ads

ঢাকা: ইতা আমরা কিতার মইধ্যে ট্যাহা ঢালতেসি!

ঢাকা: ইতা আমরা কিতার মইধ্যে ট্যাহা ঢালতেসি!
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সাম্প্রতিক কালের ঘটনা। ঘটনাস্থল রাজধানী ঢাকার এক ব্যস্ত সড়ক। রাত ৯টার বেশি বাজে। রিকশা চলছে, ব্যাটারিচালিত। বরং এটা বলা ভালো যে, রিকশার রেলগাড়ি চলছিল। বাড়ি ফেরার তাড়ায় আছে অনেক যাত্রী।

ঠিক সেই সময় হুট করেই গতিশীল একটি রিকশা ব্রেক ধরল। অমনি পেছনের রিকশার সামনের চাকা গিয়ে সজোরে ধাক্কা খেল সামনের রিকশার পেছনে। যেহেতু ব্যাটারি দিচ্ছে গতির জোগান, সেহেতু ধাক্কাটাও বেশ জোরেশোরেই হলো। এতটাই যে, এই অভাগার বাম পা গিয়ে ধাক্কা খেল পাদানিতে। তাতে আঙুলটা ব্যথায় প্রায় ফুলে ওঠার জোগাড়। ভাগ্য ভালো যে, রিকশার হুডের হাতল শক্ত করে ধরে রাখা ছিল। এতে আর কপালে বা মাথায় ব্যথা পেতে হয়নি।

ওদিকে টানা তিন-চারটি রিকশার যাত্রীরই অবস্থা তখন বেগতিক। এক রিকশা আবার ধাক্কা দিয়েছে আরেক গাড়ির পেছনে। সব মিলিয়ে যাত্রী ও চালকদের চিৎকার, চেঁচামেচিতে এক হুলুস্থুল কাণ্ড।

তা, কেন এমন হলো? জানা গেল, অগ্রবর্তী ব্যাটারি রিকশা ব্রেক কষেছিল রাস্তার গর্ত বুঝে। ওই গর্ত আবার বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর। চাকা পড়লে রিকশা উল্টে যায় কিনা, সেই ভয়ে চালক ব্রেক ধরেন জোরে। পেছনের আরেক রিকশার চালক তা বুঝতে পারেননি, তার পেছনের গাড়িও বোঝেনি। ফলে সবাই সবার পেছনে গিয়ে একের পর এক ধাক্কা দেয়।

ব্যাটারি রিকশার কথা যখন এলোই, তখন আরেকটু বিস্তারিত যাওয়া যাক। ঢাকার রাস্তা এখন ভরে গেছে হরেক রকমের ব্যাটারিচালিত রিকশায়, যেগুলো পরিচিতি পেয়েছে ‘বাংলার টেসলা’ নামে। এগুলো এত মডেলেরই আছে যে, চাইলে ভাড়া করার সময় যাত্রীরা সুবিধা, অসুবিধা বুঝে বাছাইও করতে পারেন। এসবের গতি তৈরি করে ব্যাটারির বিদ্যুৎ, কিন্তু অধিকাংশেরই গতি থামানোর জন্য আছে সাধারণ পায়ে টানা রিকশার হ্যান্ডব্রেক। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্রেক ঠিকমতো ধরাই যায় না, চাকা থামে না ঠিক সময়ে। ওপরের দুর্ঘটনার পেছনে এটিও একটি কারণ বটে।

আর এসবের বাইরেও ‘বাংলার টেসলা’ যে প্রতিদিন কত ধরনের দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। বেপরোয়া গতি, ব্রেক ধরে না ঠিকমতো, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, রিকশার মনোহারী মডেল ইত্যাদি অনেক কিছুই দায়ী এসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে। আবার এসব ‘টেসলা’ আইনের দৃষ্টিতে বৈধও নয়। এ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তও একেক সময় একেক রকম। মাঝখানে বিপদে আছে যাত্রী সাধারণেরা। তাদের ব্যবহারও করতে হচ্ছে, আবার দুর্ঘটনায় পড়লে তার হ্যাপাও নিতে হচ্ছে।

যানবাহনের প্রসঙ্গ এলে গণপরিবহনের কথাও আসে। ঢাকা একটা রাজধানী শহর। এর দুটো সিটি করপোরেশন আছে। অথচ এই শহরের গণপরিবহনের অবস্থা দেখলে মনে হবে, কোনো গঞ্জ, গাঁ যেন! বেশির ভাগ পাবলিক বাস মুড়ির টিন। সেসব টিনে অনেক ছিদ্র! এসবের মধ্যে অনেকগুলো নানা নামে চলে। কেউ গেইট লক, কেউ ঘোষণা দিয়ে গেইট ওপেন। তবে রাস্তায় চলা নাগরিকদের পক্ষে সেসব নাম দেখে পরিবহনের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে পাবলিক বাস চলে ফিটনেস ছাড়াই মা-বাবার দোয়ায়! নাগরিকেরা শুধু কর্তৃপক্ষীয় নানা ঘোষণা শোনে নানা সময়। এই হয়ে যাচ্ছে, সেই হয়ে যাচ্ছে! তবে দিনের শেষে ওই কপাল চাপড়ানোই নাগরিক-কর্তব্য যেন।

দেখুন, এক রাস্তার গর্ত থেকে কত কথায় যাওয়া গেল। সবগুলোই আবার একটা আরেকটার সাথে যুক্ত। অবশ্য এখনও অনেক প্রসঙ্গে যাওয়া হলো না। থাক, সেসব শোনার আগে একটু প্রসঙ্গান্তর করে জিরিয়ে নেওয়া যাক। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে এত এত দুরবস্থা দিয়ে বিশ্বের বুকে জায়গা করে নিচ্ছে আমাদেরই ঢাকা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচক ২০২৬-এ টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে কম বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় তলানির দিকে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। বিশ্বের মোট ১৭৩টি দেশের প্রধান শহরের ওপর করা এই জরিপে ঢাকার অবস্থান এবার ১৭১তম। ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক এবং লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি।

প্রতি বছর স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো–এই পাঁচটি প্রধান মানদণ্ড বিবেচনা করে এই বৈশ্বিক সূচক প্রকাশ করে ইআইইউ। চলতি বছরের সূচকে ১০০ নম্বরের মধ্যে ঢাকার সার্বিক স্কোর এসেছে মাত্র ৪২। বিভিন্ন ক্যাটাগরির মধ্যে ঢাকা সবচেয়ে খারাপ করেছে অবকাঠামো খাতে, যেখানে স্কোর মাত্র ২৭। এ ছাড়া সংস্কৃতি ও পরিবেশ ক্যাটাগরিতে ৪১, স্বাস্থ্যসেবায় ৪২, স্থিতিশীলতায় ৪৫ এবং শিক্ষা খাতে ঢাকা সর্বোচ্চ ৬৭ স্কোর করেছে। সাধারণত তীব্র যানজট, উচ্চ জনঘনত্ব এবং অপরাধপ্রবণতার মতো নাগরিক সংকটের কারণেই এই বড় শহরগুলোর বাসযোগ্যতার সূচক এত নিচে নেমে যায়।

খেয়াল করুন, অবকাঠামো খাতেই ঢাকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এতটাই খারাপ যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শহর কিয়েভও ঢাকার চেয়ে এগিয়ে আছে। তাহলে কি ঢাকার রাস্তায় মিসাইল, বোমা পড়ে নিয়মিত?

ঢাকার গত কয়েক বছরের সূচক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহরের বাসযোগ্যতার ধারাবাহিক কোনো টেকসই উন্নতি হয়নি, বরং দিন দিন এর অবনমন ঘটেছে। ২০২১ সালে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৩৭তম, যেখানে করোনা মহামারির কারণে স্বাস্থ্যসেবার স্কোর নেমেছিল মাত্র ১৬.৭-এ।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

২০২২ সালে মহামারি-পরবর্তী পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে ১৭২টি শহরের মধ্যে ঢাকা ১৬৬তম অবস্থানে আসে। ২০২৩ সালে শিক্ষা খাতে ভালো করার পরও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ঢাকার অবস্থান ১৬৬তমই থেকে যায়। এরপর ২০২৪ সালে শিক্ষা খাতের স্কোর কমে যাওয়ায় ঢাকার অবস্থান আরও পিছিয়ে ১৬৮তম হয়।

পরে ২০২৫ সালে শহরের ‘স্থিতিশীলতা’ স্কোর বড় ধাক্কা খেয়ে ৪৫-এ নামে, যা ঢাকাকে বিশ্বের তৃতীয় অবাসযোগ্য শহর হিসেবে ১৭১তম অবস্থানে নামিয়ে দেয়। চলতি ২০২৬ সালেও আগের সেই ৪২ স্কোরেই আটকে থাকায় পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি।

বোঝেন তাহলে, বিশ্বমঞ্চে কীভাবে নাম উজ্জ্বল করছে আমাদের ঢাকা! এসবই তো শুধু না, এই শহরের বায়ুর মানেরও ‘মুড সুইং’ হয় অহরহ। নিয়মিত বিরতিতে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকার শীর্ষে উঠে যায় ঢাকা। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) স্কোর দিয়েই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকা তৈরি হয়। তাতে প্রায়ই দিল্লি, জাকার্তাকে বলে-কয়ে হারায় ঢাকা।

অথচ, এই শহরে থাকা মানুষেরা কর দিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত, এখানে টাকা খরচ করছে। ঢাকায় থাকা নাগরিকেরা বাড়ি ভাড়া দেয়, পানির বিল দেয়, গ্যাসের বিল দেয়, বিদ্যুতের বিল দেয়, দেয় আরও নানা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কর। সেসব থেকে সরকার আয় করে দেদারসে। এর বাইরে নানামাত্রিক ভ্যাট তো আছেই। রাজধানী ঢাকার নাগরিকদের খরচ এতই বেশি যে, ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘মার্সার কস্ট অব লিভিং সার্ভে’ অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা। এ তালিকায় ১৪০ নম্বরে ছিল ঢাকা, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। বিভিন্ন শহরের অন্তত ২০০টি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে এই তালিকা প্রস্তুত করেছিল মার্কিন ফিন্যান্সিয়াল সার্ভে কোম্পানি মার্সার। বিবেচনার বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল পরিবহন, খাদ্য, পোশাক, গৃহস্থালী সামগ্রী ও বিনোদনের পেছনে ব্যয়।

তো, এত খরচের পর নাগরিকেরা যদি সীমাহীন ভোগান্তির মধ্যেই থাকেন, তাহলে লাভটা কী? বছর বছর বাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকা যদি তলানিতেই থাকে, তাহলে এত খরচ করে নাগরিকেরা কী পাচ্ছেন আসলে? তবে কি সিলেটি ভাষার সেই ভাইরাল মিমের মতো করে ঢাকার নাগরিকদের মনে হবে না যে–‘ইতা আমরা কিতার মইধ্যে ট্যাহা ঢালতেসি?’

হ্যাঁ, মনে হবে। সেটাই স্বাভাবিক। যদিও অধিক শোকে মন পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেলে ভিন্ন কথা। অবশ্য সেটি হবে নাই বা কেন? দিনের পর দিন, বছরের পর বছর একটি দেশের রাজধানী শহরের মান যদি সার্বিকভাবে কেবল নিচেই নামতে থাকে, তখন সাধারণ নাগরিকদের মনে আশা আসবে কোথা থেকে?

রাজধানীর বাসিন্দাদের হতাশা তাই আকাশছোঁয়া, যা আবার মহাকাশও ছুঁতে চায় প্রায়শই। যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের বাসিন্দারাও এক্ষেত্রে ঢাকার নাগরিকদের চেয়ে এগিয়ে, অন্তত আন্তর্জাতিক সূচক তাই বলে। আর আমরা, ঢাকার হতভাগ্য নাগরিকেরা প্রতিদিন এই শহরের হাজারো প্রতিবন্ধকতা সামলে চলতে চলতে শুধু বিড়বিড় করে বলতে থাকি–‘ইতা আমরা কিতার মইধ্যে ট্যাহা ঢালতেসি!’

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত