন তরিকায় লুণ্ঠনতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাইরে থাকে কথিত উন্নয়নের একটি রঙচঙা মোড়ক। তবে তা দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সম্পূর্ণ চিত্র কখনোই প্রকাশিত হতো না। দেশে আওয়ামী লীগ ব্যতীত অন্য কোনো রাজনৈতিক দল স্বাধীনভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারত না। আওয়ামী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে অন্য সকল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে। তৈরি হয় ভয়ের সংস্কৃতি। এ ছিল এমন এক ভয়ের বলয়, যাতে সরাসরি নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল ‘চাইলেই নিপীড়ন করতে পারি’ শীর্ষক ভয়। কে না জানে, নিপীড়ন চালানোর চেয়ে নিপীড়ন করা সম্ভব–এমন আশঙ্কা বিরোধী মতকে দমাতে বেশি কাজে দেয়। আর এভাবেই গড়ে ওঠে একটি জনতুষ্টিবাদী একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, যেখানে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের লক্ষণগুলো মূর্ত হয়ে ওঠে।
সমস্যা হলো, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকারের বিদায়ের পরও উপরিউক্ত শাসনব্যবস্থার প্রকারে খুব বেশি পরিবর্তন চোখে পড়ে না। উল্টো কখনো কখনো কিছু কিছু খাতে একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য আরও প্রকট হয়ে ধরা দেয়। একটি অরাজনৈতিক দাবি করা অন্তর্বর্তী সরকারও সেই একচেটিয়া বৈশিষ্ট্যকে লাঘব করতে পারেনি, কেবল ফেসবুকে স্ট্যাটাসবাজি বাদে। দেখা গেছে ক্ষমতার দম্ভের প্রদর্শনী। মব কমেনি, আইনশৃঙ্খলার অবস্থা বেগতিক, আগের সরকারের মতোই রাজনৈতিক দলকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করার নিদর্শন আছে। সেই সাথে আছে অধ্যাদেশের পর অধ্যাদেশ দিয়ে জনসংযোগহীন প্রক্রিয়ায় পরিমাণে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী যাবতীয় ধারণাকে চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একের পর এক আইন সংশোধন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন। এমনকি যখন সরকারের হাতে নির্বাচনের আগে ৭ দিনও সময় নেই, তখনও বিভিন্ন চুক্তিতে সাক্ষরের তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে ‘দেশের স্বার্থে’, কিন্তু আদতে যে কার স্বার্থে, কে জানে! যদিও আকলমান্দ কে লিয়ে ইশারাই কাফি হ্যায়!
এমন ধারাবাহিকতাতেই এ দেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। হবে গণভোটও, যেখানে প্রায় ৮৪-এর কাছাকাছি বিষয়ে একমত বা দ্বিমত থাকার বিষয়টি জনতাকে জানাতে হবে একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে। মানে একজন ভোটারকে হয় সবকিছুতে একমত হতেই হবে, নইলে সবকিছুতেই দ্বিমত হতে হবে। সেই গণভোটে আবার অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে কেবল এবং ‘না’ ভোট দেওয়াকে একটা ‘জাতীয় লজ্জা’র পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঠিক যেমনটা করা হতো আগের সরকারের আমলেও। সরকারের বিরোধিতা তখন রাষ্ট্রের বিরোধিতা হিসেবে দেখা হতো, দেওয়া হতো উন্নয়নবিরোধীর তকমা। এক ধরনের ‘ভালো’ পক্ষ বা ‘খারাপ’ পক্ষ যেন তৈরি করা হচ্ছে। এভাবে একসময়ের উন্নয়নবিরোধীর তকমা এখন মোড়ক বদলে যেন হয়ে যাচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের বিরোধিতার শামিল।
আবার যদি ভোটে অংশ নেওয়া দুই প্রধান জোটের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যায়, তবে দেখা যাবে, সেসব জোটেও আদতে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রাধান্যই বেশি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বৈচিত্র্যময়, তুলনায় কিছুটা উদারপন্থী বলে বোধ হয়। তবে সেই জোটে বিএনপি যা বলবে, তাই আসলে হবে। এমনকি আসনবিন্যাস ও মনোনয়ন দেওয়া দেখলেও বোঝা যায় যে, বিএনপি তাদের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বজায় রাখতে কতটা মরিয়া। এমনভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনে জিতে যদি এই জোট সরকার গঠন করে, এবং তারপর যদি কখনো জোটে ভাঙনও ধরে, তাহলেও সরকার কখনো ঝুঁকিতে পড়বে না। জোটের অন্যান্য শরিকদের এত যৎকিঞ্চিৎ আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যে, তা থেকেই বোঝা যায়, জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাদের অবদান রাখার সম্ভাবনা অতীব সামান্য। অনেকটা প্রবল ঝড়ো বাতাসে উড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা!

