জাতিসংঘের কি লজ্জা লাগে?

জাতিসংঘের কি লজ্জা লাগে?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। ছবি: রয়টার্স

এখনকার দুনিয়ায় লজ্জা বেশ দুর্লভ বিষয়। পুঁজিবাদী সমাজে এর উপস্থিতি কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। তবে কিছু নির্দিষ্ট সংস্থা বা ব্যক্তির অবশ্য লজ্জার শেষ নেই। তারা বেশ নিয়মিত হারে লজ্জিত হন, নিন্দাও জানান। এসব সংস্থার মধ্যে জাতিসংঘ অন্যতম। যদিও বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠে যায় যে, জাতিসংঘের কি আদৌ এখন লজ্জা লাগে?

লজ্জা বোধের প্রসঙ্গটি কেন উঠছে, তা নিয়ে আলোচনার আগে একটু প্রেক্ষাপট নিয়ে বলে নেওয়া যাক। নতুন বছরে; অর্থাৎ, ২০২৬ সালের শুরুতে এক দারুণ উপহার মিলেছে। সেই উপহার এতটাই অভাবনীয় যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে যার ন্যূনতম ধারণাও আছে, তারও কপালে হাত দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ছবি: রয়টার্স
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ছবি: রয়টার্স

কারণ, গত ৩ জানুয়ারি আমেরিকা সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে স্ত্রীসহ তুলে নিয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে আমেরিকায় মাদক ঢোকানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। আবার সেই সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে দিয়েছেন ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ব্যবস্থাপনার প্রতি আমেরিকার আগ্রহের বিষয়টিও। সে বিষয়টি এমনভাবেই বলা হয়েছে যে, দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে প্রেসিডেন্টকে অপহরণের কারণও আর খুঁজে বের করতে হচ্ছে না। কারণসমূহ আসলে এতটাই প্রকাশ্য!

এ বিষয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানামাত্রিক আলোচনা হচ্ছে। কোনো দেশ সমালোচনা করছে, কেউ ট্রাম্পের সুরে সুর মেলাচ্ছে, কেউ কেউ আবার ডানে-বামে যাচ্ছে না, মাঝে থাকছে। অথচ ঘটনাটি এমন যে, সোজা যুক্তিতে এর সমালোচনা না করা কঠিন। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি তো সব সময় ঠিক যুক্তির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক যে আমেরিকা তুলে নিয়ে গেল, সেই আমেরিকাও সব সময় যুক্তিতে চলে না। তাদের ধামাধরারা তো আরও না। অনেকে আবার স্বার্থের কারণে ফেঁসে গিয়েও ভিন্ন আচরণ করতে বাধ্য হন।

সে যাক গে। কথা হলো, এলাকার প্রতিবেশীদের মধ্যেও অনেক সময় গ্যাঞ্জাম লাগে। সেই গ্যাঞ্জামেও এক পক্ষ আগ্রাসনের শিকার হয়, আরেক পক্ষ সহ্য করে। মধ্যস্থতা করে ঝামেলা মেটাতে তখন আরেকটি পক্ষ সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এমনটা হয়। এটি করার জন্য আবার গত শতকে একটি সংস্থাও তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির গালভরা নাম হলো–জাতিসংঘ।

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি বা ইতালির মতো কেউ যেন অযাচিতভাবে অন্য দেশে আগ্রাসন চালাতে না পারে এবং বিশ্বযুদ্ধের মতো জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সেজন্যই জাতিসংঘ গঠন করা হয়েছিল। এর সদর দপ্তর মার্কিন মুলুকে। উদ্যোক্তারাও মূলত তৎকালীন ‘মিত্রপক্ষ’। শুরু থেকেই তাই ইউরোপ-আমেরিকার গা ঘেঁষেই বড় হয়েছে জাতিসংঘ। নীতির বিষয়গুলোতেও তেমন বৈশিষ্ট্যই দেখা গেছে বেশির ভাগ সময়। তাতে বিশ্বযুদ্ধকালীন মিত্রপক্ষীয় প্রভুদের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানোর ইতিহাস খুব একটা সমৃদ্ধ নয়। বরং রোগী মরিয়া যাইবার পরই ডাক্তার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার উদাহরণ বেশি।

১৯৪৮ সালের মে মাসে শান্তিরক্ষার্থে প্রথম মিশন পাঠিয়েছিল জাতিসংঘ। সেটি পাঠানো হয়েছিল ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকায়। এই প্রথম মিশন দিয়েই শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সফলতার হার সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো–যে সংঘাত ও সংকট নিরসনের জন্য প্রথম মিশন পাঠিয়েছিল জাতিসংঘ, সেটির সমাধান আজ অবধি হয়নি। তার অর্থ হলো, জাতিসংঘ এই সমস্যার সম্মানজনক সমাধান গত ৭৭ বছরেও করতে পারেনি। তার ফলে এখনো গাজায় ফিলিস্তিনিরা মরছে এবং মানুষ হিসেবে ন্যূনতম সম্মানটুকুও পাচ্ছে না।

কেন ফিলিস্তিন সমস্যার সম্মানজনক সমাধান করতে পারল না জাতিসংঘ? মোটা দাগে কারণ হলো, আমেরিকা চায়নি। আমেরিকা চায়নি; কারণ, ইসরায়েলও চায়নি। এই না চাওয়ার পেছনে আছে দখলদারত্বের মনোভাব। সোজা আঙুলে না হলে, বাঁকা আঙুলই সই। আর তাই হয়তো ‘কঠোর বিবৃতি’ দেওয়া ছাড়া জাতিসংঘের করার আর কিছু থাকে না। কারও বাড়িতে সাবলেট থেকে কি আর মহাজনের বিরুদ্ধে আঙুল তোলা যায়?

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ছবি: রয়টার্স
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ছবি: রয়টার্স

মোটা দাগে বলা যায়, আন্তর্জাতিক দুনিয়ার মহাজনদের জোরজবরদস্তি প্রতিরোধে জাতিসংঘের ভূমিকা নগণ্য। অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্যও। তা রাশিয়া হোক, চীন হোক, বা আমেরিকাই। রাশিয়া বা চীনে তাও বিবৃতির কঠোরতা অনুভূত হয়। আর আমেরিকা বা ইউরোপের ব্যাপারে কেমন যেন ‘মিউ মিউ’ স্বর মেলে, তাও বেশ অনুচ্চারে। যেমন সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা সংকটের কথাই বলা যায়। মনরো ডকট্রিনের আওয়াজ তুলে সেটিকে ‘ডনরো ডকট্রিন’ দাবি করে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্টের অঙ্গুলি হেলনে রাতারাতি একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্ট স্ত্রীসুদ্ধ অপহরণ করা হলো এক সামরিক অভিযানে। তার বিপরীতে জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সর্বপ্রথম যে প্রতিক্রিয়া জানান, সেটি হলো–‘এটি একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ’!

তা, একই ঘটনা অন্য কোনো দেশ যদি ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় ঘটাত, এত সংক্ষেপে কি নিন্দাপ্রকাশ সম্পন্ন হতো? জাতিসংঘের ক্ষোভ কি বিক্ষোভে রূপ নিত না? নিদেনপক্ষে বিবৃতি কি আরেকটু কঠোর হতো না?

যদিও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে এরই মধ্যে বৈঠক ডেকেছে। সেই বৈঠকে হয়তো আমেরিকাবিরোধী দেশগুলো আওয়াজও তুলবে। তবে জাতিসংঘ সংস্থা হিসেবে কতটা কঠোর হতে পারবে, বা কঠোর হওয়ার চেষ্টা করতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ ও অবিশ্বাস থেকেই যায়। কারণ, সবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ইতিহাস জাতিসংঘের খুব একটা নেই। ৭০ বছরেরও বেশি সময়ের যাত্রায় কেবলমাত্র দুর্বলদের মধ্যে মোড়লগিরি করার সক্ষমতাই অর্জন করতে পেরেছে জাতিসংঘ। সবলদের মধ্যে জাতিসংঘ উল্টো নিজেই হয়ে পড়ে দুর্বল। অবশ্য সেই দুর্বলতা কাটানোর জন্য প্রয়োজনে ভিটামিন ট্যাবলেট খাওয়ার ইচ্ছাও জাতিসংঘের খুব একটা নেই। বরং পোষ্য থাকাতেই যেন যত আনন্দ!

অথচ, সবলদের কাছ থেকে দুর্বলদের রক্ষা করতেই জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল। যেকোনো সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধের জন্যই জাতিসংঘকে চেয়েছিল বিশ্ব।

দিনশেষে তাই প্রশ্ন জাগে, সবল মতান্তরে ‘ভাসুর’দের বিরুদ্ধে কথা বলতে বা পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘের কি লজ্জা লাগে? সেই লজ্জা কাটাতে আসলে কতটা অবগুণ্ঠন প্রয়োজন? সারা দুনিয়ার গার্মেন্টস কারখানায় সম্ভব হবে তো?

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত