শহরে পানি উঠলে সেটি ‘ওয়াটার লগিং’; গ্রামে উঠলে সেটি ‘দুর্যোগ’।
চিররঞ্জন সরকার

মধ্যবিত্ত রোমান্টিক বাঙালির কাছে বৃষ্টি এক ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসব। আকাশ কালো হলেই তাদের ভেতরের কবি জেগে ওঠেন। জানালার কাচে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ পড়লেই রবীন্দ্রসংগীতের প্লে-লিস্ট খুলে যায়, হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, সঙ্গে পেঁয়াজু কিংবা খিচুড়ির সুবাস–এই হলো বর্ষার নন্দনতত্ত্ব। ফেসবুকে তখন একের পর এক স্ট্যাটাস, ‘আজ মনটা ভিজে গেল’, ‘বৃষ্টি মানেই তুমি’, ‘মেঘেরও বুঝি কষ্ট আছে!’ যেন দেশের সব নদী-নালা, খাল-বিল আর মানুষের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত প্রেমের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু যে বৃষ্টিকে মধ্যবিত্ত ‘রোমান্স’ বলে, গরিব মানুষ তাকে বলে ‘সর্বনাশ’। একজনের কাছে বর্ষা মানে জানালার কাচে জলবিন্দু, আরেকজনের কাছে ঘরের ভেতরে হাঁটুসমান পানি। একজন বৃষ্টি দেখে কবিতা লেখেন, আরেকজন ভিজে যাওয়া চাল শুকানোর জায়গা খোঁজেন। একজনের কাছে বৃষ্টি মানে খিচুড়ি, অন্যজনের কাছে সেদিন চুলায় আগুনই জ্বলে না।
ইতিমধ্যেই বর্ষা তার চিরচেনা রূপ দেখাতে শুরু করেছে। টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ প্রায় ১৮টি জেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ধসে উখিয়া, টেকনাফ, বান্দরবানসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। কোথাও রেললাইন পানির নিচে, কোথাও সড়ক নদীতে পরিণত হয়েছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি। প্রকৃতি যেন প্রতি বছর একই প্রশ্নপত্র দেয়, কিন্তু আমরা প্রতি বছরই ফেল করি।
বন্যার পানির একটা অদ্ভুত গণতন্ত্র আছে। সেটা ধনী-গরিবের ভেদাভেদ মানে না। তবে কষ্টের বণ্টনে বৈষম্যটা ঠিকই থেকে যায়। গুলশানের মানুষ জলাবদ্ধতা নিয়ে ফেসবুকে ক্ষোভ ঝাড়েন, আর গ্রামের মানুষ নৌকায় করে গরু, বাচ্চা আর চালের বস্তা সরিয়ে নেন। শহরে পানি উঠলে সেটি ‘ওয়াটার লগিং’; গ্রামে উঠলে সেটি ‘দুর্যোগ’।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। পরীক্ষার্থীরা কেউ স্বস্তি পেয়েছে, কেউ আবার দুশ্চিন্তায় পড়েছে। তবে বন্যা কখনো পরীক্ষা স্থগিত করলেও জীবন নামের পরীক্ষাটা এক দিনের জন্যও স্থগিত করে না।
এদিকে শহুরে সৌখিন মধ্যবিত্ত ঘরে বসে বর্ষা উপভোগ করছেন। জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখা, হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ, পেছনে রবীন্দ্রসংগীত–এই দৃশ্য এখন প্রায় নাগরিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু যাদের জানালাই নেই, তারা বৃষ্টি দেখেন না; তারা বৃষ্টিতে ভিজে যান। যাদের ঘর টিনের, তারা বর্ষার সুর শোনেন না; তারা টিন ফুঁড়ে পানি পড়ার হিসাব করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে বর্ষার নন্দনতত্ত্বের চেয়ে বর্ষার অর্থনীতি অনেক বড়। পেটের দায়ে তাদের বের হতেই হয়। রিকশাওয়ালা, ভ্যানচালক, দিনমজুর, হকার–কারও জীবনে ‘রেইনি ডে’ বলে ছুটি নেই।
তাই বর্ষাকালে তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা হলো একটি ছাতা। এই ক্ষুদ্র বস্তুটিই মাথা, বাজারের থলে, মজুরির টাকা আর শেষ সম্বলটুকু একসঙ্গে বাঁচানোর চেষ্টা করে।
কান টানলে যেমন মাথা আসে, তেমনি ছাতার কথা উঠলেই মাথা হাজির। বর্ষাকালে এই সম্পর্ক আরও গভীর। কারণ বৃষ্টির দিনে মাথা আর ছাতা একে অপরের পরিপূরক, জামায়াত-এনসিপি জোটের মতো। ছাতা না থাকলে মাথা ভিজবে, মাথা ভিজলে সর্দি হবে, সর্দি থেকে জ্বর, আর জ্বর এলে মানুষ এমন সব সিদ্ধান্ত নেয়, যার মাশুল পরে পরিবার, অফিস, এমনকি দেশও দেয়। তাই ছাতা নিছক কাপড়ের তৈরি একটি বস্তু নয়; এটি মাথার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী, বর্ষার বডিগার্ড, আর অনেক সময় সংসারের শেষ প্রতিরক্ষা-কবচ।
মাথা নিয়ে মানুষের মাথাব্যথার শেষ নেই। শরীরের অন্য অঙ্গের বদলি মিললেও মাথার বদলি এখনো বিজ্ঞান দিতে পারেনি। হাত-পা ভাঙলে প্লাস্টার হয়, দাঁত উঠলে কৃত্রিম দাঁত বসে, চুল পড়ে গেলে উইগ পাওয়া যায়; কিন্তু মাথা হারালে আর কিছুই করার থাকে না। তাই যুগে যুগে মানুষ মাথা বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছে, আর ছাতা কিনতে দরদাম করেছে।
এই ‘হেড’-কে ‘শেড’ দেওয়ার জন্যই মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছাতা। চাকা, আগুন, ছাপাখানা, ইন্টারনেট–সবই সভ্যতার বিস্ময়। কিন্তু প্রবল বর্ষার দুপুরে এগুলোর কোনোটাই মাথা শুকনো রাখতে পারে না। সেই কাজটা একাই করে ছাতা। কত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছে, কত মতবাদ ইতিহাসের ডাস্টবিনে গেছে, কত নেতা নির্বাচনের পর হারিয়ে গেছেন; কিন্তু ছাতা আজও সমান জনপ্রিয়। গণতন্ত্র কখনো ভিজে যায়, অর্থনীতি ডুবে যায়, রাস্তা নদী হয়ে যায়, কিন্তু ছাতার চাহিদা কখনো কমে না।
কবিও তাই বোধহয় অকারণে লেখেননি-
পেটের উপর বুকের বসতি,
বুকের উপর মাথা,
তাহারও উপর মুখের বসতি,
তাহারও উপর ছাতা।
সমাজে যাদের মাথার দাম যত বেশি, তাদের ছাতার দামও তত বেশি। গরিব কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা খেটে-খাওয়া মানুষ বছরের অর্ধেক সময় রোদে পোড়েন, বাকি অর্ধেক সময় বৃষ্টিতে ভেজেন। তাদের মাথা এতটাই অভ্যস্ত যে প্রকৃতিও যেন আর বিশেষ কষ্ট দিতে পারে না। তাদের মাথা রোদে-জলে এমন ওয়াটার ও হিটপ্রুফ হয়ে গেছে, যা কোনো বহুজাতিক কোম্পানিও বানাতে পারেনি।
কিন্তু মধ্যবিত্তের অবস্থা ভিন্ন। তারা মাথা খাটিয়ে খায়, মাথা বেচে চাকরি করে, মাথা নিচু করে ঋণের কিস্তি দেয়, আবার প্রয়োজনমতো মাথা উঁচু করে নীতি শেখায়। তাই তাদের মাথা বাঁচানোর জন্য ছাতা অপরিহার্য। আর উচ্চবিত্তের ছাতা তো একেকটা প্রায় সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। কারও ছাতা খুললেই বোঝা যায়, তার ব্যাংক ব্যালেন্সও সম্ভবত ছাতার ব্যাসার্ধের মতোই বড়।
আদি মানুষ গাছের পাতা দিয়ে মাথা ঢেকেছিল। তারপর এল বাঁশের কঞ্চির ছাতা, কাপড়ের ছাতা, প্লাস্টিকের ছাতা, ভাঁজ করা ছাতা, অটোমেটিক ছাতা, বোতাম টিপলেই ফুটে ওঠা ছাতা। সভ্যতা এগিয়েছে, ছাতাও আধুনিক হয়েছে। শুধু একটি জিনিস বদলায়নি, তা হলো, বাসে, ট্রেনে, অফিসে কিংবা আদালতে ছাতা ফেলে আসার জাতীয় অভ্যাস।
একসময় ছাতা দেখে মানুষ চেনা যেত। যার ছাতায় যত বেশি তালি, জীবনে তিনি তত বেশি ঝড়ঝাপটা সামলেছেন। নতুন ছাতার মালিকদের আবার ছাতা হারানোর অসাধারণ প্রতিভা থাকে। তারা সাধারণত কবি, প্রেমিক অথবা সরকারি কর্মকর্তা, যারা নিজের জিনিসের চেয়ে রাষ্ট্রীয় বা মহাজাগতিক বিষয় নিয়ে বেশি ভাবেন।
আর যাদের নিজের ছাতা নেই, অথচ প্রয়োজনমতো অন্যের ছাতার নিচে দিব্যি দাঁড়িয়ে যান, তাদের বিষয়ে একটু সাবধান থাকা ভালো। এরা জীবনে নিজের ঝুঁকি নেন না, কিন্তু অন্যের নিরাপত্তা ব্যবহার করতে ওস্তাদ। দলবদলকারী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে এদের আশ্চর্য মিল রয়েছে। বৃষ্টি নামলেই তারা বাতাসের দিক দেখে ছাতা বদলান।
আজকের যুগে সাফল্যের সবচেয়ে কার্যকর মন্ত্র সম্ভবত মেধা নয়, পরিশ্রমও নয়, ঠিক সময়ে ঠিক ছাতার নিচে দাঁড়াতে পারা। নীতি-নৈতিকতা আজকাল ছাতার কভারের সঙ্গে দেওয়া ওয়ারেন্টি কার্ডের মতো, কেউ পড়ে না, কেউ মানেও না। যোগ্য ছাতার তলায় আশ্রয় পেলে মামলা হালকা হয়, ঋণ ভারী হয়, লাইসেন্স সহজ হয়, পদোন্নতি দ্রুত হয়, আর প্রয়োজনে ইতিহাসও নতুন করে লেখা যায়।
সবশেষে দেখা যায়, এই দেশে সবারই কোনো না কোনো ছাতা আছে। শুধু নেই আমজনতার। তারা নিজেরাই যেন ব্যাঙের ছাতা; বর্ষায় হঠাৎ জন্মায়, রোদ উঠলে শুকিয়ে যায়, আর ক্ষমতার পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মিলিয়ে যায়। সরকার বদলায়, মন্ত্রী বদলায়, পতাকা বদলায়, ক্ষমতার ছাতার রং বদলায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের মাথার ওপর ছাতাটা আর ওঠে না!
পুনশ্চ: আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে ডাণ্ডা হিসেবেও ছাতা ব্যবহার হয়। আপদে-বিপদে জুতাপেটার মত ছাতাপেটাও মোটামুটি প্রচলিত। তবে ছাতার ব্যবহার ও গুরুত্ব যত বিচিত্রই হোক না কেন, মূলত ছাতা হচ্ছে ‘হারানোর জিনিস’। পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বেশি হারানো যায় সম্ভবত ছাতা (এর খুব কাছেই রয়েছে কলম ও প্রেমিকা)। বাঙালির আশার মত ছাতাও ‘এই আছে এই নেই’। ছাতা হারানো নিয়ে কত কেলেংকারি হতে পারে, সেটা অনুধাবন করতে তারাপদ রায় থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে:
প্রিয় মেঘনাদ বাবু,
গত শনিবার রাতে খুব বৃষ্টির সময় আমাদের বাড়ি থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য আমাদের বাসার কাজের ছেলেটি পাশের বাড়ি থেকে যে ছাতাটি আপনাকে চেয়ে এনে দিয়েছিল, সেই ছাতাটি পাশের বাড়ি ভদ্রলোক আজ চাইতে এসেছেন। ভদ্রলোক বললেন, ছাতাটি তিনি অফিসের বড়সাহেবের কাছ থেকে চেয়ে এনেছিলেন। বড়সাহেবের ভায়রাভাই খুব চাপ দিচ্ছেন ছাতাটির জন্য, কারণ বড়সাহেবের ভায়রাভাই যে বন্ধুর কাছ থেকে ছাতাটি আনেন, সেই বন্ধুর মামা তার ছাতাটি ফেরত চাইছেন। ছাতাটি পত্রবাহকের হাতে ফেরত দিয়ে বাধিত করবেন!
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও গবেষক

মধ্যবিত্ত রোমান্টিক বাঙালির কাছে বৃষ্টি এক ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসব। আকাশ কালো হলেই তাদের ভেতরের কবি জেগে ওঠেন। জানালার কাচে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ পড়লেই রবীন্দ্রসংগীতের প্লে-লিস্ট খুলে যায়, হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, সঙ্গে পেঁয়াজু কিংবা খিচুড়ির সুবাস–এই হলো বর্ষার নন্দনতত্ত্ব। ফেসবুকে তখন একের পর এক স্ট্যাটাস, ‘আজ মনটা ভিজে গেল’, ‘বৃষ্টি মানেই তুমি’, ‘মেঘেরও বুঝি কষ্ট আছে!’ যেন দেশের সব নদী-নালা, খাল-বিল আর মানুষের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত প্রেমের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু যে বৃষ্টিকে মধ্যবিত্ত ‘রোমান্স’ বলে, গরিব মানুষ তাকে বলে ‘সর্বনাশ’। একজনের কাছে বর্ষা মানে জানালার কাচে জলবিন্দু, আরেকজনের কাছে ঘরের ভেতরে হাঁটুসমান পানি। একজন বৃষ্টি দেখে কবিতা লেখেন, আরেকজন ভিজে যাওয়া চাল শুকানোর জায়গা খোঁজেন। একজনের কাছে বৃষ্টি মানে খিচুড়ি, অন্যজনের কাছে সেদিন চুলায় আগুনই জ্বলে না।
ইতিমধ্যেই বর্ষা তার চিরচেনা রূপ দেখাতে শুরু করেছে। টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ প্রায় ১৮টি জেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ধসে উখিয়া, টেকনাফ, বান্দরবানসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। কোথাও রেললাইন পানির নিচে, কোথাও সড়ক নদীতে পরিণত হয়েছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি। প্রকৃতি যেন প্রতি বছর একই প্রশ্নপত্র দেয়, কিন্তু আমরা প্রতি বছরই ফেল করি।
বন্যার পানির একটা অদ্ভুত গণতন্ত্র আছে। সেটা ধনী-গরিবের ভেদাভেদ মানে না। তবে কষ্টের বণ্টনে বৈষম্যটা ঠিকই থেকে যায়। গুলশানের মানুষ জলাবদ্ধতা নিয়ে ফেসবুকে ক্ষোভ ঝাড়েন, আর গ্রামের মানুষ নৌকায় করে গরু, বাচ্চা আর চালের বস্তা সরিয়ে নেন। শহরে পানি উঠলে সেটি ‘ওয়াটার লগিং’; গ্রামে উঠলে সেটি ‘দুর্যোগ’।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। পরীক্ষার্থীরা কেউ স্বস্তি পেয়েছে, কেউ আবার দুশ্চিন্তায় পড়েছে। তবে বন্যা কখনো পরীক্ষা স্থগিত করলেও জীবন নামের পরীক্ষাটা এক দিনের জন্যও স্থগিত করে না।
এদিকে শহুরে সৌখিন মধ্যবিত্ত ঘরে বসে বর্ষা উপভোগ করছেন। জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখা, হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ, পেছনে রবীন্দ্রসংগীত–এই দৃশ্য এখন প্রায় নাগরিক সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু যাদের জানালাই নেই, তারা বৃষ্টি দেখেন না; তারা বৃষ্টিতে ভিজে যান। যাদের ঘর টিনের, তারা বর্ষার সুর শোনেন না; তারা টিন ফুঁড়ে পানি পড়ার হিসাব করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে বর্ষার নন্দনতত্ত্বের চেয়ে বর্ষার অর্থনীতি অনেক বড়। পেটের দায়ে তাদের বের হতেই হয়। রিকশাওয়ালা, ভ্যানচালক, দিনমজুর, হকার–কারও জীবনে ‘রেইনি ডে’ বলে ছুটি নেই।
তাই বর্ষাকালে তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা হলো একটি ছাতা। এই ক্ষুদ্র বস্তুটিই মাথা, বাজারের থলে, মজুরির টাকা আর শেষ সম্বলটুকু একসঙ্গে বাঁচানোর চেষ্টা করে।
কান টানলে যেমন মাথা আসে, তেমনি ছাতার কথা উঠলেই মাথা হাজির। বর্ষাকালে এই সম্পর্ক আরও গভীর। কারণ বৃষ্টির দিনে মাথা আর ছাতা একে অপরের পরিপূরক, জামায়াত-এনসিপি জোটের মতো। ছাতা না থাকলে মাথা ভিজবে, মাথা ভিজলে সর্দি হবে, সর্দি থেকে জ্বর, আর জ্বর এলে মানুষ এমন সব সিদ্ধান্ত নেয়, যার মাশুল পরে পরিবার, অফিস, এমনকি দেশও দেয়। তাই ছাতা নিছক কাপড়ের তৈরি একটি বস্তু নয়; এটি মাথার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী, বর্ষার বডিগার্ড, আর অনেক সময় সংসারের শেষ প্রতিরক্ষা-কবচ।
মাথা নিয়ে মানুষের মাথাব্যথার শেষ নেই। শরীরের অন্য অঙ্গের বদলি মিললেও মাথার বদলি এখনো বিজ্ঞান দিতে পারেনি। হাত-পা ভাঙলে প্লাস্টার হয়, দাঁত উঠলে কৃত্রিম দাঁত বসে, চুল পড়ে গেলে উইগ পাওয়া যায়; কিন্তু মাথা হারালে আর কিছুই করার থাকে না। তাই যুগে যুগে মানুষ মাথা বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছে, আর ছাতা কিনতে দরদাম করেছে।
এই ‘হেড’-কে ‘শেড’ দেওয়ার জন্যই মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছাতা। চাকা, আগুন, ছাপাখানা, ইন্টারনেট–সবই সভ্যতার বিস্ময়। কিন্তু প্রবল বর্ষার দুপুরে এগুলোর কোনোটাই মাথা শুকনো রাখতে পারে না। সেই কাজটা একাই করে ছাতা। কত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছে, কত মতবাদ ইতিহাসের ডাস্টবিনে গেছে, কত নেতা নির্বাচনের পর হারিয়ে গেছেন; কিন্তু ছাতা আজও সমান জনপ্রিয়। গণতন্ত্র কখনো ভিজে যায়, অর্থনীতি ডুবে যায়, রাস্তা নদী হয়ে যায়, কিন্তু ছাতার চাহিদা কখনো কমে না।