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের একটি আদর্শিক পরিচয় এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। যতই এনসিপি থাকুক, বা এলডিপি থাকুক, দিনশেষে এটি একটি ডানপন্থী রাজনৈতিক জোটই। এর শুরুটাই হয়েছিল সব ইসলামী ভোটকে এক বাক্সে আনার ইচ্ছাতেই। এখন ইশতেহারে যতই মধ্যপন্থী ও তুলনায় উদারবাদী বয়ান শোনানো হোক না কেন, আদতে এই জোটের ধর্মীয় মোড়ক অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই। আবার এই জোটের ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সংরক্ষণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিসহ প্রগতি ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভাবমূর্তিও প্রবল। জোটের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যে নানা সময়ে তা ফুটেও উঠেছে। যদিও পরে নানা ‘কার্যকারণ’ সামনে এনে সেসব ধোয়া-মোছার চেষ্টা হয়েছে বটে, তবে তাতে সব অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার, এই জোটেও মনোনয়ন দেওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জামায়াতেরই দখলে, এবং নির্বাচিত হলে এই জোটেও সরকার টেকানোর জন্য জামায়াতকে কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না। জোটের শরিকদের নির্বাচন করতে অর্থের জোগানও জামায়াতে ইসলামীই দিচ্ছে, অন্তত এনসিপি’কে তো দিচ্ছেই। আর কথায় তো আছেই–নুন যার, গুণও তার! সেক্ষেত্রে এমন জোটে আদৌ কোনো শরিক দল কখনো জোর গলায় কথা বলতে পারবে কিনা, সেই আশঙ্কা প্রবলই থাকে।
অর্থাৎ, একটি বিষয় স্পষ্ট যে, নির্বাচনে যে জোটই জিতুক, আরেকটি একক দলীয় প্রাধান্য এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। যেহেতু সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন তেমন হয়নি, সেহেতু বাংলাদেশে কোনো একক দলের প্রাধান্য ফের প্রতিষ্ঠিত হলে, এই সরকারি-বেসরকারি অভিজাততন্ত্রই আবার ওই একক দলটিকে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ বা পার্টিসিপেটরি ফ্যাসিজমের দিকে ধাবিত করতে পারে। এই আশঙ্কা কিন্তু থাকছেই। কেননা, গত দেড় বছরের বেশি সময়ে এই দেশের মানুষ ওই দুষ্টচক্র ভেঙে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখেনি, অরাজনৈতিক দাবিকৃত সরকারের আমলেও না। বরং কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের নতুন নতুন গোষ্ঠীর উত্থান দেখেছে।
গবেষকদের মতে, বর্তমানের শাসকদের কাছে এই অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ সবচেয়ে আদরনীয় পন্থা। কারণ এতে সাপও মরে, কিন্তু লাঠিও ভাঙে না। এই ব্যবস্থায় একদিকে সমাজে প্রবল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, অন্যদিকে বিভ্রান্ত জনতাকে বোকাও বানানো যায় এবং ব্যবহারও করা যায়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, বিশ্বের বেশির ভাগ আর্থ-রাজনৈতিক কাঠামোই এখন অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ আত্তীকরণ করছে। কারণ, এতে গাছেরটাও খাওয়া যায়, আবার তলারটাও কুড়ানো যায়। আর এমন সুযোগ পেলে বাংলাদেশে ‘ভালো’ থাকাটা দুর্লভ। কারণ এ দেশে ভালো হতে পয়সা লাগে বলে বোধ হলেও, খারাপ হতে লাগে না!
এমন পরিস্থিতিতে আশাবাদী হওয়াটা বেশ কঠিন। যদিও বাংলায় আছে, আশায় বাঁচে চাষা। আর আমাদের দেশে চাষা প্রকৃতি খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষই সংখ্যাগুরু। তাদের তাই আশা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। আশা করেই তারা বাঁচে, আশা করেই ঠকে। এসব মানুষের সামনে উপায় শুধু তাই ‘যদি লাইগ্যা যায়’!
এখন লাগলেই ভালো।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট