পলিহীনতা ও সেকেলে চুক্তির বেড়াজালে বাংলাদেশ

পলিহীনতা ও সেকেলে চুক্তির বেড়াজালে বাংলাদেশ
একসময় লাখো মানুষের জীবনের অবলম্বন ছিল ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা। আর এ নদীগুলোই হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার প্রতীক। ছবি: রয়টার্স

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গঙ্গা অববাহিকা গত ১,৩০০ বছরের মধ্যে ভয়াবহতম খরার কবলে পড়েছে, যা প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাভাবিক সীমার অনেক বাইরে। অন্যদিকে, ‘বায়ুমণ্ডলীয় নদী’ এখন এমন বিপর্যয়কর বন্যা ডেকে আনছে, যা বর্তমান অবকাঠামোর ধারণক্ষমতাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন চরম মৌসুমি আবহাওয়ার ঘটনা চার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে; গঙ্গা অববাহিকার ৭৩ শতাংশ বন্যার পেছনেই এসব বায়ুমণ্ডলীয় নদীর ভূমিকা রয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের বন্যা সরাসরি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ফল না হলেও এটি একটি নতুন বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। বাংলাদেশে এতে ৫৮ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা গত ৩৭ বছরের মধ্যে ভয়াবহতম। একই সময়ে ভারতের উজানেও সমান মাত্রার ধ্বংসযজ্ঞ দেখা গেছে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি এমন একটি জলবায়ু ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যার অস্তিত্ব আজ আর নেই।

২০২৭ সালে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। প্রশ্নটি কেবল চুক্তি নবায়ন হবে কি না, তা নয়; বরং বাংলাদেশ কি বর্তমান জলবায়ু বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন কাঠামোর জন্য জোরালো দাবি তুলবে, নাকি মান্ধাতা আমলের ধারাতেই আটকে থাকবে সেটিই মূল প্রশ্ন।

পলি মাটির অভাবে একটি বিশাল বদ্বীপের মৃত্যু আমি নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছি। লুইজিয়ানায় পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার সময় দেখেছি, কৃত্রিম প্রকৌশলগত নিয়ন্ত্রণের কারণে পলি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মিসিসিপি বদ্বীপ প্রায় ১,৯০০ বর্গমাইল এলাকা হারিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি। উজানের বাঁধগুলো সেই পলি আটকে দিচ্ছে, যা বদ্বীপ গঠন ও রক্ষার জন্য অপরিহার্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাব, যা এই চুক্তির কাঠামোয় কখনোই বিবেচনায় আনা হয়নি এবং যা মোকাবিলার সক্ষমতাও বর্তমান চুক্তির নেই।

জলবায়ুর প্রভাবে পানি চুক্তি হয়ে পড়েছে অকার্যকর

এই দাবির পক্ষে প্রমাণ এখন দ্ব্যর্থহীন। জলবায়ু পরিবর্তন চরম মৌসুমি আবহাওয়ার ঘটনা চার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বর্তমানে গঙ্গা অববাহিকার ৭৩ শতাংশ বন্যার মূল কারণ বায়ুমণ্ডলীয় নদী। গঙ্গা, তিস্তা ও গোমতী নদীর ওপর নির্মিত বাঁধগুলো বিংশ শতাব্দীর আবহাওয়ার ধরন অনুযায়ী নকশা করা হয়েছিল, যা বর্তমান বাস্তবতা মোকাবিলায় অক্ষম। আজ জলাধারগুলো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, ফলে জরুরি ভিত্তিতে পানি ছেড়ে দেওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ছে।

২০২৪ সালের আগস্টের বন্যা এই অঞ্চলের অবকাঠামোগত ব্যর্থতাকে নগ্নভাবে তুলে ধরেছে। তিস্তা, গোমতীসহ অন্যান্য অববাহিকায় সংঘটিত বন্যা, যা সরাসরি গঙ্গা চুক্তির আওতায় নয় প্রমাণ করেছে যে সেকেলে অবকাঠামো জলবায়ুর এই চরম পরিবর্তন সামাল দিতে ব্যর্থ। এই বন্যায় বাংলাদেশে ৭১ জনের মৃত্যু হয়, ৫৮ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়। গোমতী নদীর পানি গত ৩৭ বছরের রেকর্ড ভেঙে নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছায়। ফেনী জেলায় ২০২২ সালের তুলনায় বন্যার তীব্রতা ১,০৮২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে ভারতের উজানেও সমপরিমাণ ধ্বংসাত্মক বন্যা দেখা যায়।

নদী ভাঙনের কারণে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে মানুষজন। ছবি: রয়টার্স
নদী ভাঙনের কারণে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে মানুষজন। ছবি: রয়টার্স

উভয় দেশের এই দুর্ভোগ একটি মৌলিক সত্য সামনে আনে বর্তমান অবকাঠামো এমন এক জলবায়ু পরিস্থিতিতে উভয় দেশকেই একযোগে ব্যর্থ করছে, যা চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ছিল না। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে জলবায়ুকে স্থির ও অপরিবর্তনীয় ধরে নেওয়া হয়েছিল। এটি কেবল শুষ্ক মৌসুমের (জানুয়ারি–মে) পানি বণ্টন নিয়ে কাজ করে; কিন্তু বর্ষা মৌসুমে (জুন–সেপ্টেম্বর) চরম বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবিলার কোনো বিধান এতে নেই।

মিসিসিপি বদ্বীপ: পলিপ্রবাহ ও জলবায়ুকে অবজ্ঞা করার পরিণাম

লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অববাহিকা বিশ্লেষণে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার সময় আমি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বদ্বীপ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিসিসিপি নদীর বদ্বীপ পর্যবেক্ষণ করি। একজন ভূতাত্ত্বিক হিসেবে আমি বাংলাদেশের সঙ্গে এর বিস্ময়কর মিল লক্ষ্য করি পলিবাহী বিশাল নদী, শাখা নদীর মাধ্যমে বদ্বীপ গঠন, ঋতুভিত্তিক বন্যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ঘনবসতি এবং পুষ্টি সরবরাহনির্ভর সমৃদ্ধ মৎস্য সম্পদ।

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে যখন কৃত্রিম প্রকৌশলগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পলিপ্রবাহ বিচ্ছিন্ন করা হয়, তখন এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সেখানে প্রত্যক্ষ করেছি।

বন্যা প্রতিরোধের জন্য মিসিসিপি নদীকে বড় বড় বাঁধের মাধ্যমে নির্দিষ্ট চ্যানেলে আবদ্ধ করা হয়েছিল। এর ফলে নদীটি বদ্বীপে প্রয়োজনীয় পলি পৌঁছে দিতে পারেনি। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩০-এর দশক থেকে লুইজিয়ানা প্রায় ১,৯০০ বর্গমাইল জমি হারিয়েছে, যা আয়তনে ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের প্রায় সমান। নেচার সাসটেইনেবিলিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁধ নির্মাণের আগে বদ্বীপটির আয়তন বাড়ছিল; কিন্তু বাঁধের ফলে পলিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর সেখানে প্রায় ৭ বর্গকিলোমিটার ভূমি বিলীন হতে শুরু করে।

বাংলাদেশের বর্তমান সংকট এই অভিজ্ঞতারই প্রতিচ্ছবি—

মিসিসিপি: বাঁধ ও কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ → পলি বণ্টন ব্যাহত → বদ্বীপ পলিহীন → ভূমি দেবে যাওয়া → ভূখণ্ড বিলীন।

বাংলাদেশ: উজানের বাঁধ → পলি আটকে যাওয়া → বদ্বীপ পলিহীন → ভূমি দেবে যাওয়া → বদ্বীপের মৃত্যু।

লুইজিয়ানাও বর্তমানে হারিকেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার মতো চরম জলবায়ু প্রভাবের শিকার। পলিহীনতার কারণে শুরু হওয়া ধসকে জলবায়ু পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত করেছে। শিক্ষা স্পষ্ট পলিহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তন একসঙ্গে যুক্ত হলে বদ্বীপের মৃত্যু দ্রুততর হয়।

অঢেল সম্পদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র মিসিসিপি বদ্বীপের পতন ঠেকাতে পারেনি। পলি ও জলবায়ুকে একসঙ্গে মোকাবিলা না করলে বাংলাদেশও গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা বদ্বীপ রক্ষা করতে পারবে না।

নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে স্থাপনা। ছবি: রয়টার্স
নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে স্থাপনা। ছবি: রয়টার্স

রিভারস অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের মার্চ মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত ১,১৫৬টি নদীর মধ্যে ৭৯টি বর্তমানে মৃতপ্রায় বা শুকিয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গায় পানির প্রবাহ ৭০–৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ১৭৩টি গেজিং স্টেশনের মধ্যে ৭৪ শতাংশে পানির প্রবাহ কমছে গড়ে প্রতি দশকে ১৭ শতাংশ হারে।

তবু পানি বণ্টন চুক্তির আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত, তা হলো পলি।

শাঁখের করাত: জলবায়ুর চরম রূপ ও পলিহীনতা

নদী কেবল পানি নয়, পলিও বহন করে। বদ্বীপীয় দেশের জন্য পলি পানির মতোই অপরিহার্য। ঐতিহাসিকভাবে গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা অববাহিকা প্রতিবছর প্রায় ১৭০ কোটি টন পলি বাংলাদেশে নিয়ে আসত। এই পলিই বদ্বীপ সৃষ্টি করেছে, ভূমিধস রোধ করেছে এবং বাস্তুসংস্থান টিকিয়ে রেখেছে।

নেচার কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সব উজানের বাঁধ নির্মিত হলে পলিপ্রবাহ ১৫–৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। কেবল চীনের প্রস্তাবিত ইয়ারলুং সাংপো সুপার ড্যামই ব্রহ্মপুত্রের প্রায় ৫০ শতাংশ পলি আটকে দিতে পারে।

অথচ ১৯৯৬ সালের পানি চুক্তিতে পলি নিয়ে একটি ধারাও নেই। না আছে কোনো লক্ষ্যমাত্রা, না পর্যবেক্ষণ, না বাধ্যবাধকতা।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বহুমুখী সংকট

চরম আবহাওয়ার ফলে উজানের ভূমিক্ষয় বেড়ে জলাধারে পলি জমছে, জলাধার দ্রুত ভরাট হচ্ছে এবং বর্ষায় জরুরি পানি ছাড়তেই হচ্ছে, যা ২০২৪ সালের বন্যার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে, পলি না পৌঁছানোয় বদ্বীপ বছরে ৫–৭ মিলিমিটার হারে দেবে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষিজমির অবক্ষয় এই সংকটকে আরও গভীর করছে।

জলবায়ু অভিযোজনের অপরিহার্য দাবি

২০২৭ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া মানে কেবল সামান্য সংশোধন নয়; বরং জলবায়ু বাস্তবতাকে সামনে রেখে সম্পূর্ণ নতুন রূপরেখার দাবি। পলি ব্যবস্থাপনা, বায়ুমণ্ডলীয় পূর্বাভাসের সঙ্গে বাঁধ পরিচালনার সমন্বয়, রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময়, একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী অবকাঠামো, পানি–পলি–ভূগর্ভস্থ পানির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো সবই এখন অস্তিত্ব রক্ষার শর্ত।

অববাহিকা-ভিত্তিক জলবায়ু রূপরেখা ও জরুরি পদক্ষেপ

এই আলোচনা কেবল গঙ্গাকেন্দ্রিক বা শুষ্ক মৌসুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা এবং উজানে চীনের ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করে সমগ্র অববাহিকাভিত্তিক রূপরেখা অপরিহার্য।

মিসিসিপি বদ্বীপ আমাদের জন্য এক জ্বলন্ত সতর্কবার্তা। পলি-শূন্যতা একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে পতন অনিবার্য। গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা বদ্বীপ এখনো সেই চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়নি, কিন্তু বর্তমান গতিপথ সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছে।

২০২৭ সালের চুক্তি নবায়ন বাংলাদেশের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ অতীতের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে জলবায়ু-উপযোগী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাধ্যতামূলক কাঠামো গড়ে তোলার। অন্যথায়, মান্ধাতা আমলের নিয়ম মেনে নেওয়ার অর্থ হবে বদ্বীপের ক্রমাবনমন ও নদীগুলোর স্থায়ী মৃত্যু মেনে নেওয়া।

লেখক: জেফারসন কমিউনিটি অ্যান্ড টেকনিক্যাল কলেজের খণ্ডকালীন অধ্যাপক

নিবন্ধটি ইউরোএশিয়ারিভিউ থেকে অনূদিত

সম্পর্কিত