কবিও তাই বোধহয় অকারণে লেখেননি-
পেটের উপর বুকের বসতি,
বুকের উপর মাথা,
তাহারও উপর মুখের বসতি,
তাহারও উপর ছাতা।
সমাজে যাদের মাথার দাম যত বেশি, তাদের ছাতার দামও তত বেশি। গরিব কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা খেটে-খাওয়া মানুষ বছরের অর্ধেক সময় রোদে পোড়েন, বাকি অর্ধেক সময় বৃষ্টিতে ভেজেন। তাদের মাথা এতটাই অভ্যস্ত যে প্রকৃতিও যেন আর বিশেষ কষ্ট দিতে পারে না। তাদের মাথা রোদে-জলে এমন ওয়াটার ও হিটপ্রুফ হয়ে গেছে, যা কোনো বহুজাতিক কোম্পানিও বানাতে পারেনি।
কিন্তু মধ্যবিত্তের অবস্থা ভিন্ন। তারা মাথা খাটিয়ে খায়, মাথা বেচে চাকরি করে, মাথা নিচু করে ঋণের কিস্তি দেয়, আবার প্রয়োজনমতো মাথা উঁচু করে নীতি শেখায়। তাই তাদের মাথা বাঁচানোর জন্য ছাতা অপরিহার্য। আর উচ্চবিত্তের ছাতা তো একেকটা প্রায় সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। কারও ছাতা খুললেই বোঝা যায়, তার ব্যাংক ব্যালেন্সও সম্ভবত ছাতার ব্যাসার্ধের মতোই বড়।
আদি মানুষ গাছের পাতা দিয়ে মাথা ঢেকেছিল। তারপর এল বাঁশের কঞ্চির ছাতা, কাপড়ের ছাতা, প্লাস্টিকের ছাতা, ভাঁজ করা ছাতা, অটোমেটিক ছাতা, বোতাম টিপলেই ফুটে ওঠা ছাতা। সভ্যতা এগিয়েছে, ছাতাও আধুনিক হয়েছে। শুধু একটি জিনিস বদলায়নি, তা হলো, বাসে, ট্রেনে, অফিসে কিংবা আদালতে ছাতা ফেলে আসার জাতীয় অভ্যাস।
একসময় ছাতা দেখে মানুষ চেনা যেত। যার ছাতায় যত বেশি তালি, জীবনে তিনি তত বেশি ঝড়ঝাপটা সামলেছেন। নতুন ছাতার মালিকদের আবার ছাতা হারানোর অসাধারণ প্রতিভা থাকে। তারা সাধারণত কবি, প্রেমিক অথবা সরকারি কর্মকর্তা, যারা নিজের জিনিসের চেয়ে রাষ্ট্রীয় বা মহাজাগতিক বিষয় নিয়ে বেশি ভাবেন।
আর যাদের নিজের ছাতা নেই, অথচ প্রয়োজনমতো অন্যের ছাতার নিচে দিব্যি দাঁড়িয়ে যান, তাদের বিষয়ে একটু সাবধান থাকা ভালো। এরা জীবনে নিজের ঝুঁকি নেন না, কিন্তু অন্যের নিরাপত্তা ব্যবহার করতে ওস্তাদ। দলবদলকারী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে এদের আশ্চর্য মিল রয়েছে। বৃষ্টি নামলেই তারা বাতাসের দিক দেখে ছাতা বদলান।
আজকের যুগে সাফল্যের সবচেয়ে কার্যকর মন্ত্র সম্ভবত মেধা নয়, পরিশ্রমও নয়, ঠিক সময়ে ঠিক ছাতার নিচে দাঁড়াতে পারা। নীতি-নৈতিকতা আজকাল ছাতার কভারের সঙ্গে দেওয়া ওয়ারেন্টি কার্ডের মতো, কেউ পড়ে না, কেউ মানেও না। যোগ্য ছাতার তলায় আশ্রয় পেলে মামলা হালকা হয়, ঋণ ভারী হয়, লাইসেন্স সহজ হয়, পদোন্নতি দ্রুত হয়, আর প্রয়োজনে ইতিহাসও নতুন করে লেখা যায়।
সবশেষে দেখা যায়, এই দেশে সবারই কোনো না কোনো ছাতা আছে। শুধু নেই আমজনতার। তারা নিজেরাই যেন ব্যাঙের ছাতা; বর্ষায় হঠাৎ জন্মায়, রোদ উঠলে শুকিয়ে যায়, আর ক্ষমতার পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মিলিয়ে যায়। সরকার বদলায়, মন্ত্রী বদলায়, পতাকা বদলায়, ক্ষমতার ছাতার রং বদলায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের মাথার ওপর ছাতাটা আর ওঠে না!
পুনশ্চ: আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে ডাণ্ডা হিসেবেও ছাতা ব্যবহার হয়। আপদে-বিপদে জুতাপেটার মত ছাতাপেটাও মোটামুটি প্রচলিত। তবে ছাতার ব্যবহার ও গুরুত্ব যত বিচিত্রই হোক না কেন, মূলত ছাতা হচ্ছে ‘হারানোর জিনিস’। পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বেশি হারানো যায় সম্ভবত ছাতা (এর খুব কাছেই রয়েছে কলম ও প্রেমিকা)। বাঙালির আশার মত ছাতাও ‘এই আছে এই নেই’। ছাতা হারানো নিয়ে কত কেলেংকারি হতে পারে, সেটা অনুধাবন করতে তারাপদ রায় থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে:
প্রিয় মেঘনাদ বাবু,
গত শনিবার রাতে খুব বৃষ্টির সময় আমাদের বাড়ি থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য আমাদের বাসার কাজের ছেলেটি পাশের বাড়ি থেকে যে ছাতাটি আপনাকে চেয়ে এনে দিয়েছিল, সেই ছাতাটি পাশের বাড়ি ভদ্রলোক আজ চাইতে এসেছেন। ভদ্রলোক বললেন, ছাতাটি তিনি অফিসের বড়সাহেবের কাছ থেকে চেয়ে এনেছিলেন। বড়সাহেবের ভায়রাভাই খুব চাপ দিচ্ছেন ছাতাটির জন্য, কারণ বড়সাহেবের ভায়রাভাই যে বন্ধুর কাছ থেকে ছাতাটি আনেন, সেই বন্ধুর মামা তার ছাতাটি ফেরত চাইছেন। ছাতাটি পত্রবাহকের হাতে ফেরত দিয়ে বাধিত করবেন!
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও গবেষক

ফ্রান্স তো রীতিমতো অজেয়! এবারের বিশ্বকাপে আসলে ফ্রান্সকে হারাবে কে? যদিও ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়নদের মূল পরীক্ষা এখনো বাকি, এমবাপ্পে, দেম্বেলেদের ফ্রান্সের ব্যাপারে ‘অজেয়’ শব্দটা ব্যবহার করা কিছুটা আগ বাড়িয়ে বলার মতোই, তবুও এখনো পর্যন্ত যে ফ্রান্সকে আমরা দেখছি, সেই ফ্রান্স প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়েই এ পর্

চীনে সি চিনপিংয়ের শাসনামলে সংস্কারের যুগের অবসান ঘটেছে। এই বিষয়টি খুব একটা আশ্চর্যজনক নয়। তবে অনেকের কাছে যা সত্যিই আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে তা হলো, সি চিনপিং নিজেই ক্রমাগত এই কথাটি প্রকাশ্যে বলে যাচ্ছেন। গত ১ জুলাই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর