তরুণ চক্রবর্তী

ভোটের দিনক্ষণ এখনো ঘোষিত হয়নি। সম্ভবত এপ্রিল-মে মাসে ভোট। চলছে ভোটার তালিকা তৈরির চূড়ান্ত প্রস্তুতি। আর এই প্রস্তুতিকে ঘিরেই পশ্চিমবঙ্গে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরোধ তুঙ্গে। যুযুধান দুই পক্ষের লড়াই রাজনীতির ময়দান ছাড়িয়ে দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট অবধি পৌঁছেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) নিয়ে অভূতপূর্ব উত্তাপই বুঝিয়ে দিচ্ছে এবারের নির্বাচনী প্রচারে কতোটা ঝড় উঠবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লি থেকে আসছে আধা সামরিক বাহিনীর প্রচুর সদস্য।
ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে বিজেপির শীর্ষ নেতারা তৃণমূলের ভাষায় কলকাতা-দিল্লি ‘ডেলিপ্যাসেঞ্জারি’ বা নিত্যযাত্রা শুরু করে দিয়েছেন। তবু মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল আবারও জয়ের বিষয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।
বিজেপির অভিযোগ, প্রচুর বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নাম রয়েছে ভোটার তালিকায়। তৃণমূলের পাল্টা অভিযোগ, বিদেশিদের নামে স্বদেশীদেরই হয়রানি করছে বাঙালি বিদ্বেষি বিজেপি সরকার। তারা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতের অভিযোগ তুলছেন। বিচার চেয়ে সশরীরে সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হন খোদ মমতা ব্যানার্জি। স্বাধীন ভারতের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা নিজেই সুপ্রিম কোর্টের কাছে সাধারণ মানুষের হয়রানির প্রতিকার চান। সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর প্রক্রিয়ায় হাইকোর্টের বিচারপতিদের যুক্ত করেছেন। সেইসঙ্গে জানিয়ে দিয়েছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
ভোটার তালিকার সংশোধন নিয়ে চলতি বিতর্কে বিজেপির ইঙ্গিত ভোটে তাদের প্রধান ইস্যু হবে অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশ। কিন্তু সেটা করতে গিয়েও পদে পদে হোঁচট খেতে হচ্ছে হিন্দুত্ববাদী দলটিকে। কারণ একাত্তর পরবর্তীতে বহু হিন্দু বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসে বসবাস করছেন। ভারত সরকার সম্প্রতি অমুসলিমদের নাগরিকত্ব দিতে আইন সংস্কার করলেও বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হিন্দুরা সহজে নাগরিকত্ব পাচ্ছেন না। এ নিয়ে রাজ্যের নেতারা চিন্তিত। তবু বিজেপির দিল্লির নেতাদের মুসলিম অনুপ্রবেশই মূল হাতিয়ার। অন্যদিকে, শাসকদল তৃণমূল বিজেপি দলটাকেই বাঙালি বিদ্বেষি বলে দাগিয়ে দিতে সচেষ্ট। তাই টার্গেট এসআইআর।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মুসলিম ভোট বড় ফ্যাক্টর। কারণ রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৮৫টিতেই ৩৫ থেকে ৬৬ শতাংশ মুসলিম ভোটার রয়েছেন। রাজ্যের ২৩টি জেলার মধ্যে মুর্শিদাবাদ (৬৬.৩) ও মালদায় (৫১.৩) মুসলিমরা সংখ্যাগুরু। এছাড়াও উত্তর দিনাজপুর (৪৯.৯), বীরভূম (৩৭.১) ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় (৩৫.৬) নির্ণায়ক শক্তি মুসলিমরা। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই ৮৫টি আসনের মধ্যে ৭৫টাই পায় তৃণমূল। গোটা রাজ্যের মোট ভোটারের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মুসলিম। এই মুসলিম ভোটই তৃণমূলের বড় ভরসা। তাই ভোটার তালিকায় মুসলিমদের নাম যাতে বাদ না যায় সেটাই নিশ্চিত করতে ব্যস্ত তৃণমূল। আর বিজেপির নেতারা ব্যস্ত মুসলিমদের নাম বাদ দিতে। উভয় পক্ষের এই চাপ ও পাল্টা চাপের জাঁতাকলে পড়ে পশ্চিমবঙ্গে শতাধিক মানুষ এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালে প্রাণ হারিয়েছেন। এদের মধ্যে নির্বাচনী কাজে নিযুক্ত সরকারি কর্মীরাও রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত খসড়া তালিকা অনুযায়ী রাজ্যের মোট ভোটারের সংখ্যা ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯। তবে মৃত্যু ও বাসস্থান বদলের কারণে বহু নাম বাদ যাওয়ার স্বাভাবিক সম্ভাবনাও রয়েছে। গতবার, ২০২১ সালে, ৭ কোটি ৩৪ লাখ ১৪ হাজার ৭৪৬ জন ভোটারের নাম ছিল চূড়ান্ত তালিকায়। তাদের মধ্যে ৮২.৩০ শতাংশ ভোটার নির্বাচনে অংশ নেন। ২০১৬ সালে অবশ্য ভোট দানের হার আরও বেশি ছিল। গতবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। টানা ৩৪ বছর শাসন করা বাম দলগুলো কংগ্রেসের সঙ্গে আঁতাত করে একটি আসনেও জিততে পারেনি। আবার বিজেপি মাত্র ২টি থেকে ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে। আসন বাড়ে শাসক দল তৃণমূলেরও।
গতবারের বিধানসভা ভোটে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সর্বশক্তি নিয়োগ করেও মমতা ব্যানার্জিকে হারাতে পারেনি। বিজেপি ও তৃণমূল নেতারা লড়াইটাকে মোদি বনাম মমতা করে তুলেছিলেন। কিন্তু তাতে মমতারই জয় হয়। ২৯০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তৃণমূল জয়লাভ করে ২১৩টি আসনে। ত্রিমুখী লড়াইতে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার ৪৮.০২ শতাংশ। অন্যদিকে, বিজেপি ২৯৩টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জেতে ৭৭টিতে। তাদের প্রাপ্ত ভোট ২৭.৮১ শতাংশ। বাম ও কংগ্রেস আইএসএফের সঙ্গে জোট করেও কোনও আসন পায়নি। আইএসএফ অবশ্য একটি আসন পেয়েছিল। বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট পেয়েছিল মাত্র ১০.০৪ শতাংশ ভোট।
গতবারের বিধানসভা ভোটের পর থেকে তৃণমূলের শক্তি আরও বেড়েছে। ভোটের আগে বিজেপি দলবদল করিয়ে বহু তৃণমূল নেতাকে তাদের দলে নিলেও ফল প্রকাশের পর উল্টো স্রোত বইতে শুরু করে। বিজেপি ভেঙে তৃণমূলে ফেরার ঢল এখনও অব্যহত। তৃণমূলের আসন ২১৩ থেকে বেড়ে হয়েছে ২২৪। আর বিজেপির ৭৭ থেকে কমে ৬৪। গত সপ্তাহেও বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণু শর্মা দলবদল করে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। শুধু বিধানসভাতেই নয়, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও বিজেপির শক্তি কমেছে। পশ্চিমবঙ্গে ১৮ থেকে তাদের আসন কমে দাঁড়ায় ১২, তৃণমূলের ২৯ এবং কংগ্রেসের ১।

তবু এবারের নির্বাচনে বেশ সতর্ক তৃণমূল। এসআইআর নিয়ে তারাও জলঘোলা করছে। তাদের আশঙ্কা, মুসলিম ভোটে ভাগ বসাতে পারে দলছুট হুমায়ুন কবিরের নতুন দল জনতা উন্নয়ন পার্টি। দল গড়েই হুমায়ুন মুর্শিদাবাদ জেলায় ৩০০ কোটির বেশি রুপি খরচ করে বাবরি মসজিদ স্থাপন করছেন। মুসলিম নেতা, আইএসএফ বিধায়ক নৌশদ সিদ্দিকির সঙ্গে আঁতাতও করছেন তিনি। বামেদের সঙ্গেও তার কথা হচ্ছে। তাই মুসলিম ভোট ভাগের ভয় কিছুটা হলেও রয়েছে শাসক শিবিরের। সেই আশঙ্কা আরও বেড়েছে তৃণমূল সাংসদ মৌসম বেনজির নূরের কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তনে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিপিএমের যুবনেতা প্রতীক উর রহমানকে দলে টেনে নিয়েছে তৃণমূল। তারা আত্মবিশ্বাসী। তবে সতর্কও। কারণ বিজেপি ছাড়বার পাত্র নয়। তাদের স্বপ্ন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতি বিজড়িত পশ্চিমবঙ্গ দখল।
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসাম, তামিলনাডু, কেরালা ও পুদুচেরি রাজ্যে বিধানসভার ভোট। আসামে বিজেপির সরকার থাকলেও সেখানে এবার কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে তাদের। রাজ্যে ৩৫-৩৬ শতাংশ মুসলিম ভোটারের পাশাপাশি অসমিয়াদের একটা বড় অংশ বিজেপির প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। বিরোধীরা কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হচ্ছে আসামে। তামিলনাডু, কেরালা ও পুদুচেরিতে বিজেপির কোনো আশা নেই। তাই পশ্চিমবঙ্গ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ উঠেছে, মমতাকে হারিয়ে ‘বাংলা’ দখলে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকেও ব্যবহার করছে বিজেপি। ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে তাই অভূতপূর্ব বিতর্ক হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে। গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হারে কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও সন্দেহ বাড়ছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

ভোটের দিনক্ষণ এখনো ঘোষিত হয়নি। সম্ভবত এপ্রিল-মে মাসে ভোট। চলছে ভোটার তালিকা তৈরির চূড়ান্ত প্রস্তুতি। আর এই প্রস্তুতিকে ঘিরেই পশ্চিমবঙ্গে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরোধ তুঙ্গে। যুযুধান দুই পক্ষের লড়াই রাজনীতির ময়দান ছাড়িয়ে দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট অবধি পৌঁছেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) নিয়ে অভূতপূর্ব উত্তাপই বুঝিয়ে দিচ্ছে এবারের নির্বাচনী প্রচারে কতোটা ঝড় উঠবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লি থেকে আসছে আধা সামরিক বাহিনীর প্রচুর সদস্য।
ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে বিজেপির শীর্ষ নেতারা তৃণমূলের ভাষায় কলকাতা-দিল্লি ‘ডেলিপ্যাসেঞ্জারি’ বা নিত্যযাত্রা শুরু করে দিয়েছেন। তবু মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল আবারও জয়ের বিষয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।
বিজেপির অভিযোগ, প্রচুর বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নাম রয়েছে ভোটার তালিকায়। তৃণমূলের পাল্টা অভিযোগ, বিদেশিদের নামে স্বদেশীদেরই হয়রানি করছে বাঙালি বিদ্বেষি বিজেপি সরকার। তারা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতের অভিযোগ তুলছেন। বিচার চেয়ে সশরীরে সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হন খোদ মমতা ব্যানার্জি। স্বাধীন ভারতের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা নিজেই সুপ্রিম কোর্টের কাছে সাধারণ মানুষের হয়রানির প্রতিকার চান। সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর প্রক্রিয়ায় হাইকোর্টের বিচারপতিদের যুক্ত করেছেন। সেইসঙ্গে জানিয়ে দিয়েছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
ভোটার তালিকার সংশোধন নিয়ে চলতি বিতর্কে বিজেপির ইঙ্গিত ভোটে তাদের প্রধান ইস্যু হবে অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশ। কিন্তু সেটা করতে গিয়েও পদে পদে হোঁচট খেতে হচ্ছে হিন্দুত্ববাদী দলটিকে। কারণ একাত্তর পরবর্তীতে বহু হিন্দু বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসে বসবাস করছেন। ভারত সরকার সম্প্রতি অমুসলিমদের নাগরিকত্ব দিতে আইন সংস্কার করলেও বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হিন্দুরা সহজে নাগরিকত্ব পাচ্ছেন না। এ নিয়ে রাজ্যের নেতারা চিন্তিত। তবু বিজেপির দিল্লির নেতাদের মুসলিম অনুপ্রবেশই মূল হাতিয়ার। অন্যদিকে, শাসকদল তৃণমূল বিজেপি দলটাকেই বাঙালি বিদ্বেষি বলে দাগিয়ে দিতে সচেষ্ট। তাই টার্গেট এসআইআর।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মুসলিম ভোট বড় ফ্যাক্টর। কারণ রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৮৫টিতেই ৩৫ থেকে ৬৬ শতাংশ মুসলিম ভোটার রয়েছেন। রাজ্যের ২৩টি জেলার মধ্যে মুর্শিদাবাদ (৬৬.৩) ও মালদায় (৫১.৩) মুসলিমরা সংখ্যাগুরু। এছাড়াও উত্তর দিনাজপুর (৪৯.৯), বীরভূম (৩৭.১) ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় (৩৫.৬) নির্ণায়ক শক্তি মুসলিমরা। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই ৮৫টি আসনের মধ্যে ৭৫টাই পায় তৃণমূল। গোটা রাজ্যের মোট ভোটারের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মুসলিম। এই মুসলিম ভোটই তৃণমূলের বড় ভরসা। তাই ভোটার তালিকায় মুসলিমদের নাম যাতে বাদ না যায় সেটাই নিশ্চিত করতে ব্যস্ত তৃণমূল। আর বিজেপির নেতারা ব্যস্ত মুসলিমদের নাম বাদ দিতে। উভয় পক্ষের এই চাপ ও পাল্টা চাপের জাঁতাকলে পড়ে পশ্চিমবঙ্গে শতাধিক মানুষ এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালে প্রাণ হারিয়েছেন। এদের মধ্যে নির্বাচনী কাজে নিযুক্ত সরকারি কর্মীরাও রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত খসড়া তালিকা অনুযায়ী রাজ্যের মোট ভোটারের সংখ্যা ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯। তবে মৃত্যু ও বাসস্থান বদলের কারণে বহু নাম বাদ যাওয়ার স্বাভাবিক সম্ভাবনাও রয়েছে। গতবার, ২০২১ সালে, ৭ কোটি ৩৪ লাখ ১৪ হাজার ৭৪৬ জন ভোটারের নাম ছিল চূড়ান্ত তালিকায়। তাদের মধ্যে ৮২.৩০ শতাংশ ভোটার নির্বাচনে অংশ নেন। ২০১৬ সালে অবশ্য ভোট দানের হার আরও বেশি ছিল। গতবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। টানা ৩৪ বছর শাসন করা বাম দলগুলো কংগ্রেসের সঙ্গে আঁতাত করে একটি আসনেও জিততে পারেনি। আবার বিজেপি মাত্র ২টি থেকে ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে। আসন বাড়ে শাসক দল তৃণমূলেরও।
গতবারের বিধানসভা ভোটে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সর্বশক্তি নিয়োগ করেও মমতা ব্যানার্জিকে হারাতে পারেনি। বিজেপি ও তৃণমূল নেতারা লড়াইটাকে মোদি বনাম মমতা করে তুলেছিলেন। কিন্তু তাতে মমতারই জয় হয়। ২৯০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তৃণমূল জয়লাভ করে ২১৩টি আসনে। ত্রিমুখী লড়াইতে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার ৪৮.০২ শতাংশ। অন্যদিকে, বিজেপি ২৯৩টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জেতে ৭৭টিতে। তাদের প্রাপ্ত ভোট ২৭.৮১ শতাংশ। বাম ও কংগ্রেস আইএসএফের সঙ্গে জোট করেও কোনও আসন পায়নি। আইএসএফ অবশ্য একটি আসন পেয়েছিল। বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট পেয়েছিল মাত্র ১০.০৪ শতাংশ ভোট।
গতবারের বিধানসভা ভোটের পর থেকে তৃণমূলের শক্তি আরও বেড়েছে। ভোটের আগে বিজেপি দলবদল করিয়ে বহু তৃণমূল নেতাকে তাদের দলে নিলেও ফল প্রকাশের পর উল্টো স্রোত বইতে শুরু করে। বিজেপি ভেঙে তৃণমূলে ফেরার ঢল এখনও অব্যহত। তৃণমূলের আসন ২১৩ থেকে বেড়ে হয়েছে ২২৪। আর বিজেপির ৭৭ থেকে কমে ৬৪। গত সপ্তাহেও বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণু শর্মা দলবদল করে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। শুধু বিধানসভাতেই নয়, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও বিজেপির শক্তি কমেছে। পশ্চিমবঙ্গে ১৮ থেকে তাদের আসন কমে দাঁড়ায় ১২, তৃণমূলের ২৯ এবং কংগ্রেসের ১।

তবু এবারের নির্বাচনে বেশ সতর্ক তৃণমূল। এসআইআর নিয়ে তারাও জলঘোলা করছে। তাদের আশঙ্কা, মুসলিম ভোটে ভাগ বসাতে পারে দলছুট হুমায়ুন কবিরের নতুন দল জনতা উন্নয়ন পার্টি। দল গড়েই হুমায়ুন মুর্শিদাবাদ জেলায় ৩০০ কোটির বেশি রুপি খরচ করে বাবরি মসজিদ স্থাপন করছেন। মুসলিম নেতা, আইএসএফ বিধায়ক নৌশদ সিদ্দিকির সঙ্গে আঁতাতও করছেন তিনি। বামেদের সঙ্গেও তার কথা হচ্ছে। তাই মুসলিম ভোট ভাগের ভয় কিছুটা হলেও রয়েছে শাসক শিবিরের। সেই আশঙ্কা আরও বেড়েছে তৃণমূল সাংসদ মৌসম বেনজির নূরের কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তনে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিপিএমের যুবনেতা প্রতীক উর রহমানকে দলে টেনে নিয়েছে তৃণমূল। তারা আত্মবিশ্বাসী। তবে সতর্কও। কারণ বিজেপি ছাড়বার পাত্র নয়। তাদের স্বপ্ন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতি বিজড়িত পশ্চিমবঙ্গ দখল।
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসাম, তামিলনাডু, কেরালা ও পুদুচেরি রাজ্যে বিধানসভার ভোট। আসামে বিজেপির সরকার থাকলেও সেখানে এবার কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে তাদের। রাজ্যে ৩৫-৩৬ শতাংশ মুসলিম ভোটারের পাশাপাশি অসমিয়াদের একটা বড় অংশ বিজেপির প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। বিরোধীরা কংগ্রেসের নেতৃত্বে জোটবদ্ধ হচ্ছে আসামে। তামিলনাডু, কেরালা ও পুদুচেরিতে বিজেপির কোনো আশা নেই। তাই পশ্চিমবঙ্গ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ উঠেছে, মমতাকে হারিয়ে ‘বাংলা’ দখলে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকেও ব্যবহার করছে বিজেপি। ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে তাই অভূতপূর্ব বিতর্ক হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে। গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হারে কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও সন্দেহ বাড়ছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট